পানি থেকে তীরে উঠে রঙিন স্বপ্ন দেখছে বেদেরা

পানি থেকে তীরে উঠে রঙিন স্বপ্ন দেখছে বেদেরা

শামীম আহমেদ, বরিশাল ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৫:৪৪ ২৮ এপ্রিল ২০২১  

বেদে সম্প্রদায়ের উন্নত জীবনযাপনের ছবি

বেদে সম্প্রদায়ের উন্নত জীবনযাপনের ছবি

ভেসে ভেসেই জীবন চলত তাদের। জন্ম, মৃত্যু, বিয়ে- সবই হতো পানিতে। ২৫-৩০টি নৌকা- প্রতিটি নৌকায় একেকটি বেদে পরিবার ভেসে চলত বিভিন্ন স্থানে। কোনো গ্রামে ৭-১০ দিন থাকত, সাপ ধরা-খেলা দেখান, সিংগা লাগিয়ে ঝাড়-ফুঁক দেয়া, তাবিজ বিক্রি করত। এভাবেই আসত তাদের জীবিকা।

সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন এসেছে বেদে সম্প্রদায়ের জীবনধারায়। পানি ছেড়ে এখন তারা উঠে এসেছে স্থলে। জমি কিনে স্থায়ী আবাস গড়ছে তারা। এরই মধ্যে অধিকাংশ বেদে পূর্ব-পুরুষদের পেশা পরিবর্তন করেছে। সাপ ধরা কিংবা খেলা দেখান বাদ দিয়ে ক্ষুদ্র বাণিজ্য, মাছ ধরা, দিনমজুরিসহ বিভিন্ন পেশায় নিজেদের স্থায়ী করে নিয়েছে পুরুষ বেদেরা। নারী বেদেরাও পুরোনো পেশা ছেড়ে কাজ করছে বিভিন্ন বাসা-বাড়িতে।

পেশার পরিবর্তনের মাধ্যমে বেদে সম্প্রদায় স্বপ্ন দেখছে সুন্দর জীবনের। অনেকের ছেলে-মেয়ে এখন পড়াশোনায় আগ্রহী হচ্ছে- ভর্তি হচ্ছে স্কুল-কলেজে। আবার নিজ সম্প্রদায়ের ছেলেদের জন্য বউ হিসেবে আনছে গৃহস্থের মেয়েদের। একই সঙ্গে নিজ সম্প্রদায়ের মেয়েদের বিয়ে দিচ্ছে গৃহস্থ বাড়িতে। বেদে সম্প্রদায়ের অনেক যুবকই উন্নত জীবনের আশায় পাড়ি জমিয়েছে বিদেশে।

বরিশালের আড়িয়াল খাঁ নদীর শাখা পালরদী নদীর তীরবর্তী গৌরনদী পৌর এলাকার ২ নম্বর ওয়ার্ড টরকী চর এলাকায় রয়েছে এমনই একটি স্থায়ী বেদে পল্লী। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ৩৫ বছর ধরে নদীর তীরে জমি কিনে স্থায়ীভাবে বসবাস করছে শতাধিক বেদে পরিবার। বিগত সময়ে নিজের জীবনমানের উন্নয়ন করেছে সহস্রাধিক বেদে। কারো ছেলে বিদেশে গেছে, কেউ পাকা বাড়ি করে স্থায়ী হয়েছে, মেয়ের বিয়ে হয়েছে গৃহস্থ বাড়িতে।

এদিকে সরেজমিনে দেখা গেছে, বেদে সম্প্রদায়ের স্থায়ী জীবনযাপন মেনে নিতে পারছে না কয়েকজন প্রভাবশালী। বেদে পল্লীর বাসিন্দাদের নানাভাবে হয়রানি করে এলাকা ছাড়তে বাধ্য করছে তারা।

বেদে পল্লীর বাসিন্দারা জানায়, এ পল্লীর প্রায় অর্ধশতাধিক শিশু স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে। এছাড়া ২০-২৫ জন ছেলে-মেয়ে হাই স্কুল ও কলেজে পড়ছে। এমনকি প্রায় ৫০০ বেদে এখানকার ভোটার। অথচ তাদের বিতাড়িত করতে উঠে পড়ে লেগেছে একদল প্রভাবশালী। ভাঙা সড়ক ঠিক করা হচ্ছে না, কবরস্থান নির্মাণ করা হচ্ছে না। বারবার দাবি জানিয়েও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে না তারা।

তারা আরো জানায়, বেদে পল্লীর বাসিন্দারা প্রভাবশালী ওই চক্রের বিরুদ্ধে একাধিকবার প্রতিবাদ জানিয়েছে। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে তারা নতুন নতুন কৌশলে হয়রানি ও নানা অপপ্রচার চালাচ্ছে। এ অবস্থায় প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছে অসহায় বেদে পল্লীর বাসিন্দারা।

টরকীচরের বেদে পল্লীর লালন খানের স্ত্রী তমা বেগম বলেন, আমি ২০ বছর আগে সাপ ধরা, খেলা দেখান, সিংগা লাগান, তাবিজ বিক্রির কাজ ছেড়ে দিয়েছি। আমার স্বামী এখন ব্যবসা করেন। ছেলে-মেয়েরাও পড়াশোনা করছে। সন্তানদের উচ্চশিক্ষা দিয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই। সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকতে চাই।

এ বিষয়ে গৌরনদী মডেল থানার ওসি মো. আফজাল হোসেন বলেন, বেদে পল্লীর বাসিন্দারা হয়রানির বিষয়ে কোনো অভিযোগ করেনি। লিখিত অভিযোগ পেলে গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

গৌরনদীর ইউএনও বিপিন চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, বেদে সম্প্রদায়ের জন্য সরকার বিশেষ কোটা বরাদ্দ করেছে। টরকীচরের বেদে পল্লীর বাসিন্দারা যেন কোটা সুবিধা থেকে বঞ্চিত না হয় সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। শিগগিরই বেদে পল্লী পরিদর্শন করে তাদের সমস্যাগুলো চিহ্নিত ও সমাধান করা হবে।

ডেইলি বাংলাদেশ/এআর