প্রমত্তা আড়িয়াল খাঁ এখন মরা খাল 

প্রমত্তা আড়িয়াল খাঁ এখন মরা খাল 

প্রদীপ কুমার দেবনাথ, বেলাব (নরসিংদী) প্রতিনিধি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৪:৫০ ১৯ এপ্রিল ২০২১   আপডেট: ১৫:১০ ১৯ এপ্রিল ২০২১

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

‘আড়িয়াল খাঁ’ নামে বাংলাদেশে মোট তিনটি নদী আছে তার মধ্যে নরসিংদী জেলায় দুটি ও অন্যটি ফরিদপুর জেলার পদ্মা নদী থেকে উৎপত্তি হয়ে মাদারীপুর জেলা হয়ে বরিশালের কীর্তনখোলা নদীতে গিয়ে মিশেছে অপরটি। নরসিংদীর বেলাব উপজেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া আড়িয়াল খাঁ নদীটি নরসিংদী ও কিশোরগঞ্জের মনোহরদী  ও কটিয়াদি বাজার এলাকায় পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ থেকে উৎপন্ন হয়েছে। পরে এটি মনোহরদীর পূর্ব পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ওয়ারী বটেশ্বর এলাকার পূর্ব পাশ দিয়ে বেলাব অতিক্রম করে  আমিরগঞ্জে শিবপুর থেকে আগত আরেকটি ছোট "উপনদী আড়িয়াল খাঁ" নদীর সঙ্গে মিলিত হয়ে নরসিংদীর মেঘনা নদীতে গিয়ে পতিত হয়েছে। 

তবে বেলাববাসীদের জন্য িএকসময়ের খরস্রোতা আড়িয়াল খাঁ নদী এখন কেবলই স্মৃতি। কয়েক দশকে বিভিন্ন কারণে জোয়ার-ভাটার প্রতিবন্ধকতার ফলে আড়িয়াল খাঁ এখন মৃতপ্রায়। পোড়াদিয়া বাজার থেকে উজিলাব পর্যন্ত ১০ কিলোমিটারের মধ্যে নদীটির উপরে রয়েছে ৬টি ব্রিজ। যা এই নদীর গতিপথকে অনেকটাই সংকোচিত করেছে। অপরিকল্পিত ইটভাটা, ভূমিদস্যুদের দখলদারিত্ব নদীটির গতিপথে ব্যাপক বাধা সৃষ্টি করেছে। 

তবে বর্তমানে ​সরকারি পৃষ্টপোষকতায় সেচ কাজের সুবিধার্থে  সরু খাল খননের ফলে এর অস্তিত্ব টিকে আছে। কিন্তু মূল গতিপথ দিয়ে খনন না করায় এর সুফল পাচ্ছে না কৃষক। তাছাড়া নদীর তীর সংলগ্ন ইটভাটা, বিভিন্ন স্থাপনা এর দৈর্ঘ্য সংকুচিত করে ফেলেছে। কোনো কোনো স্থানে অস্তিত্ব নেই খালটিরও। অথচ কয়েক দশক আগেও এ নদীর যৌবনে আকর্ষিত হয়ে গড়ে উঠতো বাজার, বসতি।

বর্ষায় নদীতে খর স্রোতের কারণে নদীর দুই পাড়ের ভাঙনে বালুর চর পড়ে নদীটি আজ মৃত প্রায়। উজানে কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ার এগারসিন্দুর এলাকা ও গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার টোক বাজারের কাছে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের মোহনায় চর পড়ে নদীতে পানি প্রবাহ কমে যাওয়ায় ও পানি শূন্যতায় নদীর জীব বৈচিত্র্য আজ বিলীন হতে চলেছে। অথচ এক সময় আড়িয়াল খাঁ নদীর দুই কুল ছাপিয়ে পানি প্রবাহিত হতো, বর্ষায় নদীতে ভাসতো লঞ্চ স্টিমার, বর যাত্রী বহনকারী গহনা, কুষা, ডিঙি, পাথরবাহী পাতাল, ধান, মিষ্টি আলু, তরি তরকারি ও কাঁঠালবাহী পাল তোলা লাল সরেঙা নৌকা, মালামাল পরিবহন হতো এক বন্দর থেকে অন্য বন্দরে, এক ঘাট থেকে আরেক ঘাটে।

কয়েক বছর আগেও মৌসুমী ব্যবসায়ীরা সিলেট অঞ্চলের হাওরের ধান ও কুমিল্লার মিষ্টি আলুবোঝাই লাল সরেঙ্গা নৌকা নিয়ে আসতো পোড়াদিয়া, বটতলা, রাধাখালি, বেলাব বাজার ঘাটে। ফিরে যাওয়ার সময় বেলাবরের লাল মাটির মৌসুমী মিষ্টি রসালো ফল আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, কলা, আনারস, বাঙ্গি, লটকন, জামবুড়া, ফেলা, তেঁতুল, জলপাই, কামরাঙা, আতা ফল, বেল, টাটকা সবজি, হলুদ, মরিচ, ধনিয়া, পেঁপে এবং জালে ও নৌকায় রঙ দেয়ার জন্য কাঁচা গাব নিয়ে যেতো নৌকা ভরে। এলাকার কৃষকরাও সিলেটি পাইকারদের অপেক্ষা করতো। নাব্য হারানোর কারণে আজ সবই হারিয়ে গেছে। বাহারি জাতের সুস্বাদু মাছ, জীববৈচিত্র্য হারিয়ে যাচ্ছে।

নদীর দুই পাড়ের খাল বিলগুলো পানির অভাবে শুকিয়ে শুষ্ক মাঠে পরিণত হয়েছে। অথচ একসময় এখানকার বদ্ধ পানির শিং, কই, মাগুর, শোল, বোয়াল, কাল বাউশ, কার্ফু, টাকি, টেংরা, চিংড়ি ও অন্যান্য মাছ জোগান দিতো দুই পাড়ের মানুষের নির্ভেজাল মুখরোচক আমিষ-প্রোটিনের চাহিদা। 

পানির অভাবে শুকিয়ে গেছে বদ্ধ পানির শত শত টন মাছের জোগানদাতা বিখ্যাত কুডির বিল, কেন্দির বিল, বগাধরের বিল যার উপর নির্ভর করতো শত শত জেলে পরিবার, এই বিলগুলোতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতো জেলেরা। আড়িয়াল খাঁ'র দুই পাড়ের খাল, বিল, পুকুর ও নদী সংলগ্ন বালুচর ছিল গবাদির পশুর চারণভূমি। রবি মৌসুমে দুই পাড়ের কৃষকরা আলু, সবজি, মশলা, বাদাম, তিল, তিশি, সরিষা ইত্যাদি চাষ এখন পানির অভাবে বন্ধ। নদী বন্ধনে গড়ে উঠা নদী তীরের সেই সিলেটের আঞ্চলিক গান, ধামাইল, ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালি, জারি, সারি, লোকনাট্য, যাত্রাপালা সবকিছু আজ বিলীন হয়ে গেছে। 

স্থানীয় মুসা মিয়া বলেন, দখলদাররা জমি দখলের পর মাটি ভরাট করে নদীর গতিপথ পরিবর্তন করে ফেলেছে। আর ইটভাটার মাটি, কনা, ইট নদীর পানি চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে।

ভুক্তভোগী মালেক মিয়া বলেন, নদীর পাড়ে বিশাল চর জেগে ওঠায় আমি পানির অভাবে কয়েক বিঘা জমিতে কোনো ফসলই করতে পারিনি। আবার ইট ভাটাও আটকে দিয়েছে পানি চলাচল। আমরা এর প্রতিকার চাই। 

জেলে নিতাই বলেন, এই নদীর মাছ বিক্রি করে চলতো আমার পরিবার। এখন শুকনো মৌসুমে পানি না থাকায় মাছ নেই। আমার পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছি। 

ইউএনও মো. আক্তার হোসেন শাহিন বলেন, আমিও লক্ষ্য করেছি এখানকার সব বড়-ছোট হাট-বাজার আড়িয়াল খাঁ কেন্দ্রিক। তাই বর্যাকালসহ সারা বছর নৌ-যোগাযোগ যেন স্বাভাবিক রাখা যায়, আমি সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে ব্যবস্থা গ্রহণ করব।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএস/জেএইচ