মেডিকেলে চান্স পেয়েও ভর্তি অনিশ্চিত রাবেয়ার

বাবা সিঙ্গারা বিক্রেতা

মেডিকেলে চান্স পেয়েও ভর্তি অনিশ্চিত রাবেয়ার

কুষ্টিয়া প্রতিনিধি   ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৬:৩০ ৭ এপ্রিল ২০২১   আপডেট: ১৬:৪৯ ৭ এপ্রিল ২০২১

বাবা মায়ের পাশে রায়েয়া আক্তার রুমি

বাবা মায়ের পাশে রায়েয়া আক্তার রুমি

সিঙ্গারা বিক্রেতা হতদরিদ্র রমজান আলীর মেয়ে রায়েয়া আক্তার রুমি এ বছর রংপুর মেডিকেল কলেজে পড়ার সুযোগ পেয়েছেন। 

প্রবল ইচ্ছা শক্তি, অদম্য মেধা ও পরিশ্রমের ফলে দরিদ্র পরিবারে জন্ম নিয়েও দমে যায়নি রুমি। পড়ালেখার মাধ্যমে মেধার স্ফূরণ ঘটিয়েছেন রুমি। তবে মেডিকেলে চান্স পেয়েও তার মুখের হাসি মলিন হয়ে গেছে। অর্থের অভাবে মেডিকেলে ভর্তি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে তার।

রুমি কুমারখালী পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের শেরকান্দি গ্রামের রমজান আলীর বড় মেয়ে। তারা দুইবোন ও একভাই। ছোটবোন সপ্তম ও ছোটভাই প্রথম শ্রেণিতে পড়ালেখা করে। 

২০১৮ সালে কুমারখালী এমএন পাইলট মডেল হাই স্কুল থেকে গোল্ডেন এ প্লাস পেয়ে এসএসসি এবং কুমারখালী কলেজ থেকে ২০২০ সালে গোল্ডেন এ প্লাস পেয়ে এইচএসসি পাস করেন রুমি। 

এমবিবিএস ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি পরীক্ষায় সবাইকে তাক লাগিয়ে রাবেয়া আক্তার রুমি রংপুর মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন। তার এই সাফল্যের সংবাদে আনন্দ উৎসবের আমেজ বইছে কুমারখালীর উপজেলায়। তার বন্ধু-বান্ধব ও সহপাঠীদের ফুলেল শুভেচ্ছায় সিক্ত হচ্ছেন রুমি। বাড়িতে ছুটে আসছেন গর্বিত শিক্ষক, আত্মীয়স্বজন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা।

চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে মহামারী করোনা পরিস্থিতিতে গত কয়েকমাস নিজ বাড়িতেই রাতদিন কঠোর পরিশ্রম করে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করেন তিনি।  

রাবেয়া আক্তার রুমি বলেন, ছোটবেলা থেকে স্বপ্ন ছিল চিকিৎসক হওয়ার। মহান আল্লাহ সেই সুযোগ আমাকে করে দিয়েছেন। রংপুর মেডিকেলে চান্স পেয়েছি। এজন্য আল্লাহর কাছে হাজারো শুকরিয়া। দেশবাসীর কাছে দোয়া চাই, যেন ভালোভাবে পড়াশোনা শেষ করে ভালো চিকিৎসক হতে পারি। 

রুমি বলেন, বাবা সিঙ্গারা বিক্রি করেন। প্রতিদিন দুপুর থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত কুমারখালী গোডাউন বাজার এলাকায় ফুটপাতে ভ্যানে করে সিঙ্গারা বিক্রি করেন। সব সিঙ্গারা বিক্রি করে যা আয় হয় তা দিয়ে সংসার চলে না। খুব কষ্ট করে আমার লেখাপড়া চলে। স্কুল ও কলেজের শিক্ষকরা আমাকে সার্বিক সহযোগিতা করেছেন। কলেজের বড় ভাইয়েরা আমাকে পুরাতন বই দিয়েছেন পড়ার জন্য। এছাড়াও তারা খুব সহযোগিতা করেছেন। মেডিকেলে পড়ালেখা করতে অনেক টাকা দরকার তা আমার বাবার পক্ষে বহন করা সম্ভব না। সরকারের কাছে সহযোগীতা কামনা করছি। তা না হলে আমার পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। 

মেডিকেলে পড়ার সুযোগ পাওয়ার পর খুব দুশ্চিন্তা হচ্ছে।  কিভাবে পড়ালেখার খরচ চালাবো বুঝতে পারছিনা। আমার বাবার পক্ষে সেই খরচ চালানো সম্ভব না।  

রুমির বাবা রমজান আলী বলেন,  সিঙ্গারা বিক্রি করে কোনোমতে খেয়ে না খেয়ে দিন পার করছি। মেয়েকে ভর্তি করাবো কিভাবে, তা বুঝে উঠতে পারছি না। করোনার মধ্যে বেচা-কেনা কম। এজন্য এক বছরে অনেক টাকা ধারদেনাও করতে হয়েছে মানুষের কাছ থেকে। এই অবস্থায় মেয়ের পড়াশোনার খরচ চালানো আমার পক্ষে সম্ভব না। 

আমার বিশ্বাস সরকারের সহযোগিতায় আমার মেয়ে একদিন বড় ডাক্তার হয়ে বের হয়ে আসবে। গরিবের কষ্ট বুঝবে। বিনামূল্যে গরিবের চিকিৎসা সেবা দেবে। 

স্থানীয় এলাকাবাসী জানান, রুমির পরিবার খুবই দরিদ্র।  তার বাবা ফুটপাতে চপ সিঙ্গারা বিক্রি করেন। যা আয় হয় তা দিয়ে কোনো রকম তাদের সংসার চলে। সরকারের উচিত মেধাবী শিক্ষার্থী রুমির পড়ালেখার দায়িত্ব নেয়া।  

কুমারখালী উপজেলার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর জুলফিকার আলী হিরো বলেন,  রুমির বাবা ফুটপাতে ভ্যানে করে চপ সিঙ্গারা ব্যবসা করেন। ওই ব্যবসার করে কোনো রকমে তাদের সংসার চলে। দিন আনা দিন খাওয়া অবস্থায় তাদের।  

অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী না হওয়ায় তার বাবা মেয়েকে নিয়ে এখন টেনশনে পড়েছেন।  মেডিকেলে পড়াশোনা করতে অনেক খরচ। সেই খরচ তার বাবার পক্ষ থেকে চালানো সম্ভব না। দরিদ্র অদম্য মেধাবী মেয়েটির পড়াশোনার দায়িত্ব সরকারের নেয়া উচিৎ। 

কুমারখালী কলেজের ভাইস-চ্যান্সেলর বিনয় কুমার সরকার বলেন, রুমি রংপুর মেডিকেল কলেজে চান্স পেয়েছে। কলেজের পক্ষ থেকে সার্বিক সহযোগিতা করেছি।  

মেয়েটির পরিবার দরিদ্র। তার বাবা ফুটপাতে সিঙ্গারা বিক্রি করেন। সরকারের পক্ষ থেকে মেয়েটির লেখাপড়ার দায়িত্ব নিলে হয়ত সে একদিন দেশ সেরা চিকিৎসক হতে পারবে। 

কুমারখালীর ইউএনও রাজিবুল ইসলাম খান বলেন, রুমি নামে কুমারখালী কলেজের একজন মেধাবী মেয়ে রংপুর মেডিকেল কলেজে চান্স পেয়েছে বলে জানতে পেরেছি। অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল হলে সরকারের পক্ষ থেকে তাকে সহযোগিতার চেষ্টা করা হবে। টাকার অভাবে কোনো মেধাবী শিক্ষার্থীর পড়াশোনা বন্ধ হবে না। বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখবো, অসচ্ছল ও মেধাবী ওই ছাত্রীর পড়ালেখার দায়িত্ব সরকারের পক্ষ থেকে নেয়া হবে।

ডেইলি বাংলাদেশ/এমকে