পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে সম্ভাবনা জাগাচ্ছে ছৈলারচর

পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে সম্ভাবনা জাগাচ্ছে ছৈলারচর

ঝালকাঠি প্রতিনিধি  ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৪:৪০ ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১   আপডেট: ১৫:০৪ ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১

ছৈলারচরের আধুনিকায়নে তৎপর উপজেলা প্রশাসন

ছৈলারচরের আধুনিকায়নে তৎপর উপজেলা প্রশাসন

বঙ্গোপসাগর থেকে মাত্র ৬০ কিলোমিটার নিকটবর্তী কাঁঠালিয়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের হেতালবুনিয়া মৌজায় বিষখালী নদীতে এক যুগেরও আগে ৩০. ৬১ একর জমি নিয়ে জেগে উঠেছে এক বিশাল চর। যেখানে রয়েছে লক্ষাধিক ছৈলা গাছ। সুন্দরবনের মতোই প্রাকৃতিকভাবে কাঠালিয়ার অবহেলিত চরাঞ্চলে বেড়ে উঠেছে এই ছৈলা গাছ। আর এ গাছের নাম থেকেই জেগে ওঠা চরটির নামকরণ করা হয়েছে 'ছৈলার চর'। 

শীতের সময় শুকনো চরে গহীন অরণ্য। চারপাশে নদীঘেরা যেন ছৈলা বনের দ্বীপ। দক্ষিণাঞ্চলের নৌপথে যাতায়াতকারীরা দেখলে মনে করবে সুন্দরবনেরই একটি অংশ। আর সেখানে লাখ ছৈলা গাছে পাখিরা বাসা বেঁধেছে। অতিথি এবং পরিযায়ী পাখিও নিরাপদ স্থান মনে করে আশ্রয় নিয়েছে। দেশীয় শালিক, ডাহুক আর বকের সারি তো আছেই। ছৈলা ছাড়াও এখানে কেয়া, হোগল, রানা, এলি, মাদার, আরগুজিসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছের সমারোহ রয়েছে। তাই পাখির কিচিরমিচির ডাক দিন-রাত সব সময় উপভোগ করা যায়। 

উপকূলীয় জেলা ঝালকাঠির দক্ষিণ জনপদ কাঁঠালিয়ার বিষখালী নদীর তীরে প্রকৃতি সেজে উঠেছে ছৈলার চরে। পর্যটনের ব্যাপক সম্ভাবনা থাকলেও রয়েছে নানা সংকট। তবু সেই সংকট উপেক্ষা করেই প্রকৃতির নয়নাভিরাম এই ছৈলার চর পর্যটকের মিলনমেলায় পরিণত হচ্ছে। পৃষ্টপোষকতা পেলে সুন্দরবনের মতোই দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে বিষখালীর বুক চিরে জেগে ওঠা ছৈলার চর।

প্রতিবছর শীত ও শুকনো মৌসুমে ভ্রমণ পিপাসুদের পদচারণায় মুখরিত থাকে ছৈলার চর বিনোদন ও পর্যটন কেন্দ্র। বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি আয়োজনে জেলাবাসী দিনের মধ্যে প্রাকৃতিক স্থান ভ্রমণে এবং সবুজের সমারোহ উপভোগ করতে ছুটে যাচ্ছে ছৈলার চরে। 

চলছে আধুনিকায়নের কাজ

২০১৪ সালে ছৈলার চর স্থানটি পর্যটনস্পট হিসেবে চি‎হ্নিত করেছে জেলা প্রশাসন। এ ছাড়া ছৈলার চরে পর্যটকদের সুবিধার্থে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। 

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে পর্যটকরা ঝালকাঠি ও পার্শ্ববর্তী জেলাসহ দূর-দূরান্ত থেকে শুকনো মৌসুমে আসছেন ছৈলার চরে। পর্যটকদের সুবিধার্থে আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেন কাঠালিয়া উপজেলা প্রশাসন। 

বছর খানেক আগে উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদ থেকে ছৈলারচরকে পূর্ণাঙ্গ বিনোদন স্পটে রূপ দিতে অভ্যন্তরীণ একটি পুকুরে ঘাট, একটি টিউবয়েল, তিনটি শৌচাগার, একটি শেড ও একটি রান্না ঘর স্থাপন করা হয়। ২০১৯ সালের বছরের ১০ নভেম্বর বুলবুলের আঘাতে ক্ষত বিক্ষত হয়ে এবং রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সবক’টিই ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিন সমস্যা সমাধান না হওয়ায় ভ্রমণ পিপাসু পর্যটকরা ছৈলার চরে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। বিশেষ করে শৌচাগার সংকটের কারণে নারী পর্যটকদের দুর্ভোগ পোহাচ্ছিলো। ইউএনও সুফল চন্দ্র গোলদারের উদ্যোগে এবং এমপি বজলুল হক হারুনের অর্থায়নে অনেকটাই পাল্টে গেছে ছৈলার চরের চেহারা। 

কাঁঠালিয়া লঞ্চঘাট থেকে নৌপথে যেতে হয় ছৈলার চরে। আমুয়া বন্দর থেকেও ট্রলারে কিংবা অন্য যেকোনো নৌযানে যাওয়া যায়। সড়ক পথে হেতালবুনিয়া আলিম মাদরাসার সামনে কেল্লা পর্যন্ত যাওয়া যায়। সেখান থেকে উপজেলা প্রশাসনের দেয়া নৌকায় পৌছানো যায় ছৈলারচরে। পর্যটন এলাকাকে ঘিরে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও রেস্ট হাউজ করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। 

পর্যটকদের নদী পথে ছৈলারচরে ওঠার জন্য দেয়া হয়েছে একটি নৌকা। নদীতে ঘাট ও পাশ দিয়ে সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। রয়েছে শিশুদের জন্য সুন্দরবনের পশুদের প্রতিকৃতি। আধুনিকায়ন করা হয়েছে পরিত্যক্ত পুকুর, টিনশেড ও শৌচারাগার। ব্যবস্থা করা হয়েছে সুপেয় পানিরও। এছাড়াও ছৈলার চরের উন্মুক্ত মাঠকে বালু দিয়ে ভরাট করে উচু করা হয়েছে। মাঠের মাঝে বসে আড্ডা ও বিনোদনের জন্য বানানো হয়েছে গোল কনক্রিট ফ্লোর। চাষ করা হয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির ফুল ও দৃষ্টি নন্দন গাছ। 

এরইমধ্যে পর্যটকরা বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসতে শুরু করেছেন। ভ্রমণপিপাসুদের চাহিদা মেটাতে সরকারি সহায়তায় এসব কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়েছে বলে জানান ইউএনও সুফল চন্দ্র গোলদার। 

ছৈলার চরে পর্যটক কলেজছাত্রী জান্নাত খান জানান, অনেক আগ থেকেই জেলার কাঠালিয়ায় ছৈলার চর নামক একটি স্থানের নাম শুনেছি। সেখানে ভ্রমণে গিয়েছিলাম। সুন্দরবনের মতোই অনেক দৃষ্টিনন্দন এই ছৈলার চর। প্রকৃতিকভাবে এখানে ছৈলার বনের সৃষ্টি যা বিষখালী নদীতীরবর্তী অপূর্ব নৈসর্গিক। এখানে পর্যটনের অপার সম্ভবনা আছে। সরকারিভাবে যদি এখানে পিকনিক স্পট গড়ে তোলা যায় তাহলে সরকার এখান থেকে রাজস্ব পাবে। 

কাঁঠালিয়া সদর ইউপি চেয়ারম্যান মো. রবিউল ইসলাম কবির সিকদার বলেন, প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা ছৈলার বনভূমিতে অনেক সম্ভবনা রয়েছে। এখানে প্রতি শীত ও শুকনো  মৌসুমে বিনোদন ও ভ্রমণ পিপাসুরা ঘুরতে আসে। প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষাকারী প্রাণিসহ পাখির নিরাপদ আবাসস্থল ছৈলার চর। এখানে পর্যটনের সম্ভাবনা থাকলেও এখন পর্যন্ত পর্যটকদের জন্য আধুনিক সরকারি কোনো ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠেনি। বজলুল হক এমপি মহোদয়ের আর্থিক অনুদানে কিছুটা উন্নয়নের ছোয়া লেগেছে। অবকাঠামোগত কিছু না থাকায় সরকার রাজস্ব পাচ্ছে না। এটি যদি পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা যায় তবে সরকার রাজস্ব পাবে।

কাঁঠালিয়ার ইউএনও সুফল চন্দ্র গোলদার বলেন, ঝালকাঠি-১ (রাজাপুর-কাঠালিয়া) আসনের এমপি বজলুল হক হারুনের দেয়া অর্থায়নে ছৈলার চরের উন্নয়ন করা সম্ভব হয়েছে। ছৈলার চরকে নিয়ে প্রশাসনের অনেক পরিকল্পনা রয়েছে। যার কারণে ছৈলার চরকে পর্যটনকেন্দ্র করার বিষয়ে পর্যটন করপোরেশনকে চিঠি দিয়ে জানানো হয়েছে। এরইমধ্যে ট্যুরিজম বোর্ড ছৈলার চর উন্নয়নের লক্ষ্যে কোটি টাকার প্রকল্প প্রস্তাব করেছে। মন্ত্রণালয় অনুমোদন করলেই এর বাস্তবায়ন শুরু হবে।
 

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএস