পল্লী চিকিৎসায় ফাতেমার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত 

পল্লী চিকিৎসায় ফাতেমার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত 

হাতিয়া (নোয়াখালী) প্রতিনিধি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৫:৩৬ ২৪ নভেম্বর ২০২০   আপডেট: ১৫:৪৭ ২৪ নভেম্বর ২০২০

নিজের চেম্বারে রোগী দেখছেন ফাতেমা

নিজের চেম্বারে রোগী দেখছেন ফাতেমা

কখনো পায়ে হেঁটে, কখনো রিকশায়, কখনো মোটরসাইকেলের পেছনে চড়ে কাঁধে ব্যাগ নিয়ে প্রতিনিয়ত ছুটে চলেন রোগীর বাড়ি বাড়ি। স্বামী নেই, তবুও নিজেকে অসহায় মনে করেন না তিনি। গ্রামের অসহায় সাধারণ মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রেখে জীবনের বাকী সময় পার করে দিতে চান ৪০ বছর বয়সী পল্লী চিকিৎসক ফাতেমা।

বুড়িরচর বড়পোল এলাকার চরআমান উল্যা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা তাছলিমা বেগম বলেন, চিকিৎসার ক্ষেত্রে ফাতেমার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পরিধি ছোট হলেও আছে ১৬ বছরের অভিজ্ঞতা।

হাতিয়ার বুড়িরচর ইউপিতে নারীদের চিকিৎসা সেবার একমাত্র অবলম্বন হয়ে উঠেছেন পল্লী চিকিৎসক ফাতেমা ডাক্তার। রোগীর অবস্থা অনুযায়ী রোগীকে কখনো নিজে বা কখনো রোগীর সঙ্গে গিয়ে উপজেলা সদরে নিয়ে চিকিৎসা সেবা দিয়ে থাকেন ফাতেমা। হাতিয়ার বুড়িরচর ইউপির বত্তা মার্কেটের রাস্তার পাশে ছোট একটি টিনসেড ঘরে ফাতেমার ফার্মেসি দোকান। এই দোকানে বসে সকাল বিকেল রোগী দেখেন ফাতেমা। 

রোগীর বাড়িতে যাচ্ছেন ফাতেমা

কর্মজীবনে প্রথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা হলেও মৎস্য চাষ, হাঁস মুরগি পালন ও অন্যান্য ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ফাতেমা। তবে এসব পেশার মধ্যে নিজেকে পল্লী চিকিৎসক এই পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন বলে জানান পল্লী চিকিৎসক ফাতেমা। 

ফাতেমা আরো জানান, তার বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম সারওয়ার ছিলেন স্বাস্থ্য সহকারী । সেই সময় গ্রামের অসহায় মানুষকে বিভিন্ন রোগব্যাধী নিয়ে তার বাবার কাছে আসতে দেখে তার চিকিৎসা সেবা করার ইচ্ছা জাগে।  

২০০২ সালে ঢাকাতে দুই বছর মেয়াদি  ডিএমএ  প্রশিক্ষণ ও গাইনি বিষয়ে ৬ মাসের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। এরপর থেকে ফাতেমা স্থানীয় বত্তা মার্কেটে ফার্মেসিতে বসে পল্লী চিকিৎসা দিয়ে আসছেন। 

ব্যক্তি জীবনে ফাতেমা এক সন্তানের জননী। ২০১৭ সালে স্বামী মারা যাওয়ার পর কিছুটা থমকে যায় তার জীবনের গতি। কিন্তু অধম্য ফাতেমা থেমে নেই । একমাত্র কন্যাকে বিয়ে দেয়ার পাশাপাশি ক্রয় করেছেন কয়েক বিঘা জমি। তৈরি করেছেন পরিপূর্ণ আধুনিক সুবিধা সম্বলিত একটি বাড়ি। চিকিৎসা সেবার পাশাপাশি দিনের অবসর সময়টুকু ব্যয় করেন হাঁস মুরগি পালন ও নিজের মাছের খামারে। 

নিজের চেম্বারে রোগী দেখছেন ফাতেমা

বুড়িরচর দক্ষিণ রেহানিয়া গ্রামের আফছার উদ্দিন বলেন, প্রতিদিন নিজের চেম্বারে ও বাড়িতে গিয়ে ৪০/৫০ জন রোগী দেখেন ফাতেমা। এর মধ্যে অধিকাংশ নারী রোগী। 

গভীর রাতে মোবাইলে কল করেও ডেকে নেন ফাতেমাকে। এই ক্ষেত্রে নিজের পরিবারের দুয়েকজন পুরুষ সঙ্গে গিয়ে ফাতেমাকে সহযোগীতা করেন প্রতিনিয়ত। 

ফাতেমার চেম্বারে চিকিৎসা নিতে আসা রেহানিয়া গ্রামের বিনা রানী নাথ নামে এক বৃদ্ধা জানান, তিনি ফাতেমার চিকিৎসা নিয়ে বেঁচে আছেন। তার বাড়ি থেকে উপজেলা সদর অনেক দূরে হওয়ায় সেখানে গিয়ে চিকিৎসা নিতে পারেন না। শুধু তিনি নয় তার পরিবারের সব সদস্যের চিকিৎসা দিয়ে থাকেন এই ফাতেমা ডাক্তার। 

মাঝে মাঝে গ্রামের অন্য পল্লী চিকিৎসকদের থামিয়ে রাখার অপচেষ্টা মোকাবিলা করতে হয় ফাতেমাকে। চলার পথে বিভিন্ন সময় নারীর প্রতি পুরুষের লোভনীয় অস্বাভাবিক শব্দ শুনেও তাকে চলতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। এটাকে এখন নিয়ম মেনে নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যান ফাতেমা। 

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. ইউছুফ সোহাগ বলেন, ফাতেমা একজন নারী। তিনি গ্রামে থেকে নারী পুরুষদের চিকিৎসা সেবা দিয়ে থাকেন । মাঝে মাঝে জটিল কোনো রোগী আসলে মোবাইলে তিনি আমার সঙ্গে পরামর্শ করে চিকিৎসা সেবা দিয়ে থাকেন। একজন নারীর ক্ষেত্রে বর্তমান সমাজে এ ধরনের দৃষ্টান্ত বিরল।  

ডেইলি বাংলাদেশ/এমকে