ফসল-কৃষকের বন্ধু নিতাই

ফসল-কৃষকের বন্ধু নিতাই

ময়মনসিংহ প্রতিনিধি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ০৪:৩৪ ২২ অক্টোবর ২০২০  

ফসল ও কৃষকের বন্ধু নিতাই চন্দ্র রায়

ফসল ও কৃষকের বন্ধু নিতাই চন্দ্র রায়

নিতাই চন্দ্র রায়। চোখে হালকা ফ্রেমের চশমা। বেশ লম্বা। কাপড় চোপড়েও অনেক পরিপাটি। কথা-বার্তায়ও বেশ মার্জিত। ষাট বছর বয়সেও বেশ উদ্যোমী। নাম নিতাই হলেও তিনি এখন বিভিন্ন নামে পরিচিত। কারো কাছে কৃষকের বন্ধু, কারো কাছে আবার শস্যের বন্ধু। কেউ বলেন সাদা মনের মানুষ।

তবে প্রায় এক ঘণ্টার আলাপচারিতায় আমার কাছে মনে হয়েছে নিতাই চন্দ্র রায় একজন আপদমস্তক চিকিৎসক। হ্যাঁ, তিনি ফসলি চিকিৎসক। এমন কেন মনে হলো তা জানাবো অবশ্যই।

যতক্ষণ বাইরে থাকেন ততক্ষণ তিনি এক পকেটে ছোট একটি প্যাড আর কলম রাখেন। অন্য পকেটে একটি স্মার্টফোন থাকে। এ নিয়েই প্রতিদিন ভোর থেকে সকাল ১০টা অব্দি ছুটে চলেন নিতাই চন্দ্র রায়।

ময়মনসিংহের ত্রিশালের এ গ্রাম থেকে ওই গ্রাম ঘুরে ঘুরে জানতে চেষ্টা করেন কোন ফসলের কী রোগ। যদি রোগের দেখা মেলে তাহলে ওই প্যাডে লিখে দেন ব্যবস্থাপত্র। আর সেই কৃষকের যদি স্মার্টফোন থাকে তাহলে নিজের মোবাইল থেকে শেয়ার করেন কৃষি বিষয়ক বিভিন্ন অ্যাপস। 

নিতাই চন্দ্রের আরেকটি নিয়ম আছে। রোজ বিকেলে নিয়ম করে উপজেলার বিভিন্ন কীটনাশকের দোকানে বসেন। সেখানে ফসলের সমস্যা নিয়ে আসা কৃষকদের ফসলের বিভিন্ন রোগ-ব্যাধি এবং কীটনাশক ব্যবহার সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করেন। এছাড়াও মোবাইল ফোনেও তিনি কৃষকদের পরামর্শ দেন বেশ ভালোভাবে। অর্থাৎ ফসলের সেবার জন্য নিজের দুয়ার ২৪ ঘণ্টার জন্যই খোলা রেখেছেন। এসবের কারণে তিনি এখন পরিচিত ‘ফসলের চিকিৎসক’ নামেও।

কথা বলে জানা গেল তার জীবন সম্পর্কেও। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ১৯৮৪ সালে বিএসসি পাস করেন তিনি। তারপর বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশনের বিভিন্ন চিনিকলে দীর্ঘ ৩২ বছর চাকরি করেছেন। অবসর নিয়েছেন ২০১৭ সালের ৪ জানুয়ারি। শেষ জীবনে নাটোর জেলার গোপালপুরের নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের ছিলেন মহাব্যবস্থাপক (কৃষি)। চাকরি শেষ করে ফিরলেন বাড়িতে। তবে ৬০ বছরের এই জীবনে তিনি এখনো বসে নেই। ছোটেন সবুজের প্রান্তরে। 

নিতাই চন্দ্রের কাছে প্রশ্ন ছিল শেষ বয়সে বিশ্রামের পরিবর্তে কেন ফসলি দিগন্তে? একগাল হাসি দিয়ে বলেন, ‘এ নিয়ে পরিবারের বিস্তর অভিযোগ আমার বিরুদ্ধে। তাদের বলি, চাকরি থেকে অবসর নিয়েছি কাজ থেকে নয়। আর কৃষকের পাশে দাঁড়ানো আমার পুরোনো অভ্যাস। চাকরিকালীন সময়েও আশপাশের অনেক কৃষকদের সেবা দিয়েছি। এখন যেহেতু অজস্র সময়, তাই ঘুরে ঘুরে দেখি ফসলি জমিগুলোর কী অবস্থা? সমস্যা থাকলে পরামর্শ দেই। আর এতে করে মানসিকভাবে ভালো থাকি। 

ফসলি এই চিকিৎসক সম্বদ্ধে আরো জানা গেল, একদিন সকালে বের হয়ে ত্রিশালের এক গ্রামে গিয়ে জানতে পারেন রইসুল ইসলাম নামে এক কৃষকের গাছের আম ঝড়ে যাচ্ছে ও যেগুলো গাছে আছে তাও ফেটে যাচ্ছে। তার বাড়িতে গিয়ে আরো অনেক সমস্যার কথা জানতে পারেন নিতাই। সঙ্গে সঙ্গে তাকে ব্যবস্থাপত্র দিয়েছেন ব্রোন ও পটাশ সার প্রয়োগ করে আমগাছে নিয়মিত সেচ দেয়ার। শুধু রইসুলই নয় নয়, তার মতো অনেক কৃষকই এখন ফসলের এই চিকিৎসকের কাছ থেকে বিভিন্ন ব্যবস্থাপত্র নিচ্ছেন।
 
আরেকটি ঘটনা, স্থানীয় কোনাবাড়ি গ্রামের এক কৃষকের শসা ক্ষেতে পোকার আক্রমণ হয়েছে জানতে পারেন। সেখানে গিয়ে তিনি দেখতে পান শসার পাতায় সুড়ঙ্গকারী পোকার আক্রমণ দেখা দিয়েছে। সেখানেই হাতেনাতে তিনি জৈব বালাইনাশক প্রয়োগের মাধ্যমে পোকা দমনের পরামর্শ দেন। এতে কাজও হয়।

ফসল ও কৃষকের বন্ধু নিতাই চন্দ্র রায়অতি লোভীদের বিষয়ে নিতাই চন্দ্র বেশ উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, প্রান্তিক কৃষকরা কীটনাশক ব্যবসায়ীদের কথা শুনে ফসলি জমিতে বেশি কীটনাশক ও রাসায়নিক সার বেশি ব্যবহার করেন। কারণ এতে নাকি লাভ বেশি হবে। এতে করে সাময়িক উৎপাদন বেশি হতে পারে। কিন্তু ওই ফসলি জমির মাটি নষ্ট হয়, মাটির উপকারী জীবাণু মারা যায়, প্রকৃতিতেও বিরুপ প্রভাব পড়ে। এমনকি সেই পানি প্রাকৃতিক জলাশয়ে গেলে মাছের উৎপাদনও ব্যাহত হয়।  

শুধু ঘুরে ঘুরে ফসলের সেবা এবং পরামর্শ দেয়াই নিতাই  চন্দ্রের কাজ নয়। তিনি কৃষি নিয়ে আরো অনেক ধরনের কাজ করেন। লিখালিখি করেন বিভিন্ন জাতয় দৈনিকে ও ওয়েবসাইটে। কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার সম্পর্কে শিক্ষা দেন। অংশ নেন কৃষি সেবার বিভিন্ন কার্যক্রমে। কৃষকদের নিয়ে প্রায় সময়ই আয়োজন করেন মতবিনিময় সভার। কাজ করেন নগরবাসীর খাদ্য এবং পুষ্টি নিরাপত্তায়। তার মতে, ৫০ ভাগ মানুষ এখন নগরে বাস করে। তাই গ্রামীণ কৃষির পাশাপাশি নগরীর কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলা উচিত। নিউজিল্যান্ড এবং কিউবায় এরমধ্যে নগর জীবনে খাদ্য এবং পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএম