নতুন পা পেয়ে হাসি মুখে হাঁটছে রিনা

নতুন পা পেয়ে হাসি মুখে হাঁটছে রিনা

ঝালকাঠি প্রতিনিধি  ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৩:২৬ ২১ অক্টোবর ২০২০   আপডেট: ১৩:২৮ ২১ অক্টোবর ২০২০

নতুন কৃত্রিম পা নিয়ে হাঁটছেন রিনা

নতুন কৃত্রিম পা নিয়ে হাঁটছেন রিনা

শিশুকালে বাবার সঙ্গে খুলনায় থাকায় বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী রিনা রেললাইনে বসে খেলার সময় ট্রেনের হুইসেল শুনতে না পেরে ডান হাত ও পা হারিয়েছে। সমাজের কিছু মানবিক মানুষের সহযোগিতায় থাকার ঘর পেয়েছেন হাত-পা হারানো বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী রিনা আক্তার। পেয়েছিলেন একটি কৃত্রিম পা। দেড় বছর ধরে ব্যবহার করায় এখন সেটি নষ্ট হয়ে যায়।

হাঁটতে গেলেই পায়ে প্রচণ্ড ব্যথা লাগে এবং কয়েকটি স্থানে কালো দাগও হয়েছে। কৃত্রিম পায়ের জন্য হাঁটতে গেলেই প্রচণ্ড ব্যথায় চিৎকার করতো রিনা। এমন একটি মাবনিক সংবাদ জাতীয়, স্থানীয় এবং অনলাইন নিউজ পোর্টালে সংবাদ প্রকাশের পর সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয় দানশীল ব্যক্তিরা। সম্পূর্ণ খরচ বহন করে রিনার কৃত্রিম পা লাগানো এবং আর্থিক সহায়তা পেয়ে রিনা এখন হাসি মুখে হাঁটছে আর দানশীল ব্যক্তিদের জন্য দোয়া করছেন। ঝালকাঠি জেলার রাজাপুর উপজেলার পুটিয়াখালী গ্রামে রিনার পৈতৃক বাড়ি। পুটিয়াখালী ভলান্টিয়ার্স নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কয়েকজন সদস্য সুষ্ঠ ব্যবস্থাপনায় সার্বিক দায়িত্ব পালন করে।

জানা যায়, অনলাইনে সংবাদ দেখে রাজাপুর উপজেলা বড়ইয়া গ্রামের কৃতি সন্তান এবং বরিশাল বিভাগীয় ক্রিড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক ও সিটি কর্পোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর আলমগীর হোসেন আলো’র স্ত্রী রাজিয়া বেগম কৃত্রিম পা পুনঃস্থাপনের দায়িত্ব নেন। গত শুক্রবার প্রতিবন্ধী রিনাকে ঢাকায় নিয়ে কৃত্রিম পা লাগিয়ে দিয়ে বুধবার বাড়িতে পাঠিয়ে দেন। পা স্থাপন এবং যাতায়াতসহ সার্বিক খরচ তিনি নিজেই বহন করেন। এর আগে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক দানশীল ব্যক্তি প্রতিবন্ধী রিনাকে ২৫ হাজার টাকা সহায়তা করেন।

নতুন কৃত্রিম পা দেয়া হচ্ছে রিনাকে

এলাকাবাসীর কাছ থেকে জানা যায়, রিনার বাবা মোজাম্মেল হক তখন খুলনা জুট মিলে দারোয়ানের চাকরি করতেন। সেখানেই দুই মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে থাকতেন তিনি। বাবার সঙ্গে খুলনায় থাকায় শিশুকালে রেললাইনে বসে খেলার সময় বাক ও শ্রবণ প্রতবিন্ধী হওয়ায় ট্রেনের হুইসেল শুনতে না পাওয়ায় রিনাকে ডান হাত ও পা হারাতে হয়েছে। ১০ বছর বয়সে বাবাকে হারান রিনা। এরপর দুই মেয়েকে নিয়ে খুলনা থেকে গ্রামের বাড়ি ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার পুটিয়াখালীর গ্রামের বাড়িতে চলে আসেন তাদের মা জয়নব বিবি। নতুন করে বসবাস শুরু করেন এখানে। 

সেখানে একটি ঘরে কোনোমতে মানবেতর জীবনযাপন করছিলেন তারা। মায়ের ভিক্ষা ও প্রতিবেশীদের সাহায্যে চলতো তাদের সংসার। কিছুদিন পর তার মা জয়নব বিবিও মারা যান। এতিম হয়ে যান বড় বোন শিরিন বেগম ও রিনা।

এরপর সেই ঘরেই অর্ধাহারে অনাহারে তাদের বসবাস শুরু। ঝড় বৃষ্টি এলেই পানি পড়ত তাদের ছোট্ট ঘরটিতে। নিরুপায় হয়ে পাশের বাড়িতে আশ্রয় নিতে হতো দুই বোনকে। স্থানীয় কলেজছাত্র মেহেদি হাসান রিনা আক্তারের এ দুর্দশা দেখে পুটিয়াখালীর স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সভাপতি সৈয়দ শাহাদাতকে সঙ্গে নিয়ে বিভিন্ন লোকদের সঙ্গে আলাপ করেন তাদের জন্য কিছু করার। এ বিষয়টি বিভিন্ন গণমাধ্যমেও প্রচারের ব্যবস্থা করেন তারা।

সহায়তার আবেদনের প্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৬ হাজার টাকা ও দুই বান ঢেউ টিন দেয়া হয় তাদের। মেরামত করা হয় তাদের সেই ঘরটি। এছাড়া সংগঠনের সদস্যরা নিজেদের আর্থিক সহায়তা ও শ্রম দিয়ে একটি তহবিল গঠন করেন। স্থানীয় অনেকেই আর্থিকভাবে সহযোগিতা করেছেন তাদেরকে। সবার সহযোগিতায় আলোর মুখ দেখেন তারা। একটি কৃত্রিম পা দেড় বছর ধরে ব্যবহার করায় এখন সেটি নস্ট হয়ে যায়। যার কারণে পায়ের কয়েকটি স্থানে কালো দাগও হয়েছিলো। হাঁটতে গেলেই কৃত্রিম পায়ের জন্য এখন প্রচণ্ড ব্যথায় চিৎকার করতো রিনা।

প্রতিবেশীরা বলেন, রিনার বাড়ি থেকে কোনো শব্দ পেতাম না আমরা। মাঝে মাঝে শুধু কান্নার শব্দ আসতো। কথা বলতে পারে না, কিছু শুনে না, চলাফেরা করে অনেক কষ্টে। অনেক কষ্ট করে বেঁচে আছে মেয়েটা।

তারপর রিনার কাছে অনুভূতি জানতে যাওয়ার চেষ্টা করলে ইশারায় মাথা নেড়ে বোঝান, তিনি এখন ভালো আছেন। সবার জন্য দোয়া করছেন (হাত তোলে ইশারায় বুঝানোর চেষ্টা করেন)। 

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএইচ