অল্প সময়ে অধিক টাকার মালিক হতেই ব্যাংক ডাকাতি

অল্প সময়ে অধিক টাকার মালিক হতেই ব্যাংক ডাকাতি

ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৮:০৬ ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০  

প্রেস ব্রিফিং করছেন  ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এসপি মোহাম্মদ আনিসুর রহমান

প্রেস ব্রিফিং করছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এসপি মোহাম্মদ আনিসুর রহমান

বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ব্রাহ্মণবাড়িয়া আশুগঞ্জ শাখার নৈশ প্রহরী রাজেশ বিশ্বাস হত্যা এবং ব্যাংক ডাকাতির ঘটনার রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ। মূলত অল্প সময়ে অধিক টাকার মালিক হওয়ার জন্যেই হত্যাকাণ্ড ও ব্যাংক ডাকাতি ঘটায় ডাকাতরা। গত একমাস ধরে ব্যাংক ডাকতির পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ডাকাতরা ব্যাংকে হানা দেয়।

বুধবার দুপুরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এসপি মোহাম্মদ আনিসুর রহমান প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। 

সংবাদ সম্মেলনে এসপি জানান, গত ২৬ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ব্রাহ্মণবাড়িয়া আশুগঞ্জ শাখার ব্যবস্থাপক মো. মোবাশ্বের হোসেনের মাধ্যমে জানতে পারেন, তার ব্যাংকের ভেতরে দায়িত্বরত নৈশ প্রহরী রাজেশ বিশ্বাসকে অনেক ডাকাডাকির পরও তার কোনো সাড়া শব্দ পাচ্ছেন না।

এমন অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশ রাতে ব্যাংকের প্রধান ফটকের তালা ভেঙে ব্যাংকের ভেতরে প্রবেশ করেন। এ সময় ব্যাংকের ভেতরের মেঝেতে নৈশ প্রহরী রাজেশ বিশ্বাসের মরদেহ রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন তারা। পরে তার লাশ উদ্ধার করে ময়নাতন্তের জন্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালে পাঠায় পুলিশ। ঘটনার পরের দিন (২৭ সেপ্টেম্বর) ব্যাংকের ব্যবস্থাপক মো. মোবাশ্বের হোসেন বাদী হয়ে আশুগঞ্জ থানায় একটি হত্যা ও ডাকাতি মামলা করেন। 

পরে মামলা করার একদিনের মাথায় পুলিশ (গত ২৮ সেপ্টেম্বর) দিবাগত গভীর রাতে আশুগঞ্জ উপজেলার আড়াইসিধা ইউপির ভবানীপুর থেকে প্রধান আসামি মো. জামাল হোসেনকে গ্রেফতার করেন। পরে তার দেয়া তথ্য অনুযায়ী মামলার ২ নম্বর আসামি মো. জামিলকে একই এলাকার রঙ্গিলা হাটি থেকে গ্রেফতার করেন। পরে জামিলের দেয়া তথ্য অনুযায়ী মো. মাসুদ কবিরকে চরচারতলার এলাকার শরীয়তনগর থেকে গ্রেফতার করা হয়। পরে চতুর্থ আসামি সাদ্দাম হোসেনকে আড়াইসিদা মাধুর বাড়ি পুকুর পাড় থেকে গ্রেফতার করেন। পরে মঙ্গলবার দুপুরে (২৯ সেপ্টেম্বর) গ্রেফতারদের ব্রাহ্মণবাড়িয়া সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করার তারা আদালতে ১৬৪ ধারা জবানবন্দিতে নিজেদের দোষ ও হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেন। 

গ্রেফতারকৃত আসামি জামিলের বরাত দিয়ে এসপি মোহাম্মদ আনিসুর রহমান বলেন, গ্রেফতার চারজন বাদে মোস্তাক ও শাহাদাৎসহ তাদের আরো দুই সহযোগী ছিল। তারা সবাই পরস্পর বন্ধু। তারা প্রায় সময় আশুগঞ্জের শরীয়তনগরের শাহাদাৎ এর দোকানে আড্ডা দেয় এবং নেশা করতো। তারা সবাই বসে ব্যাংক ডাকাতির মতো বড় ধরনের অপকর্মের পরিকল্পনা নেয়। পরে তারা আশুগঞ্জ সোনালী ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেডে ডাকাতির পরিকল্পনা করার জন্য খোঁজ-খবর নিতে থাকে। 

সোনালী ব্যাংক মাঝ বাজারের মধ্যে হওয়ায় সেখানে সব সময় লোকজনের আনাগোনা থাকে বলে সোনালী ব্যাংক লুট করার পরিকল্পনা বাদ দেয় তারা। পরে প্রিমিয়ার ব্যাংককে টার্গেট করেন। কিন্তু প্রিমিয়ার ব্যাংকের সামনে পেছনে চার পাশে সিসি ক্যামেরা থাকায় প্রিমিয়ার ব্যাংক লুট করার পরিকল্পনাও বাদ দেয় তারা। পরবর্তীতে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেডে (বিডিবিএল) লুট করার পরিকল্পনা করেন। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে কয়েকদিন সেই ব্যাংকের পেছনে চলাচলের গলিসহ একটি অরক্ষিত জানালা তারা খুঁজে পান। সুবিধাজনক অবস্থা থাকায় বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেডে ডাকাতি করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়। 

সিদ্ধান্ত মোতাবেক জামিল ও জামাল প্রথমে জানালার গ্রিল কেটে ব্যাংকের ভেতরে প্রবেশ করেন। মোস্তাক গলির মধ্যে পাহারা দেয়। শাহাদাৎ তার দোকানের মধ্যে বসে সাধারণ লোকজনের গতিবিধি লক্ষ্য করেন। মাসুম সকাল ও সন্ধ্যার মোড়ে দাঁড়িয়ে টহল পুলিশসহ সাধারণ লোকজনের গতিবিধি লক্ষ্য করেন। পরে জামাল ও জামিল ব্যাংকের মধ্যে প্রবেশ করে ব্যাংকের সিকিউরিটি গার্ড রাজেশ বিশ্বাসকে প্রথমে তাদের হাতে থাকা লোহার রড, শাবল দিয়ে আঘাত করে। পরে গামছা ও লঙ্গির মাধ্যমে মুখ বেঁধে হত্যা করে। পরে তারা ম্যানেজারের রুমে গিয়ে সিসি ক্যামেরার টিভির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন এবং ম্যানেজারের রুম থেকে একটি ল্যাপটপ ও ৫ হাজার টাকা নিয়ে নেন। 

পরে ব্যাংকের ভল্টে রক্ষিত টাকা লুট করার চেষ্টা করেন। কিন্তু অনেক চেষ্টার পরও ভল্ট থেকে টাকা লুট করতে না পেরে ব্যর্থ হয় ফিরে যান। মূলত অল্প সময়ে অধিক টাকার মালিক হওয়ার জন্যে তারা ব্যাংকে ডাকাতি করেন। আর এ ঘটনার যেন কোনো ধরনের সাক্ষী না থাকে সে জন্যে তারা নৈশ প্রহরী রাজেশ বিশ্বাসকে লোহার রড দিয়ে আঘাত করার পর শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করেন। তবে ডাকাতেরা ব্যাংকের ভেতরে প্রবেশ করে ড্রয়ার থেকে ল্যাপ এবং নৈশ প্রহরী রাজেশের দুটি মোবাইল সেট লোট করতে পারলেও ব্যাংকের ভল্টে ভাংগার চেষ্টা করে তারা ব্যর্থ হয়। যার কারণে ভল্টের মালামাল সুরক্ষিত ছিল বলে মামলায় উল্লেখ করাহয়। 

এদিকে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও আশুগঞ্জ থানার ওসি (তদন্ত) হাবিবুর রহমানের আবেদনের প্রেক্ষিতে বিজ্ঞ আদালত আসামি মো. জামিল ও মো. মাসুম কবিরের বিরুদ্ধে তিনদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন এবং অপর দুই আসামি জামাল ও সাদ্দামকে জেলহাজতে পাঠানো হয়। 

হাবিবুর রহমান জানান, এরইমধ্যে আসামি জামালের হেফাজত হতে লুন্ঠিত ল্যাপটপ এবং জামিলের হেফাজত থেকে নিহত রাজেশ বিশ্বাস এর ব্যবহৃত একটি মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়। অপর একটি মোবাইল ফোন উদ্ধারের চেষ্টাসহ মামলার তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত আছে বলে তিনি নিশ্চিত করেন। 

সংবাদ সম্মেলনে অ্যাডিশনাল এসপি (অপরাধ ও প্রশাসন) রহিজ উদ্দিন, অ্যাডিশনাল এসপি (সদর দপ্তর) আবু সাঈদ, অ্যাডিশনাল এসপি (সদর সার্কেল) মোজাম্মেল হোসেন রেজা, অ্যাডিশনাল এসপি (নবীনগর) মকবুল হোসাইন, এএসপি (বিশেষ শাখা) আলাউদ্দিন চৌধুরী, এএসপি (সরাইল) আনিছুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএইচ