চট্টগ্রাম কারাগারে যে হালে আছেন প্রদীপ

চট্টগ্রাম কারাগারে যে হালে আছেন প্রদীপ

আদনান সাকিব, চট্টগ্রাম ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ০২:২৫ ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০   আপডেট: ০২:৪২ ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০

গ্রেফতার বরখাস্ত ওসি প্রদীপ কুমার দাশ--ফাইল ফটো

গ্রেফতার বরখাস্ত ওসি প্রদীপ কুমার দাশ--ফাইল ফটো

বাইরের জগতে নিজের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন টেকনাফ থানার বরখাস্ত হওয়া ওসি প্রদীপ কুমার দাশ। তিনিই যেন সব ক্ষমতার অধিকারী। এজন্য যা ইচ্ছে তাই করতেন তিনি। কেউ চোখ তুলে তাকাতে পারেননি। কিন্তু সম্প্রতি অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যা মামলায় কারাগারে রয়েছেন তিনি। সেখানেও ভিন্ন হালে দিন কাটাচ্ছেন প্রদীপ।

১৪ সেপ্টেম্বর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যার ঘটনায় কারাগারে থাকা প্রদীপকে দুদকের করা মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। সেই থেকে চট্টগ্রাম কারাগারেই আছেন প্রদীপ কুমার দাশ।

কারাগারে ডিভিশন-১ ভোগ করছেন টেকনাফ থানার বরখাস্ত হওয়া ওসি প্রদীপ কুমার দাশ। ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে এ সুবিধা ভোগ করছেন বলে কারাগার সূত্রে জানা গেছে। তবে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার কর্তৃপক্ষ।

জানতে চাইলে জেলার রফিকুল ইসলাম বলেন, এ বিষয়ে কথা বলার এখতিয়ার আমার নেই। চট্টগ্রামের ডিসির দায়িত্বে থাকা ইয়াছমিন পারভীন তিবরীজির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

এদিকে, আজ সোমবার প্রদীপ কুমার দাশের বিষয়ে চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আশফাকুর রহমানের আদালত একটি নির্দেশনা দেন।

এতে বলা হয়, প্রদীপ কুমার দাশ আত্মীয়-স্বজন ও তার আইনজীবীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারবেন না। তবে চাইলে তাদের সঙ্গে কারাবিধি অনুযায়ী টেলিফোনে কথা বলতে পারবেন। কারাগার থেকে আসা একটি রিপোর্টের ওপরই এ শুনানি শেষে আদালত এ আদেশ দেন।

এর আগে, ২৬ সেপ্টেম্বর আত্মীয়-স্বজন ও আইনজীবীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারবেন বলে আদেশ দেন মহানগর দায়রা জজ আশফাকুর রহমানের আদালত।

দুদকের আইনজীবী মাহমুদুল হক বলেন, আত্মীয়-স্বজন ও আইনজীবীদের সঙ্গে প্রদীপ সাক্ষাৎ করতে পারবেন এমন আদেশটি প্রত্যাহার করে নিয়েছে আদালত। এখন থেকে প্রদীপ শুধুমাত্র আত্মীয়-স্বজন ও তার আইনজীবীদের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলতে পারবেন। বর্তমানে কারা কর্তৃপক্ষ নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বন্দিদের টেলিফোনে কথা বলার সুযোগ দিয়েছে।

ডিভিশনের বিষয়ে জানতে চাইলে মাহমুদুল হক বলেন, চট্টগ্রামের আদালত থেকে প্রদীপের ডিভিশন বিষয়ে কোনো আদেশ হয়নি। অন্য কোথাও থেকে হয়েছে কি-না তা বলতে পারবো না।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম কারাগারের জেল সুপার কামাল উদ্দিন কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে কারাগারের অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে, ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে চট্টগ্রাম কারাগারের ডিভিশন-১ বন্দির মর্যাদা পাচ্ছেন টেকনাফ থানার বরখাস্ত হওয়া ওসি প্রদীপ কুমার দাশ। তিনি ডিভিশন ওয়ার্ডে ভারতীয় নাগরিক জিবরান তায়েবী হত্যা মামলার যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত কয়েদি ইয়াছিন রহমান টিটুর পাশের রুমেই থাকছেন।

জেল কোড অনুযায়ী ডিভিশনপ্রাপ্তরা কী ধরনের সুবিধা পান-

জেল কোড অনুসারে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে মর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তিদের কারাগারে ডিভিশন দেয়া হয়। এছাড়া আদালতের নির্দেশেও কাউকে কাউকে দেয়া হয় ডিভিশন। জেল কোড অনুযায়ী তিন শ্রেণির ডিভিশন দেয়া হয়ে থাকে। ডিভিশন-১, ডিভিশন-২ এবং ডিভিশন-৩।

বিধি অনুসারে প্রথম শ্রেণির ডিভিশন-প্রাপ্তদের প্রত্যেক বন্দির জন্য আলাদা রুম থাকে। খাট, টেবিল, চেয়ার, তোষক, বালিশ, তেল, চিরুনি, আয়না সব কিছুই থাকে। আর তার কাজকর্ম করে দেয়ার জন্য আরেকজন বন্দিও দেয়া হয়। ছেলে বন্দির ক্ষেত্রে সাহায্যকারী হিসেবে ছেলে আর মেয়ে বন্দির জন্য একজন মেয়ে থাকবেন।

এছাড়া ডিভিশনপ্রাপ্ত বন্দি বইপত্র ও তিনটি দৈনিক পত্রিকা পাবেন। সাধারণ বন্দিদের চেয়ে ডিভিশনপ্রাপ্ত বন্দির খাওয়ার মানও ভালো থাকে। তাদের জন্য টাকার পরিমাণটি বেশি থাকে। এ কারণে তারা চিকন চালের ভাত পান। সকালে রুটি, ডিম, কলা, ভাজি, বাটার, জ্যাম-জেলি চাইলে সেগুলোও দেয়া হয়। দুপুরে ভাত-মাছ-মাংস তাদের সঙ্গে কথা বলে ঠিক করা হয়। কিন্তু সাধারণ বন্দিদের ক্ষেত্রে এসব সুযোগ থাকে না।

জেল কোড অনুযায়ী ডিভিশন পাওয়ার যোগ্য যারা-

জেল কোডের ৬১৭ নং বিধিতে বলা হয়েছে যে, সাজাপ্রাপ্ত বন্দি ডিভিশন ১, ২ ও ৩ এ তিনটি ডিভিশনে বিভক্ত হবে। এরমধ্যে নাগরিকত্ব নির্বিশেষে নিম্নোক্ত বন্দিরা ডিভিশন ১ প্রাপ্তির যোগ্য হবেন-

(ক) যারা ভালো চরিত্রের অধিকারী ও অনাভ্যাসগত অপরাধী। (খ) সামাজিক মর্যাদা, শিক্ষা এবং অভ্যাসের কারণে যাদের জীবনযাপনের ধরন উচ্চমানের।

(গ) যারা নিম্নোক্ত অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত নয়- নৃশংসতা, নৈতিক স্খলন এবং ব্যক্তিগত প্রতিহিংসামূলক অপরাধ। মারাত্মক বা পূর্বপরিকল্পিত হিংস্রতা। সম্পত্তি সংক্রান্ত মারাত্মক অপরাধ। অপরাধ সংঘটনের উদ্দেশ্যে বা অপরাধ সংঘটনের ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বিস্ফোরক আগ্নেয়াস্ত্র এবং অন্যান্য মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্র সঙ্গে রাখা। এসব অপরাধ সংগঠনের জন্য প্ররোচিত বা উত্তেজিত করা।

উল্লেখ্য, ৩১ আগস্ট রাতে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের বাহারছড়া ইউপির শামলাপুর চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে নিহত হন অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান। এ ঘটনায় ৫ আগস্ট কক্সবাজার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ইন্সপেক্টর লিয়াকত, ওসি প্রদীপ কুমার দাশসহ নয়জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন নিহত সিনহার বোন শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস। ৬ আগস্ট বরখাস্ত ওসি প্রদীপ ও লিয়াকতসহ সাত আসামি কক্সবাজার সিনিয়র জুডিশিয়াল আদালতে আত্মসমর্পণ করেন।

সিনহা হত্যা মামলার তদন্ত চলার মধ্যেই ২৩ আগস্ট প্রদীপ ও তা স্ত্রী চুমকি কারণের বিরুদ্ধে প্রায় ৪ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা করে দুদক। মামলাটি করেন দুদকের সহকারী পরিচালক রিয়াজ উদ্দিন। মামলায় প্রদীপ দম্পতির বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ২০০৪ এর ২৬(২) ও ২৭(১), মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ দমন আইন- ২০১২ এর ৪(২), ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারা ও দণ্ডবিধির ১০৯ ধারায় অভিযোগ আনা হয়। ওই মামলা সম্পত্তি ক্রোকের নির্দেশ দেয় আদালত ও গ্রেফতারও আছেন প্রদীপ কুমার দাশ।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএইচ