প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা পাথরঘাটা

পর্যটন দিবস

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা পাথরঘাটা

শফিক খোকন, পাথরঘাটা ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৬:৫৪ ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০  

বিহঙ্গদ্বীপে সূর্যাস্ত

বিহঙ্গদ্বীপে সূর্যাস্ত

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলা। বঙ্গোপসাগর ও সুন্দরবন ঘেঁষা এ উপজেলায় রয়েছে বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্র। এরমধ্যে হরিণঘাটা, লালদিয়ার চর, সংরক্ষিত বনাঞ্চল, বিহঙ্গদ্বীপ, নীলিমা পয়েন্ট, কালমেঘা অন্যতম। তবে এসব পর্যটন কেন্দ্র আরো আকর্ষণীয় করতে প্রয়োজন সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগ। ফলে এ স্থানগুলো ঘিরে দেশের পর্যটনশিল্পের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে।

হরিণঘাটা:

সুন্দরবনের কোলঘেঁষা উপকূলের বহতা দুই নদ-নদী এসে পড়েছে বঙ্গোপসাগরে। এ মোহনাজুড়ে বিশাল চর আর বনের সুবিস্তৃত সবুজের সতেজতা। সাড়ে ছয় হাজার একর জুড়ে বিস্তৃত নয়নাভিরাম বনের ভেতর নিসর্গের মুগ্ধতা।

২৬ প্রজাতির বৃক্ষরাজিতে ঠাসা হরিণঘাটার এ সংরক্ষিত বনাঞ্চল। সাগর মোহনার চরজুড়ে প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা বন। সেই সঙ্গে সৃজিত বনের সম্প্রসারণে বনের পরিধি বাড়ছে। হিংস্র প্রাণী না থাকলেও আছে হরিণ, বানর, শূকর, গুইসাপ, নানা প্রজাতির সরীসৃপসহ ২৫ প্রজাতির প্রাণী। আরো রয়েছে ৭০ থেকে ৮০ প্রজাতির পাখি আর অগণিত প্রজাপতি, ফড়িংসহ নানা পতঙ্গকুল।

হরিণঘাটা

এখানে রয়েছে গেওয়া, কেওড়া, পশুর, সৃজিত, সুন্দরী, গোলগাছ, ঝাউবনসহ নানা প্রজাতির গাছ। বনের ভেতরে এঁকেবেঁকে চলা ছোট-বড় মিলিয়ে ১০-১২টি খাল প্রবহমান। বনের দক্ষিণ সীমানায় সাগর মোহনার চরে রয়েছে মৌসুমি শুঁটকি পল্লী। সাগর-সান্নিধ্যে সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত দেখার আদর্শ জায়গাও এটি।

বিহঙ্গদ্বীপ

ওপরে নীল আকাশ, নিচে চারদিকে জলরাশি, মাঝখানে প্রকৃতি সাজিয়েছে অপরূপে। এমন একটি দ্বীপের নামই ‘বিহঙ্গ দ্বীপ’। সুন্দরবন ঘেঁষা বলেশ্বর নদীর বুক চিড়ে দ্বীপটির চারপাশে অথৈ জলরাশি আর সবুজ বেস্টনি দিয়ে ঘেরা। এর একদিকে রয়েছে ধু-ধু বালুচর, অন্যদিকে শীতল বালু, যেখানে প্রকৃতি খেলে নিজ রূপে। ঢেউয়ের গর্জন, সূর্যাস্ত, পাখির কিচির-মিচির আর হরিণের ছোটাছুটি তো আছেই। সেই সঙ্গে কাঁকড়া, শামুকের অবাধ ছোটাছুটি আর বিভিন্ন পাখির কলকাকলি মুহূর্তেই মুগ্ধ করে দেয় যে কাউকে। দূর থেকে দেখলে মনে হবে সাগরের মাঝে বড় কোনো সবুজ পাহাড়।

বিহঙ্গদ্বীপ

লালদিয়া বন ও সি-বিচ

পাথরঘাটার দক্ষিণেই লালদিয়ার বন। এ বনের পূর্বে বিষখালী নদী, পশ্চিমে বলেশ্বর নদীর মোহনা। এ দুই নদীর মোহনা ঘিরে রেখেছে লালদিয়ার বনকে। এখানে বিভিন্ন রকমের পাখি থাকে। রাতে এ বনে দূর-দূরান্ত থেকেও পাখিরা এসে আশ্রয় নেয়। এ বনে কিছু কিছু শীতকালীন অতিথি পাখিও দেখা যায়। এ বন সংলগ্ন পূর্ব প্রান্তেই সমুদ্র সৈকত। কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের আদলে হচ্ছে এ সৈকত।

লালদিয়া বন ও সি-বিচ

পাথরঘাটা উপজেলা শহর থেকে ৬ কিলোমিটার দূরে সদর ইউপির হরিণঘাটা গ্রামে বিষখালী নদীর তীরে অবস্থান লালদিয়া সংরক্ষিত বনাঞ্চল। সেখানকার বিষখালী নদীর অদূরে বঙ্গোপসাগরের পাড়েই হচ্ছে লালদিয়া সমুদ্র সৈকত। এখান থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত অবলোকন করা যায়। এক পাশে সমুদ্র, অন্য পাশে বন, মাঝে সৈকত, এমন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য প্রকৃতিতে বিরল।

নীলিমা পয়েন্ট

বরগুনার উপকূলীয় পাথরঘাটা পৌর শহরের দক্ষিণ অংশের বিষখালী নদীর তীরের শহর রক্ষা বাঁধ ও তার আশপাশের এলাকা এখন পর্যটন সম্ভাবনায় উজ্জ্বল হয়ে উঠছে দিন দিন। সুনীল আকাশ আর বিশাল জলরাশি এখানে মিলেমিশে একাকার যেন- আর তাই এ স্থানের নামকরণ করা হয়েছে ‘নীলিমা পয়েন্ট’। বরগুনা জেলা প্রশাসন পর্যটন সম্ভাবনার দিকটি মাথায় রেখে আগামী শুক্রবার নীলিমা পয়েন্ট নামের এ চিত্তকর্ষক পর্যটন স্পটটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের পরিকল্পনা নিয়েছে।

পাথরঘাটা পৌর শহরের দক্ষিণে ২ নম্বর ওয়ার্ড। সেখানে বিষখালী নদীর তীরে ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধটি মেরামত করা হচ্ছে, সুরক্ষার জন্য স্থাপন করা হচ্ছে কংক্রিট ব্লক। এখনো ব্লক বসানোর কাজ অসম্পূর্ণ। দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের মোহনা। সব সময় থাকে মৃদুমন্দ বাতাস। সব সময় কানে প্রশান্তির পরশ বোলায় নদীর বহমান পানির ছন্দ। নৌকায় জেলেদের আনাগোনায় গোধূলীতে নীল আকাশ মিতালি করে বিষখালীর পূর্ব তীরের সবুজ-শ্যামল গাছগাছালির সঙ্গে। বাঁধে নির্মিত ব্লকে বসে সন্ধ্যায় দেখা যায় পূর্ব দিক থেকে চাঁদ ওঠার দৃশ্য। চাঁদের আলো পড়ে শান্ত নদীতে এক অপার্থিব নয়নাভিরাম দৃশ্যের সৃষ্টি হয়।

নীলিমা পয়েন্ট

দুপুরের সূর্য ক্রমে পশ্চিমে হেলে পড়লে এখানে এক-দুজন করে শুরু হয় লোকসমাগম। নির্মল প্রকৃতির পরশে অবসর-বিনোদনে মশগুল লোকজন এখানে থাকে রাত অবধি। দৈনন্দিন কাজের চাপে ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত শহুরে মানুষগুলো কোলাহলমুক্ত এ পরিবেশে কংক্রিটের ব্লকের ওপরে বসে থেকেও খুঁজে প্রশান্তির পরশ। এখানে এসে তাদের হয়তো মনে পড়ে নিজ ঘরে দখিনের জানালা খুলে বসে থাকার কথা।

কালমেঘা পর্যটন কেন্দ্র

বিষখালী নদী। একদিকে জেলেদের অভয়ারণ্য, অন্যদিকে বিষখালী নদীর পাশেই সারিবদ্ধ ব্লক। দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসে একটু প্রশান্তির জন্য। বিকেল বেলার আকাশের কালোর মেঘ আর জেলেদের তাজা মাছ নিয়ে ছোটাছুটি সবাইকে মুগ্ধ করবে। যার নাম কালমেঘা পর্যটন কেন্দ্র। একট প্রশান্তি পেতে প্রতিদিনই ছুটে আসে শিশু, কিশোর, বৃদ্ধ কোনো বয়সের মানুষ বাদ থাকে না।

কালমেঘা পর্যটন কেন্দ্র

যাতায়াত: সড়ক পথে সায়দাবাদ, গাবতলী বাসস্ট্যান্ড থেকে বরগুনা অথবা পাথরঘাটাগামী বাসে করে পাথরঘাটার কালমেঘা বাজারে নেমেই কালমেঘা পর্যটন কেন্দ্র।

পর্যটন বিকাশে উদ্যোগ

এখানকার স্থানগুলোকে এক্সক্লুসিভ পর্যটন কেন্দ্র করার প্রস্তুতি নিয়েছে সরকার। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সোনার চরের ২০ হাজার ২৬ হেক্টর বিস্তৃত বনভূমিসহ ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ সমুদ্র সৈকতজুড়ে গড়ে তোলা হবে এক্সক্লুসিভ পর্যটন কেন্দ্র। এজন্য ‘প্রিপারেশন অব পায়রা-কুয়াকাটা রিজিওনাল প্ল্যান’ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে সরকার। 

মূলত কুয়াকাটা, তালতলী ও পাথরঘাটা উপজেলার সমন্বয়ে পর্যটন জোন স্থাপন করা হবে। এ লক্ষ্যে চলতি সময় থেকে শুরু করে ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত চলবে সার্ভের কাজ। 

বনবিভাগের পটুয়াখালী উপকূলীয় বনকেন্দ্রের ডিএফও মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, সরকারের নির্দেশনা মোতাবেক আমরা কাজ করছি। এরইমধ্যে হরিণঘাটা পর্যটন কেন্দ্র উন্নয়নের জন্য এক কোটি টাকার ‘ইকোট্যুরিজম উন্নয়ন’ প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। এছাড়া সুন্দরবন সংলগ্ন বলেশ্বর নদীর ওপর বিহঙ্গ দ্বীপ নিয়েও আমরা কাজ করছি। লালদিয়া সি-বিচ।

সংরক্ষিত আসনের এমপি নাদিরা সুলতানা বলেন, হরিণঘাটা পর্যটন কেন্দ্র আরো পর্যটক আকৃষ্ট করতে উচ্চপর্যায়ে যোগাযোগ চলছে। এছাড়া বিহঙ্গ দ্বীপ নিয়েও ডিও লেটার (চাহিদাপত্র) দেয়ার জন্য প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে।

বরগুনা-২ আসনের এমপি শওকত হাচানুর রহমান রিমন বলেন, পাথরঘাটার পর্যটন কেন্দ্রগুলোকে এক্সক্লুসিভ পর্যটন জোনের আওতায় এনে ওই আদলে এখানকার কেন্দ্রগুলোকে সাজালে শুধু দেশি নয়, বিদেশি পর্যটকরাও এখানে আসবে।

ডেইলি বাংলাদেশ/এমআর