বড় ভাইদের ছত্রচ্ছায়ায় যেভাবে বেপরোয়া হয়ে উঠেন ধর্ষক রনি

এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে গণধর্ষণ

বড় ভাইদের ছত্রচ্ছায়ায় যেভাবে বেপরোয়া হয়ে উঠেন ধর্ষক রনি

জাকারিয়া চৌধুরী, হবিগঞ্জ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৫:৫৫ ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০   আপডেট: ১৬:০১ ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০

ধর্ষণ মামলার আসামি শাহ মাহবুবুর রহমান রনি

ধর্ষণ মামলার আসামি শাহ মাহবুবুর রহমান রনি

হবিগঞ্জ সদর উপজেলার নিজামপুর ইউপির বাগুনিপাড়া গ্রামের বাসিন্দা শাহ জাহাঙ্গীর মিয়ার ছেলে শাহ মাহবুবুর রহমান রনি। শিক্ষা জীবনের প্রথম ধাপটা অতিবাহিত করেন নিজ গ্রামেই। নিজ গ্রাম শায়েস্তাগঞ্জ থেকে এইচএসসি পাশ করে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স শেষ করে এমসি কলেজে স্নাতকোত্তর করছেন।

তিনি এমসি কলেজের মাস্টার্সের ইংরেজি বিভাগের অনিয়মিত ছাত্র বলেও জানা গেছে। পড়ালেখায় মেধাবী রনি ছোটবেলায় অনেকটা শান্ত স্বভাবের ছেলে ছিলেন। তবে কলেজে উঠার সঙ্গে সঙ্গে তার স্বভাব-চরিত্রে পরিবর্তন আসতে শুরু করে। বিভিন্ন ধরনের নেশা, বখাটেপনা, মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা ছিল তার নিত্যদিনের সঙ্গী। তবে এলাকায় থাকাকালীন সময় রাজনীতিতে তিনি এতটা সক্রিয় ছিলেন না। সিলেট যাওয়ার পর বড় ভাইদের ছত্রচ্ছায়ায় সেই রনি হয়ে উঠেন বেপরোয়া। 

অনুসন্ধানে জানা যায়, সিলেট গিয়ে একটি রাজনৈতিক দলে সক্রিয় হওয়ার পাশাপাশি গণধর্ষণ মামলার প্রধান আসামি এম সাইফুর রহমানের নেতৃত্বে গড়ে উঠে একটি ‘গ্যাং’। যে ‘গ্যাং’য়ের অন্যতম সদস্য রনি। এই ‘গ্যাং’টি ছিল এমসি কলেজ এলাকার আতঙ্ক। এমসি কলেজের ছাত্রাবাস ভাঙচুর ও পোড়ানোর সঙ্গেও এই ‘গ্যাং’টি জড়িত ছিল বলে জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা তুলতেন তারা। অভিযোগ রয়েছে বিভিন্ন সাংবাদিকদের হত্যার হুমকি দেয়ারও।

এমসি কলেজ ক্যাম্পাসে বিকেল বেলার এক আতঙ্কের নাম ‘ছিনতাই’। আর সেই ছিনতাইয়ের ঘটনায় নেতৃত্ব দিত রনিসহ তাদের সিন্ডিকেট। দৃষ্টিনন্দন ক্যাম্পাসটিতে ঘুরতে যাওয়া তরুণ-তরুণীসহ সাধারণ মানুষজন ছিনতাইয়ের শিকার হতো রনি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে। ঘুরতে যাওয়া পর্যটকদের টাকা, মোবাইল, মোটরসাইকেল, দামি হাতঘড়ি, নারীদের সোনা-গহনা ছিনতাইয়ের মূল চক্র ছিল ‘গ্যাংটি’। 

স্থানীয় এলাকাবাসীর দাবি, বাগুনিপাড়ায় রনির পিতাসহ দুই ভাই অত্যন্ত সহজ ও সরল প্রকৃতির। তাদের চলাফেরাও আর দশজনের মত সাধারণ। কিন্তু রনি সিলেটে রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে যাওয়ার পর থেকেই এলাকায় তার প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে। এলাকায় যেকোনো সভা সমাবেশ হলেই উপস্থিত থাকতেন রনি। এছাড়াও তার পরিবারের সঙ্গে কারো ঝগড়া হলেই রনি রামদাসহ দেশীয় অস্ত্রসস্ত্র নিয়ে ঝাপিয়ে পড়তেন প্রতিপক্ষের উপর। এলাকার অনেক মেয়েরা রনির ইভটিজিংয়ের শিকার হয়েছেন। স্থানীয় বখাটেদের নিয়ে বাড়ি এসে বেপরোয়া চলাফেরা ও রাতে নেশার আড্ডা বসাতেন রনি। কোমরে অস্ত্র নিয়ে চলাফেরাই ছিল তার ‘লাইফস্টাইল’। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাগুনিপাড়া গ্রামের বেশ কয়েকজন যুবক জানান, রনি এলাকায় আসলে বখাটের উৎপাত বৃদ্ধি পেয়ে যেতো। রাজনৈতিক দলের ক্ষমতা দেখিয়ে তিনি নেশার আড্ডা বসানোসহ বিভিন্ন অপকর্ম চালাতেন। কেউ তার অপকর্মের প্রতিবাদ করলে অস্ত্র দিয়ে হুমকি দিতেন। রনির বেপরোয়া জীবন-যাপনে অতিষ্ট ছিল এলাকাবাসী। 

এদিকে, এমসি কলেজে গণধর্ষণের ঘটনায় রনি জড়িত থাকায় লজ্জিত হয়েছেন হবিগঞ্জবাসী। রনির প্রতি ঘৃণা ও নিন্দার ঝড় উঠেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে। পাশাপাশি রনিকে ‘কুলাঙ্গার’ উপাধি দিয়ে ধরিয়ে দিতে ফেসবুকে তার ছবিসহ স্ট্যাটাস দিচ্ছেন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিসহ সাধারণ মানুষ। 

তবে রনির বিষয়ে ইউপি সদস্য মো. আব্দুল গফফুর বলেন, রনির বাবা শাহ্ জাহাঙ্গীরের সঙ্গে আমার ভালো সম্পর্ক। বলতে গেলে আমাদের দুই পরিবারের মধ্যে পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে। তিনি অনেক মেধাবী এবং অনেক শান্ত স্বভাবের ছিলো। সিলেটের ঘটনাটি শুনে আমি অবাক হয়েছি। 

এ ব্যাপারে শায়েস্তাগঞ্জ থানার পুলিশ পরিদর্শক (ওসি তদন্ত) মো. আল মামুন বলেন, পুলিশ বিষয়টি নিয়ে তৎপর রয়েছে। এরমধ্যে তার বাড়িতে অভিযান চালানো হয়েছে। 

গত শুক্রবার (২৫সেপ্টেম্বর) এমসি কলেজে স্বামীর সঙ্গে বেড়াতে গিয়ে গণধর্ষণের শিকার হন এক গৃহবধূ। রাত সাড়ে ৮টার দিকে স্বামীর কাছ থেকে ওই গৃহবধূকে জোর করে তুলে নিয়ে ছাত্রাবাসে ধর্ষণ করেন একটি রাজনৈতিক দলের কয়েকজন নেতাকর্মী। এ সময় কলেজের সামনে তার স্বামীকে আটকে রাখেন দুইজন। এ ঘটনায় ভিকটিমের স্বামী বাদী হয়ে শাহপরান থানায় মামলা করেছেন। মামলায় ৬ নেতাকর্মীসহ অজ্ঞাত আরো ৩ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলার অন্য আসামিরা হলেন, সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার উমেদনগরের রফিকুল ইসলামের ছেলে তারেকুল ইসলাম তারেক, হবিগঞ্জ সদরের বাগুনীপাড়ার মো. জাহাঙ্গীর মিয়ার ছেলে শাহ মো. মাহবুবুর রহমান রনি, দিরাই উপজেলার বড়নগদীপুর (জগদল) গ্রামের রবিউল ইসলাম ও কানাইঘাটের গাছবাড়ি গ্রামের মাহফুজুর রহমান মাসুম। 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএম