৪০ বছর পর পদ্ম হাসল চলনবিলে

৪০ বছর পর পদ্ম হাসল চলনবিলে

তাড়াশ-রায়গঞ্জ (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৬:১০ ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০  

ছবি : সংগৃহীত

ছবি : সংগৃহীত

প্রায় ৪০ বছর পদ্মফুল ফুটল সিরাজগঞ্জের তাড়াশের চলনবিলে। হারিয়ে যাওয়া পদ্মের এই সগৌরব প্রত্যাবর্তনে উচ্ছ্বসিত চলনবিলবাসী। শুধু তাড়াশ নয়, পার্শ্ববর্তী গুরুদাসপুর উপজেলার হাঁড়িভাঙা বিলও উদ্ভাসিত হয়েছে পদ্মশোভায়। খবর পেয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের একদল গবেষক সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার দোবিলায় পদ্মফোটা বিল পরিদর্শন করেছেন।

বিলজুড়ে শত শত পদ্মের এ নয়নাভিরাম দৃশ্য চোখভরে দেখতে ছুটে আসছে পর্যটক আর প্রকৃতিপ্রেমীরা। পবিত্রতার আবেশ ছড়ানো পদ্মের রূপবৈচিত্র্য দেখে প্রকাশ করছে তাদের মুগ্ধতা।

দোবিলা গ্রামের ইসাহাক আলী জানান, গত শতাব্দীর আশির দশকের শুরু থেকে চলনবিল অঞ্চল থেকে হারিয়ে যেতে থাকে পদ্ম। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. মো. জামালের গবেষণায়ও প্রায় একই চিত্র উঠে এসেছে। তিনি ১৯৮৫ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত চলনবিল নিয়ে গবেষণা করেন। ওই সময়টায় তিনি তাড়াশের বিলে পদ্ম দেখেছেন। কিন্তু এরপর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের গবেষকেরা এ অঞ্চলে আর কোনো পদ্ম দেখতে পাননি। 

তাড়াশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার গাজী আব্দুর রহমান স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, এককালে চলনবিলে হরেক রকম জলজ উদ্ভিদ পাওয়া যেত। বিলের বিভিন্ন প্রান্তে ফুটে থাকত শাপলা ও পদ্ম। পদ্ম ফোটার সেই মনোমুগ্ধকর দৃশ্য মানুষকে আবেগতাড়িত করত। বিলের মানুষ পদ্মপাতায় ভাত খেত। হাট থেকে লবণ, জিলাপি, গুড়জাতীয় পণ্য নিয়ে আসত পদ্মপাতায় মুড়িয়ে। কিন্তু বিলের জলাধার দিনের পর দিন কমতে থাকায় ধীরে ধীরে তা হারিয়ে যায়।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে জন্মানো পদ্মফুলকে বৈশিষ্ট্য অনুসারে দুটি প্রজাতিতে ভাগ করা হয়। এর মধ্যে একটি হচ্ছে এশিয়ান বা ইন্ডিয়ান লোটাস (পদ্ম), অন্যটি হচ্ছে আমেরিকান বা ইয়েলো লোটাস। এশীয় পদ্ম আবার দুই রঙে দেখা যায়। একটি মসৃণ সাদা, অন্যটি হালকা গোলাপি। আমাদের দেশে যেসব পদ্মফুল দেখতে পাওয়া যায়, সেগুলো এশিয়ান বা ইন্ডিয়ান লোটাস বলে জানিয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাবরিনা নাজ। তিনি গত শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) চলনবিল অধ্যুষিত সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার মাগুড়াবিনোদ ইউপির দোবিলা বিলে ফোটা পদ্মফুল পরিদর্শন করেন।

অধ্যাপক সাবরিনা প্রায় ৪০ বছর পর চলনবিলে পদ্ম ফিরে আসা প্রসঙ্গে বলেন, পদ্ম একটি বহুবর্ষজীবী জলজ উদ্ভিদ। পদ্মফুলের একটি পরিপক্ব বীজ এক হাজার বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। অনুকূল পরিবেশ পেলে সে আবারো বংশবিস্তার করে। চলনবিলে ফোটা পদ্মের ক্ষেত্রেও সেটিই হয়েছে।

অধ্যক্ষ এম এ হামিদ রচিত ‘চলনবিলের ইতিকথা’ বই থেকে জানা যায়, ১৮২৭ সালে চলনবিলের জলমগ্ন অংশের আয়তন ছিল ৫০০ বর্গমাইলের ওপর।

১৯০৯ সালে পরিচালিত চলনবিল জরিপের এক প্রতিবেদনে এর আয়তন দেখানো হয় ১৪২ বর্গমাইল। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. নজরুল ইসলাম জানান, বর্তমানে শুষ্ক মৌসুমে চলনবিলের জলমগ্ন এলাকা থাকে মাত্র ৮৫ বর্গকিলোমিটার।

চলনবিল এলাকার মধ্যে বিভিন্ন নামে এক হাজার ৭৫৭ হেক্টর আয়তনের ৩৯টি বিল রয়েছে। এসব বিলে পদ্ম, শাপলা, মাখনা, সিঙ্গট, গেচু, চেচুয়া, ভাতসোলাসহ বহু প্রজাতির সপুষ্পক, ফার্ন, মস ও শৈবাল পাওয়া যেত একটা সময়। এর অনেকটিই এখন বিপন্ন এবং বেশ কিছু প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

জলবায়ুর পরিবর্তন, অপরিকল্পিত রেল ও সড়কপথ নির্মাণ, নদী ও খাল দখল, যত্রতত্র অবকাঠামো নির্মাণের ফলে বিশাল প্রাকৃতিক জলাধার চলনবিল এখন অস্তিত্ব সংকটে রয়েছে। গবেষকদের অভিমত, পরিবেশের ভারসাম্য ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় চলনবিল নিয়ে এখনই চিন্তাভাবনা আর পদক্ষেপ নেয়ার সময়। তা না হলে হারিয়ে যাবে অনেক জলজ উদ্ভিদ, প্রাণী এবং প্রাণবৈচিত্র্যে ভরপুর ঐতিহ্যময় চলনবিল।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএইচ