বায়োমেট্রিক মেশিনের পর এবার শিক্ষা উপকরণ কেনায় দুর্নীতি 

বায়োমেট্রিক মেশিনের পর এবার শিক্ষা উপকরণ কেনায় দুর্নীতি 

মাসুম বাদশাহ, সিংগাইর ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৮:৫৯ ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০  

সিংগাইর উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্স

সিংগাইর উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্স

মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে বায়োমেট্রিক হাজিরা মেশিন ক্রয় সংক্রান্ত দুর্নীতির পর এবার স্লিপ ফান্ডের টাকায় কেনাকাটার নামে হয়েছে লুটপাট।

বিধিবহির্ভূতভাবে বিদ্যালয়গুলোতে বিভিন্ন উপকরণ ক্রয়ে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।  এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটি ও শিক্ষকদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। 

উপজেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে উপজেলার ৯৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা অনুযায়ী স্লিপ ফান্ডের টাকা বরাদ্দ হয়। সে ক্ষেত্রে স্কুলভিত্তিক তিন ক্যাটাগরিতে ৫০ হাজার, ৭০ হাজার ও ৮৫ হাজার টাকা করে পায় স্কুলগুলো। বরাদ্দপ্রাপ্ত টাকা থেকে সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট ও ২ শতাংশ আইটি কর্তনের পর বাকি টাকায় স্ব-স্ব স্কুলের ব্যবস্থাপনা কমিটি ও প্রধান শিক্ষক সমন্বয়ে প্রয়োজনীয় উপকরণ ক্রয় করার কথা। 

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, সিংগাইরে স্লিপ ফান্ডের বরাদ্দকৃত টাকা উপকরণ কেনার জন্য জমা দেয়া হয় শিক্ষা অফিসের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা ক্লাস্টার প্রধানদের কাছে। যার পরিমাণপ্রায় অর্ধকোটি টাকা। এতে স্কুলপ্রতি সেলাই মেশিন ক্রয় ৮ হাজার, হারমোনিয়াম সাড়ে ১৭ হাজার, প্রিন্টার ১০ হাজার, মডেম ৩ হাজার ও পেনড্রাইভ দেড় হাজার টাকা দাম ধরা হয়। 

এর মধ্যে শুধু হারমোনিয়াম ছাড়া অন্য সব নিম্নমানের উপকরণস্কুলগুলোতে পৌঁঁছেছে। এ সমস্ত বিভিন্ন উপকরণ বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাজার মূল্যের চেয়ে এসব পণ্যের দাম ধরা হয়েছে দুই তিন গুণ বেশি। 

কেনাকাটায় নয়-ছয় করে বাড়তি অর্থ সহকারি শিক্ষা অফিসার মো. ফারুক হোসেনের নেতৃত্বে অন্যান্য অফিসারদের মধ্যে ভাগ- বাটোয়ারা হয়েছে বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষক ও ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি জানিয়েছেন। 

এদিকে, প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণি সজ্জিতকরণে স্কুল প্রতি ৯ হাজার পঞ্চাশ টাকা বরাদ্দ হয়। যা থেকে মিনি বাস্কেটবল সাড়ে তিন হাজার টাকা, পুশপিন ১ হাজার , হোয়াইট বোর্ড দেড় হাজার ও ম্যাট ক্রয়ে ৩ হাজার পঞ্চাশ টাকা দেখানো হয়। 

পাশাপাশি প্রত্যেক স্কুলে প্রাকৃতিক দুর্যোগকালীন উপকরণ ক্রয় ও কিছু কিছু স্কুলে ওয়াশবøক মেরামত এবং রুটিন মেইনটেন্যান্সের কাজে প্রায় অর্ধ লাখ টাকার ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।

এ ছাড়া স্কুলগুলোতে কন্ট্রাকের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ কর্নার তৈরিতে ১৩ হাজার, বৈদ্যুতিক মেরামত সাড়ে ৭ হাজার ও নামজারিতে আড়াই হাজার টাকার কাজেও হয়েছে কারচুপি। 

এর আগে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সহকারি শিক্ষা অফিসার মো. ফারুক হোসেনের বিরুদ্ধে ডিজিটাল হাজিরা মেশিন ক্রয়ে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতি ও সিলেবাস বাণিজ্য নিয়ে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে ফলাও করে সংবাদ প্রকাশিত হয়। পরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ম্যানেজ হওয়ায় বিষয়টি ধামাচাপা পড়ে। 

প্রতিবাদকারী শিক্ষকরা দুর্নীতিবাজদের রোষানলে পড়ে হন হয়রানির শিকার। যে কারণে অনেকে এবার দুর্নীতি নিয়ে মুখ খুলতে নারাজ। 

৮১ নম্বর দেহনাখিলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তুলসী রানী সরকার বলেন, মাস্ক, সাবান ও ব্লিচিং পাউডার ছাড়া স্লিপের টাকার যাবতীয় উপকরণ এটিইও তিনি (ফারুক হোসেন) কিনে দিয়েছেন। এর জন্য তাকে ৪২ হাজার টাকা দেয়া হয়েছে। 

রামনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কার্তিক চন্দ্র মণ্ডল বলেন, টিইও, এটিইও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মিডিয়া করে এ কাজগুলো করেছেন। বিভিন্ন কোম্পানির সঙ্গে কন্ট্রাক অনুযায়ী তাদের পৌঁছে দেয়া মালামাল সিংগাইর থেকে সংগ্রহ করেছি। 

এ প্রসঙ্গেঁ সহকারি শিক্ষা অফিসার মো. নজরুল ইসলাম ও মাহফুজা খাতুনের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলে তারা ফোন রিসিভ করেননি। 

সদর ও গোলাইডাঙ্গা ক্লাস্টারের দায়িত্বে থাকা এটিইও মো. ফারুক হোসেন বলেন, আমরা কেনা কাটার সঙ্গে জড়িত না, জাস্ট সমন্বয় করে দিয়েছি। যাতে কাজগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হয়। 

সিংগাইর উপজেলা শিক্ষা অফিসার সৈয়দা নার্গিস আক্তার বলেন, দামের সঙ্গে ভ্যাট ধরে সমন্বয় করায় একটু বেশি মনে হতে পারে। এ বিষয়ে নেগেটিভ কিছু না লিখে স্কুলগুলোতে বিভ্ন্নি উন্নয়নমূলক কাজ সঠিকভাবে হচ্ছে কিনা সেদিকে খেয়াল রাখার অনুরোধ করেন তিনি। 

এ ব্যাপারে, মানিকগঞ্জ জেলা শিক্ষা অফিসার তাপস কুমার অধিকারী বলেন, স্কুলগুলোর প্রয়োজন অনুযায়ী স্কুল ম্যানেজিং কমিটি মিটিং করে স্লিপের টাকা থেকে বাজারদর যাচাই-বাছাই করে উপকরণ ক্রয় করবেন। উপজেলা শিক্ষা অফিস থেকে এসব উপকরণ ক্রয় করা বা সরবরাহ করার কোনো বিধান নেই। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। 

ডেইলি বাংলাদেশ/এমকে