যেভাবে দেশসেরা আলেম হলেন আল্লামা আহমদ শফী

যেভাবে দেশসেরা আলেম হলেন আল্লামা আহমদ শফী

মো. রাকিবুর রহমান, চট্টগ্রাম মহানগর ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৪:৪৬ ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০   আপডেট: ১৭:৪৯ ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০

আল্লামা আহমদ শফী (ফাইল ছবি)

আল্লামা আহমদ শফী (ফাইল ছবি)

১৩৫১ হিজরী সনে (১৯১৭ সালে) চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার পাখিয়ারটিলা গ্রামে এক আলেম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন শাহ আহমদ শফী। শিশুকালে পিতা-মাতার ইচ্ছায় মৌলভী আজিজুর রহমানের কাছে কোরআন শিক্ষা গ্রহণ করেন তিনি। কোরআন শিক্ষার পাশপাশি নেন চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত মাতৃভাষা শিক্ষাও। 

এরপর সরফভাটা মাদরাসায় প্রাথমিক কিতাব পাঠে মনোনিবেশ করেন আহমদ শফী। সাফল্যের সঙ্গে কিতাবে শিক্ষা গ্রহণ শেষে তিনি ভর্তি হন চট্টগ্রামস্থ ঐতিহ্যবাহী আল জামিয়াতুল আরাবিয়া ইসলামিয়া জিরি মাদরাসায়। সেখানে পাঁচ মাস অধ্যয়ন শেষে ১৩৬১ হিজরীতে এশিয়া মহাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম দীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দারুল উলূম মুঈনুল ইসলামে ভর্তি হন তিনি। তখন তার বয়স মাত্র ১০ বছর। 

দারুল উলূম মুঈনুল ইসলামে একাধারে ১০ বছর উর্দু, ফার্সি, আরবি ও সাহিত্যসহ ইলমে নাহু, ইলমে সরফ, ইলমে ফিকাহ, মানতিক (যুক্তিবিদ্যা), ফালসাফা (দর্শনবিদ্যা), বালাগাত (অলঙ্কারবিদ্যা) প্রভৃতি বিষয়ে জ্ঞান অর্জন শেষে ইলমে হাদিস ও ইলমে তাফসিরের উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণের জন্য ১৩৭১ হিজরিতে ইসলামি শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র, ঐতিহ্যবাহী হাদিস শিক্ষার পাদপীঠ, এশিয়া মহাদেশের শ্রেষ্ঠতম দীনি বিদ্যানিকেতন ভারতের দারুল উলূম দেওবন্দে পাড়ি জমান আহমদ শফী।

আরো পড়ুন: পানিতেই কাটছে দিনরাত

দেওবন্দে অধ্যায়নকালে শায়খুল আরব ওয়াল আযম আল্লামা হুসাইন আহমদ মাদানীর সংস্পর্শে এসে তার হাতেই বাইয়াত গ্রহণ করে ‘খেলাফতপ্রাপ্ত’ হন তিনি। সেখানে একাধারে চার বছর অধ্যায়ন ও বিখ্যাত ধর্মগুরুদের পদাঙ্ক অনুসরণের মাধ্যমে হাদিস, তাফসির ও ফিকাহশাস্ত্র বিষয়ে জ্ঞান অর্জন শেষে আল্লামা মাদানীর প্রতিনিধি হয়ে চলে আসেন বাংলাদেশে।

বাংলাদেশে আসার পর জামিয়ার তৎকালীন মহাপরিচালক আল্লামা শাহ্ আবদুল ওয়াহ্হাবের সংস্পর্শে আসেন আহমদ শফী। এরপর আল-জামিয়াতুল আহ লিয়া দারুল উলূম মুঈনুল ইসলামে শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হন তিনি। পরে ১৪০৭ হিজরীতে পান মহাপরিচালকের দায়িত্ব। এর পাশাপাশি বাংলাদেশ কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড (বেফাক) এবং বাংলাদেশ সর্বোচ্চ ওলামা পরিষদের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন তিনি।

তার হাত ধরেই ২০১০ সালের ১৯ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠিত হয় কওমি মাদরাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। আমৃত্যু সেই সংগঠনের আমির হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।

উর্দু ও বাংলা মিলিয়ে মোট ২৫টি গ্রন্থ লিখেছেন আহমদ শফী। সেগুলো হলো- হক্ব ও বাতিলের চিরন্তন দ্বন্দ্ব, ইসলামি অর্থ ব্যবস্থা, ইসলাম ও রাজনীতি, ইজহারে হাক্বীক্বত বা বাস্তব দৃষ্টিতে মওদূদী মতবাদ, তাকফীরে মুসলিম বা মুসলমানকে কাফির বলার পরিণাম, সত্যের দিকে করুণ আহ্বান, ধুমপান কি আশীর্বাদ না অভিশাপ, একটি সন্দেহের অবসান, একটি গুরুত্বপূর্ণ ফতোয়া, তাবলীগ একটি অন্যতম জিহাদ, ইছমতে আম্বিয়া ও মিয়ারে হক্ব, সুন্নাত-বিদআতের সঠিক পরিচয়, বায়আতের হাক্বীক্বত, আল বয়ানুল ফাসিল বাইনাল হক্কে ওয়াল বাতিল, আল হুজাজুল ক্বাতিয়াহ্ লিদাফয়িন নাহ্জিল খাতেয়াহ, আল-খায়রুল কাসীর ফী উসূলীত্ তাফ্সীর, ইসলাম ওয়া ছিয়াছত, ইজহারে হাক্বীক্বত, তাকফীরে মুসলিম, চান্দ রাওয়েজাঁ, ফয়ূজাতে আহমদিয়া, বুখারি শরীফের ব্যাখ্যা গ্রন্থ ফয়জুল জারি এবং মিশকাত শরীফের ব্যাখ্যা গ্রন্থ প্রমুখ। এছাড়াও উর্দু ও বাংলা ভাষায় তার আরো অনেকগুলো গ্রন্থ প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে।

আরো পড়ুন: সোনামসজিদ বন্দর দিয়ে ফের পেঁয়াজ আমদানি শুরু

১০৪ বছর বয়সে শুক্রবার সন্ধ্যায় পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়ায় আজগর আলী হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন আল্লামা শাহ আহমদ শফী।

এর আগে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয় তাকে। সেখান থেকে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে শুক্রবার সন্ধ্যার আগে ঢাকার আজগর আলী হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করা হয়। সেখানে লাইফ সাপোর্টে থাকা অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

এদিকে, শনিবার সকাল সাড়ে ৯টায় অ্যাম্বুলেন্স যোগে আল্লামা শাহ আহমদ শফীর মরদেহ হাটহাজারী দারুল উলুম মাদরাসায় এসে পৌঁছে। জোহরের নামাজের পর দারুল উলুম মাদরাসা প্রাঙ্গণে জানাজা শেষে মাদরাসার পাশের মাকবারায়ে হাবিবিয়াতে তাকে দাফন করা হয়।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএম/জেএইচ