দেশ ও সাধারণের সেবা করাই তার লক্ষ্য, উদ্ধার করেছেন ১৪০০ বেশি নিখোঁজ বাচ্চাকে

দেশ ও সাধারণের সেবা করাই তার লক্ষ্য, উদ্ধার করেছেন ১৪০০ বেশি নিখোঁজ বাচ্চাকে

সাতরং ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১১:২৪ ২২ সেপ্টেম্বর ২০২২   আপডেট: ১১:৩৪ ২২ সেপ্টেম্বর ২০২২

উদ্ধার করেছেন ১৪০০ বেশি নিখোঁজ বাচ্চাকে রেখা মিশ্র। ছবি: সংগৃহীত

উদ্ধার করেছেন ১৪০০ বেশি নিখোঁজ বাচ্চাকে রেখা মিশ্র। ছবি: সংগৃহীত

পুলিশের চাকরি থেকে অবসারে যাওয়ার আর মাত্র আট বছর বাকি। এই স্বল্প সময়েই এক হাজার ৪০০ বেশি নিখোঁজ শিশু, কিশোর-কিশোরীকে উদ্ধার করেছেন। কর্মক্ষেত্রে তার দক্ষতাকে কুর্নিশ করেছে ভারত সরকারও। সেই স্বীকৃতি হিসাবে পেয়েছেন রাষ্ট্রপতি পুরস্কার। তবে সেই সম্মানের সঙ্গে প্রাপ্ত অর্থ অর্থাৎ এক লাখ টাকা অক্লেশে দান করে দিয়েছেন রেখা মিশ্র।

নিজের কর্মকাণ্ডের জেরে প্রায়শই শিরোনামে ভেসে ওঠেন রেলপুলিশের (সিআরপিএফ) আধিকারিক রেখা। পুলিশ বা সেনাবাহিনীতে তিনি যে যোগদান করবেন, ছোটবেলা থেকেই তা জানতেন। বাবা কাজ করতেন ভারতীয় সেনাবাহিনীতে। ঠাকুরদা ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী। রেখার কথায়,‘জনসেবা করাটা আমার রক্তেই রয়েছে। ছোটবেলা থেকেই স্থির করেছিলাম যে আমি পুলিশেই কাজ করব।

ছোটবেলা থেকেই স্থির করেছিলাম যে আমি পুলিশেই কাজ করবমুম্বই রেলপুলিশে কর্মরত হলেও আদতে তিনি উত্তরপ্রদেশের কানিজা গ্রামের বাসিন্দা। রেখা জানিয়েছেন, ছোটবেলা থেকেই নানা খেলাধুলোয় উৎসাহ ছিল তার। জনসমক্ষে ভালো বক্তৃতাও করতেন। স্কুলের পড়াশোনা শেষ করে অবশ্য বিএড ডিগ্রি লাভ করেন তিনি। এর পর ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর করেন।

বিএড ডিগ্রি লাভের পর শিক্ষকতা করেননি রেখা। বরং পুলিশে কাজ করার চেষ্টা শুরু করেন। তিনি বলেন, বাবা-ঠাকুরদাকে দেখেই পুলিশের কাজ করার অনুপ্রাণিত হয়েছি। বড় হলে যে আমি পুলিশের চাকরি করব, তাও ঠিক করে নিয়েছিলাম।

রেখা জানিয়েছেন, অন্যদের সাহায্য করার শিক্ষা পেয়েছিলেন পরিবার থেকে। তার কথায়, আমাদের এমন একটা পেশা বেছে নেয়ার কথা বলা হত, যার মাধ্যমে দেশ এবং মানুষের সেবা করা যায়। ছোট থেকেই কড়া অনুশাসনে বড় হয়েছেন রেখারা। ছোটবেলা থেকেই আমাদের ভোরে ঘুম থেকে উঠতে হত। এরপর চলত ব্যায়ামের পালা। পুলিশের চাকরির পরীক্ষায় পাশ করার দিনটি আজও ভোলেননি তিনি।

পুলিশের চাকরির পরীক্ষায় পাশ করার দিনটি আজও ভোলেননি তিনিরেখার কথায়, যে দিন পুলিশের চাকরির পরীক্ষায় উতরোনোর খবর পেলাম, সে দিন আমাকে স্যালুট করেছিলেন বাবা। বলেছিলেন, প্রশংসা পাওয়ার জন্য কাজ কোরো না। বরং কোনো একটি উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করে যাও।  বাবার সে কথাগুলো আজও মনে রেখেছেন রেখা। ১৯৮৬ সালে জন্ম রেখার। মধ্য তিরিশের রেখা জানিয়েছেন, পুলিশের চাকরির পরীক্ষায় পাশ করার পর মুম্বই রেলপুলিশে সাব-ইনস্পেক্টরের কাজে যোগ দেন তিনি। সেটি ছিল ২০১৪ সাল। সাব-ইনস্পেক্টর হিসাবে রেখার প্রথম দায়িত্ব ছিল মুম্বইয়ের ছত্রপতি শিবাজি মহারাজ টার্মিনাসে। শিশু, কিশোর-কিশোরীদের পাচার রোখা-সহ তাদের উদ্ধার করাই দায়িত্ব ছিল তার।

রেখার সহকর্মীদের মতে, ছোট ছেলেমেয়েরা যে বিপদে পড়েছে, তা সহজেই ধরে ফেলতে পারেন রেখা। এ বিষয়ে তার দক্ষতা প্রশ্নাতীত। মুম্বই সিএসটির মতো স্টেশনের ভিড়ভাট্টায় কীভাবে বুঝে যান যে কোনো ছেলেমেয়ে বাড়ি ছেড়ে পালাচ্ছে অথবা তাদের অপরহণ করা হয়েছে? সংবাদমাধ্যমের এ প্রশ্নের জবাবে রেখা বলেন, ‘আমরা এমন ছেলেমেয়েদের খুঁজি, যাদের দেখে মনে হয় তারা হারিয়ে গিয়েছে। কোথায় যাবে, তা বুঝে উঠতে পারছে না। আমাদের সে ট্রেনিংই দেওয়া হয়েছে।’

 ১৯৮৬ সালে জন্ম রেখারবছর আটেকের পুলিশের চাকরির পর রেখার নজরও অভিজ্ঞ হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন, ‘দারিদ্রের জ্বালায় বহু ছেলেমেয়েই বাড়ি ছেড়ে কাজের খোঁজে মুম্বইয়ে পালিয়ে আসে। তবে অনেকে আবার মা-বাবার সঙ্গে ঝগড়াঝাঁটি করে ঘর ছাড়ে। এ রকমের আট থেকে ১২ বছরের ছেলেমেয়েই বেশি। কেউ আবার মাদকাসক্ত। কেউ আবার ফেসবুকে কারও সঙ্গে আলাপপরিচয়ের পর এখানে চলে আসে। আবার বলিউডের তারকাদের টানেও অনেকে এ শহরে পাড়ি দেয়।’

পুলিশের চাকরিতে নিজের অভিজ্ঞতার কথাও জানিয়েছেন রেখা। তার কথায়, ‘এক বার একটি ১৬ বছরের মেয়েকে উদ্ধার করেছিলাম। ও বাড়ি ছেড়ে মুম্বইয়ে পালিয়ে এসেছিল। ওকে দেখেই বোঝা যাচ্ছিল,  আনমনা। আমরা ওর মা-বাবাকে খবর দিই। মেয়েটির মা-বাবা আসার পর জানতে পারি, সে অন্তঃসত্ত্বা।’

আর এক বার গোয়া থেকে আসা ৪৫ বছরের এক অপহরণকারীকে ধরেছিলাম। তার সঙ্গে ১৫ বছরের একটি মেয়ে ছিলনিজের পেশায় প্রতি দিনই বিচিত্র ঘটনার সাক্ষী হন রেখা। তিনি বলেন, ‘আর এক বার গোয়া থেকে আসা ৪৫ বছরের এক অপহরণকারীকে ধরেছিলাম। তার সঙ্গে ১৫ বছরের একটি মেয়ে ছিল। গোয়া পুলিশ দুই জনের ছবি পাঠিয়েছিল। মুম্বই স্টেশনে পা রাখামাত্রই ঐ মেয়েটিকে দেখতে পাই। সঙ্গে সঙ্গে আমার টিম ঐ অপহরণকারীকে ধরে ফেলে। মেয়েটিকে বিয়ে করার জন্য তার উপর যৌন নির্যাতন করেছিল ঐ লোকটি।’

৩৬ বছর বয়সী রেখা জানান, কাজের চাপে নিজের ঘরসংসারের মন দিতে না পারলেও পরিবারের সকলেই তার পাশে দাঁড়িয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমার মা-বাবা বরাবরই আমাকে উৎসাহ দিয়েছেন। এখন শ্বশুরবাড়িতেও পুরোপুরি সহযোগিতা পাই। যদিও আত্মীয়স্বজনেরা প্রশ্ন করেন, ‘আর কবে মা হবে?’ 

২০১৮ সালে আন্তর্জাতিক নারী দিবসে নারী শক্তি পুরস্কারে তাকে ভূষিত করে ভারত সরকারনিজের কাজ নিয়েই মেতে রয়েছেন রেখা। তিনি বলেন, ‘প্রতি দিন ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা কাজ করতে হয়। তবে আমি এ কাজ করতে ভালবাসি। পুলিশ আধিকারিক হিসাবে গর্বও হয়। সন্তানধারণ করাই তো নারীর একমাত্র কাজ নয়! দেশের, দশের জন্য অবিরত কাজ করাই আমার লক্ষ্য।’ মুম্বইয়ের একটি সংবাদপত্রের রিপোর্ট জানিয়েছে, এমনকি, এক বছরে ৪৩৪ বাচ্চাকে উদ্ধার করেন তিনি।

রেখার এই নিষ্ঠার পুরস্কারও জুটেছে। ২০১৮ সালে আন্তর্জাতিক নারী দিবসে নারী শক্তি পুরস্কারে তাকে ভূষিত করে ভারত সরকার। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ তার হাতে সে পুরস্কার তুলে দেন। তবে পুরস্কার সঙ্গে প্রাপ্ত অর্থ রেখা দান করেছেন ‘চাইন্ডলাইন’ নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাকে। যারা উদ্ধার হওয়ার শিশুদের পুনর্বাসনের কাজ করে। রেখার দাবি, পুরস্কারের অর্থ ঐ শিশুদের প্রয়োজন, তার নয়।

সূত্র: আনন্দবাজার 

ডেইলি বাংলাদেশ/এসএ