সাইমন ড্রিং : মুক্তিযুদ্ধের এক বিদেশি বন্ধু

স্মরণ

সাইমন ড্রিং : মুক্তিযুদ্ধের এক বিদেশি বন্ধু

সাত রঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৪:৫৬ ১২ জানুয়ারি ২০২২   আপডেট: ১৫:০০ ১২ জানুয়ারি ২০২২

আন্তর্জাতিক পুরস্কার বিজয়ী ইংরেজ সংবাদিক সাইমন ড্রিং। ছবি : সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক পুরস্কার বিজয়ী ইংরেজ সংবাদিক সাইমন ড্রিং। ছবি : সংগৃহীত

তখন মুক্তিযুদ্ধের প্রারম্ভকাল। মার্চ মাসের প্রথম থেকে ২৫ বছরের তরুণ এক ইংরেজ সাংবাদিক সংবাদ সংগ্রহের জন্য ঢাকায় অবস্থান করছিলেন। তিনি ছবি তুলেছিলেন অবিরাম। তোলা ছবিগুলোর কিছু ছবি হয়তো প্রিন্ট করতে পেরেছিলেন। কিছু ছবি ছিল একেবারেই নেগেটিভে। সেই সাংবাদিককে দেশে ফিরত পাঠানোর চক্রান্ত শুরু করলো পাকিস্তানি শাসকরা। তখন তিনিসহ বেশ কিছু বিদেশি সাংবাদিককে পিআইএ বিমানযোগে করাচিতে পাঠানো হলো। সেখান থেকে সেনাবাহিনীর মর্জিমতো তারা স্বদেশে ফিরতে পারবেন।

কিন্তু বিপত্তি দেখা দিল একটি বিষয়ে, কিভাবে ছবির নেগেটিভগুলো দেশে নেবেন তিনি? নানা কৌশলে ছবিগুলো লুকিয়ে রওনা দিলেন। করাচি বিমানবন্দরেই তল্লাশি শুরু হলো। সাংবাদিকের কৌশলের কাছে হার মানল সেনাবাহিনীর তল্লাশি দল। অবশেষে ছাড়া পেয়ে লন্ডনের পথে রওনা হলেন। লন্ডনের বিখ্যাত পত্রিকায় প্রকাশিত হতে থাকে ঢাকায় ২৫ মার্চ রাত থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতার প্রতিবেদন ও ছবি। এর ফলে কেঁপে উঠল বিশ্ব বিবেক। ১ মার্চ থেকেও কী ঘটেছিল, তা প্রকাশ পেতে থাকে। এই সাহসী সাংবাদিকের নাম সাইমন ড্রিং।

সাইমন ড্রিং ১৯৪৫ সালের ১১ জানুয়ারি ইংল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন একজন আন্তর্জাতিক পুরস্কার বিজয়ী ইংরেজ সংবাদিক। ছিলেন টেলিভিশন উপস্থাপক এবং প্রতিবেদন নির্মাতা। তিনি বিশ্বখ্যাত সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের বৈদেশিক প্রতিনিধি হিসেবে বিশ্বের অনেক জায়গা ভ্রমণ করেন। এ ছাড়াও তিনি লন্ডনভিত্তিক দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ, বিবিসি টেলিভিশন এবং রেডিও সংবাদ ও চলতি ঘটনা তুলে ধরার লক্ষ্যে কাজ করেছেন। সর্বদাই তরতাজা ও গুরুত্বপূর্ণ খবর পরিবেশনের মাধ্যমে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি। তিনি বাংলাদেশে টেলিভিশন সাংবাদিকতার জনক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। আধুনিক টেলিভিশনের স্থপতি হিসেবে বাংলাদেশে পরিচিত তিনি। একদল তরুণ সৃজনশীল কর্মীকে নিয়ে সাইমন ড্রিংই শুরু করছিলেলেন একুশে টিভির পথচলা।

মুক্তিযুদ্ধের এক বিদেশি বন্ধু সাংবাদিক সাইমন ড্রিং। ছবি : সংগৃহীত

শৈশবকালে আওজ নদীতে গভীর রাতে সাঁতার কাটার অভিযোগে তাকে বোর্ডিং স্কুল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। এরপর তিনি কিংস্‌ লিন টেকনিক্যাল কলেজে অধ্যয়ন করেন। ১৭ বৎসর বয়সে তিনি গৃহত্যাগ করেন। ১৯৬২ সালে বহিঃবিশ্ব ভ্রমণের অংশ হিসেবে ভারত ভ্রমণ করেন। ১৮ বছর বয়সে তিনি প্রথম চাকুরীতে যোগদান করেন। সেই থেকে তার সাংবাদিকতা শুরু। যুদ্ধক্ষেত্রে সংবাদ সঙগ্রহ করতে গেয়ে আহত হয়েছেন একাধিকবার। সায়মন ড্রিং বাংলাদেশের গণহত্যার প্রত্যক্ষদর্শী প্রথম বিদেশি সাংবাদিক যিনি নিজের জীবন বিপন্ন করে সরেজমিন প্রতিবেদন তৈরি করেন। তিনিই সারা বিশ্বকে জানিয়ে দেন পাকিস্তানি বাহিনীর লোমহর্ষক নির্যাতন ও গণহত্যার কথা।

২৫ মার্চ গণহত্যার এক ঘণ্টা আগে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পূর্ব কমান্ডের জনসংযোগ কর্মকর্তা মেজর সিদ্দিক সালিক হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালে ঢুকলেন। তিনি জানান, ‘গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। এবং আপনাদের নিজের সুরক্ষার জন্য আমরা আপনাদের দেশের বাইরে নিয়ে যাচ্ছি।’ সাইমন ড্রিং উঠে দাঁড়ালেন এবং পরিচয় দেওয়ার পর তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আমি শুনেছি আমাদের চলে যেতে হবে। এটা কি আদেশ?’ উত্তর এল, ‘ওহ না, এটি কোনো আদেশ নয়। এটি কেবল আপনার নিজের সুরক্ষার জন্য।’

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঠিক পেছনের ট্রাকেই ছিলেন সাইমন ড্রিং। ছবি : সংগৃহীত

ড্রিং আরো বলেন, ‘আমি যদি থাকার কথা বেছে নেই, তবে কি ঠিক আছে?’ উত্তরে মেজর সালিক এবার বললেন, ‘হ্যাঁ, আপনি থাকতে পারবেন, তবে এটি আপনার পক্ষে বিপজ্জনক হতে পারে। আমরা আপনার জন্য একটি বিশেষ পার্টি প্রস্তুত করতে পারি।’
মেজরের কাছ থেকে এমন ব্যঙ্গাত্মক, তবে রহস্যজনক উত্তর পেয়ে সাইমন তার ঘরে চলে গেলেন। ব্যাগপত্র গুছিয়ে নিলেন এবং যাওয়ার ভান করলেন। তবে তিনি তখন দেশ ছাড়লেন না।

১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চের কালরাতে সাইমন ড্রিং হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে লুকিয়ে ছিলেন। তিনি প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে হোটেলেই লুকিয়ে ছিলেন। ২৭ মার্চ সকালে কারফিউ উঠে গেলে হোটেলের কর্মচারীদের সহযোগিতায় ছোট্ট একটি মোটরভ্যানে করে ঘুরে ঘুরে দেখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ইকবাল হল, রাজারবাগ পুলিশ ব্যারাক ও পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকা। তৎকালীন পাকিস্তানে সামরিক আইনের তোয়াক্কা না করে ২৭ মার্চ তিনি মুক্তিযুদ্ধের সংবাদ সংগ্রহ করে ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় প্রতিবেদন আকারে প্রেরণ করেন। যা ট্যাংকস ক্র্যাশ রিভোল্ট ইন পাকিস্তান শিরোনামে ৩০ মার্চ প্রকাশিত হয়। উক্ত প্রতিবেদনে তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে, ‘আল্লাহর নামে আর অখণ্ড পাকিস্তান রক্ষার অজুহাতে ঢাকা আজ ধ্বংসপ্রাপ্ত ও সন্ত্রস্ত এক নগর। পাকিস্তানি সৈন্যদের ঠান্ডা মাথায় টানা ২৪ ঘণ্টা গোলাবর্ষণের পর এ নগরের...’

১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চের কালরাতে সাইমন ড্রিং হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে লুকিয়ে ছিলেন। ছবি : সংগৃহীত

১৯৭১ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার তাকে জোরপূর্বক দেশ থেকে বের করে দিয়েছিল। ইংল্যান্ডে ফিরে গিয়ে পুনরায় নভেম্বর, ১৯৭১ সালে কলকাতায় আসেন তিনি। সেখান থেকে তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের যাবতীয় খবরাখবর নিরপেক্ষভাবে ঐ দৈনিকে প্রেরণ করতেন। ১৬ই ডিসেম্বর তারিখে বিজয়ের দিনে যৌথবাহিনীর সাথে ময়মনসিংহ হয়ে তিনিও ঢাকায় এসেছিলেন।

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের নির্বাসন থেকে ফিরে আসার সময়ও সাইমন ড্রিং ঢাকায় ছিলেন। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে বঙ্গবন্ধুর সাথে দুই-তিনবার সাক্ষাৎ করায় বঙ্গবন্ধু তাকে চিনতেন। সাইমন সেই ট্রাকের পেছনে ছিলেন, যেটি শেখ মুজিবকে ঢাকা বিমানবন্দর থেকে পল্টন ময়দানে নিয়ে যায়। বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পরদিন ছিল সাইমনের ২৮ তম জন্মদিন। তিনি অবস্থান করছিলেন একটি আন্তঃমহাদেশীয় হোটেলে। বঙ্গবন্ধু তাকে চমক দিতে সেই হোটেলে জন্মদিনের একটি কেক পাঠিয়ে দেন। এমন চমকে সাইমন ড্রিং রীতিমতো আপ্লুত হয়ে যান।

সাংবাদিকতার কাজে সরেজমিনে তথ্য সংগ্রহ করতেন সাইমন ড্রিং। ছবি : সংগৃহীত

যুদ্ধক্ষেত্রে কাজ করার সময় সাইমন ড্রিং দু'বার আহত হন- প্রথমবার ভিয়েতনামে, এবং দ্বিতীয়বার সাইপ্রাসে। সাংবাদিক হিসেবে তার আলোকিত ক্যারিয়ার অসংখ্য মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার এবং সম্মাননায় ভরপুর। ২০১২ সালে, মুক্তিযুদ্ধের চার দশক পর যুদ্ধে অবদান রাখায় রাষ্ট্রীয় সম্মাননা প্রদান করতে সাইমনকে বাংলাদেশ সরকার ঢাকায় আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। ২০১৩ সালে যমুনা টেলিভিশনের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করার জন্য ড্রিং প্রায় এক বছরের জন্য আবার বাংলাদেশে ফিরে এসেছিলেন। ২০২১ সালের ১৬ জুলাই ৭৬ বছর বয়শে রোমানিয়ার একটি হাসপাতালে তিনি মারা যান। বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের সময় অসাধারণ ভূমিকার জন্য সাইমন ড্রিংয়ের প্রতি আজও কৃতজ্ঞ পুরো বাংলাদেশ।

ডেইলি বাংলাদেশ/কেবি