কাঁচ ঘষে ৪১৯ লেন্স বানালেন লিউয়েনহুক

কাঁচ ঘষে ৪১৯ লেন্স বানালেন লিউয়েনহুক

সাত রঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৬:১৪ ৩ ডিসেম্বর ২০২১  

কাঁচ ঘষে ৪১৯ লেন্স বানালেন লিউয়েনহুক। ছবি সংগৃহীত

কাঁচ ঘষে ৪১৯ লেন্স বানালেন লিউয়েনহুক। ছবি সংগৃহীত

নাম তার অ্যান্থনি ভন লিউয়েনহুক। জন্ম ১৬৩২ সালের ২৪শে অক্টোবর। জীবনের ৯০টা বছর সে কাটিয়েছে ডেলফট শহরে। ছেলেবেলায় লেখাপড়া তেমন হয়নি, ১৬ বছর বয়সে বাবা মারা যায়। তাই স্কুল ছেড়ে চাকরি নিতে হয় এক মুদির দোকানে। কয়েক বছর পরে নগরসভার ঝাড়ুদারের কাজ। 

লিউয়েনহুক ছোটবেলায় চশমার দোকানে দেখেছিলেন কাঁচের টুকরো ঘষে ঘষে লেন্স বা আতশি কাঁচ তৈরি করা যায়। এই কাঁচের ভেতর দিয়ে তাকালে কোনো জিনিসকে সামান্য একটু বড় দেখায়। খুব সামান্যই একটুখানি বড়, কিন্তু তাই বা কম কি? লিউয়েনহুক অবাক হয়ে ভাবলো আরো ভালো করে ঘষতে পারলে হয়তো তার ভেতর দিয়ে সব জিনিস আরো বড় দেখাবে। সেই থেকে ঐ এক নেশা তাকে পেয়ে বসলো। 

অ্যান্থনি ভন লিউয়েনহুকপ্রতিদিন সে যেত চশমার দোকানে। দেখতো, সেখানে কি করে কাঁচ ঘষে। তারপর বাড়ি ফিরে চেষ্টা করতো ছোট ছোট কাঁচের টুকরো ঘষে তার থেকেও ভালো আরো নিখুঁত লেন্স বানাতে। হাতে ঘষে ঘষে লেন্স তৈরি অনেক খাটুনির কাজ। বহুদিনের চেষ্টার পর সে এমন একটি লেন্স বানিয়ে ফেললো যা দিয়ে ক্ষুদে ক্ষুদে জিনিসকে ২০০ বা আড়াইশো গুণ বড় দেখায়। এমনকি ছোট কাঁচের লেন্স সে বসিয়ে নিলো রুপা বা তামার পাতের গায়ে ছিদ্র করে তার উপরে। আর এই যন্ত্রটার নাম রাখলো মাইক্রোস্কোপ বা অণুবীক্ষণ। অর্থাৎ কিনা যে যন্ত্র দিয়ে খুব ছোট জিনিস বড় দেখায়। 

লিউয়েনহুক তার তৈরি মাইক্রোস্কোপ নিয়ে যেন একেবারে মেতে উঠলো। সারাক্ষণ সে শুধু ছোট লেন্সের ভেতর দিয়ে তাকিয়ে থাকতো। আর দেখতো এক নতুন জগত, যা আর কেউ দেখতে পায় না। কেউ কল্পনাও করতে পারে না যে, এমনও এক জগত রয়েছে মানুষের চোখের আড়ালে।

বহুদিনের চেষ্টার পর সে এমন একটি লেন্স বানিয়ে ফেললো যা দিয়ে ক্ষুদে ক্ষুদে জিনিসকে ২০০ বা আড়াইশো গুণ বড় দেখায়ডেলফটের বোকা লোকেরা আধাপাগল ঝাড়ুদারকে নিয়ে হাসি ঠাট্টা করে। তবে সে তার আপন জগতে বিভোর হয়ে থাকে। দিনের আলো ফুঁড়িয়ে রাত নামে। সে তার ঘরে মোমের আলোয় তন্ময় হয়ে তাকিয়ে থাকে মাইক্রোস্কোপের দিকে। তাও কি আর একটা দুটো মাইক্রোস্কোপ? আশ্চর্য নিপুণতার সঙ্গে ঘষে ঘষে সে একের পর এক লেন্স তৈরি করে। তারপর তার ভেতর নিয়ে তাকিয়ে থাকে ঘন্টার পর ঘন্টা, দিনের পর দিন। এভাবে সারা জীবনে সে ৪১৯টি লেন্স বানিয়ে ফেলে। 

কি দেখে সে এভাবে? কি যে দেখে না, তাই বলা মুশকিল। মাছির মাথা, তিমি মাছের এক টুকরো মাংসপেশি, মরা গরুর চোখ, মাকড়শার জাল, বোলতার হূল, উকুনের পা, নিজের গায়ের চামড়া। কোনো কিছুই বাদ যায় না। একদিন এক বন্ধু এসেছিল তার সঙ্গে দেখা করতে। বন্ধুর লম্বা লম্বা গোঁফের দিকে তাকিয়ে তার বড় লোভ হলো। তাড়াতাড়ি বন্ধুর একটা গোঁফ উপড়ে নিয়ে ধরলো তার লেন্সের তলায়। বন্ধুও দেখলো তাকিয়ে। দেখে তার বিশ্বাস হয় না যে, এই রুক্ষ গাছের গুঁড়ির মতো জিনিসটা আসলেই তার গোঁফ। 

বন্ধুর একটা গোঁফ উপড়ে নিয়ে ধরলো তার লেন্সের তলায়লিউয়েনহুক তার লেন্সের ভেতর দিয়ে যা কিছু দেখে তা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে। আর সেসব একটা খাতায় এঁকে রাখে। কিন্তু হোলে কি হয়? সে নিজে তেমন লেখাপড়া জানে না। আর তার প্রতিবেশীরাও তেমনি মূর্খ। তার কাজের কদর কেউ বোঝে না। কেমন করে জানি লিউয়েনহুকের কানে গেল বিলেতে বিজ্ঞানীদের এক রয়েল সোসাইটি গড়া হয়েছে। আর তারা তার দেখা এসব জিনিস সম্বন্ধে জানতে পারলে খুশি হবেন। সেই থেকে রয়েল সোসাইটির নামী পণ্ডিতদের সঙ্গে হল্যান্ডের এই ঝাড়ুদারের চিঠিপত্রের আদানপ্রদান শুরু হলো। 

লিউয়েনহুক কখনো নিজের দেশের বাইরে যাননি। তবে ৫০ বছর ধরে লন্ডনের রয়েল সোসাইটিতে লিখে পাঠাতে লাগলো তার দেখা নানারকম আশ্চর্য জিনিসের বর্ণনা। নতুন নতুন সব চমকপ্রদ আবিষ্কারের কাহিনী। পণ্ডিতেরা প্রথম প্রথম বিশ্বাস করলেন না তার কথা। কিন্তু রয়েল সোসাইটির এক বিজ্ঞানী তার বর্ণনা মতো নিজেই এক মাইক্রোস্কোপ বানিয়ে ফেললেন। তারপর লিউয়েনহুক তার তৈরি ২৬টি মাইক্রোস্কোপ উপহার পাঠালো রয়েল সোসাইটির সদস্যদের জন্য। নিজের চোখে যখন তারা দেখলেন মাইক্রোস্কোপের মধ্য দিয়ে নতুন এক জগতের দৃশ্য তখন আর অবিশ্বাস করার উপায় রইলো না।

৫০ বছর ধরে লন্ডনের রয়েল সোসাইটিতে লিখে পাঠাতে লাগলো তার দেখা নানারকম আশ্চর্য জিনিসের বর্ণনা১৬৬৫ সালে লিউয়েনহুক একটি ব্যাঙাচির স্বচ্ছ লেন্স নিয়ে ধরলেন তার লেন্সের তলায়। অবাক হয়ে দেখলেন, শুক্ষ শিরার মধ্য দিয়ে রক্ত বয়ে চলেছে। তার আগে আর কেউ কখনো এভাবে শিরার ভিতরে রক্ত চলাচল দেখতে পায়নি। কয়েক বছর পর তিনি রক্তের ভিতরে অবস্থিত লাল কণিকাও আবিষ্কার করলেন। সবচেয়ে আশ্চর্য আবিষ্কার করলেন তিনি ১৬৭৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। 

শরতের আকাশ থেকে মাঝে মাঝে ঝরঝর করে বৃষ্টি পড়ছিল। বাগানে একটা গামলায় জমে ছিল এই বৃষ্টির পানি। লিউয়েনহুকের মনে হলো আচ্ছা খানিকটা বৃষ্টির পানি লেন্সের তলায় নিয়ে দেখলে কেমন হয়? যেমন ভাবা, তেমনি কাজ। লেন্সের গায়ে চোখ লাগিয়ে তিনি যা দেখতে পেলেন তাতে নিজের চোখকে বিশ্বাস করাও কঠিন হলো। 

কয়েক বছর পর তিনি রক্তের ভিতরে অবস্থিত লাল কণিকাও আবিষ্কার করলেনএকি! এ যে সব জানোয়ার। ক্ষুদে ক্ষুদে জানোয়ার পানিতে মনের আনন্দে নড়ে বেড়াচ্ছে। জ্যান্ত জানোয়ার, অথচ এতো ছোট যে তার কাছে একটা উকুনও মনে হবে হাতির সমান। ঘন্টার পর ঘন্টা তিনি দেখতে লাগলেন সে পানির ফোঁটা। এক ফোঁটার পানির মধ্যে রয়েছে জন্তু জানোয়ারদের এক বিশাল জগত। অসংখ্য জীবাণু ছোটাছুটি করছে তাতে। এমন এক বিচিত্র জীবের বিচিত্র জগতের কথা কেউ কখনো স্বপ্নেও ভাবেনি। 

বিলেতে রয়েল সোসাইটির জ্ঞানীগুণী সদস্যরা যখন লিউয়েনহুকের চিঠি পেয়ে জানলেন এক ফোঁটা পানিতে রয়েছে হাজার হাজার ক্ষুদে জানোয়ার, তখন প্রথমে তারা হেসে উড়িয়ে দিলেন। তবে দুই একজন বললেন, কথাটা পরীক্ষাই করে দেখা যাক না। আর মাইক্রোস্কোপ নিয়ে তারা পরীক্ষা করে দেখলেন সত্যি তো এ ঝাড়ুদার যা লিখেছে যা মোটেই ফেলবার মতো কথা নয়। বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক অসাধারণ আবিষ্কার করেছেন সে।

খানিকটা বৃষ্টির পানি লেন্সের তলায় নিয়ে দেখতে পেল ক্ষুদে ক্ষুদে জানোয়ারএরও ২০০ বছর পরে ফরাসি বিজ্ঞানী লুই পাস্তুর প্রমাণ করলেন যে এগুলো হলো এককোষী জীব। আর এরাই নানা ধরনের অসুখ-বিসুখের কারণ। মানুষ এদের হদীস না পেলে ডাক্তারি বিদ্যার জন্মই হতো না। লিউয়েনহুকের বয়স যত বাড়তে লাগলো, মাইক্রোস্কোপের অজানা রহস্যের জগতের দিকের টান তার যেন ততই বেড়ে চলল। অনাবরত তিনি নতুন নতুন জিনিস আবিষ্কার করে চললেন। চারিদিক থেকে তার জন্য অজস্র সম্মান আসতে লাগলো। 

বিলেতের রয়েল সোসাইটি তাকে সাদরে তাদের সদস্য করে নিল। ডেলফটের লোকেরা একদিন অবাক হয়ে দেখলো, তাদের ছোট্ট শহরে পায়ের ধুলো পড়েছে রাশিয়ার রাজা পিটার দ্য গ্রেটের। তিনি এসেছেন সেই আধা পাগলা ঝাড়ুদারের মাইক্রোস্কোপের ভিতর দিয়ে একনজর তাকিয়ে দেখতে। আর একবার বিলেতের রানী এসে হাজির হলেন লিউয়েনহুকের সঙ্গে দেখা করতে। সে যেমন তেমন সম্মান নয়। 

রাশিয়ার রাজা পিটার দ্য গ্রেটের। তিনি এসেছেন সেই আধা পাগলা ঝাড়ুদারের মাইক্রোস্কোপের ভিতর দিয়ে একনজর তাকিয়ে দেখতেলিউয়েনহুকের বয়স ৯০ পেরিয়েছে। তিনি মৃত্যুশয্যায়। এক বন্ধুকে কাছে ডেকে বললেন, আমার টেবিলের উপর দুটো চিঠি লেখা আছে। লন্ডনের রয়েল সোসাইটির কাছে পাঠাতে হবে। দেখো, ভুলে যেওনা যেন। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কি গভীর নিষ্ঠা। একাগ্র সাধনা ছিল তার বিজ্ঞানের জন্য।

ডেইলি বাংলাদেশ/এসএ