উত্তমাশা অন্তরীপ যেসব কারণে বিখ্যাত

উত্তমাশা অন্তরীপ যেসব কারণে বিখ্যাত

সাত রঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৪:৪৬ ২৫ নভেম্বর ২০২১  

উত্তমাশা অন্তরীপ যেসব কারণে বিখ্যাত। ছবি সংগৃহীত

উত্তমাশা অন্তরীপ যেসব কারণে বিখ্যাত। ছবি সংগৃহীত

উত্তমাশা অন্তরীপের নাম আমরা সবাই শুনেছি। ছোটবেলায় পাঠ্য বইতে পড়ে, না বুঝে মুখস্তও করেছি। তবে অন্তরীপ বিষয়টি আসলে কি, আমরা অনেকে হয়তো তাই জানি না। অন্তরীপ হচ্ছে এক ধরনের বিশেষ ভূমিরূপ। ভূগোলের পরিভাষায় ভূপৃষ্ঠের কোনো অংশ ক্রমশ সরু হয়ে সাগরে প্রবেশ করলে সেই সংকীর্ণ অংশ কে অন্তরীপ বলা হয়। পৃথিবীতে যতগুলো অন্তরীপ আছে, তারমধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হলো উত্তমাশা অন্তরীপ।

কেপ অব গুড হোপ বা উত্তমাশা অন্তরীপ দক্ষিন আফ্রিকায় অবস্থিতঅন্তরীপকে ইংরেজিতে বলা হয় কেপ। কেপ অব গুড হোপ বা উত্তমাশা অন্তরীপ দক্ষিন আফ্রিকায় অবস্থিত। এই অন্তরীপটি সরু হয়ে দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরে প্রবেশ করেছে। ইউরোপীয়দের মধ্যে সর্বপ্রথম পর্তুগিজ নাবিক বার্থোলোমিউ ডিয়াজ দক্ষিণ আফ্রিকার এই অন্তরে পৌঁছে। ১৪৮৮ সালে তিনি আফ্রিকা মহাদেশের সর্বদক্ষিণ প্রান্ত নির্ণয় করার অভিযানে এই জায়গাটি আবিষ্কার করেন। বার্থোলোমিউ ডিয়াজ তখন এই জায়গাটির নাম দিয়েছিলেন ‘কেপ অব স্টর্মস’ বা ঝড়ের অন্তরীপ। 

 এই অঞ্চলটি সামুদ্রিক ঝড়ের জন্য বিখ্যাতকারণ এই অঞ্চলটি সামুদ্রিক ঝড়ের জন্য বিখ্যাত। এক দিকে ভারত মহাসাগর এবং আটলান্টিক মহাসাগরের অবস্থানের কারণে এই অঞ্চলে শক্তিশালী উপকূলীয় স্রোতের সৃষ্টি হয়। সমুদ্রের উত্তাল তরঙ্গের কারণে এই অঞ্চলটি জাহাজ চলাচলের জন্য অনেক বিপদজনক। তবে সব ধরনের দুর্যোগ উপেক্ষা করে এই সমুদ্রপথ ইউরোপীয়দের মধ্যে বিপুল আশার সঞ্চার করেছিল। অন্তরীপটি অতিক্রম করতে পারলেই ইউরোপীয়রা সমুদ্রপথে ভারতে তথা দূর প্রাচ্যে যেতে পারবে। সে জন্য পর্তুগালের পারফেক্ট প্রিন্স খ্যাত রাজা দ্বিতীয় জন এই অন্তরীপের নাম রাখেন কেপ অব গুড হোপ বা উত্তমাশা অন্তরীপ।

পর্তুগালের পারফেক্ট প্রিন্স খ্যাত রাজা দ্বিতীয় জন এই অন্তরীপের নাম রাখেন কেপ অব গুড হোপ বা উত্তমাশা অন্তরীপ১৮৯৮ সালে পর্তুগিজ নাবিক ভাস্কো দা গামা উত্তমাশা অন্তরীপ ভারতের কালিকট বন্দরে এসে পৌঁছায়। এরপর থেকে সুয়েজ খাল তৈরি হবার আগ পর্যন্ত প্রায় ৪০০ বছর ইউরোপ থেকে ভারতে আসার জন্য উত্তমাশা অন্তরীপের সমুদ্রপথই ছিল একমাত্র অবলম্বন। সেসময় উত্তমাশা অন্তরীপের সমুদ্রপথে ইউরোপ থেকে ভারতে আসতে প্রায় চার মাস সময় লাগতো।

পর্তুগিজ নাবিক ভাস্কো দা গামা উত্তমাশা অন্তরীপ ভারতের কালিকট বন্দরে এসে পৌঁছায়উত্তমাশা অন্তরীপ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠার পেছনে প্রধান কারণ ছিল তৎকালীন বিশ্ববাণিজ্য। তখনকার দিনে আরব বণিকরা ভারতে, সিংহল ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য দেশ থেকে মনি-মুক্তা, রেশম, সুগন্ধি এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পণ্য মশলা সংগ্রহ করে ভূমধ্যসাগরের বন্দরগুলোতে বিক্রয় করতো। ইতালির বণিকরা এসব পণ্য কিনে ইউরোপের বাজারে সরবরাহ করতো। 

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পণ্য মশলা সংগ্রহ করে ভূমধ্যসাগরের বন্দরগুলোতে বিক্রয় করতো১৪৫৩ সালে তুর্কিদের হাতে  কনস্টান্টিনোপলের বা রোমান সাম্রাজ্যের পতন ঘটার পর ইউরোপীয়দের জন্য প্রাচ্যের দেশগুলোতে যাতায়াতের একমাত্র স্থলপথটি পথ বন্ধ হয়ে যায়। তখন ইউরোপের ব্যবসায়ীদের কাছে নতুন জলপথের সন্ধান অতি জরুরী হয়ে পড়ে। পর্তুগিজ নাবিক নতুন জলপথ ও নতুন দেশ আবিষ্কারে সব সময়ই অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে। কারন তৎকালীন বাজারব্যবস্থায় পর্তুগিজরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। মধ্যযুগীয় বিশ্ববাণিজ্যে উত্তমাশা অন্তরীপ আবিষ্কার সবচেয়ে যুগান্তকারী ঘটনা। এর ফলশ্রুতিতে ঔপনিবেশিকতার প্রসার ঘটেছিল। পরবর্তীতে ১৬৫২ সালে ডাচ বা ওলন্দাজরা এই অন্তরীপে ইউরোপীয় বসতি স্থাপন করেন। তারাই দক্ষিণ আফ্রিকার সবচেয়ে প্রাচীন শহরের কেপটাউনের গোড়াপত্তন করেছিল।

মধ্যযুগীয় বিশ্ববাণিজ্যে উত্তমাশা অন্তরীপ আবিষ্কার সবচেয়ে যুগান্তকারী ঘটনাএরপর ১৮০৬ সালে কেপটাউন যুদ্ধের মাধ্যমে ব্রিটিশরা উত্তমাশা অন্তরীপ দখল করে নেয়। উত্তমাশা অন্তরীপ বিশ্বজুড়ে এতোটাই আলোচিত হয়েছিল যে, এর নামে পুরো উপদ্বীপের নাম রাখা হয় কেপ পেনিনসুলা। আর দক্ষিণ আফ্রিকার এই প্রদেশের নাম রাখা হয় কেপ প্রভিন্স। এমনকি দক্ষিণ আফ্রিকার পুরো উপনিবেশকেও কেপ কলোনি নামে ডাকা হতো।

কেপ পেনিনসুলাউত্তমাশা অন্তরীপ শুধু ভৌগলিক, বাণিজ্যিক এবং রাজনৈতিক কারণেই বিখ্যাত নয়, এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বেশ মনমুগ্ধকর। উত্তমাশা অন্তরীপের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিবছর বহু পর্যটক দক্ষিণ আফ্রিকায় ভিড় জমায়। এই অন্তরীপ কেন্দ্রিক পর্যটনের প্রধান আকর্ষণ হলো, কেপ পয়েন্ট। কেপ পয়েন্টে দাঁড়িয়ে দুটি মহাসাগরের দিগন্ত বিস্তৃত জলরাশি উপভোগ করা যায়। কেপ পয়েন্টে এসে দাঁড়ালে মনে হবে আপনি হয়তো পৃথিবীর শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেছেন। তবে পৃথিবীরটা যেহেতু গোলাকার তাই এর শেষ প্রান্ত বলে আসলে কিছু নেই।

ডেইলি বাংলাদেশ/এসএ