৩৩ বছর নির্জন দ্বীপে ইতালির ‘রবিনসন ক্রুসো’

৩৩ বছর নির্জন দ্বীপে ইতালির ‘রবিনসন ক্রুসো’

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৫:৪২ ৬ অক্টোবর ২০২১   আপডেট: ১৫:৫৪ ৬ অক্টোবর ২০২১

মোরিন্দা আধুনিক জীবনেও বেশ সগ্রহী হয়ে উঠেছেন

মোরিন্দা আধুনিক জীবনেও বেশ সগ্রহী হয়ে উঠেছেন

নির্জন দ্বীপে ২৮ বছর একা কাটানো রবিনসন ক্রুসোর গল্প জানেন না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না। তবে ইতালির এই ব্যক্তি নির্জন এক দ্বীপে ৩৩ বছর কাটিয়ে দিয়েছেন। নির্জন সন্ন্যাসী কিংবা এ যুগের রবিনসন ক্রুসো, যে কোনো এক নামে আপনি ডাকতে পারেন ইতালির এই বিখ্যাত ব্যক্তিটিকে। দীর্ঘ ৩৩ বছর ধরে ভূমধ্যসাগরীয় একটি দ্বীপে একাকী বসবাস করেছেন তিনি; আধুনিক জীবন থেকে অনেক দূরে, সামাজিক বিধিনিষেধের বাইরে।

মাউরো মোরান্দিকে ইতালিতে সবাই 'রবিনসন ক্রুসো' বলেই চেনে। কিন্তু সেটা অনলাইন জগতে বিশাল অনুসারী পেয়ে যাওয়ার পর। আপনি নিশ্চয়ই ভাবছেন, সন্ন্যাসী আবার অনলাইনে সক্রিয় হলেন কি করে? তাহলে আপনাকে মাউরো মোরান্দির জীবনের গল্প খানিকটা বিস্তারিত জানতে হবে, যে গল্প নিঃসন্দেহে অবাক করার মতো!

মাউরো মোরান্দিকে এখন ইতালিতে সবাই `রবিনসন ক্রুসো` বলেই চেনেসার্ডিনিয়ান আইল্যান্ড অব বুদেল্লি'র তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন মোরান্দি। জীবনানন্দের কবিতার মতোই যেন দূর পরবাসে নির্জনতাকে আলিঙ্গন করেছিলেন তিনি। সমুদ্রসৈকতের একটা কুঁড়েঘরে নির্ঝঞ্ঝাট জীবন কাটাচ্ছিলেন। ছিল না কোনো সামাজিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ঝামেলা, কোনো দামি খাবার কিংবা বন্ধুবান্ধবও। শুধুমাত্র অরণ্যের গাছপালা, পাখি আর বিড়াল ছিল তার সঙ্গী। গুটিকয়েক জামাকাপড় ছিল, তা দিয়েই কোনোরকমে দিন পার করতেন। আধুনিক জীবনের সব আরাম-আয়েশ বাদ দিয়ে আপন মনে ধ্যান করতেন বুদেল্লির পিংক বীচে। 

তবে বহু বছর ধরেই মেরিন পার্ক কর্তৃপক্ষ চাইছিল মোরান্দিকে দ্বীপ থেকে উচ্ছেদ করতে। তার বদলে সেখানে এনভায়রনমেন্টাল অবজারভেটরি তৈরি করার সিদ্ধান্ত নেয় তারা। গত মে মাসে, অবশেষে পরাজয় স্বীকার করে নেন মোরান্দি। ছেড়ে আসেন তার বুদেল্লি দ্বীপ। কিন্তু ৮২ বছর বয়সী একজন মানুষ, যিনি তিন দশকেরও বেশি সময় কাটিয়েছেন স্বর্গীয় সুন্দর এক দ্বীপে, তার পক্ষে কি আধুনিক সমাজে ফিরে এসে বসবাস করা সম্ভব? উত্তরে মোরান্দি নিজেই বলছেন, 'হ্যাঁ, সম্ভব!'

আধুনিক জীবনে এসে মোরান্দি নতুন নতুন খাবার বেশ উপভোগ করছেন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে মোরান্দি জানিয়েছেন তার মনোভাব, "আসলে জীবন কখনো শেষ হয়ে যায় না। আমিই সেই প্রমাণ যে আরেকটা নতুন জীবন আরম্ভ করা সম্ভব। আপনি জীবনের যেকোনো পর্যায়েই নতুনভাবে শুরু করতে পারেন, এমনকি বয়স আশির ওপর হলেও। কারণ তখনো জীবনে অনেক অভিজ্ঞতা নেয়া বাকি থাকে।"

আর মোরান্দি যে একেবারেই মন থেকে এমনটা বিশ্বাস করেন, তা তার কর্মকাণ্ড দেখেই বোঝা যায়। বুদেল্লি থেকে কাছেই আরেকটি দ্বীপ, লা মাদালেনা'তে আধুনিক জীবনে রীতিমতো করিতকর্মা হয়ে উঠেছেন মোরান্দি। এবার তার কন্ঠে একেবারে ভিন্ন সুর,দৈনন্দিন সবরকম আরাম-আয়েশসহ, আমি এই জীবনটা নতুন করে উপভোগ করছি।

দ্বীপবাসের আগের জীবনে একজন শিক্ষক ছিলেন মাউরো মোরান্দি। তাই পেনশনের টাকা দিয়ে এবার চমৎকার একটি অ্যাপার্টমেন্ট কিনেছেন তিনি। দীর্ঘদিন সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকায়, এই মুহূর্তে নিজের যোগাযোগ দক্ষতা বৃদ্ধির দিকে নজর দিয়েছেন মোরান্দি। এতগুলো বছর একাকী থাকার পর, মানুষের সঙ্গে কথা বলতে, মতবিনিময় করতে বেশ আগ্রহী হয়ে উঠেছেন তিনি। এরই মধ্যে, নিজের জীবনের স্মৃতিকথাও লিখতে শুরু করেছেন মোরান্দি।   

মোরান্দি তার জীবনী নিয়ে প্রথমে বই এবং পরে সিনেমা তৈরি করতে চান মোরান্দি ছিলেন মূলত নর্দার্ন ইতালির মোডেনা অঞ্চলের বাসিন্দা। ১৯৮৯ সালে ইতালি থেকে পলিনেশিয়া যাওয়ার পথে দুর্ঘটনাবশত তিনি বুদেল্লিতে পৌঁছান। সমুদ্রের স্বচ্ছ পানি, সুন্দর আবহাওয়া ও সূর্যাস্ত দেখেই দ্বীপটির প্রেমে পড়ে যান এবং থাকতে শুরু করেন। দ্বীপে থাকাকালীন, মাঝেমাঝে দ্বীপে আগত অতিথিদের সঙ্গে দেখা হয়ে গেলেও, বেশিরভাগ সময় মোরান্দি একাই ছিলেন। তবে সম্প্রতি তিনি ভার্চুয়াল জগতে যুক্ত হয়েছেন। বুদেল্লি দ্বীপের ছবি পোস্ট করে অনেকের নজরে আসেন তিনি।  

মোরান্দি জানান, তিনি বুদেল্লি দ্বীপের নির্জনতাকে মিস করেন। নাগরিক যান্ত্রিক জীবন, গাড়ি, ট্রাকের শব্দের সঙ্গে তিনি পরিচিত নন। তবে তার নতুন এলাকা তার কাছে বেশ প্রশান্তির মনে হয়। মোরান্দির নতুন বাসস্থানে আধুনিক সরঞ্জামে সজ্জিত রান্নাঘর থেকে ধরে বিলাসবহুল শাওয়ারও আছে। পড়ার জন্য বিস্তর বইপত্রও রয়েছে। কিন্তু নতুন বাসস্থানে এসে মোরান্দি তার তারুণ্যের এক পুরনো প্রেমকে খুজে পেয়েছেন, যে নারীকে তিনি একসময় পছন্দ করতেন! এছাড়া, ভালোমন্দ খাবার তো আছেই!

একটি নির্জন বিষুবীয় দ্বীপে ২৮ বছর রবিনসন ছিলেন একেবারেই একা তিন দশকেরও বেশি সময় দ্বীপে থেকে তিনি ভুলেই গিয়েছিলেন সুস্বাদু খাবারের স্বাদ। কিন্ত ইতালির বিখ্যাত পিজ্জা, হ্যামে মজে যাননি তিনি। বরং দ্বীপে যা প্রচুর পাওয়া যেত, কিন্তু তবুও খেতে পারতেন না; সেই 'মাছ' এর প্রতি তার আকর্ষণ। দ্বীপে মোরান্দির কোনো নৌকা না থাকায় মাছ ধরতে পারতেন না তিনি। কিন্তু এখন প্রতিদিন স্থানীয় বাজার থেকে মাছ কিনে আনেন তিনি।

তবে তিনি অস্বীকার করেন না যে, বুদেল্লি দ্বীপের জীবন তার জন্যে কষ্টকর হয়ে উঠেছিল। বিশেষত, শীতকালে অস্বাভাবিক ঠান্ডা পড়তো। মাসের পর মাস তাকে টিনজাত খাবারের উপর ভরসা করতে হতো। দ্বীপের জীবন থেকে ফেরার পর মোরান্দি প্রথম মাছ খেয়েছিলেন যেদিন, সেই দিনটির কথা আজও তার মনে পড়ে। ইতালিয়ান আল্পস এ ঘুরতে গিয়ে এক রেস্টুরেন্ট মালিক বন্ধুর সঙ্গে থেকেছিলেন তিনি। পাহাড়ের অপরূপ সৌন্দর্য আর সুস্বাদু খাবার একই সঙ্গে উপভোগ করেছেন তিনি।  

মোরান্দি বুদেল্লি দ্বীপে আর ফিরে যেতে চান না মোরান্দি তার 'ব্যাক টু আর্থ' ট্রিপের ছবি, মন্ট ব্ল্যাংক ও পাহাড়ি গ্রামে ভ্রমণ, 'গ্রিলড সোলস উইদ পটেটোস অ্যান্ড টমাটোস' খাওয়ার ছবিও অনলাইনে পোস্ট করেছেন। আসছে বড়দিনে তিনি আবারও আল্পস ভ্রমণে যেতে চান। এবার লা মাদালেনা'তে নিজের প্রাত্যহিক জীবনের দিকে নজর ফেরালেন মোরান্দি, "প্রতিদিন সকালে উঠে আমি বার্লি কফি হাতে আমার বারান্দায় দাঁড়াই। তারপর সিগারেট খাওয়া শেষে, বন্দরের দিকে হাটা ধরি কিংবা ঐ গ্রামটাতে যাই। সেখানে অনেক মানুষের সাথে কথাবার্তা হয় অথবা মুদি জিনিসপত্র কিনি।"

বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারির ভয়াবহতার মধ্যে, মাউরো মোরান্দি ইতিমধ্যেই পূর্ণ ডোজ ভ্যাকসিন নিয়েছেন এবং বাইরে গেলে মাস্কও পরেন তিনি। স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে মিশতে ভালোবাসেন তিনি। তাই বেশ ব্যস্ত দিন কাটে তার। তিনি বলেন, "মানুষ আমাকে কিভাবে নেয়, তা নিয়ে চিন্তিত ছিলাম। কিন্তু তারা খুব বন্ধুত্বভাবাপন্ন। আমাকে প্রায়ই কফি, দুপুরের বা রাতের খাবারের দাওয়াত দেয় তারা। তবে আমার বুদেল্লির জীবন নিয়ে যারা ঈর্ষা করে, তারাই শুধু আমাকে অপছন্দ করে।"

বই পড়ে আর লেখালেখি করেই কাটছে মোরান্দির সময় মোরান্দিকে উচ্ছেদের ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় রেডিও স্টেশন হিসেবে ব্যবহৃত এই ঐতিহাসিক বুদেল্লি অঞ্চলকে তারা রক্ষণাবেক্ষণ করতে চায়। তাই আইন অনুযায়ীই, তারা মোরান্দিকে সরে যেতে বলেছে। মোরান্দির দ্বীপে টিকে থাকার লড়াই আগেপরেও সংবাদের শিরোনাম হয়েছে। কিন্তু এখন, চলে যাওয়ার পরেও তিনি স্পটলাইটে। নিজের দ্বীপবাস নিয়ে একটি বই লিখেছেন মোরান্দি এবং দ্বিতীয় বইয়ের কাজ চলছে। মোরান্দি মনে করেন, তার বই থেকে হয়তো কোনো সিনেমা তৈরি হবে ভবিষ্যতে।

পার্ক কর্তৃপক্ষ যদি অনুমতি দেয়, তাহলে কি আবারও বুদেল্লি দ্বীপে ফিরে যাবেন কিনা, এমন প্রশ্নে মোরান্দি বলেন, "আমি আর ওখানে যাওয়ার জন্য মরিয়া নই। এখন হয়তো পারিশ্রমিকের বিনিময়ে আমি ওই দ্বীপে কেয়ারটেকার হিসাবে কাজ করতে পারি।" তবে মোরান্দি কিন্তু বুদেল্লি দ্বীপকে একবারেই দূরে সরিয়ে দেননি। এখনও তিনি মাঝেমাঝে একদিনের ট্রিপে দ্বীপ থেকে ঘুরে আসেন, নিজের ব্যক্তিগত মালামাল সংগ্রহ করেন।

মোরান্দি এই দ্বীপের ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তিত। তিনি নিজে কেয়ারটেকার থাকার সময় পিংক বীচে কাউকে অবৈধভাবে প্রবেশ করতে দিতেন না। নিজেই দ্বীপের আবর্জনা পরিষ্কার করতেন। কিন্তু এখন লা মাদালেনা তার নতুন জীবন, এখন তিনি এই জীবনকে আবিষ্কারে ব্যস্ত, "আমি সেই দ্বীপে এতগুলো বছর ছিলাম, সেটা আমার খুবই আপন ছিল। এখন আমার মনে হয়, আমি আসলে জানিই না তাকে। তাই প্রতিদিন যখন মাউরো মোরান্দি শহরের পথে ঘুরে বেড়ান, প্রায়ই তিনি নির্জন জায়গাগুলোর ছবি তোলেন। কে জানে, হয়তোবা বুদেল্লি দ্বীপের সেই হারানো নির্জনতাকেই খোঁজেন!      

সূত্র: সিএনএন

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে