তিনবার বিদ্যুৎপৃষ্টের পর মৃত্যু, শেষমেষ বজ্রপাতে পুড়লো কবর

তিনবার বিদ্যুৎপৃষ্টের পর মৃত্যু, শেষমেষ বজ্রপাতে পুড়লো কবর

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৭:১৪ ১৮ জুলাই ২০২১   আপডেট: ১৯:০৪ ১৮ জুলাই ২০২১

ওয়াল্টার সামারফোর্ড

ওয়াল্টার সামারফোর্ড

বাংলা সিরিয়াল কিংবা সিনেমায় নায়ক নায়িকার কোনো কিছু হলেই বজ্রপাতের শব্দ শোনা যায়। একই সিন বারবার দেখানো হয়। তবে বাস্তব জীবনে কি এভাবে কারো উপর এতবার বজ্রপাত হতে পারে। হলে ও বা সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু। তবে এমনই একজন হতভাগ্য ব্যক্তি ছিলেন মৃত্যুর পরও রেহাই পাননি তিনি। 

কানাডার ভ্যাঙ্কুভার শহরের ১৯৩৬ সালের এক সন্ধ্যাবেলা। সেদিন আকাশ এক ভয়ঙ্কর খেলায় মেতেছে। প্রবল ঝড়বৃষ্টির মধ্যেই আকাশ চিরে নামল বিদ্যুতের ফলা। সুসংবাদ হচ্ছে, কোনো জীবন্ত প্রাণীর ক্ষতি করেনি। কিন্তু একটি সমাধিপ্রস্তর ভেদ করে তা আঘাত করল মৃতদেহকে। সঙ্গে সঙ্গে পুড়ে ছাই হল দেহটি। তবে তার আগেও কখনো সেই মানুষটির মুখে হাসি ফোটানি। একের পর এক বজ্রপাত যে তার জীবনের সঙ্গী হয়ে গিয়েছিল। মৃত্যুর পরেও সেই বজ্রপাতের হাত থেকে মুক্তি নেই। ব্রিটিশ সেনা অফিসার ওয়াল্টার সামারফোর্ডের জীবন সত্যিই এক বিস্ময়।

প্রথমবার ওয়াল্টার ঘোড়ার উপর থাকতে তার উপর বজ্রপাত হয় পরিসংখ্যান বলছে ১৩ হাজার বার বজ্রপাত ঘটলে তার মধ্যে একটি কোনো জীবিত প্রাণীর শরীরে আছড়ে পড়ে। আর একজন মানুষের জীবনে বিদ্যুৎপৃষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা তো, ফেলুদার কথায়, ওয়ান্স ইন আ মিলিয়ন। আসলে প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। কিন্তু যদি এমন কোনো মানুষের কথা বলা হয়, একবার নয়, চারবার বিদ্যুৎপৃষ্ট হয়েছেন তিনি! হ্যাঁ, প্রায় অবিশ্বাস্য এমন উদাহরণই তৈরি করে গিয়েছিলেন ওয়াল্টার সামারফোর্ড।

জীবনের শুরুটা অবশ্য আর পাঁচজন মানুষের মতোই ছিল। আলাদা কিছু যে তার সঙ্গে ঘটতে পারে, এমনটা ভাবতেই পারেননি অনেকে। এর মধ্যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে সেনা হিসেবে যোগ দিলেন ওয়াল্টার। সৈনিকের জীবন সবসময় অনিশ্চয়তার ভরা। কিন্তু সেইসব রোমাঞ্চ ওয়াল্টারের কাহিনির কাছে তুচ্ছ।

জীবদ্দশায় ওয়াল্টারের উপর তিনবার বজ্রপাত হয়েছিল, তিনবারই তিনি বেঁচে যান যুদ্ধে গোলা-বারুদ বা বন্দুকের গুলি নয়, ওয়াল্টারকে আঘাত করল আকাশ থেকে ছুটে আস বজ্রপাত। সময়টা ১৯১৮ সাল। বেলজিয়াম শহরের বুকে ঘোড়া ছুটিয়ে চলেছিলেন ওয়াল্টার। হঠাতই শরীরে বিদ্যুৎ খেলে গেল। মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন তিনি। ঘোড়াটি সেখানেই প্রাণ হারাল। আর ওয়াল্টার প্রাণে বেঁচে গেলেন। তবে তার কোমরের নিচের অংশ পক্ষাঘাতে অকেজো হয়ে গেল। এরপর আর ইউরোপে থাকেননি ওয়াল্টার। চলে এলেন কানাডায়। আটল্যান্টিক মহাসাগরের এপারেও সঙ্গে নিয়ে এলেন বজ্রপাতের অভিশাপ।

পক্ষাঘাতের পরেও নানা ছোটখাটো খেলাধুলোয় নিজেকে ব্যস্ত রাখতেন ওয়াল্টার। আর মাঝে মাঝেই বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে নিয়ে চলে যেতেন মাছ ধরতে। ক্রমশ সেরেও উঠছিলেন একটু একটু করে। ঠিক এরকম সময়েই, ১৯২৪ সালে রাতের বেলায় মাছ ধরতে গিয়ে আবারও দুর্ঘটনার কবলে পড়লেন তিনি। বাকি বন্ধুদের কারোর কিছু হল না। শুধু তিনি যে গাছের নিচে বসেছিলেন, সেটিই বজ্রপাতে ঝলসে গেল। আর বিদ্যুতের প্রবাহ খেলে গেল তার শরীরেও। এবারেও প্রাণ হারালেন না তিনি। তবে শরীরের সম্পূর্ণ ডানদিক অকেজো হয়ে গেল। 

পরিসংখ্যান বলছে ১৩ হাজার বার বজ্রপাত ঘটলে তার মধ্যে একটি কোনো জীবিত প্রাণীর শরীরে আছড়ে পড়েশেষ পর্যন্ত চিকিৎসায় সাড়া দিয়েছিল ওয়াল্টারের শরীর। কয়েক বছর পর দিব্যি হেঁটেচলেও বেড়াতে পারতেন। আর এই সময়েই সপ্তাহে একদিন অন্তত কোনো পার্কে ঘুরতে না গেলে তার মন ভরত না। এভাবেই চলছিল সবকিছু। কিন্তু সেই অভিশাপ যে তখনও তার পিছনে ঘুরছে, তা কে জানতো! ১৯৩০ সাল, একটি পার্কের বনভূমিতে ঘুরতে ঘুরতেই আবারও বিদ্যুৎপৃষ্ট হলেন ওয়াল্টার। এবার কিন্তু একেবারে শয্যাশায়ী হয়ে পড়লেন তিনি। আর দুবছরের মাথায়, ১৯৩২ সালে মৃত্যু হল তার। 

গল্পের শেষ হয় নি এখানেই...

বজ্রপাতে ওয়াল্টারের শবদেহ পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল জীবদ্দশায় তিনবার বিদ্যুৎপৃষ্ট হয়েছেন ওয়াল্টার। কিন্তু তার শরীরের উপরে বজ্রপাত ঘটেছে ৪ বার। মৃত্যুর ৪ বছর পর ভ্যাঙ্কুভার শহরের সমাধিক্ষেত্রে সেই বজ্রপাতে পুড়ে ছাই হয়ে যায় ওয়াল্টার সামারফোর্ডের শরীর। নাহলে হয়তো তার পরেও বারবার বজ্রপাতের আঘাত সহ্য করে যেতে হত তাকে। ওয়াল্টারের প্রতি প্রকৃতির কি খেয়ালি। ওয়াল্টারেরই বা কেমন ভাগ্য। 

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে/এনকে