বিজ্ঞানী থেকে ইতিহাসের প্রথম সিরিয়াল কিলার, এই নারীর পরিণতি ছিল ভয়ংকর

বিজ্ঞানী থেকে ইতিহাসের প্রথম সিরিয়াল কিলার, এই নারীর পরিণতি ছিল ভয়ংকর

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৬:৪৩ ২৯ এপ্রিল ২০২১   আপডেট: ১৭:০৩ ২৯ এপ্রিল ২০২১

লাকোস্টা মানব ইতিহাসের প্রথম সিরিয়াল কিলার

লাকোস্টা মানব ইতিহাসের প্রথম সিরিয়াল কিলার

চিকিৎসা বিজ্ঞানের উৎকর্ষতা আজ থেকে নয়, হাজার হাজার বছর আগেই এর শুরু। শেকড়বাকড় দিয়েই হতো চিকিৎসা। যাকে বলা হয় ভেষজ চিকিৎসা। এই ভেষজ চিকিৎসায় বিখ্যাত হয়েছেন অনেকেই। তেমনি একজনের ভেষজ বিজ্ঞান ছিল তার নখদর্পণে। গাছগাছড়া, শেকড়বাকড় খুঁজে তৈরি করতেন আশ্চর্য সব বিষ। সেই বিষের সামান্য প্রয়োগেই টপাটপ মারা যেত নির্দোষ মানুষ। এভাবে বিষপ্রয়োগ করে মানুষ মারাটা একসময় নেশার পর্যায়ে চলে যায় তার। 

কখনও খেলার ছলে, কখনও পরীক্ষা নিরীক্ষার প্রয়োজনে চলতেই থাকে হত্যালীলা। শাস্তির ভয় ছিল না কোনো। কেননা রাজার খুব কাছের মানুষ ছিলেন তিনি। নিয়মিত সাহায্য করেন রাজকার্যেও। তার উদ্ভাবন করা বিষ দিয়েই মেরে ফেলা হত রাজার শত্রু আর দেশদ্রোহীদের। আর তাই সাত খুন কেন , সাতশ খুনও মাফ ছিল সেই বিজ্ঞানীর। আইনকানুনের চোখের সামনেই অবাধে চলছিল সেই মানুষ মারার খেলা।

সম্রাট ক্লডিয়াসকে বিষ দিয়ে প্রথম হত্যা করেছিলেন লাকোস্টা তবে সময়ের নিয়মে গদি পালটে যেতেই নেমে এল সমূহ বিপদ। রাষ্ট্রযন্ত্রের হাতে ধরা পড়লেন পৃথিবীর প্রথম সিরিয়াল কিলার। বিচার বসল , আর সেই বিচারে ভয়ংকর এক সাজা দেয়া হল তাকে। কী সেই শাস্তি? কীভাবেই বা ধরা পড়েছিলেন তিনি? এসব জানতে ফিরে যেতে হবে কয়েক হাজার বছর পেছনে।

ষড়যন্ত্র , নিষ্ঠুরতা , অবাধ যৌনতা , ভাইয়ের হাতে ভাইয়ের খুন এসব নিয়েই গড়ে উঠেছিল দু'হাজার বছরের প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্য। এই রোম সাম্রাজ্যের জুলিও - ক্লডিয়ান রাজবংশের চতুর্থ রাজা ছিলেন ক্লডিয়াস। তার আগের সম্রাট ক্যালিগুলা সম্পর্কে ছিলেন ক্লডিয়াসের ভাইয়ের ছেলে। নিজের দেহরক্ষীদের হাতে একদিন আচমকাই খুন হয়ে যান ক্যালিগুলা। তারপর যা হয় , পথের কাঁটা সরিয়ে রোমের সিংহাসনে বসেন তার বাবার সৎ ভাই ক্লডিয়াস।

এগ্রিপিন ক্লডিয়াসের প্রথমে ভাইঝি ছিলেন, পরে তারা স্বামী স্ত্রী হন রাজা হিসেবে ক্লডিয়াস নেহাত মন্দ ছিলেন না। অন্তত আগের রোমান সম্রাটদের মতো রক্তপিপাসু আর পাশব চরিত্রের ছিলেন তিনি। কিন্তু সমস্যা দেখা দিল যখন অবৈধ যৌন সম্পর্ক আর ষড়যন্ত্রের আঁচ পেয়ে তিনি নিজের আগের স্ত্রী মেসালিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে বিয়ে করলেন নিজেরই ভাইঝি এগ্রিপিনা দ্য ইয়ঙ্গার'কে । প্রথম রোমান সম্রাট অগাস্টাসের বংশধর এই এগ্রিপিনা। তার ধমনিতেও বইছে নীলরক্ত। রাজকীয় উচ্চাশার পাশাপাশি কূটবুদ্ধি আর হিংস্রতা ছিল তার চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ক্লডিয়াসকে সরিয়ে নিজের ছেলে নিরোকে রোমের সিংহাসনে বসানোই একমাত্র ধ্যানজ্ঞান হয়ে দাঁড়ায় রানি এগ্রিপিনার। নতুন বউয়ের চাপে পড়ে সৎ ছেলে নিরোকে দত্তক নিতে বাধ্য হন ক্লডিয়াস।

নিরোর নাম শুনেই সেই প্রশ্নটা মাথায় ঘুরছে নিশ্চয়? রোম যখন আগুনে পুড়ে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছিল, তখন নিরো কি সত্যিই আপন মনে বাঁশি বাজাচ্ছিল! সে প্রশ্নের সঠিক জবাব এখনো পাওয়া যায়নি ইতিহাসের কোথাও। মায়ের আদরে-প্রশ্রয়ে ছেলেবেলা থেকেই উচ্ছন্নে গেছিল নিরো। রাজ্য পরিচালনার চেয়ে অভিনয়, সুর আর সুরাতেই তার আগ্রহ ছিল বেশি। একইসঙ্গে তার ভেতর জন্ম নিচ্ছিল এক ভয়ানক নিষ্ঠুর ব্যক্তিত্বের। সৎ ছেলে হলেও রাজার সন্তানদের মধ্যে বয়সে নিরোই ছিলেন বড়। তাই ক্লডিয়াসের পর নিরোই ছিলেন রাজসিংহাসনের দাবিদার। 
এদিকে তর সইছিল না রানি এগ্রিপিনার। অনেকদিন ধরেই তক্কে তক্কে ছিলেন তিনি। রাজা ক্লডিয়াসকে খুন করতে হবে , আর এমনভাবে করতে হবে যাতে রোমান সেনেট বা প্রজারা কিছুই বুঝতে না পারে। আর তাই গোপনে বিষপ্রয়োগ করে খুন করার বুদ্ধিই আঁটলেন তিনি। তবে পরিকল্পনাটা সহজেই পাওয়া গেলেও কাজটা মোটেও সোজা ছিল না।

রানি এপ্রিপিনা লাকোস্টার কথা লোকমুখে জানতে পারেন বয়স্ক হলেও অসম্ভব বুদ্ধিমান আর দূরদর্শী ছিলেন রাজা ক্লডিয়াস। রাজপরিবারের ঘৃণ্য রাজনীতিও তার অজানা ছিল না। তাই বিশ্বস্ত দেহরক্ষীদের পাশাপাশি তার সঙ্গে সবসময় থাকত একদল খাবার পরীক্ষক। যেকোনো খাবার রাজা খাওয়ার আগে তা খেতে হত সেই পরীক্ষকদের। এতেও নিশ্চিন্ত ছিলেন না রাজা। তিনি জানতেন টাকার লোভ দেখিয়ে রাজকর্মচারীদের কিনে নেয়া ষড়যন্ত্রকারীদের পক্ষে অসম্ভব নয় মোটেই। তাই খাবারে বিষ থাকলেও যাতে তা পাকস্থলী অব্দি পৌঁছতে না পারে, তাই খাওয়ার পর গলায় পালক ঢুকিয়ে বমি করার অভ্যেসও ছিল রাজার।

এ অবস্থায় এগ্রিপিনার পাশে ত্রাতার ভূমিকায় এসে দাঁড়ালেন আর এক নারী। তার নাম লোকাস্টা। রোমের গল প্রদেশের বাসিন্দা ছিলেন লোকাস্টা। আশ্চর্য মেধাবী ছিলেন তিনি। জিনিয়স বললেও কম বলা হয়! চিকিৎসা বিজ্ঞানে, বিশেষত ভেষজবিদ্যায় তার জ্ঞান ছিল অপরিসীম। নানারকম বিষ নিয়ে সেসময় গবেষণা করছিলেন লোকাস্টা। লোক মারফত তার মেধা আর পাণ্ডিত্যের কথা জানতে পারেন রানি। লোকাস্টাকে ডেকে পাঠিয়ে তার সাহায্য চান রানি। রাজার খাদ্যাভ্যাস খুব ভালোমত জানতেন এগ্রিপিনা। তিনি লোকাস্টাকে এমন বিষ প্রস্তুত করতে বলেন, যা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ছড়িয়ে পড়বে শরীরে। স্বাদ পরীক্ষকদের কয়েকজনকে সম্ভবত টাকা দিয়ে বশ করা হয়েছিল। অথবা কোনোভাবে তাদের চোখ এড়িয়ে কাজ হাসিল করার পরিকল্পনা করা হয়।

রোম ধবংসের সময় নিরো বাঁশি বাজিয়েছিলেন কিনা তার সঠিক ইতিহাস আজো জানা যায়নি অভিনব ষড়যন্ত্রের শিকার হলেন রাজা ক্লডিয়াস রানি এগ্রিপিনার হাতে লোকাস্টা তুলে দিলেন ডেথ ক্যাপ নামের এক বিষাক্ত মাশরুম। সামান্য অ্যাকোনাইটও মিশিয়ে দেয়া হয়েছিল সেই মাশরুমে। ভয়ানক সেই বিষ মাশরুম সুকৌশলে মিশিয়ে দেয়া হল রাজার খাবারে। কিন্তু খাওয়ার পরেই তো গলায় পালক ঢুকিয়ে বমি করবেন রাজা। ঠিকমতো কাজ হওয়ার আগেই বিষ যদি বেরিয়ে যায়! এবারেও বুদ্ধি আঁটলেন লোকাস্টা। ফন্দি করে পালকের ডগাতেও লাগিয়ে রাখলেন কয়েকফোঁটা বিষাক্ত তরল। ফলে যা হওয়ার তাই হল। একটার পর একটা বিষের তীব্র প্রতিক্রিয়ায় মুহূর্তে নীল হয়ে গেল রাজার শরীর। রাজার ব্যক্তিগত চিকিৎসক জেনোফোনকে ডেকে পাঠানো হল। তবে সেই চিকিৎসকও এগ্রিপিনা আর নিরোর হাতের পুতুল তখন। তাই ওষুধের বদলে রাজার শরীরে তিনিও ঢুকিয়ে দিলেন বিষ। এক নিদারুণ ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে নিজের ঘরেই ছটফট করতে করতে মারা গেলেন হতভাগ্য সম্রাট ক্লডিয়াস।

ক্লডিয়াসের মৃত্যুর পর এগ্রিপিনার ছেলে নিরো সিংহাসনে বসেন ঠিকই। তবে নিশ্চিন্ত হতে পারলেন না। ক্লডিয়াসের ছেলে ব্রিটানিকাস তখনও বেঁচে আছেন। সিংহাসনকে নিষ্কণ্টক করতে আবারও লোকাস্টারের সাহায্য চান রানি এবং নিরো। তখনকার সময়ে গরম পানিতে ওয়াইন মিশিয়ে খেতে ভালোবাসত রোমের অভিজাতরা। তেমনই একবার সুযোগ বুঝে ভীষণ গরম ওয়াইন পরিবেশন করা হয় ব্রিটানিকাসকে। গরমে  তার জিভ পুড়ে যাওয়ার দশা। কোনোক্রমে কিছুটা ঠাণ্ডা পানি গলায় ঢালতেই চোখে অন্ধকার দেখল সে। কেননা সেই ঠাণ্ডা পানির পাত্রে সবার অজান্তে বিষ মিশিয়ে রেখেছিল লোকাস্টা। বিষের জ্বালায় প্রাণ হারায় ক্লডিয়াসের ছেলে ব্রিটানিকাসও। 

ক্লডিয়াসের ছেলে ব্রিটানিকাসকেও নিরোর আদেশে বিষ দিয়ে হত্যা করেন লাকোস্টা নিরো দুশ্চিন্তা মুক্ত হলেন। সিংহাসনের কাঁটা সরে গেছে তার। জমি, বাড়ি, ধনদৌলত আর দামি দামি উপহারে ভরিয়ে দেয়া হল লোকাস্টাকে। লোকাস্টার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ নস্যাৎ করে গবেষণার কাজ চালিয়ে যাওয়ার পূর্ণ স্বাধীনতাও দেয়া হল তাকে। রাজার আদেশে সেসময় নিয়ম করে কারাগার থেকে বন্দিদের পাঠানো হত লোকাস্টার গবেষণাগারে। গিনিপিগের বদলে এইসব বন্দিদের উপর নিজের আবিষ্কৃত নানা মারণ বিষের পরীক্ষানিরীক্ষা চালাতেন লোকাস্টা ।

নিরোর রাজত্বে বেশ সুখেই দিন কাটছিল বিজ্ঞানী লোকাস্টার। সম্মান , প্রতিষ্ঠা , ধনদৌলতের মাল্কিন হন অল্পদিনেই। যেকোনো বিপদে রাজা সবার আগে ডেকে পাঠাতেন তাকে। একদল শিষ্যও জুটেছিল তার, যারা তার কাছে নিয়মিত ভেষজ বিজ্ঞানের বা প্রকারান্তরে বিষ তৈরির পাঠ নিতে আসত। কনট্র্যাক্ট কিলার বলতে আজকাল আমরা যা বুঝি , সেকালে রোম সাম্রাজ্যে অনেকটা তেমনই ছিলেন লোকাস্টা। এই নারীই মানব ইতিহাসের প্রথম সিরিয়াল কিলার।

নিরো মারা যাওয়ার পর লাকোস্টার অপরাধের খবর বের হতে থাকে সবার কাছে দিনের পর দিন কখনও টাকার বিনিময়ে, কখনও গবেষণার নামে কারণে - অকারণে মানুষ মারতে হাত কাঁপত না তার। যত অপরাধই করুন না কেন, নিরোর রাজ্যে তার গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করার স্পর্ধা ছিল না কারও। রাজার সমাদর আর পৃষ্ঠপোষকতায় তার গবেষণা আর মানব-নিধন যজ্ঞ দুইই চলতে থাকে সমানতালে লোকাস্টার।

রোম ইতিহাসের সবচেয়ে নিষ্ঠুর আর অত্যাচারী রাজা বলা হয় নিরোকে। নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য মা, ভাই, স্ত্রী কাউকে হত্যা করতেই হাত কাঁপেনি তার। ১৬ বছর বয়সে রোমের সিংহাসনে বসেছিলেন , আর সেনাবাহিনীর সহযোগিতা নিয়ে রোমান সেনেট যখন তাকে ‘ জনগণের শত্রু হিসেবে ঘোষণা করে , তখন নিরোর বয়স মাত্র ৩০। কিন্তু সেনেটের সৈন্যদের হাতে ধরা পড়ার আগেই বুকে ছুরি বসিয়ে আত্মঘাতী হন তিনি। আশ্রয়দাতা রাজার এই আকস্মিক মৃত্যুতে বিপদে পড়েন লোকাস্টা। মাথার উপর থেকে নিরোর ছায়া সরে যেতেই জনরোষ আছড়ে পড়ে তার উপর।

কঠিন শাস্তি দিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয় লাকোস্টাকে বিচারসভা বসে, বিচারে দোষী সাব্যস্ত হন বিজ্ঞানী লোকাস্টা। কিন্তু যেমন তেমন শাস্তি নয়, এক নির্মম ভয়াবহ শাস্তি অপেক্ষা করে ছিল লোকাস্টার জন্য। এতটাই উদ্ভট আর ভয়ংকর সে শাস্তি, যে শুনলে হাড় হিম হয়ে আসে আজও। দোষ প্রমাণের পর লোকাস্টাকে ভিড়ের মধ্যে নগ্ন করে তার গায়ে ঢেলে দেয়া হয়েছিল এক নারী জিরাফের যোনিরস। তারপর তার দিকে লেলিয়ে দেয়া হয় বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত কিছু পুরুষ জিরাফকে। বন্যপ্রাণীর হাতে সর্বসমক্ষে ধর্ষিত হন লোকাস্টা। এরপর তার আহত, ক্ষতবিক্ষত দেহটা ছুঁড়ে ফেলা হয় হিংস্র বুভুক্ষু জানোয়ারদের খাঁচায়। লোকাস্টাকে যে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিল তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। তবে শাস্তির এই প্রক্রিয়া কতখানি সত্য তার  সত্যতা নিতে সন্দেহ আছে ইতিহাসবিসদদের। 

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে