বাঙালির ইফতার সংস্কৃতিতে মুখরোচক খাবার মিশে গেলো যেভাবে 

বাঙালির ইফতার সংস্কৃতিতে মুখরোচক খাবার মিশে গেলো যেভাবে 

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৬:০২ ২১ এপ্রিল ২০২১   আপডেট: ১৬:১৫ ২১ এপ্রিল ২০২১

বাঙালি ইফতার সংস্কৃতিতে মুখরোচক খাবার এসেছে মাত্র কয়েকশ বছর আগে

বাঙালি ইফতার সংস্কৃতিতে মুখরোচক খাবার এসেছে মাত্র কয়েকশ বছর আগে

সারাবিশ্বের ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা পালন করছে সিয়াম সাধনার মাস রমজান। সারাদিনের রোজা শেষে সবার প্রধান আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু থাকে ইফতারের আয়োজন। নানান পদের খাবারের সমারোহ ইফতারে। স্থান কাল ভেদে ইফতার আয়োজনে রয়েছে খাবারের রকমফের। তবে ইফতারে সবচেয়ে আকর্ষণীয় খাবার হচ্ছে ভাজাপোড়া খাবারগুলো।  

বিশেষ করে বাংলাদেশে, ইফতারের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে মিশে গেছে এসব মুখরোচক খাবার। রমজান মাসে বাংলাদেশের ইফতারে পেঁয়াজু, বেগুনি, ছোলা, চপ, এবং মাংসের তৈরি কাবাবসহ নানা মুখরোচক খাবার অনেকটা যেন অত্যাবশ্যকীয় উপাদান। তবে সারাদিন রোজা রাখার পর ক্লান্তি মেটাতে কিংবা শরীরের বিভিন্ন ঘাটতি মেটাতে যে স্বাস্থ্যকর খাবারের প্রয়োজন, তার তোয়াক্কা করেন না কেউ।  

ইফতারে এসব ভাজাপোড়া খাবারই বাঙালির প্রধান আকর্ষণ সারা বছর এই ধরনের খাবার ততোটা গুরুত্ব না পেলেও, রমজানে ইফতারে সব বাড়িতেই ইফতারের প্রধান আকর্ষণ নানারকম ভাজা-পোড়া খাবার। শুধুমাত্র বাড়িতেই নয়, এই সময় খাবারের দোকানগুলোতেও এরকম মশলাদার ইফতারি বিক্রির হিড়িক পড়ে যায়। ধর্মীয় বিধিবিধানে ইফতারে এই ধরনের মুখরোচক খাবারের রীতির উল্লেখ পাওয়া যায় না। তাহলে কীভাবে বাঙালির ইফতারের সংস্কৃতিতে মিশে গেল মুখরোচক সব খাবার। চলুন আজ জানব সেই আদ্যোপান্তই-  

ইসলামের ইতিহাসবিদরা বলছেন, বিভিন্ন সময়ে এই উপমহাদেশে আসা এবং শাসন করা নানা জাতি গোষ্ঠীর নানা ধরনের সংস্কৃতির মতো খাবারও এখন এই অঞ্চলের মানুষের খাদ্য তালিকায় মিশে গেছে। সেভাবেই ইফতারের এই খাবারের তালিকায় ছাপ রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের নানা দেশের খাবারের সংস্কৃতির।

ইফতারে নানা জাতিগোষ্ঠীর খাবার

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রয়েছে নিজস্ব ইফতার এবং সাহরির সংস্কৃতি
ইসলামী ইতিহাসবিদদের মতে, বাংলাদেশে ইফতারে যেসব খাবার খাওয়া হয়, তার বড় অংশটি এসেছে পার্সিয়ান বা মুঘল খাবারের তালিকা থেকে। এক সময় মুঘলরা ভারতবর্ষ শাসন করতো। তারা যখন ঢাকা শাসন করেছেন, তাদের সেই খাদ্য তালিকা তখনকার ঢাকার লোকজন গ্রহণ করেছে। এরপর আস্তে আস্তে সেটা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। যেমন ধরুন খেজুর। হজরত মোহাম্মদ (সা.) রোজা খোলার সময় অর্থাৎ ইফতারে খেজুর খেতেন। সে কারণে মনে করা হয় এটা ভালো অনুষঙ্গ। সেজন্যই বাংলাদেশের মানুষ ইফতারিতে সুন্নত হিসেবে খেজুর খায় 

মোঘলদের দেখে কাবাব, মাংসের খাবার ইফতারিতে যুক্ত হয়েছে। কাবাব, হালিম, বিরিয়ানি মুঘল খাবারের মধ্যে পারসিক খাবারের প্রভাবটা অনেক বেশি ছিল। তারাই ইফতারে বিরিয়ানি, কাবারের মতো খাবার খেতো। সেটা দেখে এই অঞ্চলের বনেদি মানুষজনও খেতে শুরু করে। 

ছোলা আফগানদের প্রিয় খাবার, তাদের কাছ থেকে ভারতবর্ষের, বাংলাদেশের মুসলমানরা গ্রহণ করেছে। তারা কাবুলি চানা বা কাবুলি ছোলা খেয়ে থাকে। সেখান থেকেই এটা খাওয়ার চল এসেছে। শবেবরাতের সময় যে বুটের হালুয়া তৈরি করা হয়, সেটার আসল নাম যেমন হাবশি হালুয়া, এটাও আফগানদের একটা খাবার। 

তবে ভারত বা বাংলাদেশে এসে সেটা আরও মশলা, পেঁয়াজ ইত্যাদি দিয়ে মুখরোচক করে রান্না করা হয়ে থাকে। সেটার সঙ্গে মুড়ি খাওয়ার চলও এই অঞ্চলের মানুষের নিজস্ব উদ্ভাবন। এখনো ইরান, আরব আমিরাত, সৌদি আরব ইত্যাদি মধ্যপ্রাচ্যের দেশে ইফতারির সময় কাবাব সহযোগে বিরিয়ানি বা পোলাও খাওয়ার চল রয়েছে। পেঁয়াজু, বেগুনি, চপ এটা উত্তর ভারত থেকে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন এলাকার খাবারে ছড়িয়ে পড়েছে, বলে ধারণা ইসলামী ইতিহাসবিদদের। 

খেজুর দিয়ে ইফতার শুরু করা নবীর সুন্নত হিসেবে পালন করা হয় এই অঞ্চলে ইসলাম ছড়ানোর সময় অ্যারাবিক প্রভাব ছিল, পার্সিয়ান প্রভাব ছিল, পরবর্তীতে সেটা একপ্রকার ভারতীয়করণও হয়। ভারতে এসে, মূলত উত্তর ভারত থেকে ইফতারের সময় মুখরোচক খাবারের অংশ হিসাবে নানা রকমের ভাজাপোড়া খাওয়ার চল যোগ হয়েছে। তখন পেঁয়াজু, বেগুনি, নানা ধরনের চপ খাওয়ার চল যুক্ত হলো। সেটাই পরবর্তীতে আমরাও গ্রহণ করেছি। ইফতারে শরবত খাওয়ার রীতি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো ছাড়াও আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও ভারতে রয়েছে। পানির পিপাসা থেকে স্বাদ, মিষ্টি ও সুগন্ধি শরবত খাওয়ার চল চালু হয়েছে বলে মনে করেন ইসলামী ইতিহাসবিদরা।

তবে এখন যেভাবে ইফতারে নানারকমের মুখরোচক খাবার, মাংস, জিলাপি বা ভাজাপোড়া খাওয়া হয়ে থাকে, সেটা মাত্র কয়েকশো বছরের পুরনো। বাঙালি সংস্কৃতিতে ইসলামে ইফতারির সময় কয়েকশো বছর পূর্বের বর্ণনাতেও এরকম ভাজাপোড়া খাওয়ার উল্লেখ পাওয়া যায় না। সুতরাং বলা যায়, কয়েকশো বছর আগেও এগুলো ছিল না। উনিশ শতকের দিক থেকে এরকম খাবার এই অঞ্চলের মানুষজন খেতে শুরু করেছে বলে ধারণা করা যায়। কারণ এর আগে বইপত্রে এরকম রকমারি খাবারের বর্ণনা পাওয়া যায় না। বরং সেই সময় মানুষ ইফতারে ভাত খেতে বলেই তথ্য পাওয়া যায়। 

ইফতারে শরবত খাওয়ার রীতি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে এসে থাকতে পারে, এছাড়াও তৃষ্ণা মেটাতে এটি পান করা হয় বলেই মত ইতিহাসবিদদের ভারতবর্ষে আরব, পার্সিয়ান, আফগান ইত্যাদি বিভিন্ন জাতির শাসকদের কারণে তাদের খাবার আর সাধারণ মানুষের মধ্যে খাবারের পার্থক্য ছিল। তবে পরবর্তীতে ধীরে ধীরে তাদের এসব খাবার এখানকার স্থানীয় মানুষ গ্রহণ করতে শুরু করে। এভাবেই স্থানীয় খাবারের সঙ্গে তাদের খাবারের রীতি মিশে যায়।

এসব মুখরোচক খাবারের বিশেষ কোনো কারণ বা পুষ্টিমাণের ব্যাপার নেই। তবে এই অঞ্চলের মানুষ একটু মুখরোচক, তেলেভাজা খাবার খেতে পছন্দ করে। এই কারণে ইফতারির মধ্যেই সেটা যুক্ত হয়ে গেছে। তবে বাংলাদেশে এখনো বিভিন্ন এলাকায় ইফতারির খাবারেও রকমফের রয়েছে। বাঙালি ভোজনরসিক হওয়ায় খাবারের দিকে তাদের বিলাসিতাও বেশি। সারাদিন রোজা রাখার পর ইফতারে পছন্দের খাবারের আয়োজন করেন অনেকে। এভাবেও অনেক মুখরোচক এবং মশলাদার খাবার ইফতারের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।

ঢাকায় ইফতারে পদের সংখ্যা থাকে আরো বেশি। বিশেষ করে পুরান ঢাকার ইফতারের নাম রয়েছে সারা বিশ্বজুড়ে। ঢাকার বয়স ৪০০ বছরের বেশি হলে ঢাকার ইফতারির ইতিহাসটাও চার শতাব্দীর। সেই আদিকালে ইফতার করাকে বলা হতো ‘রোজা খোলাই’। এখনো পুরান ঢাকার অনেক এলাকায় রোজা খোলাই শব্দটির প্রচলন রয়েছে। ইফতারি বানানোর রেওয়াজ পুরান ঢাকার প্রতি ঘরে ঘরে। তারপরও পুরান ঢাকার ইতিহাস বলে, ঢাকাইয়ারা সব সময় বাইরের খাবারে আকর্ষণ বোধ করে। সে কারণেই বাইরের ইফতারির টান সেই আদিকাল থেকেই চলে আসছে।

পুরান ঢাকার আবার রয়েছে ইফতারের আলাদা এক সংস্কৃতি ৪০০ বছরের পুরাতন বাজার চকবাজারই ছিল ঢাকার প্রধান বাজার। সে সময় চকবাজার বাদশাহি বাজার নামে পরিচিত ছিল। চকবাজারের মতো না হলেও রায়সাহেব বাজার নাজিরাবাজার পুরান ঢাকার নামকরা বাজারগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। দিনে দিনে ঢাকা শহরটাই হয়ে গেছে ইফতারির বাজার। তারপরও ইতিহাস ও স্বাদের কথা বললে পুরান ঢাকার কথাই প্রথমে চলে আসে। আর পুরান ঢাকা মানেই বাদশাহি চকবাজার, রায়সাহেব বাজার ও নাজিরাবাজার। 

 চকবাজার ইফতারিপাড়া মোঘল ঐতিহ্যের ধারক। এখানকার ইফতারির মধ্যে উল্লেখযোগ্য আস্ত মুরগির কাবাব, মোরগ মুসাল্লম, বটিকাবাব, টিকাকাবাব, কোফ্তা, চিকেন কাঠি, শামিকাবাব, শিকের ভারী কাবাব, সুতিকাবাব, কোয়েল পাখির রোস্ট, কবুতরের রোস্ট, জিলাপি, শাহি জিলাপি, নিমকপারা, সমুচা, আলাউদ্দিনের হালুয়া, হালিম, দইবড়া, সৌদি পানীয় লাবাং, কাশ্মীরি সরবত, ইসবগুলের ভুসি, পুরি এবং ৩৬ উপকরণের মজাদার ‘খাবার বড়বাপের পোলারা খায়’সহ কতনা পদ। অনেক এলাকায় পেঁয়াজু বা বেগুনির বদলে সন্ধ্যায় খেজুর ও শরবত খেয়ে ইফতারি করার পরপরই ভাত বা খিচুড়ি খাওয়ারও চল রয়েছে।
 
ইসলামে ইফতারে খাবার সম্পর্কে যা বলা হয়েছে
ইফতারে ইসলামের নবী খেজুর খেতেন, মিষ্টিজাতীয় খাবার খেতেন। বাকি যে খাবারগুলো আছে, সেগুলো বিভিন্ন দেশ তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি অনুযায়ী তারা যে সমস্ত খাবার পছন্দ করে, সেগুলো খেয়ে থাকে। ইফতারে বাংলাদেশি বা পাকিস্তানের লোকজন বুট, মুড়ি, ছোলা-যেগুলো ভাজাপোড়া বলা যায়, সেগুলো খেয়ে থাকে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের মানুষজন কিন্তু এগুলো খায় না। তারা বিরিয়ানি, মুরগির রোস্ট বা ফ্রাই খায়, সাথে খেজুর খায়।

ইফতারে পাজাপোড়া খাবারের পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর খাবার রাখাও জরুরি বলে মত পুষ্টিবিদদের  ইফতারে সুন্নত বলতে একটা মিষ্টি খাবার, খুরমা বা খেজুর বুঝি। বাকি খাবারের ব্যাপারে সুস্পষ্ট কোন নির্দেশনা নেই। যার যার রুচি অনুযায়ী, সংস্কৃতি অনুযায়ী এই খাবার গ্রহণ করে থাকে। তবে ইফতারে মুখরোচক হলেও তেলে ভাজা খাবার স্বাস্থ্যের জন্য ততোটা ভালো নয় বলেই মনে করেন পুষ্টিবিদরা। পুষ্টিবিদরা মনে করেন, ইফতারির খাদ্য তালিকায় এমন খাবার থাকা উচিত, যা সহজে শরীরে পুষ্টি, পানি ও শক্তির যোগান দেবে। অনেকেই সারাদিক খালি পেটে থাকার পর এভাবে তেলেভাজা খাবার খাওয়ার ফলে নানান শারীরিক সমস্যায় ভোগেন। গ্যাস্ট্রিক, কোষ্ঠকাঠিন্যসহ পেটের বিভিন্ন সমস্যাও দেখা যায়। তাই অনেকদিন ধরেই পুষ্টিবিদরা এ ধরনের খাবার এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিচ্ছেন।  

বিশেষ করে বাইরে থেকে যেসব খাবার কিনে এনে রমজানের সময় খাওয়া হয়, তার অনেক খাবার খোলা অবস্থায় বিক্রি করা হয়, তৈরির সময়ও স্বাস্থ্যবিধি মানা হয় না। ফলে এসব খাবার বরং শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। 

পুষ্টিবিদরা পরামর্শ দিচ্ছেন, ছোলাটা শরীরের জন্য খারাপ নয়। সেই সঙ্গে খাবারে পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি থাকা ও মিষ্টি জাতীয় খাবার রাখা উচিৎ। তবে প্রতিদিন তেলে ভাজা খাবার না খেয়ে তার বদলে চিড়া, ফলমূল জাতীয় খাবার খাওয়া শরীরের জন্য ভালো হবে।

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে