তিনবার তাজমহল ছাড়াও লালকেল্লা বেচে দিয়েছিলেন এই ব্যক্তি

তিনবার তাজমহল ছাড়াও লালকেল্লা বেচে দিয়েছিলেন এই ব্যক্তি

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৩:৫৫ ২০ এপ্রিল ২০২১   আপডেট: ১৪:০৭ ২০ এপ্রিল ২০২১

নটবরলাল সর্বকালের সেরা প্রতারকের তকমা পেয়েছেন

নটবরলাল সর্বকালের সেরা প্রতারকের তকমা পেয়েছেন

আইফেল টাওয়ার বেচে দেয়ার কাহিনী অনেকবারই শুনেছেন হয়তো। তবে ভারতের আগ্রার তাজমহলও যে তিনবার বিক্রি হয়েছিল সেই ইতিহাস জানেন কি? একবার নয় তিন তিনবার একই ব্যক্তি সম্রাট শাহজাহানের সেই বিখ্যাত প্রেমের সমাধি বিক্রি করেছিলেন। শুধু তাই নয়, লালকেল্লা, এমনকি রাষ্ট্রপতি ভবনসহ, ভারতীয় সংসদ ভবনও বিক্রি করেছিলেন মোটা অঙ্কের বিনিময়ে। এছাড়াও অন্যদের সবাক্ষর নকল করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। 

ভারতের সেই প্রতিভাবান ব্যক্তি হচ্ছেন মিথিলেশ কুমার শ্রীবাস্তব। ইতিহাসে তিনি নটবরলাল নামেই খ্যাত। তাকে ভারতের সর্বকালের সেরা প্রতারকের আখ্যা দেয়া হয়েছিল। তার অপরাধগুলো এখনো যে কাউকে ধাঁধা ধরিয়ে দিতে পারে। ১৯১২ সালে ভারতের বিহারের জিরাদাই জন্ম হয় মিথিলের শ্রীবাস্তবের। মেধাবী মিথিলেশ সে স্নাতক পাশ করার পরেই আইন নিয়ে পড়াশোনা শুরু করে। কিন্তু তখন থেকেই সে প্রতারণা শুরু করে।

আসল নাম  মিথিলেশ কুমার শ্রীবাস্তবনিজের গ্রামের এক লোকের সঙ্গে তিনি প্রথম প্রতারণা করেন। সেই ব্যক্তি শহরের ব্যাংকে টাকা জমা করতে দিয়েছিলেন। জমা করার সময় ওই ব্যক্তির সই নকল করে ব্যাংক‌ থেকে প্রায় এক হাজার টাকা তার অ্যাকাউন্ট থেকে তুলে নেন। ১৯৩০ সালের দিকে এক হাজার টাকার বর্তমান মূল্য আশা করি অনুমান করতে পারছেন।

একদিন ধরা পড়ে যায় সে ধরা পড়ে যায় তার বাবার কাছে বাবার শাসনে সে ঘর ছেড়ে পালায় কলকাতায়। কলকাতায় এক ব্যবসায়ীর ছেলেকে টিউশন পোড়ানো শুরু করেন। সে সেই ব্যবসায়ীকে ঠকিয়ে সাড়ে চার লাখ টাকা হাতিয়ে নেন। এরপর ছেষট্টি বছর ধরে ভারতের আট রাজ্যে পঞ্চাশটি ছদ্মনাম ব্যবহার করে প্রায় চার হাজার লোককে ঠকিয়ে সে কোটি টাকা উপার্জন করেন মিথিলেস।

ছদ্মবেশ ধরায় অসম্ভব পটু ছিলেন নটলাল। প্রতারণা নিত্যনতুন আইডিয়া আবিষ্কার করতে তিনি যেমন তুখোড় ছিলেন তেমনি ইংরেজি বলতে তুখোড় ছিলেন। এছাড়াও মানুষের স্বাক্ষর জাল করায় সে ছিল ওস্তাদ একবার কারোর স্বাক্ষর দেখেই সে স্বাক্ষর নিখুঁতভাবে নকল করতে পারত। বেশিরভাগ লোককে সে ঠকিয়েছে তাদের সই জাল করে।

তুখোড় বুদ্ধিমান এই ব্যক্তি ছিলেন সাক্ষর নকল করার ওস্তাদ আইনজীবী হওয়ায় জমিজমা কাগজপত্রের খুঁটিনাটি জানতো নটবরলাল। তাজমহলের মালিকানা তার এই মর্মে প্রয়োজনে সব কাগজ ও সরকারি নথিপত্র জোগাড় করে সে তাজমহল‌ বিক্রি করে ছিলেন বিদেশিদের কাছে তিনবার । শুধু তাজমহল নয় লালকেল্লাও বেচে দিয়েছিলেন দুবার এছাড়াও প্রথম রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্র প্রসাদের সই নকল করে সরকারি নির্দেশ জারিও করেন।

এছাড়া প্রয়োজনীয় নথিপত্র দেখিয়ে বেছে দিয়েছেন ভারতের লোকসভা ভবনও। পুলিশ ও আদালতের কাছে থাকা মামলার নথি দেখলে বোঝা যাবে এসব অভিযোগ এক বর্ণ মিথ্যে নয়। একবার আদালতে জর্জ সাহেবের মুখ থেকে প্রশ্ন শুনে জর্জের কাছ থেকে এক টাকা চেয়েছিলেন নটলাল টাকা নিয়ে পকেটে পুরে নিয়ে নটলার উত্তর দিয়েছিলেন আমি লোকদের কাছে চাই এভাবেই লোক আমাকে দিয়ে দেয় আমি কাউকে বন্দুক দেখিয়ে মারধর করে লুট করিনি।

লালকেল্লা, রাষ্ট্রপতি ভবনসহ, ভারতীয় সংসদ ভবনও বিক্রি করেছিলেন নটবরলাল দেড়শো কোটি টাকার মামলায় আমার বিরুদ্ধে আক্রমণ বা আঘাত করার অভিযোগ নেই। আমি চেয়েছি ওরা দিয়েছে। ভারত সরকার চাইলে আমার বুদ্ধি ধার নিতে পারে। বিদেশিদের কাছে ভারতের ধার মিটিয়ে দেবো আমি। সে এক টাকাও সেই জর্জ সাহেবকে তিনি ফেরাতে দেননি। বিশ্বখ্যাত প্রতারক হলেও নটবরলাল চেট গরিবের রবিনহুড কথিত আছে তিনি নিজের উপার্জিত সব অর্থ দরিদ্র ও অবহেলিত মানুষের সাহায্যে বিলিয়ে দিয়েছেন। এলাকাবাসীর মতে তিনি গ্রামে উপস্থিত হলে তাকে সবাই ঘিরে ধরতেন ভালোবাসার খাতিরে। নিজ গ্রামে তার ছিল দাতব্য প্রতিষ্ঠান।   

অথচ এই ব্যক্তিই  নিজের ৫০টি মিথ্যা পরিচয় তৈরি করেছিলেন। নিকৃষ্টতম এ প্রতারকের ১১৩ বছরের কারাদণ্ড হলেও পুলিশ তাকে আটকে রাখতে পারেনি। এমনকি তার মৃত্যু আজও রহস্যই রয়ে গেছে। ১৯৩৭ সালে ৯ টন আয়রন চুরির অপরাধে প্রথবারের মতো গ্রেফতার হন নটবরলাল। পুলিশ জানায়, তিনি নিয়মিত পতিতাদের কাছে যেতেন। মদের মধ্যে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে খাইয়ে তাদের গহনা ও অর্থ চুরি করে পালাতেন। নটবরলাল ঠিকই প্রথমবার পুলিশের কাছ থেকে ছাড়া পেয়ে গেলেন।

তাজমহল বিক্রি করেছিলেন তিনবার এরপর থেকে নটবরলাল ১০০টিরও বেশি দোকান মালিক, জুয়েলারি, ব্যাংক এবং বিদেশিদের স্বাক্ষর নকল করে মিথ্যা পরিচয়ে লাখ লাখ রুপি উপার্জন করতে শুরু করেন। তিনি নিত্যনতুন উপায়ে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করতেন। নটবরলালের হাজার হাজার কুকীর্তি মধ্যে বিহারের মাত্র ১৪টি জালিয়াতি মামলার মুখোমুখি হয়েছিলেন। ১১৩ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন তিনি। নটবরলালকে ১০ বারের মতো গ্রেফতার করা হলেও তাকে বেশিদিন ধরে রাখতে পারেনি পুলিশ। বেশিরভাগ সময়ই তিনি পালাতে সক্ষম হন।

নটবরলাল বেশ কয়েকবার বিচারকের সামনে বলেছেন, তিনি কারও কাছ থেকে ছিনতাই করেননি কিংবা কাউকে খুনও করেননি। যারা তাকে অর্থ দিয়েছেন; তাদের কাছ থেকেই নিয়েছেন। তিনি একবার ভরা বিচার মজলিসেই বিচারকের কাছে এক টাকা চেয়ে বসেন। বিচারকও তাকে টাকা দেন। নটবরলাল বলেন, এভাবেই না-কি তিনি মানুষের কাছে চাইলেই টাকা পেয়ে যান!

জেল পালাতেও বুদ্ধি খাটিয়েছেন তিনি জেল পালানোর বিষয়েও তিনি ধূর্ত ছিলেন। একবার ১৯৫৭ সালে নটবরলাল কানপুর জেল থেকে পালিয়ে যান। একটি সুটকেস ভরা টাকা দেখিয়ে কারারক্ষীদের ঘুষ দিয়ে সামনের গেট দিয়ে পালিয়ে যান নটবরলাল। এরপর কারারক্ষীরা সুটকেস খুলে দেখেন সংবাদপত্রে ঠাসা। তার জীবনকালে মোট ২০ বছর কারাভোগ করেছেন নটবরলাল।

সর্বশেষ ১৯৯৬ সালে ৮৮ বছর বয়সে নটবরলালকে গ্রেফতার করা হয়। বার্ধক্য এবং হুইলচেয়ার ব্যবহার করা সত্ত্বেও তিনি আবার পালাতে সক্ষম হন। ১৯৯৬ সালের ২৪ জুন পুলিশ তাকে শেষবারের মতো দেখেছিলেন কারাগার থেকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময়। কানপুর জেল থেকে চিকিৎসার জন্য পুলিশ বাহিনীর অধীনে তাকে নিয়ে যাওয়ার সময় নয়াদিল্লি রেল স্টেশনে নিখোঁজ হন নটবরলাল। তারপরে আর কখনো দেখা যায়নি তাকে। নটবরলালের ছোট ভাই পরে সাক্ষ্য দেন, শেষবার পলায়নের কিছুদিন পরেই মারা যান নটবরলাল। তার দাহ করা হয়েছিল রাঁচিতে। তার দুই স্ত্রী এবং একটি মেয়ে ছিলেন।

শেষবার ১৯৯৬ সালে কানপুর জেল থেকে পালানোর পর তার খোঁজ আর মেলেনি  ২০০৯ সালে নটবরলালের আইনজীবী তার বিরুদ্ধে থাকা ১০০টিরও বেশি অভিযোগ খারিজ করার দাবি জানান। তিনি জানান, ২০০৯ সালের ২৫ জুলাই মারা গিয়েছিলেন নটবরলাল। যদিও তার আসল মৃত্যু তারিখ জানা যায়নি।

ইতিহাসে তিনি প্রতারকের তকমা পেলেও বাংরার মানুষের কাছে নটবরলাল আজও এক গর্বের নাম। তার জীবনী নিয়ে দুটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। তার মধ্যে ১৯৭৯ সালে ‘মি. নটবরলাল’ এবং ২০১৪ সালে ‘রাজা নটবরলাল’ । এ ছাড়াও নটবরলালের জীবনী নিয়ে ডকুমেন্টরিও তৈরি হয়েছে। যা একটি ক্রাইম টেলিভিশন প্রোগ্রামে ২০০৪ সালে প্রচার হয়েছিল।

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে