বিশ্বে একমাত্র মানুষ, লোহার ফুসফুসে বেঁচে আছেন ৬৮ বছর

বিশ্বে একমাত্র মানুষ, লোহার ফুসফুসে বেঁচে আছেন ৬৮ বছর

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৪:৫৯ ২ মার্চ ২০২১   আপডেট: ১৫:১৫ ২ মার্চ ২০২১

লোহার ফুসফুস নিয়ে  সবচেয়ে বেশি বছর বেঁচে থাকা একমাত্র মানুষ পল

লোহার ফুসফুস নিয়ে সবচেয়ে বেশি বছর বেঁচে থাকা একমাত্র মানুষ পল

পৃথিবীর একমাত্র মানুষ তিনি, যাকে আটষট্টি বছর বাঁচিয়ে রেখেছে লোহার ফুসফুস। ১৯৫০ সালের দিকের কথা, তখনও পোলিও রোগের টিকা আবিষ্কার হয়নি। পোলিওমায়েলাইটিস ভাইরাসের আতঙ্কে রাত পার করছে পুরো আমেরিকা। প্রতি গ্রীষ্মেই প্রায় ১৫ হাজার শিশু পোলিওর কারণে মারা যাচ্ছিল। এদের মধ্যে যারা বেঁচে ছিল, তারা সারাজীবনের জন্য পঙ্গুত্ব বরণ করে।

তবে এই সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছিল ১৯৫২ সাল। সে বছর আমেরিকাতে পোলিও রোগে আক্রান্ত হয়েছিল প্রায় ৫৮ হাজার শিশু। এর মধ্যে শুধু টেক্সাসেই আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ২১ হাজার। পরিসংখ্যান মতে, সর্বমোট ৩১৩৫ জন শিশুর মারা যায়। 

পোলিওতে হাজার হাজার শিশু মারা যাচ্ছিল, বেঁচে থাকলে পঙ্গুত্ব বরণ করেই তাদের পথচলা সে বছর গ্রীষ্মের শুরু থেকেই টেক্সাসের রাস্তাঘাট, দোকানপাট, স্কুল কলেজ, অফিস, চার্চ থেকে সিনেমা হল, সব বন্ধ করে দেয়া হয়। নিষিদ্ধ করা হয় জনসমাবেশ। কেউ কারও বাড়ি যেতেন না। রাস্তা থাকত জনশূন্য, সম্পূর্ণ গৃহবন্দি হয়ে যায় টেক্সাস শহরের মানুষ। একই সঙ্গে টেক্সাসে সে বছর এসেছিল এক ভয়াবহ গ্রীষ্ম তাপমাত্রা ছুঁয়েছিল প্রায় চল্লিশ ডিগ্রি। টানা পচিশ দিন ধরে রাতের তাপমাত্রা ছিল ৩০ ডিগ্রির আশেপাশে। 

একে তো পোলিওমায়েলাইটিস ভাইরাসের আতঙ্ক, সেই সঙ্গে দুঃসহ গরমে নাজেহাল টেক্সাসবাসীদের। হাসপাতালের পোলিও ওয়ার্ডগুলোতে অসুস্থ শিশুদের উপচে পড়া ভিড়ে। টেক্সাস জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল কীটনাশকের গন্ধ। আসলে কেউ বুঝে উঠতে পারছিল না পোলিও রুখতে তাদের এখন কী করা উচিত। তাই অবিশ্বাস্য পরিমাণে ছড়িয়ে দেয়া ডিডিটি, বাতাসকে ভয়ংকরভাবে দূষিত করে তুলেছিল।

ছয় বছর বয়স থেকে পল লোহার ফুসফুসের সাহায্যে নিশ্বাস নিচ্ছে ঠিক সেসময় মুক্তির আনন্দে পাগলপ্রায় ছয় বছরের পল। টেক্সাসের বিখ্যাত ডালাস শহরের উপকণ্ঠে, বাবা মা আর বড় ভাইয়ের সঙ্গে থাকত পল আলেকজান্ডার। গৃহবন্দি থাকতে থাকতে হাঁফিয়ে উঠেছিল ছোট্ট পল। তার ছুটে যেতে ইচ্ছা করত ম্যাপল গাছের তলায় আর মাঠের শেষ প্রান্তে। জুলাই মাসে হঠাৎই একদিন আকাশ জুড়ে দেখা যায় কালো মেঘ। বৃষ্টি নেমেছিল পুড়ে খাক হয়ে যাওয়া ডালাসে। আনন্দে প্রায় পাগল হয়ে গিয়েছিলেন ডালাসের মানুষজন। শিশুদের ঘরে আটকে রেখে বড়রা নেমে এসেছিলেন রাস্তায়।

ডানপিটে পল বাড়ির পিছনের জানলার কাঁচ সরিয়ে নেমে এক দৌড়ে মাঠে। তিন মাস পর মুক্তির আনন্দে পাগল হয়ে উঠেছিল পল। কর্দমাক্ত মাঠে গড়াগড়ি, গাছে ঢিল ছুড়ে, বন্ধুদের বাড়ির সামনে গিয়ে ডাকাডাকি করেছিল। প্রায় এক ঘণ্টা বৃষ্টিতে ভেজার পর পিছনের জানলা দিয়েই নিজের ঘরে আবার ফিরে আসে পল। শরীর মুছে আয়নার দিকে তাকাতেই চমকে উঠে পল। তার মুখের রঙ টকটকে লাল হয়ে গিয়েছে। সেই সঙ্গে তার গলা এবং মাথা খুব ব্যথা। শরীরে প্রচন্ড জ্বর। পলের বাবা মা ফোন করেছিলেন পারিবারিক চিকিৎসকে। তিনি জানান সব উপসর্গই পোলিওর। তবে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার দরকার নেই। কারণ হাসপাতালের পোলিও ওয়ার্ড উপচে পড়েছে, কোথাও তিল পরিমাণ জায়গা নেই।

মুখ দিয়ে ছবি আঁকতে শিখে যায় পল চিকিৎসার অভাবে মারা যাচ্ছে পোলিও আক্রান্ত শিশুরা। তাই বাড়িতে চিকিৎসা করলে বেঁচে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। তবে সেদিন রাতেই পলের শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি হয়। কথা বলার ক্ষমতা পর্যন্ত নেই পলের। হাত দিয়ে কিছু ধরতে পারছে না, খাবারও গিলতে পারছে না। এমনকি কাশতে গেলেও সমস্যা হত তার। আলেকজান্ডার দম্পতি পলকে রাতেই নিয়ে গিয়েছিলেন স্থানীয় পাল্যান্ড হাসপাতালে। নতুন পোলিও রোগী নেয়ার অবস্থায় ছিল না সেখানে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাদের কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে বপ্লে। কেননা অনেক শিশুই মারা যাচ্ছে। একটু পর পর মৃত শিশুদের ওয়ার্ড থেকে বাইরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তখন বেড খালি হলে পলকে ভর্তি করানো যাবে। 

এভাবেই চালিয়ে যান পড়াশোনা, হন আইনজীবী স্টাফদের কথা শুনে কিছুক্ষণ পলকহীন চোখে চেয়েছিলেন পলের মা। তারপরও অচৈতন্য পলকে কোলে নিয়ে হাসপাতালের করিডরে অপেক্ষা করছিলেন তিনি। কোনও মায়ের কোল খালি হলে তবেই মিলবে পলের বেড। এদিকে ধীরে ধীরে পলের অবস্থা আরো বেশি খারাপের দিকে যাচ্ছিল। ক্রমশ ঝিমিয়ে পড়ছিল পল। শ্বাস নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছিল, মুখের রঙ নীল ও ঘোলাটে, চোখের তারা ক্রমশ স্থির হয়ে আসছিল। স্বাস্থ্যকর্মী ও চিকিৎসকদের হাতে পায়ে ধরছিলেন আলেকজান্ডার দম্পতি। কেউ তাদের কথায় গুরুত্ব দিচ্ছিলেন না। হঠাৎই এক তরুণ চিকিৎসক মায়ের কাছ থেকে পলকে ছিনিয়ে নিয়ে ছুটেছিলেন অপারেশন থিয়েটারের দিকে। 

জরুরীভিত্তিতে তিনি পলের ট্রাকিয়োটমি অপারেশন করেন। ফুসফুসে জমে থাকা ফুইড বের করে আনেন। তবে ততক্ষণে পক্ষাঘাতে অসাড় হয়ে গিয়েছিল পলের ফুসফুস। তাই ছয় বছরের ছোট্ট পলকে ঢুকিয়ে দেয়া হয় সিলিন্ডার আকৃতির প্রকাণ্ড এক মেশিনের ভেতর। যে মেশিনটি কৃত্রিম ফুসফুসের কাজ করে। তাই মেশিনটিকে বলা হত ' আয়রন লাং ' বা লোহার ফুসফুস। চিকিৎসকরা বলতেন ট্যাঙ্ক ভেন্টিলেটর বা ড্রিঙ্কার ট্যাঙ্ক। যে মেশিনটি ১৯২৮ সালে আবিষ্কার করেছিলেন ফিলিপ ড্রিষ্কার নামে একজন মেডিকেল ইঞ্জিনিয়ার।

এখন ক্যাথি নিজে না পারলেও নার্সদের বলে দেন কখন পলের কি প্রয়োজন এই আয়রন লাং হচ্ছে বিদ্যুতচালিত লোহার ফুসফুস। এটি দেখতে ছিল অনেকটা সাবমেরিনের মতো। এক একটির ওজন প্রায় ৩০০ কেজি। মেশিনটির ভেতরে রোগীর চিত হয়ে শোয়ার ব্যবস্থা ছিল। তবে রোগীর মাথা থাকতে হবে সিলিন্ডারের বাইরে। রোগীর পায়ের দিকে সিলিন্ডারটির প্রান্তে লাগানো ছিল চামড়া দিয়ে তৈরি হাপর। যেটি হারমোনিয়ামের বেলোর মতো কাজ করে সিলিন্ডারের ভেতরের বাতাসের চাপ কমাত ও বাড়াত। ফলে কৃত্রিমভাবে রোগীর ফুসফুস সংকুচিত ও প্রসারিত হয়ে রোগীর শ্বাসপ্রশ্বাস চালু রাখত। সাধারণত কোনো পোলিও আক্রান্ত শিশুকে দুই সপ্তাহ রাখা হত লোহার ফুসফুসের মধ্যে।

এরমধ্যে শিশুটির ফুসফুস কাজ করা শুরু করলে তো ভালোই , না হলে তার মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও তাকে বের করে আনা হত মেশিন থেকে। পরের শিশুটিকে বাঁচবার সুযোগ করা হত। পলের জ্ঞান ফেরে তিনদিন পর। তখন হাত পা একদমই নাড়াতে পারছিল না। পল এক মুহূর্তের জন্য ভেবেছিল সে হয়তো মারা গিয়েছে। তাকে কবরের মধ্যে শুইয়ে রাখা হয়েছে। হাত পা নাড়াতে না পারলেও ছাড় ঘোরাতে পারছিল। সে দেখেছিল লম্বা হলঘরটিতে রাখা আছে সারি সারি সিলিন্ডার। সেগুলোর ভেতর থেকে বেরিয়ে আছে তারই বয়সী অনেক ছেলেমেয়ের মাথা। প্রত্যেকের মুখ অস্বাভাবিক রকমের নীল। তখন সে ভাবছিল তার মতো যারা মারা গেছে তাদের সবাইকে হয়তো এখানে রাখা হয়েছে। এটা তার মৃত্যুর পরের জীবন।

সে সময় সব শিশুকেই আয়রন লাংয়ে রাখা হত তবে স্টাফদের আনাগোনা কথা বার্তায় সে বুঝতে পারে। মারা যায়নি সে, তবে কোথায় এবং কেন তাকে এখানে রাখা হয়েছে বুঝতে পারছিল না তার কিছুই। কথা বলতে পারত না পল। তবুও চোখের ইশারায় ভাব জমাত পাশের সিলিন্ডারে থাকা শিশুটির সঙ্গে। চোখের ইশারায় ও মুখের অভিব্যক্তিতে চলত আলাপচারিতা।  হয়ত একে পরকে এভাবেই সাহস যোগাত হারা। তবে সেই বন্ধুত্ব বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। কারণ কয়েকদিন পরপরই সিলিন্ডার থেকে বের করে নেয়া হত পলের নতুন বন্ধু বা বান্ধবীকে। সাদা কাপড়ে ঢাকা ছোট্ট শরীরটিকে নিয়ে মর্গের পথে ছুটত ট্রলি।

একসময় প্রাথমিক সংক্রমণ কাটিয়ে উঠে পল। তবে তার ঘাড়ের নীচ থেকে পুরো শরীরটা পক্ষাঘাতে অবশ হয়ে গিয়েছে। সারাক্ষণ সে চিত হয়ে শুয়ে থাকত মেশিনে। নার্সের তার দিকে আর তেমন আর মনোযোগ ছিল না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা মলমূত্র মেখে মেশিনের মধ্যে পড়ে থাকত পল। যখন মলমূত্র পরিষ্কার করা হত বা জামা কাপড় বদলানো হত, ওই কয়েক মুহূর্ত পলকে নিশ্বাস বন্ধ করে থাকতে হত। কারণ তখন মেশিন এক মিনিটের জন্য বন্ধ করে দেয়া হত। শ্বাস বন্ধ করে থাকতে প্রচন্ড কষ্ট হত পলের। ভাবত তাকে মেরে ফেলার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। চিৎকার করত প্রাণপণে।

লোহার ফুসফুসটিকে পল ভালোবেসে নাম দেয় আয়রন হর্স নামে

পলকে প্রতিনিয়ত মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে। চিকিৎসক ও নার্সদের বিরক্তিভরা মুখ দেখতে দেখতে তার কেটে যায় দেড় বছর। সিলিন্ডারের ভেতর তার ওজন বেড়ে যায়। এরপর পলের বাবা মা পলকে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার কথা ভেবেছিলেন। তার জন্য কিনে ফেলেছিলেন লোহার ফুসফুস। ১৯৫৩ সালের ক্রিসমাসে পার্কল্যান্ড হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরেছিল পল। যে ট্রাকে লোহার ফুসফুসে ভরে পলকে নিয়ে আসা হয়, সেই ট্রাকে মেশিনটি চালানোর জন্য লাগানো হয় জেনারেটার। 

নিজের বাড়ি ফেরার পর পলের স্কুলের শিক্ষক শিক্ষিকা এবং তার বন্ধুরা তাকে দেখতে আসে। রাতে পলের বাবা মা লোহার ফুসফুসের পাশে শুতেন। সারা রাত প্রায় জেগেই থাকতেন তারা। মেশিনের হুশ হুশ ' শব্দটা খেয়াল রাখতেন। কারণ মেশিন বন্ধ হওয়া মানেই পলকে হারিয়ে ফেলা। যখন বিদ্যুৎ চলে যেত , তখন পলের বাবা মা দুই হাত দিয়ে পাম্প করতেন মেশিনের হাপরটিকে। ক্লান্ত হয়ে গেলে প্রতিবেশীদের ডাকতেন। প্রতিবেশীরা পালা করে পাম্প করে যেতেন, যতক্ষণ না বিদ্যুৎ আসে। তবে কিছুদিনের মধ্যেই পলের জন্য কেনা হয়েছিল জেনারেটার।

১৯৫৪ সাল। আট বছরের পলের জীবনে আশীর্বাদ হয়ে আসেন ফিজিওথেরাপিস্ট মিসেস সুলিভান। তিনি পলকে শিখিয়েছিলেন কৃত্রিমভাবে শ্বাস নেয়ার একটি কৌশল। কৌশলটির নাম ফ্রগ - ব্রিদিং বা গ্লসোফ্যারিঞ্জিয়াল ব্রিদিং। কৌশলটি হল নাক মুখ দিয়ে বাতাস নিয়ে গিলে ফেলা। কয়েক সেকেন্ডের জন্য মেশিন বন্ধ করে শুরু হয় গ্লসোফ্যারিঞ্জিয়াল ব্রিদিং ট্রেনিং। প্রচন্ড কষ্ট হত পলের। চিৎকার করতে থাকত সে। তবে উৎসাহ দিতেন ফিজিওথেরাপিস্ট মিসেস সুলিভান। লোভ দেখাতেন বিভিন্ন উপহারের।

একজন নার্স সবসময় পলের খেয়াল রাখেন একদিন তিনি একটি সুন্দর কুকুরছানা নিয়ে আসেন পলের জন্য। বলেছিলেন পল যদি ফ্ৰগ- ব্রিদিং শিখে নেয় তাহলে কুকুরছানাটি তিনি পলকে উপহার দেবেন। একবছরের চেষ্টায় পল রপ্ত করে নিয়েছিল ফ্রগ- ব্রিদিং। উপহার পাওয়া কুকুরছানাটির নাম রেখেছিল জিঞ্জার। ফ্রগ - ব্রিদিং রপ্ত করার পর , পলকে কয়েক মিনিটের জন্য মেশিনের বাইরে বের করতে শুরু করেছিলেন মিসেস সুলিভান। হুইলচেয়ার করে পলকে নিয়ে যাওয়া হত বারান্দায়, লনে, বাড়ির অনান্য ঘরে। আনন্দে থর থর করে কাঁপত পলের ঠোঁট। বাতাস গেলার ফাঁকে ফাঁকে বাবা মা দাদার সঙ্গে কথা বলত পল। 

তিন বছর পর, বেশ কয়েক ঘণ্টা সিলিন্ডারের বাইরে থাকতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল পল। রোজ সকালে বারন্দায় নিয়ে যাওয়া হত তাকে। পলের খুব স্কুলে যেতে ইচ্ছা হত। তবে ঘাড়ের নীচ থেকে পুরো শরীর অবশ। লেখার শক্তি নেই তার হাতে। সিলিন্ডারের ভেতর শুয়ে , প্লাস্টিকের ছোট ব্লডের মাথায় কলম বেঁধে, মুখ দিয়ে খাতায় লেখা অভ্যাস করেছিল। পলের মা বাবা তাকে বাড়িতেই পড়াতে শুরু করেন। দাঁতে তুলি কামড়ে খুব সুন্দর ছবি আঁকতে পারত পল। তার এই কাজে মুগ্ধ হয়ে যেতেন সবাই। কিছু ছবিতে ফুটে উঠত পলের স্বপ্ন। কোনো ছবিতে সে বাস্কেটবল খেলছে। কোনোটাতে সে বেসবল খেলছে। যদিও পল জনত ছবিতে ফুটে ওঠা স্বপ্নগুলো আর কোনো দিনই সত্যি হবে না।

পল এখানে শুয়ে থেকেই সব কাজ করেনঅনেক লড়াইয়ের পর, পলকে বাড়ি থেকে পড়াশোনা করার অনুমতি দিয়েছিল ডালাসের শিক্ষা দফতর। ১৯৬৭ সালে একুশ বছর বয়সে ডালাস হাই স্কুল থেকে ১২ ক্লাসের গন্ডি পেরিয়েছিল পল। বায়োলজি ছাড়া সব বিষয়ে পেয়েছিল ‘এ ’গ্রেড। বায়োলজিতে পেয়েছিল ' বি ', কারণ সে গিনিপিগ কাটতে পারেনি। স্কুল পাশ করে পল ভর্তি হয় সাউদার্ন ইউনিভার্সিটিতে। সেখান থেকে স্নাতক হয়ে , ইউনিভার্সিটি অফ টেক্সাস থেকে আইন নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন পল। তখন তার যুবা বয়স। আইনজীবী হয়ে প্র্যাকটিস শুরু করেন ১৯৮৪ সাল থেকে। হুইল চেয়ার নিয়ে কোর্টে যেতেন। অন্য আইনজীবীর মতোই মামলা লড়তেন ফ্রগ - ব্রিদিং করতে করতে। 

কিছুদিনের মধ্যেই বিখ্যাত হয়ে গিয়েছিলেন আইনজীবী হিসেবে। চেম্বারে ভিড় লেগেই থাকত। পোর্টেবল ভেন্টিলেটর অনেক আগেই আবিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। তবুও পল ত্যাগ করেননি তার বিপদের সঙ্গী লোহার ফুসফুসটিকে ৷ যাকে পল আদর করে ডাকতেন ও আয়রন হর্স। নীরবে প্রেম একবার এসেছিল পলের জীবনেও। কলেজে পড়া অবস্থায় ক্লেয়ার নামে একটি মেয়ের প্রেমে পড়েন পল। মেয়েটি বাড়ি এসে পড়াশোনায় পলকে সাহায্য করতেন। বলতে গেলে ভালো বন্ধু ছিল তারা। একসময় ক্লেয়ারও পলকে ভালোবেসে ফেলে। 

তবে বাস্তবতা স্বপ্নের মতো সাজানো গোছানো হয় না। একজন পক্ষাঘাতগ্রস্থ যুবকের সঙ্গে মেয়ের প্রেম মেনে নিতে পারেননি ব্লেয়ারের মা। প্রায় জোর করেই ক্লেয়ারকে নিয়ে চলে গিয়েছিলেন অন্য শহরে। ভীষণ ভেঙে পড়েন পল। সমাজের মূলস্রোতে প্রতিবন্ধীদের ফেরবার অধিকার নিয়ে লড়াই শুরু করেছিলেন পল। তার লড়াইয়ে সঙ্গী হন আইন কলেজের সহপাঠিনী ক্যাথি। ততদিনে পলের জীবন থেকে একে একে হারিয়ে গিয়েছিলেন বাবা, মা ও ভাইকে। ডায়াবেটিসের কারণে ক্যাথি তখন তার দৃষ্টিশক্তির প্রায় নব্বই শতাংশ হারিয়ে ফেলেছেন। দুই বন্ধু জীবন সায়াহ্নে এসে একসঙ্গে থাকবেন বলে ঠিক করেছিলেন। আজ প্রায় দুই দশক একই ছাদের নিচে আছেন ক্যাথি ও পল। সঙ্গে আছে পলের লোহার ফুসফুসটিও।

পলকে খাবার খাইয়ে দিচ্ছেন ক্যাথি ২০১৫ সালে লোহার ফুসফুসটিতে সমস্যা দেখা দেয়। তবে তা সারানো সম্ভব হয়নি। কেননা অর্ধ শতাব্দী আগেই যে লোহার ফুসফুসের উৎপাদন বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ডালাসের এক ইঞ্জিনিয়ার মেরামত করে দিয়েছিলেন লোহার ফুসফুসটি। ২০১৬ সাল থেকে পল আবার চব্বিশ ঘণ্টার জন্য বন্দি হয়ে গিয়েছেন লোহার ফুসফুসের মধ্যে। কারণ ফ্রগ - ত্রিদিংও তিনি আর করতে পারছিলেন না। ছোট্টবেলার ভয়াবহ স্মৃতি ফিরে এসেছিল পলের মনে। সেদিনের মতোই পলকে বাঁচিয়েছিল লোহার ফুসফুস। নতুন করে স্বপ্ন দেখা শুরু করেছেন পল পলের বাবা, মা ও সুলিভানের জায়গা এখন নিয়েছেন ক্যাথি। দৃষ্টিশক্তির সমস্যা থাকলেও, ক্যাথিই নার্সদের বলে দেন। কীভাবে পলকে দেখভাল করতে হবে। কখন পলের জামা কাপড় পাল্টাতে হবে। পলের আঙুল ও মুখে হাত দিয়ে ক্যাথি দেখে নেন পলের নখ ও দাড়ি কাটার সময় হয়েছে কিনা। তবে পলকে প্রতিদিন নিজের হাতে খাইয়ে দেন ক্যাথি। এই দায়িত্বটা কাউকে দেন না। একা হাতে পলের সংসার সামলাচ্ছেন সত্তরা উর্ধ্ব ক্যাথি।

সূত্র: ডালাস নিউজ 

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে