অযোধ্যার এই নবাবের বিয়ের খরচ ৩০ লাখ, সমাধি দিতে বরাদ্দ ছিল মাত্র ১০ টাকা

অযোধ্যার এই নবাবের বিয়ের খরচ ৩০ লাখ, সমাধি দিতে বরাদ্দ ছিল মাত্র ১০ টাকা

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৫:৪০ ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১   আপডেট: ১৫:৪৫ ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১

ওয়াজির আলি খান

ওয়াজির আলি খান

নবাবী আমল বাংলায় শেষ হয়েছে সিরাজুদ্দৌলার মৃত্যুর পরই। এর আগে অনেক নবাব শাসন করেছেন বাংলায়। তাদের বীরত্বগাঁথা এবং নানান ঘটনা আজো চর্চা হয় ইতিহাসে। তেমনই এক অযোধ্যার নবাব ওয়াজির আলি খান। উত্তরাধিকার সূত্রে তিনি নবাব ছিলেন। তিনি তার জীবনের উত্থান পতনের জন্য ইতিহাসে বেশি উল্লেখিত।

১৭৯৪ খ্রিস্টাব্দে তার বিয়েতে খরচ হয়েছিল ৩০ লাখ টাকা। তার মাত্র ২৩ বছর পরে বন্দিদশায় অবর্ণনীয় যন্ত্রণার পরে মৃত্যু হয়েছিল নবাব ওয়াজির আলি খানের। তাকে সমাধিস্থ করতে ব্রিটিশ শাসক খরচ করেছিল ১০ টাকা। কলকাতার কাসিয়াবাগানে কোথায় হারিয়ে গিয়েছে সেই সমাধি।নবাবি অওয়ধে ওয়াজিরের জন্ম ১৭৮০ খ্রিস্টাব্দের ১৯ এপ্রিল। তিনি কোনো নবাবের পুত্র ছিলেন না। নবাব আসাফউদ্দৌলার বোনের ছেলে  ছিলেন ওয়াজির। নবাব আসাফউদ্দৌলার কোনো পুত্র ছিল না। এজন্য বোনের ছেলেকেই দত্তক নেন। মাত্র ১৪ বছর বয়সে ওয়াজিরের বিয়ের আয়োজন করেন তার পালক পিতা। কয়েক মাস ধরে লখনউয়ে চলে তার বিয়ের উৎসব। 

নবাব আসাফউদ্দৌলার পালক পুত্র ছিলেন ওয়াজির আলি খানতার ৩ বছর পরে মৃত্যু হল আসফউদদৌল্লাহর। আসাফউদ্দৌলার মৃত্যুর পর ১৭৯৭ সালের সেপ্টেম্বরে ওয়াজির আলি খান সিংহাসনে বসেন। ব্রিটিশরা তাকে সমর্থন দিয়েছিল। প্রথম থেকেই বিরোধ বাঁধতে শুরু করল। ব্রিটিশদের মোকাবিলা করার ক্ষমতা কিন্তু ছিল না ওয়াজিরের। তিনি পরিবর্তে ব্রিটিশদের অপদস্থ করতে শুরু করলেন। মাত্র চার মাস পরে ব্রিটিশরা তাকে অবিশ্বস্ত বলে অভিযোগ করে। স্যার জন শোরকে এসময় ১২ ব্যাটেলিয়নসহ প্রেরণ করা হয় এবং ওয়াজির আলি খানের স্থলে তার চাচা দ্বিতীয় সাদাত আলি খানকে ক্ষমতায় বসানো হয়।

ওয়াজিরের আচরণ ধুরন্ধর ব্রিটিশের কাছে স্পষ্ট হতে সময় নিল না। তারা সিংহাসন থেকে তাকে সরিয়ে বসালেন দ্বিতীয় সাদাত আলিকে। তিনি ছিলেন সম্পর্কে ওয়াজিরের আত্মীয় । সিংহাসনচ্যুত ওয়াজিরকে বার্ষিক ৩ লাখ টাকার ভাতায় বারাণসী নির্বাসনে পাঠানো হল। অসহায় ওয়াজিরকে সেই নির্বাসন দণ্ড মেনে নিতে হল। লখনউ থেকে তিনি চলে গেলেন বারাণসী। সেখানে রেসিডেন্ট জর্জ চেরীর দরবারে তাকে তলব করা হল। এরপর তার নির্বাসন ঠিকানা কোথায় হবে, ঠিক হওয়ার ছিল ওই দরবারেই। ১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দের ১৪ জানুয়ারি পদচ্যুত নবাব হাজির হলেন চেরীর দরবারে।

মাত্র ১৪ বছর বয়সে বিয়ে করেন ওয়াজির আলি খানঠিক তলব রক্ষা উদ্দেশ্য ছিল না ওয়াজিরের। তিনি সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন অনুগত ফৌজদের। তারা আক্রমণ করল চেরী-কে। ওয়াজিরের ফৌজের আক্রমণে প্রাণ হারালেন চেরী। মৃত্যু হল ক্যাপ্টেন কনওয়ে এবং মিস্টার গ্রাহামেরও। এরপর ওয়াজির চললেন বারাণসীর তৎকালীন ম্যাজিস্ট্রেট স্যামুয়েস ডেভিসের বাসভবনের দিকে। সেখানে বাড়ির সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে ডেভিস সাহেব একা বর্শাহাতে ঠেকিয়ে রাখলেন তাদের আক্রমণ। তাকে রক্ষা করতে ব্রিটিশ বাহিনী চলে আসায় ঘটনাস্থল ছেড়ে পালান ওয়াজির ও তার সঙ্গীরা।

এই ঘটনা পরিচিত ‘বারাণসী তাণ্ডব’ নামে। বারাণসী ছেড়ে অনুচরসমেত ওয়াজির চলে গেলেন দাক্ষিণাত্যের বেরার প্রদেশে (আজকের হায়দরাবাদ)। কিন্তু সেখানে গিয়ে শেষরক্ষা হল না। ব্রিটিশ ফৌজদের হাতে ধরা পড়লেন তিনি। বন্দি ওয়াজিরকে পাঠিয়ে দেয়া হল তৎকালীন রাজধানী কলকাতায়।

ব্রিটিশদের সঙ্গে ওয়াজির আলি খান পেরে ওঠেননি ব্রিটিশদের বিচারে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন অতীতের নবাব। তার জীবনের বাকি দিনগুলো কেটেছিল ফোর্ট উইলিয়ামের এক নির্জন কুঠুরিতে। অনাহারে বন্দিদশা কেটেছিল অতীতের অওয়ধের সিংহাসনের উত্তরাধিকারীর। তেষ্টায় কাতর হয়ে গেলেও বরাদ্দের বেশি একফোঁটা পানিও তাকে দেয়া হত না।

১৮১৭ খ্রিস্টাব্দের ১৫ মে কলকাতায় মৃত্যু হয়েছিল ওয়াজির আলি খানের। তখন তার বয়স মাত্র ৩৭ বছর। তার শেষকৃত্যের জন্য ফোর্ট উইলিয়াম থেকে বরাদ্দ করা হয়েছল মাত্র ৭০ টাকা। গোর দেয়ার খরচ হিসেবে পড়েছিল সাকুল্যে ১০ টাকা। তখনকার নিরিখে সে টাকা কম ছিল না ঠিকই। তবে যার বিয়েতে খরচ হয়েছিল ৩০ লাখ টাকা। তাও ২২৭ বছর আগেকার কথা। তার ঠিক ২৩ বছর পরেই তাকে সমাধিস্থ করতে ১০ টাকা তো কিছুই না। 

অন্ধকার কারা কুঠির ছিল তার জীবনের শেষদিন পর্যন্ত সঙ্গী ৩৭ বছরের জীবনে নবাবের শেষ ১৭ বছর কেটেছিল কারাগারে। অওয়ধের সিংহাসনে ছিলেন মাত্র ৪ মাস। ১৭৯৭ সালের ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ১৭৯৮ সালের ২১ জানুয়ারি। তার পরেই সিংহাসনচ্যুত হন। রেখে গিয়েছিলেন ৪ সন্তানকে। তারা হলেন মির্জা জালালউদ্দিন হায়দর আলি জান বাহাদুর, নবাব মুবারক উদ-দৌলা, মির্জা মহম্মদ আলি খান এবং শাহিবজাদি সাদাতউন্নিসা বেগম। তাদের মধ্যে মুবারক উদ দৌলা পরবর্তীতে চলে গিয়েছিলেন অটোমান সাম্রাজ্য‌ের দিকে। তবে তার সম্বন্ধেও খুব বেশি জানা যায়নি। বাকিরাও মিলিয়ে গিয়েছেন কালের স্রোতে।

ওয়াজির আলি খানের সমাধিও আজ হারিয়ে গিয়েছে। গোমতীপারের শহর থেকে শুরু হয়ে তার যাত্রা শেষ হয়ে গিয়েছিল গঙ্গার ধারে বাংলায়। কলকাতার মাটি নিজের কোলে টেনে নিয়েছে ৪ মাস নবাবের দায়িত্ব পালন করার সুযোগ পাওয়া এই হতভাগ্য অকালমৃতকে। 

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে