বন্য প্রাণী সংরক্ষণে আফ্রিকান এই আদিবাসীরা নেচে গেয়ে এক বিচিত্র উৎসব পালন করে

বন্য প্রাণী সংরক্ষণে আফ্রিকান এই আদিবাসীরা নেচে গেয়ে এক বিচিত্র উৎসব পালন করে

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৬:০৭ ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২১   আপডেট: ১৬:১১ ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২১

জুলু জনগোষ্ঠী

জুলু জনগোষ্ঠী

আদিকালে মানুষের খাবারের প্রধান উৎস ছিল বনের পশু। নিজস্ব উপায়ে পশু শিকার করে কাঁচা অবস্থায় মাংস খাওয়া। পশুর চামড়া তারা ব্যবহার করত লজ্জা নিবারণ করতে। পশু শিকার বিলুপ্ত হয়েছে বহুকাল আগেই। তবে এখনো আফ্রিকাসহ বিভিন্ন দেশের উপজাতিদের মধ্যে এই প্রথা রয়েই গেছে। সভ্য পৃথিবী থেকে যোজন যোজন দূরে তাদের বসবাস। 

আধুনিকতার ছোয়া লাগেনি তাদের জীবনে। তেমনই এক জাতি দক্ষিণ আফ্রিকার নাজারেথ গির্জায় জুলু গোষ্ঠী।  আদিবাসীদের রয়েছে নিজস্ব সংস্কৃতি , আচার- ব্যবহার। তেমনই এক অনুষ্ঠান তারা পালন করে প্রতি বছর। তাও একবার নয় বছরে দু’বার আয়োজিত হয় অদ্ভুত এই অনুষ্ঠান। সেখানে  প্রায় দেড় হাজার  সদস্য শিঙ্গা, মাদল বাজাতে বাজাতে চলেন কোয়াজুলু-নাটাল প্রদেশের দিকে তাদের পবিত্র মাঠে। মূলত পুরুষরাই অংশ নেন এই উৎসবে। তবে এখানে ব্যতিক্রম হচ্ছে  অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীদের পোশাক। যা দেখলেই চমকে উঠবে যে কেউ। 

বন্য প্রাণী রক্ষায় উৎসব পরনে থাকে চিতার চামড়া, মাথায় মহিষের সিং প্রতি নর্তকীর শরীরেই জড়ানো চিতাবাঘের ছাল। কারোর মাথায় ফারের টুপি। যা তৈরি হয় ভালুকের ত্বকের ওপরে মহিষের শিং আটকে।দক্ষিণ আফ্রিকার এই ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির কথা শুনে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে। প্রতিবছর তারা এত এত প্রাণীর হত্যা হয়ে চলেছে নির্বিচারে? প্রথম দেখাই এই ভাবনা মনে উকি দিলেও আসল ঘটনা জানার পর কিছুটা স্বস্তি পাবেন। তারা মূলত এই ‘বিগ ক্যাট’বা চিতা বাঘ সুরক্ষার জন্যই এই উৎসব করে থাকে।

বন্য প্রাণীদের যে চামড়া পরিধান করতে দেখা যাচ্ছে,তা আসলে সিন্থেটিকের তৈরি। এতোটা নিখুঁতভাবে তৈরি করা হয় চামড়ার আদলে পোশাকগুলো। যা প্রথম দেখায় নকল বুঝতে কষ্ট হবে আপনার। এখনো অনেকেই এমন আছেন যারা বংশ পরম্পরায় পাওয়া সংরক্ষিত আসল প্রাণীর চামড়াই ব্যবহার করেন উৎসবে। তবে দ্রুত পাল্টাচ্ছে পরিস্থিতি। 

তবে নিকট অতীতেও এমন ছিল না এই ছবি। এক সময় সত্যিই বন্যপ্রাণীর চামড়া ব্যবহার করতেন উৎসবের পোশাক হিসাবে। তবে প্রতি বছরই যে শিকার চলত, এমনটা নয়। একটি চামড়া ব্যবহৃত হয়ে আসত বংশ-পরম্পরায়। তারপর তা নষ্ট হয়ে গেলে আবার নতুন শিকার, নতুন পোশাক। জুলু সম্প্রদায়ের মানুষেরা প্রধান পেশা পুঁতির কাজ। নানা রকম কাঠ, ঝিনুক, শামুক দিয়ে তারা মালা তৈরি করে। এই মালা তৈরির চল তাদের মধ্যে এসেছে ব্রিটিশদের সঙ্গে যুদ্ধের পর থেকে। 

এই মালা তাদের সাহস এবং প্রেমের প্রতীক পুঁতিশিল্পের এই বিশেষ রূপটি যুদ্ধের মেডেলিয়নসকে আমেরিকান নামে পরিচিত ছিল। মূলত পুঁতির নেকলেস যোদ্ধাদের সাহসিকতার প্রতীক ছিল। প্রথমে কাচ থেকে এই মালা তৈরি হলেও জোগানের অভাবে কাঠ, ফলের বীজ এবং শুকনো বেরি দিয়ে মালা তৈরি করত। ইউরোপীয়দের আগমনের আগ পর্যন্ত এই কাঁচটি পর্তুগিজদের সঙ্গে একটি বাণিজ্য সামগ্রীতে পরিণত হয়েছিল। যা তাদের জীবিকা নির্বাহের একমাত্র উৎস হয়ে দাঁড়ায়। এই মালা তাদের প্রেমের প্রতীকও ছিল। কোনো নারী বা পুরুষ অন্য কাউকে এই মালা উপহার দেয়া মানেই প্রেম নিবেদন করা বোঝায়। এটিকে তারা খুবই মূল্যবান বলে মনে করত। 

খুবই শান্ত স্বভাবের এই জুলু জাতি। অন্যান্য আফ্রিকান আদিবাসীদের সঙ্গে সংস্কৃতি রীতিনীতি, খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে মিল থাকলেও অমিল রয়েছে কিছু জায়গায়। যেমন ধরুন এই উৎসব। যেখানে তারা প্রতিবছর তাদের আশেপাশে বনের পশু সংরক্ষণের জন্য উৎসব করে থাকে। এমন ঘটনা পৃথিবীতে সত্যিই বিরল। পোশাকের বেলায় পুরুষের তেমন কোনো কিছু নেই।

হাজার হাজার বছর পেরিয়ে তারা এখনো ধরে রেখেছে পূর্ব পুরুষের ঐতিহ্য  লজ্জা নিবারনের জন্য সামান্য একটি কাপড় চামড়ার বেল্টের সঙ্গে পরেন। নারীরা শুধু শরীরের নিচের অংশে কাপড় পরেন। উপরের অংশের জন্য তেমন কোনো কাপড় পরেন না নারীরা। তবে গলায় থাকে কাচ কিংবা কাথের মালা। গর্ভবতী নারীদের জন্য রয়েছে বিশেষ এক কাপড়। এই সময় তারা কাচের বদলে ঘাসের মালা পরেন। শরীরের বাড়তি ওজন যেন তার অস্বস্তির কারণ না হল। বলা যায় অন্যান্য অনেক আদিবাসী জাতির চেয়ে জুলুরা অনেকটাই সভ্য। 

ব্রিটিশদের সঙ্গে যুদ্ধ হয়েছিল জুলু জনগোষ্ঠীরজুলু জনগণ পিতৃতান্ত্রিক সমাজের অধীনে বিশ্বাসী। পুরুষদের পরিবারের প্রধান হিসাবে বিবেচিত এবং কর্তৃত্বমূলক ব্যক্তিত্ব হিসেবে দেখা হয়। জুলু পুরুষরা নিজেকে খুব গর্ব এবং মর্যাদার সঙ্গে চিহ্নিত করে। তারা বলদ, সিংহ এবং হাতির মতো শক্তিশালী বন্য প্রাণীর গুণাবলীর সঙ্গেও নিজেদের তুলনা করে। তাদের কাজ শিকার করা, পরিবারের ভরণপোষণ সব কিছু। নারীদের কাজ ঘরের কাজকর্ম করা, পরিষ্কার করা, বাচ্চাদের লালন-পালন, পানি এবং কাঠ সংগ্রহ, লন্ড্রি, ফসলের মাথে কাজ, রান্না করা এবং পোশাক তৈরি করা। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ হলেও নারীদের উপার্জনেই চলে সংসার।  

অনুমানিক এক দশক আগে বিশ্বব্যাপী বন্য-বিড়াল সংরক্ষণ সংস্থা ‘প্যান্থেরা’ একটি প্রকল্প নিয়েছিল জনসচেতনতার। ‘ফার্স ফর লাইফ’ নামাঙ্কিত সেই প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকার এই ব্যাপটিস্ট চার্চটিকে। সহযোগিতার এগিয়ে এসেছিলেন অনেকেই। উপস্থাপন করা হয় সিন্থেটিক ‘লেদার’। এই সিন্থেটিক ‘চামড়া’-র দাম কম হওয়ায় এবং সহজলভ্য হওয়ায় বছর দুয়েকের মধ্যেই বন্ধ হয়ে যায় আনুষ্ঠানিক এই শিকারযজ্ঞ। আসল চামড়ার বদলে প্লাস্টিক, প্ল্যাডার আর ভিনাইল থেকে তৈরি পোশাকের মাধ্যমেই সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার উদ্যোগ নেন তারা।

পুরুষতান্ত্রিক সমাজে বসবাস জুলুদের বর্তমানে শুধু ‘প্যান্থেরা’-ই নয়, তার সঙ্গে হাত মিলিয়েই এই প্রচার ও সচেতনতার ক্লাস নিয়ে চলেছেন ব্যাপটিস্ট চার্চের কর্মকর্তারাও। বদলে যাচ্ছে পুর দৃশ্যই। বর্তমানে দক্ষিণ আফ্রিকায় চিতা সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তারাই। হয়ে উঠেছেন নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত। যেখানে প্রকৃতির কোলে বেড়ে ওঠা মানুষগুলো বন্যপ্রাণীদের সংরক্ষণে নিজেদের প্রথা পাশ কাটিয়ে যাচ্ছেন। সেখানে সভ্য সমাজ কতটুকু ভূমিকা রাখতে পারছে। শুধুমাত্র অর্থ কিংবা বিলাসিতার জন্যই চোরাশিকারের মুখে পড়তে হচ্ছে প্রাণীদের।  

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে