স্বামী অ্যালবার্টের সঙ্গে রানি ভিক্টোরিয়ার সংসার জীবন 

শেষ পর্ব

স্বামী অ্যালবার্টের সঙ্গে রানি ভিক্টোরিয়ার সংসার জীবন 

সাত রঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৬:০৮ ২৫ জানুয়ারি ২০২১   আপডেট: ১৬:২০ ২৫ জানুয়ারি ২০২১

ছবি: রানি ভিক্টোরিয়া

ছবি: রানি ভিক্টোরিয়া

পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত রানিদের একজন তিনি। ইংল্যান্ডের রাজতন্ত্রের সেই টালমাটাল দশায় শক্ত হাতে টেনে ধরেছিলেন রাশ। ফিরিয়ে এনেছিলেন রাজতন্ত্রের পুরোনো গরিমা। মাত্র ১৮ বছর বয়সেই তার মাথায় উঠেছিল রাজমুকুট। 

একের পর এক আধুনিক সংস্কার, জনকল্যাণমূলক কাজকর্ম তাকে করে তুলেছিল দেশের মানুষের নয়নের মণি। তিনি আর কেউ নন, ইংল্যান্ডের রাজপরিবারের অন্যতম চর্চিত নাম রানি ভিক্টোরিয়া। রানির জীবন নিয়ে লেখা হয়েছে বহু বই। তৈরি হয়েছে সিনেমা। তবু এখনও তার জীবনের অনেকটাই রয়ে গেছে লোকচক্ষুর আড়ালে। বাকিংহাম প্যালেসের অন্দরে আজও পাক খায় রাজপরিবারের তেমনই অনেক অজানা গল্পের দ্বিতীয় পর্বে আজ জানবো।

রানি ভিক্টোরিয়াপরামর্শের জন্য রানি নির্ভর করতেন ফাদার ফিগার মেলবোর্নের উপর এইসব ঘটনায় ভয়ানক রেগে যান ভিক্টোরিয়া। তার মানসিক শান্তিও নষ্ট হচ্ছিল। তাছাড়া মেলবোর্নের রাজনৈতিক দীক্ষা ভিক্টোরিয়ার খুব বেশি কাজেও লাগেনি। বহু টালবাহানার পর ১৮৪১ সাল নাগাদ প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে সরিয়ে দেয়া হয় লর্ড মেলবোর্নকে। খুব অল্প বয়সে বাবাকে হারিয়েছিলেন ভিক্টোরিয়া, মায়ের সঙ্গেও খুব মধুর সম্পর্ক ছিল না। 

এ অবস্থায় ফাদার ফিগার লর্ড মেলবোর্নের মধ্যে হয়তো রানি সেই আস্থা আর বিশ্বাসই খুঁজে পেতে চেয়েছিলেন, অন্তত এমনটাই ধারণা অনেক ইতিহাসবিদের। অ্যালবার্টের সঙ্গে বৈবাহিক জীবনে বেশ সুখী ছিলেন ভিক্টোরিয়া। যৌথ দাম্পত্যে এক এক করে ৯ সন্তানের জন্ম দেন তারা। রানির তৎকালীন ডায়েরি আর চিঠিপত্র পড়লেই বোঝা যায় স্বামী অ্যালবার্টকে তিনি কতটা ভালোবাসতেন।

স্বামী অ্যালবার্টের সঙ্গে রানি ভিক্টোরিয়াসেসময় রানি ভিক্টোরিয়ার প্রধান উপদেষ্টাও ছিলেন প্রিন্স অ্যালবার্ট। তবে ইংল্যান্ডের রাজনীতিতে খুব বেশি জনপ্রিয় হতে পারেননি অ্যালবার্ট। লন্ডনের মানুষও তাকে পছন্দ করত না। শারীরিকভাবেও খুব একটা সুস্থ ছিলেন না তিনি। নানা অসুখে প্রায়ই শয্যা নিতেন। সন্তানদের নিয়ে সপরিবারে রানি ভিক্টোরিয়া ১৮৬১ সালে মাত্র ৪২ বছর বয়সেই মারা যান প্রিন্স অ্যালবার্ট। এই অপ্রত্যাশিত শোক রানিকে ভেঙে ফেলেছিল। 

দীর্ঘদিন তিনি প্রাসাদের বাইরে বেরোতেন না। সরকারি কাজকর্মেও মন ছিল না। শোকের প্রতীক হিসেবে পরতেন কালো পোশাক। সেসময় রানির শোকের সমব্যথী হয়ে দেশের লোকজনও বেশ কিছুদিন কালো পোশাক পরেছিলেন। পরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরলেও রানি কখনো ভোলেননি অ্যালবার্টকে। একাধিক সম্পর্কের গুঞ্জন তৈরি হলেও আর কখনো বিয়ে করেননি রানি।

 রানি ভিক্টোরিয়া কালো পোশাকে একইরকমভাবে সাজিয়ে রাখতেন তার প্রিয় অ্যালবার্টের ঘর। রোজ নতুন নতুন পোশাক উপহার দিতেন মৃত স্বামীকে। অ্যালবার্টকে যে তিনি ভোলেননি, সে কথা স্মরণে রেখেই আজীবন পরেছেন কালো পোশাক। বারবার খুনের চেষ্টা যেকোনো রোমহষর্ক গল্পের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে রানি ভিক্টোরিয়ার জীবন। রানিকে খুন করার চেষ্টা হয়েছে একবার নয়, ছয়বার। প্রতিবারই আশ্চর্যজনকভাবে বেঁচে ফেরেন রানি। 

এইসব খুনের ষড়যন্ত্রের সঙ্গে রাজপরিবারের কাউকে সরাসরি জড়িত থাকতে দেখা গেলেও, ধারণা করা হয় সিংহাসনের উত্তরসূরিরাই পথের কাঁটা সরাতে গোপনে এসব করাতেন। সদ্য যৌবনে রানি ভিক্টোরিয়া ১৮৪০ সালে এডওয়ার্ড অক্সফোর্ড নামে এক ১৮ বছরের এক তরুণ লন্ডনের রাস্তায় রানিকে লক্ষ্য করে দুটি গুলি ছোঁড়ে। অল্পের জন্য রক্ষা পান গর্ভবতী রানি। পরে তদন্তে জানা যায় মাথার গন্ডগোল আছে ওই তরুণের।

মন্ত্রীদের সঙ্গে সভায় রানি ভিক্টোরিয়া বিনা সাজায় ছেড়ে দেয়া হয় তাকে। ১৮৪২ সালে জন উইলিয়াম নামে আরেক তরুণ দু বার রানিকে হত্যার ব্যর্থ চেষ্টা চালায়। শাস্তি হয়নি তারও। আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যায় অপরাধী। ১৮৪৯ সালে এক ক্ষুব্ধ আইরিশ নাগরিক আবার হামলা করে রানির ঘোড়ার গাড়িতে। পরের বছর রবার্ট পেট নামে এক অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা রানির মাথায় বেত দিয়ে আঘাত করেন। রানি তখন একাই গাড়ি চালাচ্ছিলেন। 

বেতের ওজন কম হওয়ায় সে যাত্রাও গুরুতর বিপদের হাত থেকে বেঁচে যান ভিক্টোরিয়া। ১৮৮২ সালে স্কটল্যান্ডের এক বিখ্যাত কবি রানির ঘোড়ার গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়েন। এটি ছিল রানিকে হত্যার লক্ষ্যে তার তৃতীয় প্রচেষ্টা। তাকেও পাগল আখ্যা দিয়ে শাস্তির হাত থেকে নিষ্কৃতি দেন রানি নিজেই। এসব খুনের চেষ্টা জনসাধারণের মধ্যে আরো বাড়িয়ে দিয়েছিল রানির জনপ্রিয়তা।

 রানি ভিক্টোরিয়া ঘোরার পিঠে বসে আছে এছাড়াও দ্য বয় জোনস নামে এক তরুণকে একবার রানির খাসকামরা থেকে গ্রেফতার করা হয়। রানির বেশ কিছু ব্যক্তিগত জিনিস সে হাতিয়েছিল বলে অভিযোগ। ১৯০১ সালে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত প্রায় ৬৪ বছর একা হাতে যুক্তরাজ্য ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের রাজত্বভার সামলেছেন রানি ভিক্টোরিয়া। পৃথিবীর ইতিহাসে যে ক'জন নারী শাসক দীর্ঘ সময় শাসনকার্য পরিচালনা করেছেন, তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত-সমালোচিত নাম সম্ভবত রানি ভিক্টোরিয়ার। 

শ্বেতাঙ্গ সমাজের গণ্ডি ছাড়িয়ে তার সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল ভারতীয় উপনিবেশ থেকে সুদূর আফ্রিকা মহাদেশেও। ব্যক্তিগত জীবনেও ভারি বর্ণময় ছিলেন ভিক্টোরিয়া। ভারতীয় ভৃত্য আবদুলের সঙ্গেও তার সম্পর্কের কথা বহুচর্চিত। তবু সবকিছুর উর্ধ্বে আজীবন এক আশ্চর্য নিঃসঙ্গতা আর বিষাদ বয়ে বেড়িয়েছেন নিজের ভিতরে। আজও তার হৃদয়ের সেই আলোআঁধারির নাগাল পায়নি কোনো তাত্ত্বিক, গবেষক, ইতিহাসবিদ।

ডেইলি বাংলাদেশ/এসএ