সাইকেল নিয়ে বিশ্ব ভ্রমণ, শত বছর আগে বাঙালিই প্রথম শুরু করেছিল

সাইকেল নিয়ে বিশ্ব ভ্রমণ, শত বছর আগে বাঙালিই প্রথম শুরু করেছিল

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৪:৪২ ২৩ জানুয়ারি ২০২১   আপডেট: ১৪:৫৩ ২৩ জানুয়ারি ২০২১

বাংলার ছেলের সাইকেলে বিশ্ব ভ্রমণ

বাংলার ছেলের সাইকেলে বিশ্ব ভ্রমণ

বর্তমানে মানুষের মধ্যে বিশ্ব ভ্রমণের ঝোঁক অনেক বেশি। কেউ করছেন নেশায়, কেউবা পেশায়। তবে বয়স এখানে একেবারেই বাঁধা নয়। তরুণ থেকে বয়োবৃদ্ধ মনের জোড় আর ইচ্ছাতেই ঘুরে বেড়াচ্ছেন দেশ বিদেশ। অনেকে সাইকেল, নিজের গাড়ি নিয়েই বেড়িয়ে পড়ছেন বিশ্বভ্রমণে। একবিংশ শতাব্দীতে আধুনিক এবং সহজলভ্য যোগাযোগ ব্যবস্থায় এটি একেবারেই কঠিন কিছু নয়। 

তবে আজ থেকে শত বছর আগের কথা ভাবুন তো! সবে শেষ হয়েছে বিশ্বযুদ্ধ। তখনো যুদ্ধের ধ্বংসাবশেষের চিহ্ন সবখানেই। বিংশ শতাব্দীর শুরুতেই বিশ্ব দেখেছে এই ধ্বংসলীলা। ব্রিটিশ কলোনি হওয়ার জন্য প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশ নিল। আর এরই অংশ হিসেবে তৈরি হল বাঙালি পল্টন। সেখানেই নাম লেখালেন মাঝারি উচ্চতা, রোগাটে চেহারা এক বাঙালি যুবক।  ইংরেজরা তাকে দেখে বেশ খানিকটা অবাক হয়েছিলেন বটে। এত রোগা ছেলে যুদ্ধে অংশ নেবে! তবে সেই ছেলেটির চোয়াল শক্ত। নিজের সিদ্ধান্তে একেবারে অটল। শরীরের জোড়ে নয়, যুদ্ধ জয় করার প্রত্যয় তার মনের জোড়ে। 

সিলেটে জন্ম রামনাথের সিলেটের সেই ছেলেটির নাম রামনাথ বিশ্বাস। কিশোর রামনাথ ছোটো থেকেই মাঠে-ঘাটে খেলে বড় হয়েছেন তিনি। আর সেই পরিবেশই তার ভেতরে তৈরি করেছিল এক দৃঢ় মনোভাব। অবশ্য রামনাথ বিশ্বাসের কাহিনী কেবল বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে নয়। অতি অল্প বয়সেই রাজনীতিতে ঢুকে পড়েন তিনি। রাজনীতি বলতে, বিপ্লব। ছোট থেকেই রামনাথ দেখছেন ব্রিটিশদের অত্যাচার। দেখছেন বঙ্গভঙ্গ। তখন চারিদিকে বিপ্লবের হাওয়া। নরম নীতি নয়, লাঠির জবাব লাঠি দিয়েই দেয়া হবে। সেই আঁচ এসে লাগল তার শরীরেও। কিশোর বয়সেই তিনি যোগ দিলেন অনুশীলন সমিতিতে। অবশ্য এই কাজে যাওয়ার জন্য অন্ন জোগানোর যে সামান্য একটা চাকরি পেয়েছিলেন, সেটিও চলে গেল।

আরো পড়ুন: এদেশে কুমারী মেয়ের হয় না বিয়ে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের যত অদ্ভুত যৌনরীতি

অনেকেই হয়তো ভ্রু কুঁচকে ভাবতে শুরু করেছেন, ব্রিটিশ বিরোধিতা সত্ত্বেও কেন রামনাথ বিশ্বযুদ্ধে নাম লেখালেন? যুদ্ধে তো সেই ব্রিটিশদের হয়েই লড়তে হবে। তাহলে? এর পেছনে রামনাথের ছিল আরেক পরিকল্পনা। রামনাথ ছিলেন অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয়। বাঙালিদের সম্পর্কে একটি বদনাম বরাবরই ছিল। তারা নাকি একটু আয়েশে কাজ করতে ভালোবাসে। তখনকার দিনে পান চিবোতে চিবোতে আপিসে যেতেন বাবুরা। রামনাথ বিশ্বাসের মতো মানুষেরা এই ছাঁচে গড়া ছিলেন না। বাঁধাধরা চাকরিতে তার পোষাচ্ছিল না একদম। ধরাবাঁধা দশটা- পাঁচটা অফিস, কেমন যেন জীবনকে একটা গন্ডির মধ্যে ফেলে দিয়েছে একেবারে। তার চেয়ে অ্যাডভেঞ্চারই ছিল তার কাছে জীবনের আসল মানে।

চাকরি ছেড়ে যোগ দেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধে  এখান থেকেই সাগর পাড়ি দিলেন রামনাথ। মেসোপটেমিয়ায় যুদ্ধ করতে গেলেন বটে। তবে তার রোগা হ্যাংলা- পাতলা শরীর এত ধকল নিতে পারল না। অসুস্থ হয়ে চলে এলেন বাড়ি। তবে ঘরবন্দি হয়ে থাকার মানুষ তো নন রামনাথ। আবারও চলে গেলেন সৈন্যদলে। তবে এই যাওয়া অন্য এক দিগন্ত খুলে দিল তার সামনে। কিশোর বয়সেই সাইকেল চালাতে শিখেছিলেন রামনাথ। সেই সাইকেলই ধীরে ধীরে নেশায় চেপে গেল। সেনাবাহিনীতে কাজের সুবাদে যখন সিঙ্গাপুরে এলেন, তখন সেই নেশা যেন আবারও পেয়ে বসল। ঠিক করলেন, সাইকেলে করেই বিশ্বভ্রমণ করবেন। অ্যাডভেঞ্চার!

আরো পড়ুন: বিশ্বের সবচেয়ে পুরনো সেলফি তোলা হয় ৫০০ বছর আগেই

সময়টা ১৯৩১ সাল। যেই ভাবা, সেই কাজ। বিশ্ববাসীকে টাক লাগিয়ে সিঙ্গাপুর থেকে প্যাডেল চালাতে শুরু করলেন রামনাথ। সবার চোখ বড় বড় করে নানা রকম কথা তোয়াক্কা করে ছুটে চললেন গন্তব্যে। গন্তব্য বিশ্বের শেষ প্রান্ত! অনেকেই বলতে লাগলেন, সাইকেলে করে কী করে বিশ্বজয় করা যায়? তবে একথা রামনাথের মনে কিন্তু একফোঁটাও সংশয় তৈরি করতে পারে নি। পুরো সময়ে রামনাথের সম্বল ছিল দুটী চাদর, চটি, আর সাইকেল মেরামতের বাক্স।

সাইকেলে চড়ে বিশ্ব ভ্রমণের সিদ্ধান্ত নেন দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশই তিনি ঘুরলেন। তবে এখানেই থেমে রইল না যাত্রা। ১৯৩৪ এবং ১৯৩৬ সালে আরও দুবার সাইকেল বের হয় রাস্তায়। আফগানিস্তান, সিরিয়া, লেবানন হয়ে প্রায় গোটা ইউরোপ, এবং শেষমেশ আফ্রিকা আর আমেরিকা। রামনাথের কাছে হার মেনেছিল সমস্ত বাধা-বিপর্যয়। রামনাথ ছিলেন প্রচণ্ড অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় মানুষ। এক উদাহরেই তা বুঝতে পারবেন আপনিও! 

তখন তিনি আফ্রিকা ভ্রমণে ব্যস্ত। সেখানে তার সঙ্গী হয়েছেন দুজন স্থানীয় মানুষ। রামনাথ ততদিনে খেয়াল করেছেন আফ্রিকায় কালো মানুষদের দুর্দশা। সে সময়টাতে আফ্রিকায়, বিশেষ করে দক্ষিণ আফ্রিকায় ভারতীয়দের রমরমা। শ্বেতাঙ্গ সাহেবরা ভারতীয়দের যেমন অশ্রদ্ধা করতেন, ভারতীয়রাও তেমনি স্থানীয় কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকানদের দেখলে নাক কুঁচকে থাকত। তারপরও এই তথাকথিত পিছনে পড়ে থাকা মানুষরাই রামনাথের সঙ্গী হয়েছিল। 

তিরিশটার মতো ভ্রমণকাহিনী লেখেন রামনাথ

আফ্রিকার জঙ্গলে ঢুকে, সেখানকার সৌন্দর্য দেখে মোহিত হয়ে যান তিনি। হঠাৎই খেয়াল হল, পকেটে কড়কড় করছে বেশ কিছু পাউন্ড। প্রকৃতির বিশুদ্ধ বাতাসে বিমোহিত হয়ে কিছুটা ভাবুক হয়ে যান রামনাথ। সন্ন্যাস জীবনের ব্রত বোধহয় মনে মনে নিয়েই নিয়েছিলেন। যে কারণে পকেট থেকে টাকা পয়সা বের করে সঙ্গী দুই আফ্রিকানদের বিলিয়ে দিলেন রামনাথ বিশ্বাস। এমন কাণ্ড দেখে বাঙালিবাবুটিকে ‘পাগল’ই ভেবেছিলেন কালো যুবকরা।  

হ্যাঁ, পাগলই ছিলেন রামনাথ বিশ্বাস। তাই নিজের শর্তে বেঁচেছেন প্রতিটা মুহূর্তে। নিজের যুক্তিতে, বুদ্ধিতে, আদর্শের চোখে দেখেছেন গোটা পৃথিবী। ম্যাপ বইয়ের পৃথিবী নয়; একেবারে বাস্তব জগত-সংসার। বহুবার বিপদে পড়েছেন, শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছেন, পা ভেঙেছেন; কিন্তু মনোবল হারাননি এতটুকুও। আফ্রিকার মানুষদের কথা তুলে ধরেছিলেন নিজের বইতে। ‘দেশ’ পত্রিকাতেও ভ্রমণকাহিনী লিখতেন রামনাথ। সেই লেখা পৌঁছে গিয়েছিল স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছেও। আজকের পুঁজিসর্বস্ব পৃথিবীতে বোধহয় এমন বাউণ্ডুলে মানুষদেরই প্রয়োজন ছিল সবচেয়ে বেশি। 

আরো পড়ুন: শুধু বাঙালিই নয়, কান লাল করা ঝাল মশলা খাবার প্রিয় বিশ্বের অনেক দেশে

রামনাথ ১৮৯৪ সালের ১৩ জানুয়ারি অসমের সিলেট জেলার বানিয়াচং গ্রামের বিদ্যাভূষণপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। যেটি বর্তমানে বাংলাদেশের সিলেট বিভাগের হবিগঞ্জ জেলার অন্তর্ভুক্ত। তার পিতার নাম বিরজানাথ বিশ্বাস ও মাতার নাম গুণময়ী দেবী। বাল্যকালে তিনি বানিয়াচঙ্গের হরিশ্চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। পিতার মৃত্যুর কারণে তার বিদ্যালাভের ইতি ঘটে।

দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত সেই ভ্রমণকাহিনী পৌঁছে গিয়েছিল রবীন্দ্রনাথের কাছে  রামনাথ হবিগঞ্জের জাতীয় ভান্ডার সমিতির ম্যানেজার পদ যোগ দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। এখানে থাকাকালীন তিনি সাইকেল চালনারও সুযোগ পান এবং তাতে তিনি বিশেষ পারদর্শী হয়ে ওঠেন। সেখান থেকেই আসলে সাইকেলে চড়ে বিশ্বভ্রমণের সাহস পেয়েছিলেন বোধহয়। ১৯২৪ সালে তিনি মালয়ে ব্রিটিশ নৌবাহিনীর একটি চাকরিতে যোগ দেন। এটিই ছিল তার জীবনের শেষ চাকরি। এরপর আর কোনো ধরাবাঁধা বাঙালির গণ্ডিতে নিজেকে আটকে রাখেন নি। 

শেষ জীবনে বাংলায় থিতু হয়েছিলেন তিনি। ১৯৪৭ সালে দেশভাগ হলে অসমের সিলেট জেলা পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়। রামনাথ বানিয়াচঙ্গেই থেকে যান।  নিজের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা লিখেই কাটিয়ে দেন সময়। তবে তার ভ্রমণকাহিনী নিয়ে বই প্রকাশ করতে চাইলে কোনো  প্রকাশক এগিয়ে আসেনি। অগত্যা তিনি নিজেই পর্যটক প্রকাশনা ভবন নামে একটি প্রকাশনা সংস্থা খুলে নিজের বই প্রকাশ করতে শুরু করেন। এরপর তিনি পূর্ব পাকিস্তানের পাট চুকিয়ে দিয়ে পাকাপাকিভাবে কলকাতায় চলে যান। বসবাসকালে রামনাথের ভ্রমণকাহিনী আনন্দবাজার পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হত। পরে তা গ্রন্থ আকারে প্রকাশিত হয়। তার রচিত গ্রন্থের সংখ্যা তিরিশের উপর।১ নভেম্বর ১৯৫৫ সালে তিনি মারা যান।

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে