নেদারল্যান্ডে কাঠের জুতা ব্যবহারের নেপথ্যে রয়েছে যে রহস্য

নেদারল্যান্ডে কাঠের জুতা ব্যবহারের নেপথ্যে রয়েছে যে রহস্য

সাত রঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৪:২৮ ২৩ জানুয়ারি ২০২১   আপডেট: ১৪:৫৬ ২৩ জানুয়ারি ২০২১

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

নেদারল্যান্ড ভ্রমণ করেছেন অথচ ডাচ ক্লগ সম্পর্কে জানবেন না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না। পুরো বিশ্বের কাছে পরিচিত এই ডাচ জাতি। তাদের রং-বেরঙের টিউলিপ, ডাচ চিজ, উইন্ডমিল আর এই ঐতিহ্যবাহী কাঠের জুতার জন্য।

এই কাঠের জুতাকে বলা হয় 'ক্লোম্পেন' ডাচ ভাষায়। মধ্যযুগ থেকে যা নেদারল্যান্ডসে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। নেদারল্যান্ডসের ১২টি প্রদেশের যেকোনো ট্যুরিস্ট শপে গেলেই দেখা মেলে চাবির রিং, কাপড়, হ্যান্ডব্যাগসহ নানা ধরনের স্যুভেনিরে রয়েছে ডাচ ক্লগ নামের কাঠের এই রঙিন জুতার ছবি।

কাঠের জুতা নেদারল্যান্ডসেই শুধু এই কাঠের জুতার ব্যবহারের ইতিহাস রয়েছে তেমনটা নয়। বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন ধরনের কাঠের জুতা ব্যবহার করা হয়। যেমন জাপানের ‘গেটা’ এবং স্পেনের ‘আলবারকাস’। তবে গঠনশৈলীর দিক থেকে সামনের দিকে সুচালো পায়ের আঙুল এবং হাত দিয়ে আঁকা কাঠের জুতা সাধারণত ‘ডাচ ক্লগ’ হিসেবে স্বীকৃত। 

ডাচ সংস্কৃতিতে কাঠের জুতা গভীরভাবে যুক্ত। তাছাড়া এই কাঠের জুতা গ্রামীণ অঞ্চলের কিছু মানুষ এখনো ব্যবহার করেন। ইতিহাস খুঁজে বেড়ানোর অভিপ্রায় থেকে কাঠের জুতার বিষয়েও জানার চেষ্টা করি। আর সে ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১২০০ শতকে কাঠের তৈরি জুতার ব্যবহার শুরু হয় নেদারল্যান্ডসে। কারখানার শ্রমিক, কারিগর, কৃষক, জেলেদের পা রক্ষার জন্য নকশা করা হয়েছিল এই জুতার।

কাঠের জুতা পরে সাইকেল চালান তবে এই জুতা শুরুতে কাঠ দিয়ে তৈরি করা হয়নি, সে সময় কাঠের ওপর চামড়া ব্যবহার করা হতো।  লক্ষ্য করা গেল, মাঠে, পানিতে ও কারখানায় কাজ করার জন্য সেগুলো খুব উপযোগী নয়। পরবর্তী সময়ে পুরো জুতাই কাঠ দিয়ে তৈরি করা হয়। তবে পেশার ভিন্নতায় জুতার নকশাতেও ভিন্নতা আসে। যারা খামারে কাজ করতো, তাদের পা কাদায় ডুবে যেত, তাই জুতায় একটি বৃহৎ বর্গাকার নাক ব্যবহার করা হতো। মাছ শিকারের তার জড়ো করতে জেলেরা ব্যবহার করতেন জুতার সামনের দিকে ধারালো ও সুচালো নাকযুক্ত ক্লগ।

বাচ্চা পরে আছে কাঠের জুতা সাদাসিধে জুতা ছিল কারখানার কর্মীদের। তবে আস্তে আস্তে এর ব্যবহার ছড়িয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের মধ্যেও। বাড়িতে পরার জন্যও জুতা তৈরি শুরু হয়। এমনকি গির্জা ও বিয়ের অনুষ্ঠানে পরার জন্য বিশেষ কাঠের জুতা বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে পুরো নেদারল্যান্ডসে। একপর্যায়ে এমন প্রথা শুরু হলো, পুরুষেরা তাদের বাগদত্তার কাছে এক জোড়া সুন্দর খোদাই করা জুতা দিয়ে প্রপোজ বা ভালো লাগার কথা বলতো।

কাঠের জুতায় ফুল সাজানো ডাচ ক্লগ তৈরি হয় যেভাবে 
প্রথমে কাঠের একটি টুকরাকে জুতার আকার দেয়া হয় বিশেষ ধরনের কুড়াল দিয়ে। সেটিকে পানিতে ডুবিয়ে রাখা হয় তিন থেকে চার দিন। এরপর একটি ধারালো ছুরি দিয়ে জুতার পূর্ণাঙ্গ আকার দেয়া হয়। জুতা তৈরির পর তিন সপ্তাহজুড়ে রোদে শুকানো হয়। শুকানো হয়ে গেলে হাতে আঁকা হয় নকশা। জুতা বানানোর মেশিন উদ্ভাবিত হয় শিল্পবিপ্লবের পর। স্বাভাবিকভাবেই তখন উৎপাদন যায় বেড়ে। তবে নেদারল্যান্ডসে এখন হাতে গোনা কয়েকজন এমন জুতা তৈরি করেন। তাদের কারখানায় জুতা তৈরি দেখার সুযোগ রয়েছে। 

যেভাবে তৈরি করা হতো কাঠের জুতা নেদারল্যান্ডসের রাজধানী আমস্টারডামের অদূরে ঐতিহ্যবাহী ডাচ সংস্কৃতির জন্য জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র জায়ানস শ্যাঞ্চস। এটি একটি ছোট গ্রাম, যেখানে বিস্তৃত অঞ্চলজুড়ে খোলা আকাশের নিচে রয়েছে একটি জাদুঘর। সেখানেই রয়েছে কাঠের জুতা তৈরির কারখানা। কারিগরেরা পর্যটকদের কাছে দারুণভাবে উপস্থাপন করেন তৈরির প্রক্রিয়া। সেখানে জুতা কেনারও ব্যবস্থা আছে। কারখানা ভ্রমণে গিয়ে কেনার সুযোগ না হলেও, সামনে রাখা নানা রঙের, নানা মাপের ও নানা নকশার কাঠের জুতা পরে ইচ্ছা মতো ছবি তুলেছি।

জাদুঘর জুতা

বিরাট আকারের ডাচ ক্লগগুলো প্রদর্শনীর জন্যই রাখা হয়েছে
নেদারল্যান্ডস এখন পর্যটক মক্কা, ক্লোম্পস, বেশিরভাগ অংশের জন্য স্যুভেনির। সুতরাং, ১৯৮৮ সাল থেকে লাকডাল শহরে, এই কাঠের জুতাগুলোর একটি জাতীয় জাদুঘর খোলা হয়েছে, যা কাঠের বিভিন্ন প্রদর্শনী, কল্পনা এবং আবিষ্কার যা তারা তৈরি করে তা অবাক করে দেয়। যারা বাড়িতে টিউলিপস ল্যান্ড থেকে কাঠের জুতা পেতে চান তাদের জন্য বছরে প্রায় তিন মিলিয়ন জোড় ক্লোগ তৈরি হয়। জুতা হিসেবে শুধুমাত্র এক মিলিয়ন জোড়া ব্যবহার করা হয়, বাকিটি স্যুভেনির হিসেবে।

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে