ইয়াহিয়ার ‘বান্ধবী’ গৃহবধূ থেকে হন ক্ষমতাধর নারী

ইয়াহিয়ার ‘বান্ধবী’ গৃহবধূ থেকে হন ক্ষমতাধর নারী

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৬:৩৪ ১৭ ডিসেম্বর ২০২০   আপডেট: ১৬:৫১ ১৭ ডিসেম্বর ২০২০

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

‘আমি দৃঢ় প্রতিজ্ঞা নিয়েছিলাম যে, পুরুষদেরকে তাদের নিজেদের ফাঁদে ফেলেই শায়েস্তা করব। আমার স্বামী ছিলেন একজন পুলিশ অফিসার। তার মধ্য দিয়ে আমি দেখেছি, একজন ক্ষমতাশালী পুরুষের অবকাশ দরকার। এরমধ্যে অন্যতম হলো তাদের বিছানার সঙ্গী। যা কোনো বিশ্বস্ত সংস্থা সরবরাহ করবে। যে যত উচ্চ ক্ষমতাশালী, তার চাহিদা তত আকাশচুম্বী।’ ২০০২ সালের মে মাসে একটি পত্রিকায় দেয়া সাক্ষাৎকারে পাকিস্তানের ক্ষমতাধর নারী আকলিম আখতার এমনটিই জানান।

তবে তিনি ছিলেন খুবই স্বচ্ছল পরিবারের কন্যা। পাকিস্তানি এক গৃহবধূ হিসেবে সুখেই জীবনযাপন করতেন পাঞ্জাবের গুজরাটে। তার স্বামী ছিলেন পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। ১৯৬৩ সালে স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর আকলিম আখতার বসবাস করতে থাকেন রাওয়ালপিন্ডিতে। এরপরেই তার জীবন হয়ে ওঠে আলো ঝলমলে।

আরো পড়ুন: নৃশংসভাবে বলি দেয়া হয় এই কুমারীকে, প্রকৃতিই তাকে করেছে মমি

ছয় সন্তানের জননী নিঃসঙ্গ এ নারী কয়েক বছরের মধ্যেই আকস্মিকভাবে হয়ে ওঠেন পাকিস্তানের অন্যতম শীর্ষ ক্ষমতাধর ব্যক্তিত্ব। সেনাবাহিনীর কেউ না হয়েও সামরিক শাসনামলে তার কথায় যেন মানতে হত বিশিষ্টজনদের। পরিচিতি পান তিনি জেনারেল রানি হিসেবে।

আকলিম আখতার ১৯৩১ বা ১৯৩২ সালে পাঞ্জাবে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একজন পুলিশ অফিসারকে বিয়ে করেন। তার স্বামী যদিও বয়সে তার চেয়ে অনেক বড় ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি তার স্বামীকে ছেড়ে চলে আসেন। বিবাহের নাটকীয় উপসংহার আকলিম আখতারের জীবন পাল্টে দেয়।

জেনারেল রানিআকলিম আখতার জীবনের একটি নীতিবাক্য গ্রহণ করেন, তা হলো-পুরুষদের শায়েস্তা করা তাদের নিজেদেরই দুর্বলতায়। আকলিম আখতারের মধ্যকার উচ্চাভিলাষী দিকগুলো প্রকাশ পেতে থাকে বিবাহবিচ্ছেদের পরই। ওই সময় তার রাওয়ালপিন্ডির ফ্ল্যাটে নিয়মিত নাচের আসর ও পার্টির আয়োজন করা হত। 

তত্কালীন সামরিক-বেসামরিক প্রশাসনের আমোদপ্রিয় কর্মকর্তারা ছিলেন এসব আসরের নিয়মিত অতিথি। এমনই এক আসরে ১৯৬৭ সালে পাকিস্তানের তত্কালীন সেনাপ্রধান ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে পরিচয় হয় আকলিম আখতারের।

আরো পড়ুন: স্বামীর অজান্তে একই বাড়িতে প্রেমিককে লুকিয়ে রাখেন ১৭ বছর

আকলিম আখতার ইয়াহিয়া খানকে সম্বোধন করতেন ‘আগা জানি’ নামে। দু’জনের ঘনিষ্ঠতা এক পর্যায়ে স্ক্যান্ডালে রূপ নেয়। ইয়াহিয়া খানের মদ ও নারীর প্রতি আকর্ষণ ছিল। এই বিষয়গুলোই পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যমের চর্চার অন্যতম বিষয়বস্তু ছিল। এর মধ্যে আকলিম আখতারের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতার বিষয়টি মিডিয়ার বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল।

১৯৬৯ সালে ইয়াহিয়া খানের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে বিদায় নেন আইয়ুব খান। ইয়াহিয়া প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বান্ধবী হিসেবে আকস্মিকভাবেই পাকিস্তানের রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠেন আকলিম আখতার। 

নাচের আসরে তার সঙ্গে দেখা হয় ইয়াহিয়া খানেরকথাশিল্পী আনিসুল হক ইয়াহিয়ার প্রেম ও লাম্পট্য নিয়ে উপন্যাস লিখেছেন জেনারেল ও নারীরা। বইয়ের এক জায়গায় আছে, ‘রানি ইয়াহিয়াকে কোট পরালেন। তার টাইয়ের নট বেঁধে দিলেন। তার মনে পড়ে গেল তার ফেলে আসা স্বামীর কথা। একদিন তিনি এভাবে স্বামীর টাইয়ের নটও বেঁধে দিতেন। তারও দুই বাহু পাখির ডানার মতো উড়িয়ে দিয়ে তাকে পরিয়ে দিতেন কোট। আগাজি তাকে চুম্বন করলেন কপালে।’ (প্রথমা প্রকাশন, ২০১৬)

গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বিষয়গুলোয় ইয়াহিয়া খানের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে থাকেন তিনি। গণমাধ্যমও তাকে অভিহিত করতে থাকে ‘জেনারেল রানি’ হিসেবে। কথিত রয়েছে, আকলিম আখতার শুধু ইয়াহিয়াকে সঙ্গই দিতেন না, তার সঙ্গে অন্য অনেক নারীর ঘনিষ্ঠতাও করিয়ে দিয়েছিলেন। 

আরো পড়ুন: বাংলার বধূর সিরিয়াল কিলার হয়ে ওঠার পেছনে করুণ ইতিহাস

বাস্তবে পতিতাবৃত্তি ব্যবসা শুরু করেন আকলিম। ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে যাদের তিনি ঘনিষ্ঠতা করিয়ে দিয়েছিলেন তাদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য নাম পাকিস্তানের কোকিলকণ্ঠী হিসেবে পরিচিত গায়িকা ও অভিনেত্রী নূরজাহান। 

জেনারেল রানি পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানি সাংবাদিক আয়েশা নাসিরকে দেয়া এক সাক্ষাত্কারে জানিয়েছেন, ইয়াহিয়া খান আগেই নূরজাহান সম্পর্কে তার কাছে আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। পরে আয়কর সংক্রান্ত এক ঝামেলা এড়াতে গিয়ে আকলিম আখতারের কাছে তদবির করতে এসেছিলেন নূরজাহান। এর সুবাদেই নূরজাহান ও ইয়াহিয়া খানের মধ্যে পরিচয় করিয়ে দেন আকলিম আখতার।

জেনারেল রানি ও ইয়াহিয়া খানবিষয়টি গণমাধ্যমে অনেক স্ক্যান্ডালের জন্ম দিলেও ওই সময়ে এ ঘটনা ইয়াহিয়া খানের কাছে আকলিম আখতারের কদর বাড়িয়ে দিয়েছিল অনেকখানি। এর মাধ্যমেই মোহাচ্ছন্ন ইয়াহিয়ার ওপর তার প্রভাব অনেকখানি বেড়ে যায়।

অনেক বছর পর নূরজাহান অবশ্য খালিদ হাসানের কাছে স্বীকার করেছিলেন, ইয়াহিয়া খান তার সঙ্গ উপভোগ করতেন। তিনি তাকে নূরি বলে ডাকতেন। ইয়াহিয়া খান সবসময়ই মগ্ন ছিলেন নূরিদের মতো নারীদের নিয়ে। 

আরো পড়ুন: বাংলার ‘মোগলি’, যার কাহিনী কাঁদায় বিশ্ববাসীকে

মান্টো সরস মন্তব্য করে বলেছেন, পাকিস্তানের তরুণেরা যখন দেশের জন্য জীবন দিচ্ছে, প্রেমিক জেনারেল তখন ‘চাতাউরের দুর্গ দখলে’ ব্যস্ত। ঢাকার পতনের পর জুলফিকার আলী ভুট্টোর কাছে ইয়াহিয়া খানের ক্ষমতা হস্তান্তরের গল্পটিও রূপকথা। আসলে মংলা গ্যারিসনে অভ্যুত্থানের কথা শুনে তিনি ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন।

ইয়াহিয়ার কার্যক্রমের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বিবরণ দিয়েছেন পুলিশ বিভাগের রাওয়ালপিন্ডির বিশেষ শাখার সুপার সি এইচ সরদার। তিনি লিখেছেন, প্রেসিডেন্ট ভবন ছিল তখন বেশ একটা জায়গা। নানা মানুষজন আসছে। প্রেসিডেন্ট নিজে মাতাল আর রমণীমোহন।.

দেহজীবিনী আর তাদের দালালেরা তো বটেই, সমাজে মর্যাদাবান অনেকেও ছিলেন। আকলিম আখতার, মিসেস কে এন হোসেন ও লায়লা মোজাফ্ফর ছিলেন অন্যতম। বহু নিন্দিত কিন্তু আকর্ষণীয় নারীও আসত। তারা প্রেসিডেন্ট হাউসজুড়ে নাচত, গাইত, পান করত। প্রেসিডেন্ট হাউসকে ওখানকার নিরাপত্তায় নিয়োজিত পুলিশ বাহিনী বলত কঞ্জরখানা, আর সেনাবাহিনীর সদর দফতর বলত ডাঙ্গরখানা।

ইয়াহিয়া খান ও জেনারেল রানিওই সময় ইয়াহিয়া খানের অনুগ্রহ পাওয়ার আশায় জেনারেল রানির কাছে ভিড় জমাতেন রাজনীতিবিদ, শীর্ষ সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীরা। এসব ব্যক্তির মধ্যে ছিলেন পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) প্রধান ও পরবর্তীকালের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোও।

ইয়াহিয়া খান ক্ষমতা গ্রহণের সময়ে জনগণের কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ১৯৭০ সালেই নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে পাকিস্তানে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনবেন তিনি। ওই নির্বাচনেই প্রথম অংশ নেয় সে সময়ের নবগঠিত রাজনৈতিক দল পিপিপি।

নির্বাচনে জয়লাভের জন্য পাকিস্তানের আমলাতন্ত্র ও সামরিক বাহিনীর সমর্থন আদায়ে মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন দলটির প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টো। এজন্য সে সময় প্রায়ই দলের তরুণ নেতা মুস্তাফা খারকে সঙ্গে নিয়ে আকলিম আখতার তথা জেনারেল রানির কাছে অনুনয় বিনয় করতেন।

আকলিম আখতার নিজেও পরবর্তী সময়ে বলেছেন, মুস্তাফা খার ও জুলফিকার আলী ভুট্টো আমার কাছে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতেন শুধু জেনারেলের সঙ্গে একবার কথা বলিয়ে দেয়ার জন্য।

আরো পড়ুন: বিশ্বের কিছু অবাক করা স্থানের নাম, উচ্চারণ করাই বিব্রতকর

বিভিন্ন মাধ্যমে উঠে আসা তথ্য বলছে, মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে ইয়াহিয়া ও ভুট্টোর মধ্যে যে ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠেছিল, তার ভিত্তিটি গড়ে দিয়েছিলেন জেনারেল রানি। আকলিম আখতার নিজেও বলেছেন,‘আমি আগা জানির জন্য যতগুলো পার্টি আয়োজন করেছিলাম, তার চেয়েও বেশি করেছিলাম ভুট্টো ও খারের জন্য।

১৯৭৭ সালের নভেম্বরে এক সংবাদ সম্মেলনে আকলিম আখতার দাবি করেন, ১৯৭০ সালের নির্বাচনের আগে ভুট্টোর দলের নির্বাচনী ব্যয়ভারের বড় একটি অংশ তিনি বহন করেছিলেন। এমনকি তিনি সে সময় ভুট্টোর ব্যক্তিগত ব্যয়ও বহন করেছেন। এর প্রতিদানে ভুট্টো প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, নির্বাচনে জয়লাভ করলে আকলিম আখতারকে পাঞ্জাবের গভর্নর বানাবেন তিনি।

জুলফিকার আলী ভুট্টোইয়াহিয়া খান যতদিন ক্ষমতায় ছিলেন, জেনারেল রানির প্রতাপ ও প্রভাবও ততদিন ছিল। মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের বিজয় ইয়াহিয়া খানের মতো আকলিম আখতারের সৌভাগ্যের দিনগুলোরও ইতি ঘটিয়েছিল। এ সৌভাগ্য আর কখনই ফিরে পাননি তিনি।

১৯৭১ সালের ডিসেম্বরেই পাকিস্তানের ক্ষমতা হারান ইয়াহিয়া খান। ক্ষমতায় আসেন জুলফিকার আলী ভুট্টো। মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের পরাজয়ের কারণ ও বাংলায় দেশটির সামরিক-রাজনৈতিক নেতাদের কার্যকলাপ নিয়ে তদন্তের জন্য গঠন করা হয় হামুদুর রহমান কমিশন।

জেনারেল রানির দাবি, ওই সময়ে পাকিস্তানের পরাজয়ের জন্য ইয়াহিয়া খানকে দায়ী করে কমিশনে সাক্ষ্য দেয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করেছিলেন ভুট্টো। তবে আকলিম আখতার তাতে অস্বীকৃতি জানান। এ কারণে চোরাচালান ও রেড লাইট জোন পরিচালনার অভিযোগে তাকে গ্রেফতার করান ভুট্টো।

১৯৭২ থেকে ১৯৭৭ পর্যন্ত পাঁচ বছর পর্যায়ক্রমে গৃহে ও কারাগারে বন্দি করে রাখা হয় আকলিম আখতারকে। এর মধ্যে লাহোর দুর্গের কারাগারে বন্দি থাকাকালে তাকে বেশ নির্যাতনও করা হয় বলে অভিযোগ তুলেছিলেন জেনারেল রানি। অন্যদিকে পাকিস্তানের এক নামজাদা উকিলের ভাষ্যমতে, ভুট্টো আকলিম আখতারকে আটকে রেখেছিলেন, কারণ তিনি অনেক কিছুই জানতেন।

১৯৭৭ সালে জুলফিকার আলী ভুট্টো ক্ষমতাচ্যুত হলে আকলিম আখতারের বন্দিত্বেরও অবসান ঘটে। এরপর পুরোপুরি লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যান তিনি। ১৯৮০ সালে ইয়াহিয়া খানের মৃত্যুর পর আবার সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হন তিনি। 

জেনারেল রানি ১ জুলাই, ২০০২ সালে ৭৩ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। লাহোরের শেখ জায়েদ হাসপাতালে তখন তিনি চিকিৎসারত ছিলেন। মৃত্যুকালে তিনি স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হন, এছাড়া তার লিভার ও কিডনির সমস্যাও ছিল।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস