বাস্তবের ড্রাকুলার, মানুষের রক্তে ভিজিয়ে খেতেন রুটি

বাস্তবের ড্রাকুলার, মানুষের রক্তে ভিজিয়ে খেতেন রুটি

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৫:৪৬ ২৫ নভেম্বর ২০২০   আপডেট: ১৫:৫১ ২৫ নভেম্বর ২০২০

ছবি: গল্পের নয় বাস্তবের ড্রাকুলার এই শাসক

ছবি: গল্পের নয় বাস্তবের ড্রাকুলার এই শাসক

গল্প উপন্যাস কিংবা সিনেমায় ড্রাকুলারের কাহিনী তো সবাই জানেন। হরর সিনেমাগুলোর মতোই ড্রাকুলারের সিমেনা দর্শকদের কাছে অনেক বেশি জনপ্রিয়। ছেলে বুড়ো সবার কাছেই ড্রাকুলারের গল্প মুখে মুখে। উনবিংশ শতকে ব্রাম স্টোকার লেখেন তার কালোত্তীর্ণ উপন্যাস ‘ড্রাকুলা’। যার উপর ভিত্তি করে পরবর্তীতে আরো অনেক বই এবং সিনেমা নির্মিত হয়েছে। 

তবে গল্পেই শুধু নয় বাস্তবেই ছিল ড্রাকুলার। পৃথিবীজুড়ে মানুষ ড্রাকুলাকে আরো চেনে ভ্লাদিমির ড্রাকোলিয়া, কাউন্ট ভ্লাদ, ভ্লাদ দ্য ইমপেলার বা ভ্লাদ টেপেস নামে। ব্রিটিশ মিউজিয়ামে গবেষণা করতে গিয়ে ব্রাম খোঁজ পান এই নিষ্ঠুর শাসকের। বইতে যে দূর্গের উল্লেখ তিনি করেছেন, রোমানিয়ার ট্রানসিলভানিয়ার এক ছোট্ট জনপদে ‘ব্রান ক্যাসেল’ নামে সত্যিই মধ্যযুগীয় সে দুর্গের সন্ধাণ মেলে। প্রতি বছর অসংখ্য পর্যটক পাহাড়ের ঢাল বেঁয়ে অন্ধকার সেই দুর্গে হাড় হিম করা অনুভূতি নিতে যান।

শাসক তৃতীয় ভ্লাদ

উপন্যাসে ড্রাকুলা তো রক্তপানকারী এক পিশাচ। ‘মানুষ’ এক শাসকের সঙ্গে মিলিয়ে কেনো তবে অমন ভুতুড়ে রচনার সৃষ্টি! আসলে কাউন্ট ভ্লাদের রয়েছে নির্মম সব রেকর্ড। বেঁচে থাকতে আশি হাজার থেকে প্রায় এক লাখ লোককে শূলে চড়ানোর কুখ্যাতি তার। অভিজাত এক নারী তার কাছে শূলগাঁথা লাশের দুর্গন্ধ নিয়ে অভিযোগ করতে গেলে তিনি এক বীভৎস সমাধান দেন তাকে। সেই নারীকেই সবচেয়ে উঁচু শূলে চড়ানোর নির্দেশ দেয়া হয় যেন চিরতরে কোনরূপ দুর্গন্ধ তার নাক অব্দি পৌছাতে না পারে। ওয়ালেসিয়া, মলডাভিয়া ও ট্রানসিলভানিয়া- মধ্যযুগে রোমানিয়া এই তিনটি ‘প্রিন্সিপ্যালিটি’ বা যুবরাজ শাসিত রাজ্যে বিভক্ত ছিল। ১৪৩১ সালে কার্পেথিয়ান পর্বতমালার কোলে অবস্থিত ট্রানসিলভানিয়ার দক্ষিণে ওয়ালেসিয়া রাজ্যে যুবরাজ তৃতীয় ভ্লাদ জন্ম নেন। 

এই দুর্গেই সেই ভয়ংকর শাসক মানুষের উপর নির্যাতন চালাতেন ড্রাকুলা তার নামের সঙ্গে কীভাবে জড়াল তা নিয়ে মতভেদ থাকলেও বেশিরভাগ ঐতিহাসিক বলেন, এটি এসেছে তার পিতার নাম হতে। তার পিতা ভ্লাদ ড্রাকুল অটোমান মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার গোপন সংঘ “অর্ডার অফ দ্য ড্রাগন”এর সদস্য ছিলেন। এ সংঘ হতেই তাকে ‘ড্রাকুল’ উপাধি দেয়া হয়। প্রাচীন ওয়ালেসিয়ান ভাষায় ড্রাকুলা শব্দের অর্থ ড্রাগনের সন্তান! আবার রোমানিয়ায় একই শব্দের অর্থ বদলে হয়ে যায়, শয়তানের সন্তান! পিতৃসূত্রে প্রাপ্ত এই ড্রাকুলা উপাধিই পরে ভয়ংকর  জীবন্মৃত এক শয়তানের প্রতীকে পরিণত হয়। আর টেপেস বা ইমপেলার (শূলবিদ্ধকারী) উপাধি তিনি লাভ করেছেন নিজ কৃতকর্মের গুণেই!

আরো পড়ুন: ব্রুকলিন ব্রিজ বিক্রি করেছিলেন ৩ হাজার বার, বাদ যায়নি স্ট্যাচু অব লিবার্টিও

জীবদ্দশায় ভ্লাদ একের পর এক যুদ্ধের সম্মুখীন হয়েছেন, শৈশব হতে নানা ঘাত প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে তাকে যেতে হয়েছে। ইউরোপের খ্রিস্টান রাজশক্তি আর অটোমান শাসকদের মাঝে তখন তীব্র সংঘাত। অটোমানরা তার বাবার রাজ্য দখল করে ফেললে তাকে এবং তার ছোটভাই রাদুকে বিশ্বস্ততার স্বরূপ হিসেবে কনস্টান্টিনোপল পাঠিয়ে দেয়া হয়। রাদু একসময় ইসলাম ধর্মও গ্রহণ করেন।

গর্ভবতী নারীদেরও রেহাই দিত না এই ড্রাকুলার ভ্লাদ মুসলিম না হয়েও কুরআন, হাদিস, দর্শন, বিজ্ঞান, অস্ত্রশিক্ষায় দীক্ষা নিতে থাকেন। ১৪৪৭ সালে তার বাবা ভ্লাদ ড্রাকুলকে হত্যা করা হয় এবং তার বড় ভাই মিরসাকে গরম লোহার রড দিয়ে অন্ধ করে জীবিত কবর দেয়া হয়। ক্রোধান্বিত ভ্লাদ তখন থেকেই মূলত নিজেকে ‘ভ্লাদ ড্রাকুলা’ বা ‘ড্রাগনের সন্তান’ বলে পরিচয় দিতে থাকে। এদিকে তার প্রথম স্ত্রী দুর্গের টাওয়ার থেকে আর্গেস নদীতে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করেন। বাবা, ভাই এবং স্ত্রী পরপর তিনজন কাছের মানুষের করুণ মৃত্যু তার মনোজগতে বিরাট পরিবর্তন নিয়ে আসে।

এই শাসকের অত্যাচারের ছিল খুবই নিষ্ঠুর। আচরণ নিয়ে জনশ্রুতিরও অভাব নেই। মৃত্যুদণ্ডের সাজাপ্রাপ্ত মানুষটির দুই পা ঘোড়ার সঙ্গে বেঁধে ছড়িয়ে রাখা হতো। এরপর লম্বা কাঠের শূল তার পায়ু পথ দিয়ে ঢুকিয়ে মুখ দিয়ে বের করে আনার চেষ্টা করা হতো। ইচ্ছে করে শূলটাকে রাখা হতো ভোঁতা করে, যেনো তা মানুষটার শরীরে প্রবেশ করতে অনেক সময় নেয় এবং সে তিলেতিলে যন্ত্রণা ভোগ করে মরে!এভাবে শাস্তি দেয়াটা রীতিমত বিকৃত রুচির পরিচায়ক। তার অন্যান্য শাস্তির মধ্যে ছিল অপরাধীর মাথা পাথর দিয়ে থেঁতলে ফেলা, মাথায় পেরেক ঢুকানো, শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ কেটে ফেলা প্রভৃতি।

মানুষের রক্ত খেয়েই ক্ষান্ত হতেন না এই ড্রাকুলার সেই সঙ্গে নির্মম অত্যাচারও করত সেযে কোনো অভিযুক্তের মলদ্বার বা যোনি দিয়ে প্রবেশ করিয়ে দেয়া হত শক্ত কাঠ বা ধাতুর একটি দণ্ড। কখনো তা হত কর্কশ, কখনো বা মসৃণ। যতক্ষণ না পর্যন্ত এই দণ্ডটি অভিযুক্তের মুখ, কাঁধ বা গলা দিয়ে বের হয়ে না আসত, ততক্ষণ চাপ দিয়ে প্রবেশ করিয়ে যাওয়া হত দণ্ডটি। কর্কশ দণ্ডের চাপে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত শরীরের ভিতরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ। অত্যাচারকে দীর্ঘায়িত করা হত এর মাধ্যমে, কারণ এতে সঙ্গে সঙ্গে শরীররের ভিতরের অঙ্গগুলি বিনষ্ট হত না। এই ক্ষেত্রে অভিযুক্ত মারা যাওয়ার জন্য বেশ কয়েক ঘণ্টা এমনকি কয়েক দিন অবধিও সময় লেগে যেত। 

আরো পড়ুন: মানসিক রোগ যেভাবে মানুষকে যৌন বিকৃতিমনা করে তোলে

গর্ভবতী কোনো নারীও নিস্তার পেত না তার নির্মমতা থেকে। তাদের শূলে চড়ানো হতো তলপেটের ওপর দিয়ে, যেনো পেটের বাচ্চাটার ওপর দিয়ে আঘাতটা আগে যায়। একবার তো নিজের শহর ট্রানসিলভানিয়ারই সব হতদরিদ্র এবং পঙ্গু মানুষকে তিনি আগুনে পুড়িয়ে মেরে ফেলেন। কারণ তিনি চাননি তার শহরে কোনো দরিদ্র লোক থাকুক। কারো কারো মতে, তার ছিল মৃতদেহে আসক্তি। প্রেমে প্রতারণাকারী এক নারীকে হত্যা করে দিনের পর দিন তিনি নাকি সেই নারীর মৃতদেহের সঙ্গেই বাস করে গেছেন! কোনো ধরনের বিশ্বাসঘাতক আর প্রতারণাকারীকেই আসলে তিনি সহ্য করতে পারতেন না। তাদের সরাসরি হত্যা না করে প্রথমে খুলে নিতেন গায়ের চামড়া কিংবা উত্তপ্ত গরম তেলের কড়াইয়ে ঢেলে ঝলসে ফেলার আদেশ দিতেন তাদের। অনায়াসে কেটে দিতেন তাদের হাতের শিরা।

এই অত্যাচারী শাসককে নিয়ে হলিউডে তৈরি  হয়েছে সিনেমা কোনো শহর আক্রমণের সময় ভ্লাদ খেলতেন আরেক মানসিক বিকারগ্রস্ত খেলা। শহরটিকে ঘিরে চারপাশে শূলে পচা, গলা অসংখ্য মৃতদেহ বিঁধিয়ে রেখে দেয়া হতো তার নির্দেশে। এ দৃশ্য দেখে আক্রমণের শিকার শহরের লোকজন প্রতিরোধের আগেই মানসিকভাবে দূর্বল হয়ে পড়ত। ১৪৬২ সালে তৎকালীন অটোমান সম্রাট দ্বিতীয় মেহমুদ ওয়ালেসিয়া জয়ের জন্য ভ্লাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করতে গেলে ভ্লাদের রাজধানীর কাছেই এক অঞ্চলে শূলে চড়ানো প্রায় ২০ হাজার গলিত মৃতদেহ দেখে রীতিমত অসুস্থতা বোধ করতে থাকেন।

আরো পড়ুন: ডিসেম্বর মাস এলেই এই সমাধিতে জ্বলে ওঠে আলো

পরে আক্রমণ না করেই তিনি ফিরে যান। আবার আরেকটি সূত্রে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, ১৪৫৯ সালে সুলতান মুহাম্মাদ আল ফাতাহ ভ্লাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য হামযা বেগের নেতৃত্বে প্রচুর সেনা পাঠায়। সুলতানকে যিযিয়া (কর) দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় এ আক্রমণর। ভ্লাদ হামযা বেগসহ ২০ হাজার সেনাকে হত্যা করে শূলে চড়িয়ে রাখেন। ভয়াবহ ঘটনার সাক্ষী সে স্থানটি ‘দ্য ফরেস্ট অফ ইমপেলড’ নামে পরিচিত।

ক্যাস্টেল দূর্গ সবার কাছে ছিল এক মৃত্যু পুরী চোর ডাকাত পর্যন্ত ভ্লাদ ড্রাকুলার বীভৎস শাস্তিকে এত ভয় পেত যে তার রাজ্যে কোন চুরি-ডাকাতি হত না। মানুষ আরো বলে, ভ্লাদের ছিল রক্তের প্রতি তীব্র আকর্ষণ। শূলবিদ্ধ মানুষের রক্তে তিনি গোসল করতেন, রক্তই পান করতেন। খাবারের সময় তিনি নাকি তার বন্দীদের সঙ্গে নিয়েই বসতেন। টেবিলেই হত্যা করে তাদের রক্তে রুটি ভিজিয়ে নিতেন। হয়তো এর কিছুটা অতিরঞ্জিত। কিন্তু তখন থেকেই সেই যে লোকে তাকে রক্তপিপাসু পিশাচ শাসক ভাবতে শুরু করে, সেটিই পরে লোকমুখে ভ্যাম্পায়ার বা ড্রাকুলা হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে। ভ্লাদের মৃত্যু নিয়েও কম রহস্য নেই।

১৪৭৬ সালের ডিসেম্বর মাসে ভ্লাদ নিহত হয়। অটোমানরা নাকি তার মাথা কেটে নিয়ে কনস্টান্টিনোপলের দরজায় কয়েক মাস শূলবিদ্ধ করে রাখে। শরীরের বাকি অংশ কোথায় সমাহিত করা হয় তা নিয়ে খুব স্পষ্ট উল্লেখ কোথাও নেই।

ভাগ্যগুণে প্রজাদের খুব বেশিদিন তার বর্বরতা সহ্য করতে হয়নি। মাত্র ছয় বছরের শাসনামল ছিল তার। মানুষ এ শাসকের মৃত্যুতে হাফ ছেড়ে বেঁচেছে সত্যিই, কিন্তু কিংবদন্তী ভ্লাদ দ্য ড্রাকুলা রেখে গেছে পৈশাচিকতার এক নির্মম ইতিহাস। তবে রোমানিয়াসহ বলকান অনেক অঞ্চলেই ভ্লাদ দ্য টেপেস কে বীরের মর্যাদা দেয়া হয়। স্বদেশকে অনধিকার প্রবেশকারীদের হাত থেকে রক্ষা করতে গিয়ে তিনি জীবন দিয়েছেন, সে ধারণা সেখানকার অনেকেরই।

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে