‘পুতুল নাচ’ দিয়েই গ্রামীণ ঐতিহ্য তুলে ধরেন এই জাদুকর

‘পুতুল নাচ’ দিয়েই গ্রামীণ ঐতিহ্য তুলে ধরেন এই জাদুকর

সৈম আকবর ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১২:২২ ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০   আপডেট: ১২:২২ ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০

ছবি: পুতুল নাচ

ছবি: পুতুল নাচ

কিশোরকালেই মাটির পুতুল দেখে মনের গহিনে স্বাদ জাগে ছন্দের তালে তালে যদি পুতুল নাচানো যেত। সেই স্বপ্ন নিয়ে প্রথম মাটির পুতুল, দেব-দেবীসহ বিভিন্ন আকৃতির পুতুল তৈরি শুরু করে ধীরে ধীরে স্টিক পুতুল, স্প্রিং পুতুল এবং সুতার দিয়ে পুতুল তৈরি করেন। 

তিনি একই এলাকার কয়েকজন সহযোগী বা শিষ্যকে নিয়ে চমক তৈরি করেছিলেন ‘পুতুল নাচ’ সৃষ্টির মাধ্যমে। তিনিই পুতুল নাচের জনক ওস্তাদ বিপিন মাঝি বা বিপিন দাস। তার জন্ম ১৮৭৯ সালে ৩১ ডিসেম্বর। 

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার ঐতিহ্যবাহী নবীনগর উপজেলার তিতাস ও পাগলী নদীর পাড় কৃষ্ণনগর গ্রামে। কালজয়ী অমর শিল্পী ভারতীয় উপমহাদেশের পুতুল নাচের জনক ওস্তাদ বিপিন দাসের পিতা বৃন্দাবন দাস। 

পুতুল নাচপিতামাতার একমাত্র সন্তান হয়েও গুরুগৃহে প্রাথমিক পর্যায়ের লেখাপড়া শিখে তার শৈশব- কৈশোরকাল কাটে। পার্শ্ববর্তী বিদ্যাকূট ইউনিয়নের মেরকূটা গ্রামের তুলসী বালাকে বিয়ে করেন। সংসার জীবনে ৪ ছেলে ৩ মেয়ের পিতা হন। 

তার ছেলেরা হলেন ওস্তাদ গোপাল দাস, ওস্তাদ গোবিন্দ দাস, অনিল দাস ও অর্জুন দাস। মেয়েরা হলেন দশদা বালা, সাধন বালা ও চারু বালা। ওস্তাদ বিপিন দাসের কনিষ্ঠ ছেলে অর্জুন দাস বাবার সঙ্গে রাতে বিভিন্ন জায়গায় পুতুল নাচ প্রদর্শনে অংশ করে দিনের বেলা পড়াশুনা করতেন। 

কৃষ্ণনগর আবদুল জব্বার উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এস এস সি পরীক্ষায় প্রথম হন। যা এখন পর্যন্ত স্কুলের রেকর্ড বলে জানা যায়। বর্তমানে তিনি শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত। 

পুতুল নাচতৎকালীন সময়ে সীতারামপুর-মনতলা ঘাট থেকে মাল বোঝাই জাহাজ ও নৌকা নারায়ণগঞ্জ হয়ে কলকাতা আসা যাওয়া করতো। এই সব জাহাজের দায়িত্বে থাকা পিতামহ গগন দাস ও পিতা বৃন্দাবন দাসের সঙ্গে ওস্তাদ বিপিন দাসও কিছুদিন কাজ করেছিলেন বলে তাকে অনেকে বিপিন মাঝি নামে ডাকতেন।

এলাকার কয়েকজন শিষ্যকে নিয়ে তৈরি করা পুতুল নাচের জনপ্রিয়তা দেখে তার পরিবারসহ মতি মিয়া, রমনাথ বাবু, তারুমিয়া, সিদ্দিক মিয়াকে সঙ্গে নিয়ে ক্রমাম্বয়ে তৈরি কাজ করেন পুতুল নাচের প্রচার ও প্রসারতার। তার এসব শিষ্যরাও দীর্ঘদিন ওস্তাদের সঙ্গে থেকে পরবর্তীতে নিজেদের এলাকায় দল তৈরি করে এই শিল্পের ব্যাপক প্রসার ও পরিচিতি তুলে ধরেন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের মেড্ডা এলাকার ধন মিয়া, কালু মিয়া, রাজ হোসেনসহ কাজিপাড়ার শরীফ মালদার এবং কান্দিপাড়ার কয়েকজন এ কাজে মনোনিবেশ করে পুতুল নাচের আকর্ষণে প্রভাবিত হয়ে নিজেরা পুতুল নাচের দল তৈরি করেন। 

গানের তালে তালে চলছে পুতুল নাচতারা এতদাঞ্চলসহ বৃহত্তর ময়মনসিংহ, নরসিংদী, বিক্রমপুর, সিলেট, নোয়াখালী, চট্টগ্রামসহ সারা দেশব্যাপী এই পুতুল নাচের দলের আনাগোনায় মুখরিত করে তোলেন।

ওস্তাদ বিপিন দাস তার দুই ছেলে গোপাল দাস ও গোবিন্দ দাসকে সঙ্গে রেখে এই পেশা শিক্ষা দেন। পরবর্তী সময়ে তারাও ওস্তাদ হয়ে বিপিন দাসের স্বপ্নের পুতুল নাচকে সর্ব ভারতে ছড়িয়ে দেন।

ওস্তাদ গোপাল দাস পিতার নির্দেশে ভারতে গিয়ে বিভিন্ন এলাকায় অসংখ্য শিষ্য তৈরি করে পুতুল নাচের দল গঠন করেন। ফলে পুরো ভারতবর্ষে এর ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও বিপিন দাসের পরিচিতি বৃদ্ধি পেতে থাকে। ভারতসহ তিনি পুতুল নাচের দল নিয়ে ২৭ টি দেশ ভ্রমণ করেন। বিপিন দাসের পুতুল নাচ দেখিয়ে লাখো মানুষের প্রশংসা অর্জন করেন।

ওস্তাদ বিপিন দাসস্বীকৃতি হিসেবে বিপিন দাসের পক্ষে মরোণত্তর বিভিন্ন পদক ও পুরষ্কার ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জীসহ (১৯৯৬-২০১১) অনেক প্রতিষ্ঠান ও স্বনামধন্য ব্যক্তি হতে গ্রহণ করেন। এদের মধ্যে অন্যতম হলো প্রেসিডেন্ট পদক,পদ্মভূষণ পদক, বিশ্বভারতী পুরষ্কার ও একাডেমি পদক।

রাজশাহী বেতারকেন্দ্র, খুলনা বেতারকেন্দ্র এবং ঢাকা বেতারকেন্দ্র থেকে একাধিকবার ওস্তাদ বিপিন দাস ও ওস্তাদ গোবিন্দ দাসের পুতুল নাচের কথা সরাসরি শ্রোতাদের সামনে তুলে ধরেন প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী জনাব মোস্তফা মনোয়ার। তিনি ওস্তাদ গোবিন্দ দাসের একজন ভক্ত হয়ে এ শিল্প বিষয়ে সম্যক ধারণা অর্জন করেন।

ওস্তাদ বিপিন দাস বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র পরিবেশনে বেশ পটু ছিলেন। তিনি তবল বোলে বদ্ধকালা বোল সৃষ্টি করেছিলেন। তৎকালীন কৃষ্ণনগরের বিখ্যাত জমিদার গোবিন্দ রায়ের বাড়িতে প্রায়ই গানের জলসা হত। 

গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যওইসব জলসাতে তিনি উপস্থিত থেকে সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খান ও ওস্তাদ আপ্তাবউদ্দিন খানের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ লাভ করেন। পরবর্তীতে তাদের প্রশংসা ও আর্শীবাদ অর্জন করেন তিনি।

শোনা যায়, কলকাতার যাত্রা আসরে তিনি বাগদান, ভাগ্য বিধি ও মা যদি মন্দ হয়, যাত্রী মঞ্চে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খান সাহেবের সঙ্গে সহবাদ্যকর্মী হিসাবে কাজ করেছিলেন।

ওস্তাদ বিপিন দাস যাত্রা ও মঞ্চাসনে চরিত্র বর্ণন দৃশ্য অংকনের কাঠামো তৈরিতে বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। ভারতের বিখ্যাত নৃত্যশিল্পী মীরা বাঈজী তার অন্যতম শিষ্যা ছিলেন।

১৯৪৮ সালে  শেখ মুজিবুর রহমান তরুণ ছাত্র সাথি রফিকুল ইসলাম (খায়ের মিয়া) এর সঙ্গে কৃষ্ণনগর আসেন এবার তিনি ওস্তাদ বিপিন দাসের বাড়িতে আসেন এবং পুতুল নাচ প্রসঙ্গে কথা বলেন। তখন তরুণ শেখ মুজিবুর রহমানকে ওস্তাদ বিপিন দাস তার হাতের তৈরি একটি মাটির নৌকা উপহার দেন।

পুতুল নাচআমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম কুমিল্লার মুরাদনগর থানার দৌলতপুর থাকাকালীন সময় একবার কৃষ্ণনগরে ওস্তাদ বিপিন দাসের বাড়িতে অতিথি হয়ে আসেন। কবি স্বকন্ঠে বিপিন দাসকে গান গেয়ে শুনিয়েছিলেন।

বাংলা সাহিত্যের অন্যতম কথাসাহিত্যিক পুতুল নাচের ইতিকথা’র রচয়িতা মানিক বন্দোপাধ্যায় ৬ মাস ওস্তাদ বিপিন দাসের কাছ থেকে এই শিল্প বিষয়ে গভীর জ্ঞান লাভ করেন এবং বিপিন দাসের কর্মে মুগ্ধ হন।

ব্রিটিশ শাসনামলে তিনি বেশ কয়েকটি মূক ছবি তৈরি করেছিলেন। এদের মধ্যে ওক্স ডল, সাইলেন্স টাওয়ার, বো্রকেন আইডলেটর স্টাইল উল্লেখযোগ্য। এছাড়া স্ববাক ছবি সোনা গাঙের নোনা মাঝি এবং ১৯৬২ সালে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে যৌথভাবে নির্মিত তার জীবনের সর্বশেষ ছবি- শুইয়ে নদীয়া জাগে পানি।

গ্রাম বাংলার লোকজ সংষ্কৃতির অগ্রপথিক ছিলেন বিপিন দাস। পর্দার অন্তরালে থেকে তিনি সমাজ ও মানুষের সুপ্ত ভাবনাকে প্রভাবিত করতে চেয়েছিলেন। 

আদি ঐতিহ্য আর প্রশান্তির ছোঁয়া পুতুলের গায়ে মেখে, নজরকাড়া পোশাক জড়িয়ে রং-বেরং এক বা একাধিক পুতুল দিয়ে কখনো সংলাপ কখনো সংগীত আর নৃত্যের সঙ্গে বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে মানুষের মনোরঞ্জনে ব্যস্ত গ্রামীণ জনপদের জীবন-যাপন সহজে তুলে ধরেছেন।

পুতুল নাচের ইতিকথাসুপ্রাচীনকাল থেকেই ঘরোয়াভাবে মা ও মেয়েরা হাতে সুই সুতা আর রঙিন কাপড় দিয়ে হরেক রকমের পুতুল তৈরি করতেন। তাছাড়া কাঠ-মাটি দিয়ে তৈরি হয়েছে নানান ধরনের পুতুল। তালপাতা, নারকেলের ছোবা পাটশলা, পিতল দিয়েও পুতুল তৈরি করেছেন।

কালের স্রোতে বিপিন দাসের পুতুল আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। আধুনিক টেলিভিশন, মোবাইল,ইন্টানেটের সার্বজনীন ব্যবহারের ফলে চরম ভাটা পড়েছে এ পেশায় জড়িত শিল্পী ও কলাকুশলীদের উপর। আর্থিক দৈন্যতা আর সামাজিক অবস্হায় অনেকেই অন্য পেশায় জড়িয়ে গেছেন।

১৯৭৮ সালে ১৪ ফেব্রুয়ারী কৃষ্ণনগরে নিজ বাড়িতেই এই মহান শিল্পী মারা যান। তবুও বহু কায় ক্লেশের মাঝে বিপিন দাসের দৌহিত্র বাদল দাস পুতুল নাচকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন।

বর্তমানে পুতুল নাচের করুণ দশা উল্লেখ করে বিপিন দাসের দৌহিত্র বাদল দাস বলেন, বর্তমানে আমাদের কোনো বায়না নেই। কোনো শো নেই। তাই চরম আর্থিক অসুবিধার মাঝে দিন কাটাচ্ছি। 

সরকার যদি আমাদের কিছু আর্থিক সাহায্য সহযোগিতা করেন তাহলে পূর্ব পুরুষের পুতুল নাচ নিয়ে এগিয়ে যেতে পারতাম। বাদল দাস আরো বলেন, আমি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ভাষণ এবং মুসলিম ইতিহাসের অন্যতম হৃদয়বিধারক ঘটনা কারবালা নিয়েও কাজ করতে চাই।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস