মুনিয়াকে হত্যা করা হয়েছে, দাবি ভগ্নিপতির

মুনিয়াকে হত্যা করা হয়েছে, দাবি ভগ্নিপতির

নিজস্ব প্রতিবেদক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৬:৫২ ২৭ এপ্রিল ২০২১   আপডেট: ১৭:০৭ ২৭ এপ্রিল ২০২১

মোসারাত জাহান মুনিয়া - ফাইল ছবি

মোসারাত জাহান মুনিয়া - ফাইল ছবি

রাজধানীর গুলশানে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট থেকে মরদেহ উদ্ধার হওয়া তরুণী মোসারাত জাহান মুনিয়া আত্মহত্যা করেনি, তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন তার ভগ্নিপতি মিজানুর রহমান।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের মর্গের সামনে উপস্থিত সাংবাদিকদের মঙ্গলবার দুপুরে তিনি একথা বলেন। এসময় মুনিয়ার বোন নুসরাত জাহান উপস্থিত ছিলেন।

মিজানুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমার শ্যালিকা (মুনিয়া) আত্মহত্যা করেনি। তাকে হত্যা করা হয়েছে। দুদিন আগেও তার সঙ্গে কথা বলেছি। আত্মহত্যা করবে এমন কোনো মোটিভেশন ছিল না। আমাদের মনে হচ্ছে, তাকে হত্যা করা হয়েছে। এখন আমরা ফরেনসিক রিপোর্টের অপেক্ষা করবো।

গতকাল সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে রাজধানীর গুলশান-২-এর ১২০ নম্বর রোডের ১৯ নম্বর বাড়ির ৩/বি ফ্ল্যাট থেকে এইচএসসি পড়ুয়া মোসারাত জাহান মুনিয়ার মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। মুনিয়ার বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা মৃত শফিকুর রহমান। তার বাড়ি কুমিল্লা শহরের উজির দিঘিরপাড় এলাকায়।

পুলিশ জানিয়েছে, এক লাখ টাকা ভাড়ায় দুই মাস আগে ফ্ল্যাটটি ভাড়া নিয়েছিলেন মুনিয়া। তবে ফ্ল্যাটে ওই তরুণী একাই থাকতেন।

এ ঘটনায় সোমবার মধ্যরাতে গুলশান থানায় মুনিয়ার বোন নুসরাত জাহান বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেন। মামলায় বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সায়েম সোবহান আনভীরকে আসামি করে তার বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগ আনা হয়েছে। ওই তরুণীর মৃতদেহ ময়নাতদন্তের পর গ্রামের বাড়ি কুমিল্লায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

মামলার এজাহারে বলা হয়, মোসারাত জাহান (২১) মিরপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী। দুই বছর আগে মামলার আসামি সায়েম সোবহান আনভীরের (৪২) সঙ্গে মোসারাতের পরিচয় হয়। পরিচয়ের পর থেকে তারা বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় দেখা করতেন এবং সব সময় মোবাইলে কথা বলতেন। এক পর্যায়ে দুজনের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। 

২০১৯ সালে মোসারাতকে স্ত্রী পরিচয় দিয়ে আসামি রাজধানীর বনানীতে একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নেন। সেখানে তারা বসবাস করতে শুরু করেন। ২০২০ সালে আসামির পরিবার এক নারীর মাধ্যমে এই প্রেমের সম্পর্কের বিষয়টি জানতে পারে। এরপর আসামির মা মোসারাতকে ডেকে ভয়ভীতি দেখান এবং তাকে ঢাকা থেকে চলে যেতে বলেন। আসামি কৌশলে তার (বাদী নুসরাতের) বোনকে কুমিল্লায় পাঠিয়ে দেন এবং পরে বিয়ে করবেন বলে আশ্বাস দেন। 

সর্বশেষ গত ১ মার্চ মোসারাতকে প্ররোচিত করেন আসামি। তিনি বাসা ভাড়া নিতে বাদী নুসরাত ও তার স্বামীর পরিচয়পত্র নেন। ফুসলিয়ে তিনি মোসারাতকে ঢাকায় আনেন। তিনি গুলশানের ১২০ নম্বর সড়কে বাসা (ফ্ল্যাট-বি-৩) ভাড়া নেন। ফ্ল্যাটের একটি কক্ষে আসামি ও তার (বাদীর) বোনের স্বামী-স্ত্রীর মতো ছবি তুলে তা বাঁধিয়ে রাখা হয়। আসামি বাসায় এলে কক্ষটি পরিপাটি করে রাখা হতো। বোনের মাধ্যমে মামলার বাদী জানতে পারেন, আসামি তাকে বিয়ে করে বিদেশে স্থায়ী হবেন। কারণ, দেশে থাকলে আসামির মা–বাবা আসামিকে কিছু না করলেও তার বোনকে মেরে ফেলবেন। গত ১ মার্চ থেকে আসামি মাঝেমধ্যে ফ্ল্যাটে আসা-যাওয়া করতেন।

বাদী এজাহারে আরো বলেন, ২৩ এপ্রিল মোসারাত তাকে ফোন করেন। মোসারাত তাকে বলেছেন, আনভীর তাকে বকা দিয়ে বলেছেন, কেন তিনি (মোসারাত) ফ্ল্যাটের মালিকের বাসায় গিয়ে ইফতার করেছেন, ছবি তুলেছেন। ফ্ল্যাটের মালিকের স্ত্রী ফেসবুকে ছবি পোস্ট করেছেন। এ ছবি ‌পিয়াসা দেখেছেন। পিয়াসা মালিকের স্ত্রীর ফেসবুক বন্ধু। এখন পিয়াসা তার মাকে সবকিছু জানিয়ে দেবেন। তিনি (আসামি) দুবাই যাচ্ছেন, মোসারাত যেন কুমিল্লায় চলে যান। আসামির মা জানতে পারলে তাকে (মোসারাত) মেরে ফেলবেন। 

দুদিন পর ২৫ এপ্রিল মোসারাত তাকে ফোন করেন। ওই সময় তিনি কান্নাকাটি করে বলেন, আনভীর তাকে বিয়ে করবেন না, শুধু ভোগ করেছেন। আসামিকে উদ্ধৃত করে মোসারাত বলেন, আসামি তাকে বলেছেন, তিনি (মোসারাত) তার শত্রুর সঙ্গে দেখা করেছেন। মোসারাতকে তিনি ছাড়বেন না।

মোসারাত চিৎকার করে বলেন, আসামি তাকে ধোঁকা দিয়েছেন। যেকোনো সময় তার বড় দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। তারা (বাদী নুসরাতের পরিবার) যেন দ্রুত ঢাকায় আসেন। নুসরাত তার আত্মীয়স্বজন নিয়ে বেলা দুইটার দিকে কুমিল্লা থেকে ঢাকায় রওনা দেন। আসার পথে বারবার মোসারাতের ফোনে ফোন করেন কিন্তু তিনি আর ফোন ধরেননি। গুলশানের বাসায় পৌঁছে দরজায় নক করলে ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে নিচে নেমে আসেন। তারা নিরাপত্তারক্ষীর কক্ষ থেকে বাসার ইন্টারকমে ফোন করেন। পরে ফ্ল্যাটের মালিকের নম্বরে ফোন দিলে মিস্ত্রি এনে তালা ভেঙে ঘরে ঢোকার পরামর্শ দেন। মিস্ত্রি ডেকে তালা ভেঙে ভেতরে ঢোকার পর তিনি দেখেন, তার বোন ওড়না পেঁচিয়ে শোয়ার ঘরের সিলিংয়ে ঝুলে আছেন।

এজাহারে আরো উল্লেখ করা হয়, পুলিশ এসে ওড়না কেটে মোসারাতের মৃতদেহ নামায়। আলামত হিসেবে আসামির সঙ্গে ছবি, আসামির সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক নিয়ে লেখা ডায়েরি ও তার ব্যবহৃত দুটি মুঠোফোন নিয়ে যায় পুলিশ।

ডেইলি বাংলাদেশ/টিআরএইচ