থমকে গেছে ডিএসসিসি’র অবৈধ দোকান উচ্ছেদ, ফের সক্রিয় সুবিধাবাদীরা

থমকে গেছে ডিএসসিসি’র অবৈধ দোকান উচ্ছেদ, ফের সক্রিয় সুবিধাবাদীরা

জাফর আহমেদ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ২০:৫৩ ৩ মার্চ ২০২১   আপডেট: ২০:৫৬ ৩ মার্চ ২০২১

ডিএসসিসির অবৈধ দখল ও নকশাবহির্ভূত দোকান উচ্ছেদ অভিযান- ফাইল ছবি

ডিএসসিসির অবৈধ দখল ও নকশাবহির্ভূত দোকান উচ্ছেদ অভিযান- ফাইল ছবি

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস দায়িত্ব গ্রহণের প্রথমদিন থেকেই অনিয়ম বন্ধে কঠোর অবস্থানে। সেই ধারাবাহিকতায় চালু হয় অবৈধ দখল, আর নকশাবহির্ভূত অবৈধ দোকান উচ্ছেদ অভিযান। কিন্তু হঠাৎ করেই ডিএসসিসি’র মার্কেটের নকশাবহির্ভূত অবৈধ দোকান উচ্ছেদ অভিযান থমকে আছে। ফলে আবারো সক্রিয় হয়ে উঠেছে সুবিধাবাদী চক্র।

এর আগে দক্ষিণ নগরপ্লাজা, সিটি প্লাজা ও জাকের মার্কেটের সভাপতি দেলোয়ার হোসেন দেলু ব্যবসায়ীদের বিক্ষোভের মুখে মার্কেট ছাড়তে বাধ্য হন। তবে এখনো রয়ে গেছে তার সিন্ডিকেটের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। পাশাপাশি আগের চেয়ে আরো সক্রিয় হয়ে উঠেছেন কামরুল আহসান, হেলেনা আক্তার, ওয়ালিদ, আতিকুর রাহমান স্বপনসহ সুবিধাবাদী চক্র। এছাড়া গুলিস্তান পোড়া মার্কেটের সভাপতি আতিকুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক মনুরাও এখন সক্রিয়। এসব অসাধু চক্র সক্রিয় হওয়ায় আতঙ্কে আছেন ব্যবসায়ীরা।

গত ৯ ফেব্রুয়ারি ফুলবাড়িয়া মার্কেটের সামনে ফুলবাড়িয়া সুপার মার্কেট-২ এর সভাপতি দেলোয়ার হোসেন দেলুর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা। তাদের অভিযোগ, দেলুর সন্ত্রাসী বাহিনী দলবল নিয়ে মার্কেটে প্রবেশ করে উচ্ছেদ হওয়া স্থানগুলো ফের দখলে নেয়ার চেষ্টা করে। এ সময় মার্কেট সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফিরোজের নেতৃত্বে ব্যবসায়ীরা বাধা দেন। এর আগে দেলুর লোকজন এসে ব্যবসায়ীদের কাছে প্রস্তাব করেন সিটি কর্পোরেশন কর্তৃক ভেঙে দেয়া দোকানগুলো তারা আবার নির্মাণ করে ব্যবসায়ীদের কাছে ভাড়া দেবেন। সিটি কর্পোরেশন থেকে অনুমোদন নিয়ে আসবেন বলেও ব্যবসায়ীদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন।

এমন প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন মার্কেটের অন্যান্য বৈধ ও উচ্ছেদ ব্যবসায়ীরা। এরপর বৈধ ব্যবসায়ীরা তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেন।

জানা গেছে, মার্কেটগুলোতে দেলু হাত ধরেই অনিয়ম আর দখল শুরু হয়। সিটি কর্পোরেশনে নকশার বাইরে গিয়ে অবৈধভাবে বাথরুম, বাথরুমের সামনের খোলা জায়গা, লিফটের জায়গা, ফ্লোর স্পেস, বারান্দা, বেজমেন্ট, ক্রেতাদের হাঁটাচলার জন্য রাখা খোলা জায়গা দখল করে প্রায় এক হাজার দোকান গড়ে তোলা হয়েছে। তিনটি মার্কেটে অবৈধভাবে দোকান গড়ে প্রায় ১০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে।

শুধু তাই নয়, দেশে অনলাইন ক্যাসিনোও তার হাত ধরেই চালু হয় বলে গুঞ্জন রয়েছে। এজন্য ক্যাসিনো অভিযানের সময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকতে বিদেশে পালিয়ে যান দেলোয়ার। তার সিন্ডিকেটে জড়িত রয়েছেন- জাকের প্লাজার কথিত সাধারণ সম্পাদক, সিটি প্লাজার সাধারণ সম্পাদক, নগর প্লাজার সাধারণ সম্পাদক, স্থানীয় যুবলীগ নেতা ও মার্কেট সমিতির কেরানি মো.আবুল কাশেম । জানা গেছে, তারা সবাই শতশত কোটি টাকার মালিক। কেউ আবার বিদেশে সেকেন্ড হোম গড়ে তুলেছেন।

অপরদিকে সুবিধাবাদী কামরুল চক্রের বিরুদ্ধে ২০১৬ সালে ৩৯টা দোকান বরাদ্দ নিয়ে প্রায় ৭ কোটি টাকা আত্মাসাতের অভিযোগ রয়েছে। তিনি ১৬০ স্কয়ার ফিট দোকান থেকে ২৮ লাখ টাকার এবং ৯০ স্কয়ার ফিট দোকান  থেকে ১৮ লাখ করে টাকা নিয়েছেন বলে জানা গেছে।

এই কামরুল আহসান নিজেকে নগর প্লাজার সভাপতি দাবি করলেও বাস্তবে তার কোনো সদস্য পদ নেই বলে জানান নগরপ্লাজার ব্যবসায়ীক মালিক সমিতির কমিটির সদস্যরা। তারা জানান, তিনি যে দোকানের জন্য সদস্যপদ দাবি করেন, তা মো. মোস্তফা নামে বরাদ্দ ছিলো। কিন্তু তাকে না দিয়ে সদস্য তালিকা থেকে মোস্তফা নাম পরিবর্তন করে মোস্তফা অরূপে কামরুল আহসান নামে লিখে মার্কেটে সদস্য পদ নেন।

এদিকে নগর প্লাজার মার্কেটের ৪২০ জন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসন করার জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছেন ডিএসসিসি’র বর্তমান মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস। কিন্তু নগরপ্লাজার প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের আড়াল করে কামরুল আহসান দোকানদারদের পুনর্বাসন করার নাম করে দোকান পাওয়ার পায়তারা শুরু করেছেন। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীর নাম না দিয়ে তার ব্যক্তিগত আত্মীয়স্বজনের নাম দিয়ে দোকানের বরাদ্দ নেয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা।

এসব ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের পক্ষে তিন মার্কেটের সভাপতি দেলোয়ার হোসেন দেলু গত বছরের ২৯ ডিসেম্বর সাবেক মেয়রসহ সাতজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। মামলার অভিযোগ থেকে জানা যায়, সাবেক মেয়র সাঈদ খোকন, সিটি কর্পোরেশন কর্মকর্তা ইউসুফ আলী সরদার ও মাজেদ পরস্পর যোগসাজশে ফুলবাড়িয়া সিটি সুপার মার্কেট-২ এর মূল ভবনের নকশাবহির্ভূত অংশে স্থাপনা তৈরি করেন এবং দোকান বরাদ্দের ঘোষণা দেন। ঘোষণা শুনে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা দোকান বরাদ্দ নেয়ার জন্য সাঈদ খোকনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এরপর ব্যবসায়ীরা কামরুল হাসান, হেলেনা আক্তার, আতিকুর রহমান স্বপন ও ওয়ালিদের কাছে যান। তখন তারা বলেন, আপনার টাকা জমাদানের ব্যবস্থা করুন। আমরা আপনাদের দোকান বরাদ্দ দিয়ে দেব।

এই কামরুল আহসান গত বছরের শেষের দিকে সিটি কর্পোরেশনের মার্কেটগুলোতে নকশাবর্হিভূত দোকান উচ্ছেদ অভিযান শুরু হলে গা ঢাকা দেন। নারী ও শিশু নির্যাতন মামলা এবং মার্কেট ফেডারেশন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফিরোজ আহমেদের দায়ের করা চাঁদাবাজি মামলাসহ হাফ ডজন মামলা আছে তার নামে। বিভিন্নভাবে ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে কোটি কোটি হাতিয়ে নিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

এ বিষয়ে সিটি কর্পোরেশন মার্কেট ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ফিরোজ আহমেদ বলেন, আমি তো মার্কেটের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক কিন্তু আজও পর্যন্ত আমার দায়িত্ব বুঝিয়ে দেয়া হয়নি। এমনকি কোনো কাজে আমার সিল স্বাক্ষরও প্রয়োজন হয় না, মার্কেটের সভাপতি নিজেই সবকিছু করেছেন। মার্কেট সভাপতি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের তোপের মুখে পড়ে মার্কেটে আসেন না আর মার্কেটের কাগজপত্র কি করছেন তাও জানি না।

কামরুল আহসানের কাছে এসব বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি মার্কেটের বৈধ সভাপতি। তবে তিনি মার্কেটের অভিযোগের বিষয়টি কিছুই জানান দাবি করে ফোন কেটে দেন।

শহর ফুলবাড়িয়া বহুমুখী সমবায় সমিতির সভাপতি হেলেনা আক্তার বলেন, মার্কেটের নকশাবহির্ভূত দোকান বিক্রি করার অভিযোগ মিথ্যা। আমি মার্কেটে বৈধ সভাপতি কিন্তু দেলোয়ার হোসেন দেলু আমার অফিস দখল করে নিয়েছে। তারপর থেকে আমি মার্কেটে যাই না। আমি সবসময় মার্কেটের ব্যবসায়ীদের পাশে ছিলাম। আমার বিরুদ্ধে দোকান বিক্রির অভিযোগ যড়যন্ত্রমূলক।

এ বিষয় কথা বলার জন্য নগরপ্লাজা, সিটি প্লাজা, জাকের মার্কেটের সভাপতি দেলোয়ার হোসেন দেলুকে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি ধরেননি।

ডিএসসিসির সম্পত্তি কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. মনিরুজ্জামান বলেন, সিটি কর্পোরেশন যখন আমাদের অর্ডার দিয়েছে, তখন আমরা অভিযান চালিয়েছি। এখন তো অভিযান চালানোর অর্ডার নেই, তাই বন্ধ আছে।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএইচ