একজন ফুটবল খেলোয়ারের গল্প 

একজন ফুটবল খেলোয়ারের গল্প 

মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ২১:৪৯ ২০ সেপ্টেম্বর ২০২২  

ছবিঃ অন্তর্জাল

ছবিঃ অন্তর্জাল

এখনো ফুটবলই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ খেলা। ফুটবল মানে একটাই মাঠ। ২২ জন খেলোয়াড়। একটাই বল। সবার জন্যে। আর কোন অনুষঙ্গ নেই। পার্থক্য করে দেয় মাত্র দুটো জিনিস। পরিশ্রম ও প্রতিভা। নোবেল পুরস্কার পাওয়া লেখক অ্যালবেয়ার কামু ব্যক্তিজীবনে ছিলেন একজন পেশাদার ফুটবল খেলোয়াড়। খেলতেন গোলকিপার পজিশনে। তার মতে একই সাথে সংহতি ও নিঃসঙ্গতাকে বিম্বিত করে এই পজিশন। এক-নম্বর জার্সি পরে গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে কামু শিখেছিলেন- 

“যখন তুমি আশা করছ এবারে বল আসছে, সেসময় কখনোই তা আসে না!”

আমার ধারণা প্রতিটা মানুষের শৈশবে বুদ্ধিলগ্ন বলে একটা সময় আছে। এই সময় থেকে মানুষ তার বুদ্ধি দিয়ে নিজের চারপাশটাকে চিনতে শেখে। প্রিয়জনদেরকে। পরিচিতজনদেরকে। এমনকি তার চারপাশের পরিবেশ প্রতিবেশকে। এই সময়টা থেকেই হয়তবা তার কার্যকরী স্মৃতির শুরু।

বুদ্ধিলগ্ন থেকেই ধীরে ধীরে আমি বুঝতে পারলাম, আমার পিতা একজন প্রবল ব্যক্তিত্ববান মানুষ। আমাদের গ্রামের পার্শ্ববর্তী ঝাড়কাটা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। সে সময়কার প্রথা অনুসারে ছাত্ররা শ্রদ্ধায় তাকে এড়িয়ে চলে। দূরের রাস্তা দিয়ে গমনাগমন করে। আমি বুঝতে পারলাম আমার মেঝো চাচা চান মাস্টার একজন বিখ্যাত ফুটবল রেফারি। তার দৃষ্টিকে কোনোদিনই ফাঁকি দিতে পারেনি খেলোয়াড়রা। অফ সাইডে যাওয়া কোন স্ট্রাইকার, রাইট ফরওয়ার্ড অথবা লেফট ফরওয়ার্ড! আমি আরো বুঝতে পারলাম আলিমুদ্দিন ভাই সেরা একজন গোলকিপার!

মাঠের বাইরে আলিমুদ্দিন ভাইকে আমাদের বাড়িতেই বেশি দেখেছি আমি। আমাদের বাড়ির কাচারিঘরে তখন খেলোয়াড়দের নৈমিত্তিক মিলন মেলা। ১১ জনের একটা ফুটবল দল এই ঘরে বসবাস করে। খাওয়া-দাওয়া এবং আনন্দ-ফুর্তি করে। চান মাস্টার ঝাড়কাটা হাইস্কুলের ফিজিক্যাল টিচার। তিনিই এদের পৃষ্ঠপোষক। প্রবল নেতৃত্ব গুন দিয়ে তিনি গড়ে তুলছেন স্কুল ফুটবল দল। 

আলিমুদ্দিন ভাই চান চাচার বন্ধু। শ্মশ্রুমণ্ডিত। লিকলিকে চেহারা। পড়াশুনা কোন ক্লাস পর্যন্ত, আমরা জানি না। আমাদের জানার সময়ও ছিল না তা। ফুটবল তখন প্রবল জনপ্রিয় খেলা। আমরা যারা শিশু তাদের নিকটেও। আলিমুদ্দিন ভাই ঝাড়কাঁটা স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র সমিতির দুর্ভেদ্য গোলকিপার। বিপরীত পক্ষ যত শক্তিশালীই হোক না কেন, আলিমুদ্দিন ভাইকে অতিক্রম করে গোলবারের ভেতরে বল ঢোকানোর সামর্থ্য তাদের নেই। এমনকি টাইব্রেকারেও না! শীর্ণ দেহের আলিমুদ্দিন ভাই তার প্রবল ক্ষিপ্রতা নিয়ে গোল পোস্টের সামনে চলাফেরা করেন।  চিতা বাঘের মতো। বিপক্ষের খেলোয়াড়রা বুঝতেই পারে না কতটা দ্রুততা এবং গতির সাথে বল ছুঁড়লে আলিমুদ্দিন ভাইকে পরাজিত করা সম্ভব। আলিমুদ্দিন ভাই প্রতিনিয়তই টাই ব্রেকারে ৫ টার মধ্যে ৩/৪ টা বলই ফিরিয়ে দেন। বিদ্যুতের চেয়েও অধিক গতিতে! এই সময়ে এলাকার হাজার হাজার দর্শকের হৃদয় স্বর্গীয় আনন্দে দুলতে থাকে। পৃথিবীর কোন দুঃখ বেদনাই তখন তাদের স্পর্শ করতে পারে না।

আলিমুদ্দিন ভাই আমাদের বাড়িতেই থাকেন। খাওয়া দাওয়া করেন। বিকেলে স্কুলের ছেলেদের সঙ্গে মাঠে নিজে প্র্যাকটিস করেন। নবীন খেলোয়াড়দের অনুশীলন করান। মাঝেমধ্যে নিজের বাড়িতে যান! তার বাড়ি স্কুলের পশ্চিম পাশে। নিশ্চিন্তপুর গ্রামে। এখানে তার পরিবার আছে। আমার বয়সী একটা ছেলেও আছে। আর আছে একটা সাইকেল মেরামতের দোকান। তার বাড়ির উঠোনে। আমরা মাঝে মধ্যেই সাইকেলের লিক মেরামত করতে তার বাড়িতে যাই। তিনি গভীর মনোযোগ দিয়ে আমাদের সাইকেলের লিক সারিয়ে দেন। বিনিময়ে চার আনার একটা সিকি তাকে দিতে হয়। আমি যাই টিউবের লিক সারানোর সলিউশনের গন্ধ শুঁকতে! চারপাশের পরিবেশ-প্রতিবেশের মধ্যে এটাই একমাত্র আধুনিক গন্ধ! এই কাজ দিয়ে তার সংসার চলতো কিনা তা আমার জানা নেই। তবে এর ভেতরে যে আনন্দ ছিল তা আমি বুঝতে পারি।

নবীন খেলোয়াড় হিসেবে আলিমুদ্দিন ভাইয়ের সঙ্গে বিকেলে ফুটবল খেলি। খেলতে খেলতেই আমিও ভালো খেলোয়াড় হয়ে যাই। ক্লাস সেভেনে আমি পড়তে আসি মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজে। আমরা ক্লাস এইটে পড়ার সময়ে কলেজ ফুটবল টিমের জন্য ঢাকার আজাদ স্পোর্টিং ক্লাব হতে কোচ আনা হলো। তাসনিম ভাই আমাদের নজরুল হাউজের হাউজ ক্যাপ্টেন। আমাকে তিনি ব্যাক পজিশনের খেলোয়াড় হিসেবে নির্বাচন করলেন। অনুশীলনের ফাঁকে তাসনিম ভাই একদিন আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, “আসাদ, তোমার বলের গতি দেখে আমি অবাক! কার কাছ থেকে শিখেছ?” আমার সাথে সাথেই মনে পড়ে গেলো আলিমুদ্দিন ভাইয়ের কথা। বাড়িতে থাকার সময়ে প্রতিদিন নিজে গোলকিপার হিসেবে থেকে আমাকে শ্যুট প্র্যাকটিস করাতেন!

আমি তখন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন। চাকরি করি ঢাকা সেনানিবাসের একটা ইউনিটে। বসবাস করি আর্মি হেড কোয়ার্টার অফিসার্স মেসে। আলিমুদ্দিন ভাই মাঝে মধ্যেই জামালপুর থেকে আমার কাছে আসেন। বয়স হয়েছে তার। শ্মশ্রুতে পাঁক ধরেছে। এক রাত থাকেন আমার সাথে। আমরা দুজনে মিলে নিবিড় আলাপে মেতে উঠি। তার ছেলের চাকরি হয়েছে পুলিশে। তবে সে তাকে খুব একটা দেখাশুনা করে না। কষ্টে-সৃষ্টে জীবন যাপন করতে হয়।

আমাদের স্কুলের সহকারী হেড মাস্টার। তিনিও ফুটবল খেলোয়াড় ছিলেন। এখন ঢাকায় থাকেন। আলিমুদ্দিন ভাইয়ের বন্ধু। আলিমুদ্দিন ভাই সম্ভবত তার বাসাতেও যান। একদিন তিনি আমাকে বললেন, “আলিমুদ্দিন কি তোমার কাছে যায়?” আরো বললেন, “তোমার কাছে সে টাকা-পয়সা চাইলে দিও না। অভাবে স্বভাব নষ্ট হয়ে গেছে।" আমি ভীষণ অবাক! 

আরো কয়েক বছর আগের কথা। ছুটিতে বাড়িতে গেছি। শুনলাম আলিমুদ্দিন ভাই মারা গেছেন। ইনফ্লুয়েঞ্জা জ্বরে আক্রান্ত হয়ে। তার এই জ্বরাক্রান্ত সময়ে কেউই সহযোগিতা ও সহমর্মিতার হাত বাড়ায়নি। আমার মনে পড়ে গেল গোলপোস্টের নীচে একাকী দাঁড়িয়ে থাকা কামুর সেই দার্শনিক ভাবনা- “যখন তুমি আশা করছ এবারে বল আসছে, সেসময় কখনোই তা আসে না!”

ডেইলি বাংলাদেশ/এমআরকে