অনুবাদ গল্প | | মারেক মারেক (৩য় পর্ব)

অনুবাদ গল্প | | মারেক মারেক (৩য় পর্ব)

মূল: ওলগা তোকারচুক

অনুবাদ: ফজল হাসান ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৮:১০ ৪ আগস্ট ২০২২  

ছবিঃ অন্তর্জাল (প্রতীকী)

ছবিঃ অন্তর্জাল (প্রতীকী)

মারেক মারেক তার অভ্যন্তরের পাখিকে ঘৃণা করত । কারণ পাখিটি তার কষ্ট বৃদ্ধি করা ছাড়া আর কিছুই করতে পারত না । যদি পাখিটি সেখানে না থাকত, তবে সে চুপচাপ মাতাল হয়ে বাড়ির সামনে বসে থাকতে পারত এবং সামনের পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে থাকত । তারপর সে শান্ত হয়ে যেত এবং আলতো হাতে কুকুরের লোম নেড়েচেড়ে মাথার ভেতর ঝিমুনি প্রশমিত করত । পরবর্তী সময়ে সে কোনও অপরাধবোধ বা সিদ্ধান্ত ছাড়া কিংবা চিন্তা না করেই আবার মাতাল হতে পারত । ভয়ংকর পাখিটির অবশ্যই ডানা ছিল । 

কখনও কখনও পাখিটি তার শরীরের অভ্যন্তরে অন্ধভাবে মারধর করত এবং শিকলে প্রচন্ডভাবে পাখা ঝাঁপটাত । কিন্তু মারেক মারেক জানত যে, পাখির পায়ে বেড়ি পড়ানো ছিল, এমনকি ভারী কিছুর সাথেও বাঁধা ছিল, কারণ পাখিটি কখনও উড়ে যেতে পারবে না । যদিও ঈশ্বরের প্রতি তার বিন্দুমাত্র বিশ্বাস ছিল না, তবুও সে আপন মনে ভেবেছিল, হায় ঈশ্বর, কেন আমার অন্তরে তুমি এই পাখি দিয়ে আমাকে নির্যাতন করছ? পাখিটি মদ্যপান করা থেকে মুক্ত ছিল এবং বেদনাদায়ক কষ্টের ভেতরেও সবসময় সচেতন ছিল । মারেক মারেক যা কিছু করেছে এবং যা কিছু হারিয়েছে, কিংবা অপচয় করেছে বা উপেক্ষা করেছে, এমনকি যা কিছু তার পাশ দিয়ে চলে গেছে, পাখিটি তা মনে করিয়ে দিত । 

‘ধুত্তরি,’ সে মদ্যপ অবস্থায় তার প্রতিবেশিকে বিড়বিড় করে বলল, ‘কেন পাখিটি আমাকে এভাবে যন্ত্রণা দেয়? সে আমার ভেতরে কী করছে?’ কিন্তু তার প্রতিবেশী বধির ছিল এবং কিছুই শুনতে পারত না । ‘তুমি আমার নতুন মোজা চুরি করেছ,’ সে বলল । ‘মোজাগুলো শুকানোর জন্য দড়িতে ঝুলিয়ে দিয়েছিলাম ।’

সুতরাং মারেক মারেকের অভ্যন্তরের পাখিটির অস্থির ডানা ছিল, ছিল বাঁধা পা এবং সারা চোখ জুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে ছিল । মারেক মারেক ধরে নিয়েছিল যে, পাখিটি তার অভ্যন্তরে বন্দী । কেউ তার মধ্যে পাখিটি বন্দী করে রেখেছে । তবে তা কীভাবে সম্ভব হয়েছে, সে সম্পর্কে তার স্পষ্ট কোনো ধারণা নেই । কখনও কখনও সে যদি তার ভাবনা-চিন্তাদের ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ দেয়, তখন সে নিজের ভেতরের সেই ভয়ানক চোখের দিকে ছুটে যায় এবং শোকার্ত ও পাশবিক আর্তনাদ শুনতে পায় । তারপর সে লাফিয়ে ওঠে অন্ধভাবে পাহাড়ের উপরের বার্চ গাছের ঝোপঝাড়ের মধ্য দিয়ে বুনো পথ ধরে ছুটতে থাকে । দৌঁড়ানোর সময় সে গাছের শাখার দিকে তাকায়—কোনটা তার ওজন বহন করতে পারবে? পাখিটি নিজের ভেতরে চিৎকার করে, আমাকে বের হতে দাও, আমাকে মুক্ত করে দাও, আমি তোমার কেউ নই, আমি অন্য কোথাও থেকে এসেছি ।

প্রথমে মারেক মারেক ভেবেছিল যে, পাখিটি কবুতর, তার বাবা যে ধরনের কবুতরের বাচ্চা ফুটাতেন । সে কবুতরদের গোলাকৃতি নিরলস ছোট চোখ, তাদের অস্থির ছোট ছোট পদক্ষেপ, তাদের ছটফট ভঙ্গিতে ওড়াউড়ি এবং সবসময় দিক পরিবর্তন করার প্রবনতাকে ঘৃণা করত । যখনই বাড়িতে খাওয়ার মতো কোনো কিছু থাকত না, তখন তার বাবা তাকে কবুতরের খাঁচার দিকে হামাগুড়ি দিয়ে টেনে নিয়ে যেত এবং বোকা ও বশ মানা পাখি বের করে আনত । সে দুই হাতে চেপে ধরে একের পর এক কবুতর এনে তার বাবার কাছে পৌঁছে দিত । তার বাবা দক্ষতার সঙ্গে সেগুলোর ঘাড় টিপে ধরত । সে পাখি বধ করার বিষয়টিও ঘৃণা করত । কোনো জিনিসের মতোই পাখিগুলোর মৃত্যু হত । সে তার বাবাকেও একই পরিমান ঘৃণা করত ।

কিন্তু একবার সে ফ্রস্টদের পুকুরের পাড়ে অন্য এক ধরনের পাখি দেখেছিল । পাখিটি তার পায়ের কাছে এসে হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল এবং সঙ্গে সঙ্গেই ঝোপঝাড়ের শীর্ষে উঠে গিয়ে গাছপালা এবং উপত্যকার ওপর দিয়ে উড়ে গিয়েছিল । পাখিটির আকৃতি ছিল বড়, গায়ের রঙ ছিল কালো, ঠোঁট ছিল লাল এবং লম্বা পা ছিল । পাখিটি চিকন স্বরে চিৎকার করেছিল এবং কিছু সময়ের জন্য সে বাতাসের মধ্যে ডানা মেলে দিয়েছিল ।

সুতরাং মারেক মারেকের অভ্যন্তরের পাখিটি ছিল একটি কালো সারস । তবে পাখিটির ছিল লাল পা এবং ক্ষত-বিক্ষত ডানা । পাখিটি আর্তচিৎকার করে এবং প্রচন্ড ঝাঁকুনি দেয় । মারেক মারেক নিজের ভেতরে সেই ভয়ঙ্কর এবং নরকীয় চিৎকার শুনে রাতে ঘুম থেকে উঠে । সে ভয়ে ভয়ে বিছানায় উঠে বসে । স্পষ্টতই সে সকাল পর্যন্ত আবার ঘুমিয়ে পড়বে না । তার বালিশ স্যাঁতসেঁতে এবং বমি লেগে আছে । সে কিছু একটা পান করার জন্য উঠে দাঁড়ায় । আগের রাতে ফেলে রাখা বোতলের নীচে কখনও কখনও কয়েক ফোঁটা অবশিষ্ট থাকে, আবার অন্য সময় থাকে না । তখনও দোকান খোলার সময় হয়নি । তার বেঁচে থাকার জন্যও ছিল অসময় । তাই সে শুধু এক দেওয়াল থেকে অন্য দেওয়ালের দিকে হাঁটাহাঁটি করে । সে মারা যাচ্ছে ।

যখন মারেক মারেক শান্ত এবং ভদ্র থাকে, তখন সে তার শরীরের প্রতিটি অংশে, ঠিক ত্বকের ঠিক নীচে, পাখির উপস্থিতি অনুভব করতে পারে । এমনকি অনেক সময় সে মনে করে যে, আসলে সে-ই পাখি এবং তারা এক সঙ্গে দুঃখকষ্ট ভোগ করছে । অতীত বা সন্দেহজনক ভবিষ্যত স্পর্শ করার প্রতিটি চিন্তা ছিল তার কাছে বেদনাদায়ক । সেই দুঃখকষ্টের জন্য তার পক্ষে কোনো কিছু চিন্তা করা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল । তাই সে অর্থপূর্ণ কিছু খোঁজার পরিবর্তে তার চিন্তাকে দূরে সরিয়ে রেখেছিল । যদি সে নিজের সম্পর্কে চিন্তা করে এবং একসময় কেমন ছিল, তবে সে ভীষণ কষ্ট পায় । যদি সে চিন্তা করে যে, এখন কেমন আছে, তবে তা তাকে আরও বেশি কষ্ট দেয় । যদি সে ভাবে যে, ভবিষ্যতে সে কেমন হবে এবং তার কী হবে, তা-ও তার কাছে অসহনীয় কষ্টদায়ক হবে । যদি সে তার বাড়ির কথা চিন্তা করে, তৎক্ষণাৎ সে পচে যাওয়া কড়িকাঠ দেখতে পাবে, যা যে কোনো দিন ভেঙে পড়বে । যদি সে ক্ষেতের কথা ভাবে, তবে তার মনে হয় যে, সে ক্ষেতে বীজ বপন করেছিল । সে যদি তার বাবার কথা চিন্তা করে, তবে তার মনে পড়ে যে, বাবা তাকে মারধর করেছিল । যদি সে তার বোনের কথা চিন্তা করে, তবে তার মনে হয় যে, সে বোনের কাছ থেকে টাকা চুরি করেছিল । যদি সে তার প্রিয় ঘোড়ার কথা চিন্তা করে, তবে তার মনে পড়ে যে, কীভাবে শান্ত হওয়ার পরে সে নবজাতক বাচ্চার সঙ্গে মৃত অবস্থায় ঘোড়াটি পেয়েছিল । 

কিন্তু যখন মারেক মারেক মদ্যপান করে, তখন তার আরও ভাল লাগে । কারণ পাখিটি তার সঙ্গে মদ্যপান করে । না, পাখিটি কখনও মাতাল হয়নি, এমনকি কখনও ঘুমায়নি । কিন্তু মারেক মারেকের মদ্যপ শরীর এবং মাতাল চিন্তা পাখির ডানা ঝাপটানোর দিকে নজর দেয়নি । তাই তাকে অধিক পরিমানে সুরা পান করতে হয়েছে ।

(চলবে)

প্রথম পর্ব: https://www.daily-bangladesh.com/art-and-culture/326640

দ্বিতীয় পর্ব: https://www.daily-bangladesh.com/art-and-culture/328156
 

ডেইলি বাংলাদেশ/এস