সত্য

সত্য

মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৬:২৪ ১৩ এপ্রিল ২০২২   আপডেট: ১৬:৫৬ ১৩ এপ্রিল ২০২২

ছবি: অন্তর্জাল

ছবি: অন্তর্জাল

সত্য সম্পর্কে আমার প্রাথমিক ধারনার সৃষ্টি দৃশ্যমান জগত থেকে। শৈশবে পৃথিবীকে মনে হতো চারকোণা। দিগন্ত পর্যন্ত বিস্তৃত। এর ওপরের ধানক্ষেত, সবুজ গ্রাম, আঁকাবাঁকা নদী বা খাল-বিলকে মনে হতো নকশীকাঁথার ওপরে আঁকা কোনো নিবিড় পল্লীবালার স্বপ্ন-গাথা। সারাদিনমান ধরে প্রতিদিন একটু একটু করে সুঁই আর সাতরঙা সুতোর আঁচড়ে এই স্বপ্নগুলোকে সে রচনা করেছে। মাথার ওপরে নুয়ে থাকা আকাশকে মনে হতো বিশাল নীল রঙের ছাতা।  শিমুল ফুলের তুলারা যেখানে উড়ে গিয়ে মেঘ হয়ে ঘুরে বেড়ায়। রঙ বদলায়। কখনও ধবধবে সাদা। কখনও গাঢ় ধূসর। বৃষ্টির জলধারাকে মনে হতো অদৃশ্য কারো অবিরাম কান্নার প্রবাহ।

আমার সকল বিশ্বাসই ছিল দৃশ্য নির্ভর। আমি বিশ্বাস করতাম সূর্য প্রতিদিন ভোরে পুবদিকের আকাশে ওঠে। সন্ধ্যায় ডুবে যায় পশ্চিম আকাশে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় পর্যন্ত এই পর্যবেক্ষিত সত্য নিয়ে আমার কোনো সন্দেহ ছিল না। গ্রামের স্কুল বিধায় ইংরেজিতে অক্ষর জ্ঞান ছাড়া আর তেমন কিছুই শেখা হয়নি। ষষ্ঠ শ্রেণীতে ওঠার পর আমার ইংরেজি শেখা শুরু হলো। পার্টস অফ স্পীচ, টেন্স, ভয়েস, বাঙলা থেকে ইংরেজিতে ট্রান্সলেশন ইত্যাদি।  আমার শেখা প্রথম বাংলা থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ ছিল “সূর্য পূর্বদিগন্তে উদিত হয়ে পশ্চিমে অস্ত যায়” এই বাক্যের। আমরা অনুবাদ করেছিলাম অথবা শেখানো হয়েছিল যে, বাক্যটির ইংরেজি হলো, The sun rises in the east and sets in the west। স্কুলের কেরানী স্যার আমাদের ইংরেজি পড়াতেন। তিনি আমাদেকে বলতেন, “সূর্য পূবদিকে ওঠে, পশ্চিমে ডুবে যায়- এটি চিরন্তন সত্য। এই বাক্যের অনুবাদ করার সময়ে কখনই অতীতকাল ব্যবহার করা যাবে না”। তিনি ছিলেন খুবই ছোটখাটো মানুষ। বয়স ষাটোর্ধ্ব। উচ্চতা চার ফুট দশ ইঞ্চির বেশি হবে না। কিন্তু ব্যক্তিত্ব ছিল অসাধারণ। যমের মতো ভয় পেতাম সবাই তাঁকে। তার মুখনিঃসৃত সকল বাক্যকেই আমরা সত্য মনে করতাম।

দৃশ্যমান জগতের বাইরেও যে সত্য থাকতে পারে তা বুঝতে পারলাম বিজ্ঞানের ক্লাসে। এই সময়ে আমাদেরকে বলা হলো যে, সূর্য নয়, পৃথিবীই সূর্যের চারপাশে ঘুরে। তবে এই সত্যও সহজে আসেনি। এখন থেকে প্রায় ১৯০০ বছর আগে (১০০-১৭০ এডি) বিজ্ঞানী টলেমীও বিশ্বাস করতেন যে, পৃথিবী চারকোনা ও স্থির। মাত্র ৫০০ বছর আগে (১৫৪৩ খ্রিষ্টাব্দে) কোপার্নিকাস নামের একজন পোলিশ জ্যোতির্বিজ্ঞানি আবিস্কার করলেন যে, পৃথিবী সূর্যের চারদিকে আবর্তন করে। কিন্তু কোপার্নিকাসও তার আবিষ্কৃত সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেননি। পরে  ব্রুনো নামের একজন জ্যোতির্বিজ্ঞানী নিশ্চিত করেন যে, পৃথিবী স্থির নয়, বরং সেটাই সূর্যের চারপাশে ঘোরাফেরা করে। কিন্তু তার এই সত্যকে ঐ যুগের মানুষেরা সহজে মেনে নেয়নি। কারণ, পৃথিবীকেন্দ্রিক জগতের ধারণা  বাইবেলে এবং পূর্বের সকল ধর্মগ্রন্থে বর্ণিত ছিল। কাজেই ধর্মীয় যাজকরা তার মতবাদকে ধর্মবিরুদ্ধ আখ্যা দিয়ে তাকে আগুনে পুড়িয়ে মেরে ফেলেন। ‘পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে ঘুরছে’– বাইবেল বিরোধী এই সত্য পুনর্বার বলার অপরাধে চার্চ গ্যালিলিওকে অভিযুক্ত করে ‘ধর্মদ্রোহিতার’ অভিযোগে। ১৬৩৩ সালে। গ্যালিলিও তখন প্রায় অন্ধ। বয়সের ভারে ন্যুব্জ। অসুস্থ ও বৃদ্ধ বিজ্ঞানীকে জোর করে ফ্লোরেন্স থেকে রোমে নিয়ে যাওয়া হয়। হাঁটু ভেঙ্গে সবার সামনে জোড় হাতে ক্ষমা প্রার্থনা করতে বলা হয়। স্বীকার করতে বাধ্য করা হয় যে এতদিন তিনি যা প্রচার করেছিলেন তা ধর্মবিরোধী, ভুল ও মিথ্যা।  বাইবেলে যা বলা হয়েছে সেটিই সঠিক। 
 
বিগত শতাব্দীর ৯০ দশকের শুরুতে সেনাবাহিনীর কনিষ্ঠ অফিসার হিসেবে ঢাকা সেনানিবাসের একটি ইউনিটে চাকুরি করি। আমার ইউনিটের উপ অধিনায়ক মেজর ফরিদ আহমেদ ভুঁইয়া। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর খুবই জ্ঞানী একজন অফিসার। স্যার আমাকে খুব স্নেহ করেন। একদিন তিনি আমাকে বেশ কয়েকটা দর্শনতত্ত্বের বই এনে দিলেন। বললেন,”আসাদ, এই বইগুলো পড়।“ বইগুলোর একটিতে ‘সঙ্গতিবাদ’ (Coherence Theory of truth) নামে একটা থিয়োরি পেলাম। {A coherence theory bases the truth of a belief on the degree to which it coheres ("hangs together") with all the other beliefs in a system of beliefs (typically one person's beliefs, but it could be any body of knowledge)}। এটি পড়তে গিয়ে জানতে পারলাম যে, কোনো জ্ঞান বা সত্য সমসাময়িক সময়ের অন্যান্য জ্ঞান বা সত্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ না হলে তাকে সত্য বলে প্রতিষ্ঠিত করা দুস্কর হয়ে পড়ে। একারণেই ব্রুনো বা গ্যালিলিও’র পর্যবেক্ষণ তাদের সময়কালের জ্ঞান বা সত্য দ্বারা অনুমোদিত না হবার কারণে তাদের জীবনহানি বা  অপদস্ত হবার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু সত্যের বিনাশ নেই। তারা কোনো না কোনো সময়ে প্রকাশিত হবেই।

সূর্যের মতো।   
“সূর্য তো অস্ত যায় না,
পৃথিবী ফিরিয়ে নেয় মুখ।
আমরা বলি অস্তু গেছে সূর্য।
সত্য সে-ও সূর্যের মতন,
আপন উজ্জ্বল্য নিয়ে আছে স্থির।
আমরাই সত্য থেকে মাঝে মাঝে
ফিরিয়ে নেই মুখ!”- নির্মলেন্দু গুণ

ডেইলি বাংলাদেশ/এমআরকে/জেডআর