একটি অর্ধেকদিনের গল্প

একটি অর্ধেকদিনের গল্প

মূলঃ ‘Half a Day’ by Naguib Mahfouj

অনুবাদঃ মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৫:৩৯ ১৬ জানুয়ারি ২০২২   আপডেট: ১৫:৫১ ১৬ জানুয়ারি ২০২২

পেইন্টিং- সংগৃহীত

পেইন্টিং- সংগৃহীত

বাবার ডান হাত ধরে হাঁটছিলাম। পাশে পাশে। তার লম্বা লম্বা পা ফেলার সাথে তাল রাখতে গিয়ে দৌড়াতে হচ্ছিল আমাকে। নতুন পোশাক পরেছিলাম। কালো জুতো, স্কুলের সবুজ ইউনিফর্ম, লাল ফেজটুপি- সবই নতুন। দিনটিতে কোনো বিশেষ অনুষ্ঠান ছিল না। তারপরেও নতুন পোশাকে আমাকে মন্দ লাগছিল না। কারণ, সেদিনই জীবনে প্রথম আমি স্কুলে যাচ্ছিলাম।  

মা জানালা দিয়ে তাকিয়েছিল। আমাদের যাওয়ার পথের দিকে। আমি একটু পর পর তার দিকে ফিরে তাকাচ্ছিলাম। মনে হচ্ছিল সে ছাড়া আমাকে সাহায্য করার আর কেউ নেই। বাগানের ভেতর দিয়ে চলে যাওয়া একটা সড়ক দিয়ে আমরা হাঁটছিলাম। সড়কটির দুপাশে শস্যখেত ছিল। সেখানে কাঁটাওয়ালা নাশপাতি, মেহেদি গাছ এবং কয়েকটা খেজুর গাছ ছিল।

‘আমাকে স্কুলে নিয়ে যাচ্ছ কেনো?’ আমি সরাসরি প্রতিবাদ করলাম। বাবার বিরুদ্ধে। ‘তুমি বিরক্ত হও এমন কাজ আমি আর কখনোই করব না।’
‘তোমাকে কোনো শাস্তি দেওয়া হচ্ছে না,’ বাব হাসতে হাসতে বলল। ‘স্কুলে যাওয়া কোনো শাস্তি নয়। স্কুল হলো একটা কারখানা, যা বালক অবস্থা থেকে তোমাকে উপকারী মানুষে পরিণত করবে। তুমি কি চাও না তোমার বাবা বা ভাইয়ের মতো হতে?’

তার যুক্তি আমার পছন্দ হলো না। আমি বিশ্বাসই করলাম না যে, বাড়ির নিবিড় সংস্পর্শ থেকে আমাকে সরিয়ে দিয়ে অন্যকোনো বিল্ডিংএর ভেতরে ছুঁড়ে দেওয়া হলে আমার কোনো উপকার হতে পারে। রাস্তার শেষপ্রান্তে সেই বিল্ডিংটি শক্ত ও গম্ভীর ভাব নিয়ে দাঁড়িয়েছিল। বিশাল এক প্রাচীর দেওয়া দুর্গের মতো।  

স্কুল গেইটের কাছে আসতেই দেখতে পেলাম ওপারে উঠোনের ভেতরে বালক বালিকারা গিজগিজ করছে। ‘যাও,  নিজে ভেতরে ঢুকে ওদের সাথে যোগ দাও,’ বাবা বলল। ‘সবার সাথে হেসে হেসে কথা বলবে।’ 

আমি থমকে গিয়ে তার হাত আঁকড়ে ধরলাম। কিন্তু বাবা ভদ্রভাবে আমাকে দূরে সরিয়ে দিলো। বলল, ‘ভয় পেয়ো না। সাহসী হও। আজ থেকে তোমার আসল জীবন শুরু হলো। ছুটির সময়ে তুমি আমাকে গেইটের এপারে দেখতে পাবে।’

কয়েক পা এগিয়ে গেলাম। থামলাম। সামনে তাকালাম। সামনে কিছুই দেখতে পেলাম না। তারপর ছেলেমেয়েদের মুখগুলো আমার চোখে পড়ল। আমি তাদের কাউকেই চিনি না। তারাও আমাকে চিনে না। নিজেকে একজন পথ হারানো আগন্তুক বলে মনে হলো। উৎসুক দৃষ্টি দিয়ে ছেলেমেয়েরা আমাকে দেখছিল। তাদের মধ্য হতে এক ছেলে এগিয়ে আসলো। জিগ্যেস করল,‘তোমাকে কে এনেছে?’ 
‘বাবা,’ আমি ফিসফিস করে বললাম।
‘আমার বাবা নেই। মরে গেছে,’ সে শান্তভাবে বলল। 
আমি বুঝতে পারলাম না আমার কী বলা উচিৎ। এই সময়ে গেইটটা বন্ধ করে দেওয়া হলো। 

কয়েকজন শিশু কাঁদতে শুরু করল। বেল বাজলো। একজন মহিলা এলো। তাকে অনুসরণ করে কয়েকজন লোক এলো। তারা আমাদেরকে বিভিন্ন দলে ভাগ করতে শুরু করল। কয়েক তলার উঁচু বিল্ডিং দিয়ে তিনপাশ ঘেরা উঠোন। এর ওপরে আমাদেরকে দিয়ে তারা এক জটিল নকসা তৈরি করল। বিল্ডিংগুলোর প্রতি তলা থেকে কাঠের ছাঁদ দেওয়া লম্বা ব্যালকনি আমাদের দিকে মুখ করেছিল। 

‘এটা তোমাদের বাড়ি,’ মহিলাটি বলল। ‘এখানেও তোমাদের বাবা-মা’রা আছে। এখানে যা আছে তার সবকিছুই উপভোগ করার মতো। জ্ঞান ও ধর্মের জন্যেও উপকারী। তোমরা চোখের জল মুছে ফেলো। এবং আনন্দের সাথে জীবনের মুখোমুখি হও।’

আমরা তাদের কথাগুলোকে সত্য বলে মেনে নিলাম। ফলে এক ধরনের মানসিক শান্তি পেলাম। জীবিত প্রাণীরা অন্য জীবিত প্রাণীদের দিকে আকৃষ্ট হয়। প্রথম থেকেই আমার মন বালকদেরকে বন্ধু করে নিলো। এবং আমি আমার পছন্দের মেয়েদের প্রেমে পড়ে গেলাম। মনে হলো এতদিন খামাখাই মনের কষ্ট পেয়েছি। আমি ভাবতেই পারিনি যে, স্কুল আমার জন্যে এতো বৈচিত্র্য নিয়ে অপেক্ষা করছে। আমরা সব ধরণের খেলা খেললাম। দোলনা, ঘোড়া লাফ, বল খেলা-সবই। মিউজিক রুমে গেলাম। সবাই সুর করে জীবনে প্রথম গান গাইলাম। ভাষা সম্পর্কে আমাদেরকে প্রাথমিক ধারণা দেওয়া হলো। আমরা পৃথিবীর একটা ঘূর্ণমান গ্লোব দেখলাম। সেটিতে বিভিন্ন মহাদেশ ও দেশ দেখলাম। সংখ্যা সম্পর্কে শেখা শুরু করলাম। সৃষ্টিকর্তা কীভাবে বিশ্বজগত সৃষ্টি করেছেন, সে সম্পর্কে বলা হলো। বর্তমান ও ভবিষ্যৎ পৃথিবী সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হলো। তারপর সুস্বাদু খাবার খেলাম। কিছুক্ষণ ঘুমালাম। আবার জাগলাম। বন্ধুত্ব, ভালোবাসা, খেলাধুলা ও শিক্ষার জন্যে। তারপরেও এক সময়ে মনে হলো জীবনকে আমরা যতটা  মধুর ও ঝামেলামুক্ত মনে করেছিলাম, সেগুলো আসলে ততটা তেমন নয়। ধূলিঝড় ও দুর্ঘটনার মতো ব্যাপারগুলো আমাদের জীবনে এলো। ফলে আমাদেরকে আরো সতর্ক, তৈরি ও ধৈর্যশীল হতে হলো। ফলে জীবন শুধু খেলাধুলা আর ঘুরে বেড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ রইল না। আমাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হলো। এটা আমাদের অন্তরে ব্যথা ও ঘৃণার সৃষ্টি করল। অথবা যুদ্ধের অবস্থা। এছাড়াও মহিলাটি কোনো কোনো সময়ে হাসলেও প্রায়ই আমাদেরকে বকা ও গালি দিতে লাগল। এবং প্রায় সময়েই আমাদেরকে শারীরিক শাস্তি দিতে লাগল।

এখান থেকে বাড়িতে ফিরে যাওয়ার কোনো উপায়  ছিল না। আমাদের সামনে অপেক্ষা করছিল শুধুই পরিশ্রম, সংগ্রাম ও অধ্যবসায়। উদ্বিগ্নতার মধ্যেও এগুলোকে আমরা সুখ ও সাফল্যের সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করতে  লাগলাম।

দিনের শেষে ঘণ্টাধ্বনি বাজল। আমাদের কাজও শেষ হলো। আমরা সবাই দল বেধে গেইটের দিকে ছুটে গেলাম। গেইট খুলে গেল। বন্ধু ও প্রেমিকাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে গেইট পার হয়ে চারদিকে তাকালাম। কোথাও বাবার পায়ের চিহ্নও দেখতে পেলাম না। অথচ সে কথা দিয়েছিল যে ছুটির পর সে এখানে থাকবে। আমি পাশে সরে গিয়ে তার জন্যে অপেক্ষা করতে লাগলাম। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পর সিদ্ধান্ত নিলাম নিজেই বাড়ি ফিরে যাবার। কয়েক পা এগোনোর পর একজন মধ্যবয়সী মানুষ আমার পাশ দিয়ে চলে গেল। আমার মনে হলো যে আমি তাকে চিনি। লোকটি হাসিমুখে আমার দিকে এগিয়ে আসলো। আমার সাথে হ্যাণ্ডশেক করল। বলল, ‘অনেকদিন পর তোমার সাথে দেখা হলো। কেমন আছ?’

আমিও মাথা নাড়িয়ে স্বীকার করলাম। তাকে জিজ্ঞেস করলাম,‘তুমি কেমন আছ?’

‘দেখতেই পাচ্ছ তেমন ভালো নেই আমি,’ বলল সে। 

আবার সে আমার সাথে হ্যান্ডশেক করে চলে গেল। আমি কয়েক পা এগিয়েই হতবাক হয়ে থেমে গেলাম। হায় আল্লাহ, রাস্তার পাশের সেই সারি সারি বাগানগুলো কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেল? এই গাড়িগুলোই কোথা থেকে এসেছে? কখন মানুষেরা এসে এই জায়গার দখল নিয়েছে? এই পাহাড়গুলোই বা কখন রাস্তার পাশে চলে এসেছে? যে মাঠগুলোকে তারা ঘিরে আছে, তারাই বা এতক্ষণ কোথায় ছিল?

উঁচু বিল্ডিং এবং রাস্তাগুলো শিশুদের ভিড়ে পরিপূর্ণ হয়েছিল। তাদের চিৎকারে বাতাস ভারী হয়ে উঠছিল। কয়েক জায়গায় দেখা গেল জাদুকররা যাদু দেখাচ্ছে। তাদের ঝুড়ি হতে সাপ বেরিয়ে আসছে। একটু দূরেই দেখা গেল একটা বাদকদল সার্কাসের ঘোষণা দিচ্ছে। সামনে ভাঁড় ও ভার উত্তোলনকারীরা হাঁটাহাঁটি করছে। একটা ট্রাকের দল  নিরাপত্তা প্রহরীদের নিয়ে মার্চপাস্ট করে যাচ্ছে। এই সময়ে অগ্নিনির্বাপক দলের সাইরেন শোনা গেল। আমি বুঝতে পারলাম না কীভাবে এই গাড়িগুলো জ্বলন্ত আগুণের কাছে আসবে। হঠাৎ করে একটা গাড়ির চালক ও যাত্রীর মধ্যে মারামারি শুরু হলো। যাত্রীর স্ত্রী চিৎকার করে সাহায্য চাইল। কিন্তু কেউই সাড়া দিলো না।

হায় আল্লাহ! আমি কি তাহলে এতক্ষণ ধাঁধাঁর মধ্যে ছিলাম? আমার মাথা  ঘুরতে লাগল। আমি প্রায় পাগল হয়ে গেলাম। কীভাবে মাত্র অর্ধেক দিন অর্থাৎ সকাল হতে সূর্যাস্তের মধ্যে এতগুলো ঘটনা ঘটল? বাড়ি ফিরে যাবার পর  বাবার কাছ থেকে আমার সবকিছুই জানতে হবে। ভাবলাম আমি। কিন্তু আমার বাড়ি কোথায়? আমি শুধু লম্বা বিল্ডিং  এবং মানুষের ভিড় দেখতে পেলাম। তাড়াতাড়ি করে বাগান ও ‘আবু খোদা’র মাঝের চৌরাস্তা পার হতে চাইলাম। আমি জানি আবু খোদা পার হলেই আমার বাড়ি।  কিন্তু রাস্তার ওপরের গাড়ির প্রবাহ আমাকে সেটা করতে দিলো না। আগুন নেভানোর গাড়িগুলোর ইঞ্জিনের সাইরেন প্রবল শব্দে বাজতে লাগল। শামুকের গতি নিয়ে গাড়িগুলো  এগোতে থাকল।খুবই বিরক্ত হয়ে ভাবতে লাগলাম কখন চৌরাস্তা পার হতে পারব। অনেকক্ষণ পর চৌরাস্তার কোণের ইস্ত্রির দোকানের যুবকটি আমার কাছে এলো। হাত বাড়িয়ে দিলো। এবং খুব সাহসের সাথে বলল, ‘দাদা, চলো, আমি তোমাকে পার  করে দিচ্ছি।’

---সমাপ্ত---

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএইচ/এমএস