দ্য প্লেগ (পর্ব ২৬) 

দ্য প্লেগ (পর্ব ২৬) 

মূলঃ আলবেয়ার কামু

অনুবাদঃ মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ২২:০৩ ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১  

স্বাস্থ্যকর্মীর দল

স্বাস্থ্যকর্মীর দল

কিছুক্ষণ পর র‍্যাম্বার্ট ও কটার্ড গার্সিয়াকে তাদের দিকে আসতে দেখল। আসার পর কোনো ধরণের ভূমিকা না করেই সে বললঃ  “তোমাদেরকে একটু অপেক্ষা করতে হবে।”  চারপাশের ভিড়ের মধ্যে তখন নীরবতা বিরাজ করছিল। বেশিরভাগই ছিল মহিলা। তারা প্রায় সকলেই খাবারের  পোটলা বহন করছিল। আশা নিয়ে যে, কোনো না কোনোভাবে তারা অসুস্থ্য আত্নীয়দের কাছে এগুলো পাচার করে দিতে পারবে। প্রবেশদ্বারটিতে সশস্ত্র প্রহরীরা পাহারা দিচ্ছিল। কিছুক্ষণ পর একটা অদ্ভুত চিৎকার শোনা গেল ব্যারাক রুম ও প্রবেশদ্বারের মধ্যের স্থানটিতে। চিৎকার শোনামাত্রই সবাই রোগীদের ওয়ার্ডের দিকে তাকাল। 

তিনজনেই শব্দটি শুনল। এসময়ে পেছন হতে শুনতে পেল ‘শুভ সকাল’। বাইরে প্রচন্ড গরম থাকা স্বত্ত্বেও রাউল গাঢ় রঙের স্যুট পরেছিল। সে ছিল লম্বা ও শক্তিশালী শারীরিক কাঠামোর অধিকারী। তবে মুখ কিছুটা ম্লান ধরণের। ঠোট প্রায় না নেড়েই সে দ্রুত ও স্পষ্টভাবে বললঃ 
“চলো আমরা সেন্টার টাউনে কেন্দ্রে যাই। গার্সিয়া তোমার আসার দরকার নেই।” 
গার্সিয়া একটা সিগারেট জ্বালিয়ে যেখানে ছিল সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল। র‍্যাম্বার্ট ও কটার্ডের মাঝখানে এসে রাউল দ্রুত পা চালাল।
“গার্সিয়া আমাকে পরিস্থিতিটা ব্যাখ্যা করেছে,” সে বলল। “আমরা এখন খরচ নিয়ে কথা বলব। আমি তোমাদেরকে আগেই বলছি যে অন্তত দশ হাজার দিতে হবে।”
র‍্যাম্বার্ট জানাল যে, সে আগেই এবিষয়ে আগেই রাজী হয়েছে। 
“আগামীকাল জাহাজঘাটের পাশের স্প্যানিশ হোটেলে আমরা একসাথে লাঞ্চ করব।”
র‍্যাম্বার্ট বললঃ “ঠিক আছে। “রাউল তার সাথে মৃদু হেসে হ্যান্ডশেক করল।
সে চলে যাবার পর কটার্ড বলল যে, পরেদিন লাঞ্চে সে আসতে পারবে না। তার অন্যএকটি কাজ আছে। অবশ্য  র‍্যাম্বার্টেরও তাকে আর দরকার ছিল না। 

পরেরদিন র‍্যাম্বার্ট স্প্যানিশ হোটেলে ঢুকতেই কক্ষের সকলে তার দিকে ফিরে তাকাল। অন্ধকার প্রকোষ্ঠের মতো একটি জায়গা। পুরুষরা ছাড়া সেখানে কেউ ছিল না। অধিকাংশই স্প্যানিশ। রাউল কক্ষটির পেছনের দিকে একটা  টেবিলে বসেছিল। ঈশারা করে সে সাংবাদিককে কাছে আসতে বলল। অন্যরা নিজেদের প্লেটের উপরে মনোনিবেশ করল। রাউলের পাশে লম্বা, শুকনা ও শেভ না করা একটি লোক দাঁড়িয়েছিল। তার কাঁধদুটো খুবই প্রশস্ত। মুখমন্ডলের আকৃতি ঘোড়ার মতো। হালকা চুলের অধিকারী। শার্টের হাতাগুলো ভাঁজ করা। ফলে কালো চুলে ঢাকা বাহু দেখা যাচ্ছিল। র‍্যাম্বার্টকে পরিচিত করাতেই সে তিনবার মাথা নাড়াল। তবে রাউল র‍্যাম্বার্টকে তার নাম বলল না। শুধু বলল “আমাদের বন্ধু।”

“আমাদের বন্ধু মনে করে যে, সে তোমাকে সাহায্য করতে পারবে। সে তোমাকে...” এইটুকু বলেই রাউল থেমে গেল। একজন ওয়েটার র‍্যাম্বার্টের অর্ডার নেয়ার জন্যে এসেছিল। “সে তোমাকে আমাদের অন্য দুই বন্ধুর সাথে পরিচয় করিয়ে দেবে। তারাই তোমাকে দুইজন প্রহরীর সাথে সাক্ষাৎ করাবে। তবে এখনই না। প্রহরীরাই ঠিক করবে তোমার সাথে দেখা করার জন্যে সবচেয়ে ভালো সময় হবে কোনটি। সবচেয়ে ভালো হয়, তুমি যদি তাদের একজনের সাথে কয়েক রাত থাকতে পারো। সে গেটের কাছেই থাকে। এখন যা আমার বন্ধু করবে তা হলো তাদের  সাথে তোমার যোগাযোগের ব্যবস্থা করে দেওয়া। যখন সবকিছু ঠিক হয়ে গেলে তুমি তাদেরকে খরচ অর্থ দিয়ে দিও।“
এবারেও ‘বন্ধু’ লোকটি তার ঘোড়ার মতো মুখমণ্ডল উপরে-নীচে নামাল। টমাটো ও মরিচের সালাদ মুখের ভেতরে নিতে নিতে। তারপর কথা বলা শুরু করল। কিছুটা স্প্যানিশ উচ্চারণে। র‍্যাম্বার্টকে সে দুইদিন পর একাকী সকাল আটটায় গির্জার বারান্দায় তার সাথে দেখা করতে বলল।
“আরও দুইদিন অপেক্ষা করতে হবে?” র‍্যাম্বার্ট বলল। 
“তুমি যেরকম মনে করছ, কাজটা অত সহজ না,” রাউল বলল। “ওদেরকে খুঁজে পেতে হবে।“ ঘোড়ামুখী আরেকবার মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। তার সাথে কী নিয়ে কথা বলা যায় সে সম্পর্কে র‍্যাম্বার্ট ভাবছিল। তবে সমস্যাটা দ্রুতই মিটে গেল, যখন র‍্যাম্বার্ট আবিষ্কার করল যে, ঘোড়ামুখো একজন নিবেদিতপ্রাণ ফুটবল খেলোয়াড়। র‍্যাম্বার্ট নিজেও ফুটবল খেলত। তারা ফরাসি চ্যাম্পিয়নশিপ, ইংলিশ দলগুলোর দক্ষতা ও বল পাস করার পদ্ধতি ইত্যাদি সম্পর্কে আলোচনা করল। খাওয়া শেষ হতেই ঘোড়ামুখো খুবই বন্ধুসুলভ ও কৌতুকপ্রবণ হয়ে উঠল। সে র‍্যাম্বার্টকে বোঝানোর চেষ্টা  করল  যে, ফুটবল মাঠের সবচেয়ে কার্যকরী পজিশন হলো সেন্টার হাফ। সেই সবাইকে বল তৈরী করে দিয়ে থাকে। রাম্বার্ট প্রায় মেনে নিল তার কথা। যদিও ব্যক্তিগতভাবে সবসময় সেন্টার ফরওয়ার্ড পজিশনে খেলত। শান্তিপূর্ণভাবেই তাদের আলোচনা চলছিল। কিন্তু কেউ একজন রেডিও চালিয়ে দিলো। কয়েকটা রোমান্টিক গান পরিবেশনের পর সেটি হতে ঘোষণা করা হলো যে, বিগত দিনে একশত সাতত্রিশ জন প্লেগে আক্রান্ত রোগী মারা গেছে। উপস্থিত কেউই বিষয়টা নিয়ে বিন্দুমাত্রও চিন্তিত বা আবেগাপ্লুত হলো বলে মনে হলো না। ঘোড়ামুখো একটু নড়ে উঠে দাঁড়াল। রাউল ও র‍্যাম্বার্টও তাকে অনুসরণ করল। 

তারা বাইরে যাবার সময়ে সেন্টার হাফ জোরে জোরে র‍্যাম্বার্টের হ্যান্ডশেক করতে করতে বলল,“আমার নাম গনজালেস।”
পরের দুইদিনকে র‍্যাম্বার্টের কাছে মনে হলো যে, শেষ হচ্ছে না। সে রিও’র সাথে দেখা করল। তাকে সর্বশেষ অগ্রগতি জানাল। তারপর তার সাথে তার এক রোগীর বাড়ি পর্যন্ত গেল। সম্ভবত প্লেগ রোগী। বাড়ির দরজার কাছে এসে সে ডাক্তারের নিকট হতে বিদায় নিল। রোগীর পরিবার ডাক্তারের জন্যে অপেক্ষা করছিল।

“আমি আশা করছি ত্যারু ঠিকসময়েই চলে আসবে,” রিও বিড়বিড় করে বলল। তাকে যথেষ্টই ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। 
“মহামারী কি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে?” র‍্যাম্বার্ট জিজ্ঞেস করল।
রিও বলল যে, তা নয়। বরং মৃত্যুর গ্রাফ আগের চেয়ে এখন কম খাঁড়াভাবে বাড়ছে। কিন্তু রোগকে ঠেকানোর জন্যে যথেষ্ট সরঞ্জাম তাদের কাছে নেই। 
“আমাদের সরঞ্জামের কমতি আছে। পৃথিবীর সকল সেনাবাহিনীতেই সরঞ্জামের অভাব পূরণ করা হয়ে থাকে জনবল দিয়ে। কিন্তু আমাদের জনবলেরও ঘাটতি আছে।“ 
“অন্য শহর থেকে ডাক্তার ও প্রশিক্ষিত মেডিক্যাল এসিস্টেন্ট আসেনি?” 
“এসেছে,” রিও বলল। “দশজন ডাক্তার ও একশত জন মেডিক্যাল এসিস্টেন্ট। সন্দেহ নেই যে, এটা শুনতে অনেক বড় সংখ্যা বলে মনে হয়। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে যথেষ্ট নয়। পরিস্থতি আরেকটু খারাপ হলে এই সংখ্যা খুবই অপ্রতুল বলে মনে হবে।“
র‍্যাম্বার্ট বাড়ির ভেতরের শব্দগুলো শুনছিল। সে এবারে রিও’র দিকে বন্ধুত্বপূর্ণ হাসি দিয়ে ফিরল। 
“হ্যা,” সে বলল,” তোমাদের উচিৎ হবে তাড়াতাড়ি এই যুদ্ধে জেতা।“ একটা ছায়া তার মুখকে অতিক্রম করে গেল। “আমি চলে যাচ্ছি বলে বলছি না,” সে নিম্নস্বরে যোগ করল। 
রিও উত্তর করল যে, সে এটা ভালো করেই জানে। কিন্তু র‍্যাম্বার্ট তারপরেও বলতে লাগলঃ
“আমি নিজেকে কখনোই কাপুরুষ বলে মনে করি না। বিষয়টি পরীক্ষা করে দেখার সুযোগ আমি আগেও পেয়েছিলাম। শুধুমাত্র কিছু চিন্তা আছে যেগুলোকে আমি একেবারেই সহ্য করতে পারি না।“
ডাক্তার তার চোখের ভেতরে তাকাল।   
“তুমি তাকে আবার দেখতে পাবে,” সে বলল। 
“সম্ভবত। কিন্তু আমি কোনোক্রমেই একটা বিষয় মেনে নিতে পারছি না। হয়তবা কোনদিনই পারব না। সেটি হলো যে, তার বয়স বাড়ছে প্রতিদিন। একত্রিশ বছর বয়সে মানুষের বয়স বাড়া শুরু করে। এই সময়ের মধ্যেই তাকে  জীবন থেকে যা আহরণ করার, তা আহরণ করে নিতে হয়। আমি কী বুঝাতে চাচ্ছি, তা কী তুমি বুঝতে পারছ?”
রিও নিজের মতো করে উত্তর করতে যাচ্ছিল। এই সময়ে ত্যারু আসলো। খুবই উত্তেজিতভাবে। 
“আমি ফাদার পেনেলাক্সকে বলেছি আমাদের সাথে যোগ দিতে।”
“কী বললেন তিনি?” ডাক্তার জিজ্ঞেস করল।  
“তিনি বিষয়টা নিয়ে ভেবেছেন এবং তারপর আমাকে বলেছেন হ্যা।”
“ভালো,” ডাক্তার বলল। আমি খুশী হলাম জেনে যে, তিনি তার অবস্থা তার ধর্মাপদেশের চেয়ে ভালো।“ 
“অধিকাংশ মানুষেরাই তাই,” ত্যারু উত্তর করল। “তাদেরকে শুধু সুযোগ দিতে হয়।“ সে রিও’র দিকে তাকিয়ে হাসল এবং চোখ টিপে দিলো। “আমার জীবনে একটাই কাজ, সব মানুষদেরকে সুযোগ দেওয়া।”
“আমাকে যেতে হবে,” র‍্যাম্বার্ট বলল।
বৃহস্পতিবারে, সাক্ষাৎ করার দিনে, র‍্যাম্বার্ট আটটা বাজার পাঁচ মিনিট পূর্বে গির্জার বারান্দায় প্রবেশ করল। বাতাস তুলনামূলকভাবে শীতল ছিল। ছোট ছোট লোমশ ধরণের মেঘেরা আকাশের ভেতরে উড়ে বেড়াচ্ছিল। লন থেকে ভেজা বাতাসের গন্ধ বেরুচ্ছিল।  সূর্য তখনও পূবদিকের বাড়িগুলোর পেছনে ছিল এবং সূর্যকে মনে হচ্ছিল জোয়ান অব আর্কের হেলমেটের মতো। সেটি গির্জার উঠোনে এক প্রস্থ উজ্জ্বলতার সৃষ্টি করেছিল।  ঘড়িতে সকাল আটটার ঘণ্টাধ্বনি বাজল। র‍্যাম্বার্ট খালি বারান্দায় কিছুক্ষণ পায়চারী করল। ভেতর থেকে অস্পষ্ট কথোপকথনের শব্দ ভেসে আসছিল। সাথে ছিল ধূপের গন্ধ ও  স্যাঁতস্যাঁতে বাতাস।
একটুপর কন্ঠস্বরগুলো নিস্তব্ধ হয়ে গেল। দশটি ক্ষুদ্রাকৃতির অবয়ব বিল্ডিঙের ভেতর থেকে বের হয়ে আসলো। তারা দ্রুত শহরের কেন্দ্রের দিকে চলে গেল। র‍্যাম্বার্ট অধৈর্য হয়ে পড়ল। অন্য কয়েকটা কালো অবয়ব সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে বারান্দায় প্রবেশ করল। র‍্যাম্বার্ট একটা সিগারেট জ্বালাতে যাচ্ছিল। সেই মুহূর্তে তার মনে হলো যে, এখানে ধূমপান করতে দেখলে কেউ রেগে যেতে পারে।
আটটা পনের মিনিটে গির্জার অরগ্যান বাজতে শুরু করল। খুবই মৃদুভাবে। র‍্যাম্বার্ট ভেতরে প্রবেশ করল। করিডরের স্বল্প আলোতে প্রথমে সে কিছুই দেখতে পাচ্ছিল না। কয়েক মুহূর্ত পর সে আবিষ্কার করল যে, তার সামনে কতগুলো  ক্ষুদ্র অবয়ব দাঁড়িয়ে আছে। সবাই দলবেঁধে একটি কোণায় দাঁড়িয়ে। একটা সাময়িক বেদীর সামনে। সেটার উপরে  St. Roch এর একটি মূর্তি খোঁদাই করা ছিল। স্থানীয় ভাস্করদের তৈরি করা। হাঁটু গেড়ে থাকার কারণে তাদের সবাইকে আরও ছোট লাগছিল। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা জমাট বাঁধা অন্ধকারগুলোকে মনে হচ্ছিল উড়ছে এবং সেগুলোর উপরে অরগ্যানগুলো বাজছে। তাদের সীমাহীন বিচিত্রতা নিয়ে।                   
গির্জার বাইরে আসার পর সে গনজালেসকে দেখতে পেল।সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে শহরের দিকে যাচ্ছে।  
“আমি ভেবেছিলাম তুমি চলে গেছ,“ সে সাংবাদিককে বলল। “আমার এত দেরী দেখে।”
সে ব্যাখ্যা করতে শুরু করল যে, সে তার বন্ধুদের সাথে নির্ধারিত স্থানে দেখা করতে গিয়েছিল। এখান থেকে কাছেই। আটটা বাজার দশ মিনিট আগে। সেখানে সে তাদের জন্যে বিশ মিনিট অপেক্ষা করেছে, কিন্তু কাউকেই পায়নি।
“কিছু একটা হয়ত তাদেরকে আসতে দেয়নি। তুমি তো জানো যে, আমাদের ব্যবসায় অনেক ধরণের অপ্রত্যাশিত প্রতিবন্ধকতা আছে।“ 
সে পরেরদিন একই সময়ে আরেকটা মিটিঙের প্রস্তাব করল ওয়ার মেমোরিয়ালের পাশে। র‍্যাম্বার্ট দীর্ঘশ্বাস ফেলে হ্যাটকে তার মাথার উপরে স্থাপন করল। 
“এত হতাশ হয়ো না,” গনজালেশ হাসল। “তুমি বলের দিকপরিবর্তন, দৌড়ানো, পাস দেওয়া ইত্যাদি আনুষঙ্গিক বিষয় নিয়ে ভাবছ কেনো? তোমার উদ্দেশ্য হবে শুধু গোল করতে পারা।”
“ঠিক বলেছ,” র‍্যাম্বার্ট  মেনে নিল। কিন্তু খেলা তো মাত্র দেড় ঘন্টার।”
ওরানের ওয়ার মেমোরিয়ালের অবস্থান হতে সাগর দেখা যায়। এখান থেকে একটা এসপ্লানেড কিছুদূর গিয়ে সাগরপাড়ের একটা খাঁড়া পাহাড়ে গিয়ে মিশেছে। যেখান থেকে পোতাশ্রয় দেখা যায়। পরেরদিন র‍্যাম্বার্ট আবার প্রথমে সাক্ষাতের জায়গায় পৌঁছল। মেমোরিয়ালে পৌঁছেই সে যারা দেশের জন্যে প্রাণ দিয়েছে তাদের তালিকাটির উপরে চোখ বুলালো। কয়েক মিনিট পর দুইজন মানুষ হাঁটতে হাঁটতে সেখানে এলো। তার দিকে অসতর্কভাবে তাকাল। তারপর এসপ্লানেডের দেয়ালের উপরে হাত রেখে নিবিষ্টভাবে খালি পোতাশ্রয়ের দিকে তাকিয়ে থাকল। তাদের দুজনেই ছোট-স্লীভের জার্সি ও নীল ট্রাউজার পরেছিল। উচ্চতাও ছিল প্রায় একই। সাংবাদিক একটু সরে গিয়ে একটা পাথরের বেঞ্চিতে বসল। আরাম করে যুবকদেরকে দেখতে লাগল। দুজনেই কম বয়সী। বিশ বছরের বেশি হবে না।                
ঠিক এই সময়ে সে গনজালেসকে আসতে দেখল।
“এরা হলো আমাদের বন্ধু,” সে বলল, আসতে বিলম্ব হবার জন্যে দুঃখপ্রকাশ করে। তারপর সে যুবকদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিল। একজনের নাম মার্সেল। অন্যজনের নাম লুইস। দুজনে দেখতে এতোটাই একরকম যে, র‍্যাম্বার্ট নিশ্চিতভাবে তাদেরকে পরস্পরের ভাই বলে ধরে নিলো। 
“ঠিক আছে,” গনজালেস বলল,” তোমরা এখন কাজ নিয়ে কথা বলতে পারো। 
মার্সেল অথবা লুইস বলল যে, তাদের ডিউটি শুরু হবে দুইদিন পর। চলবে এক সপ্তাহ। এই সময়ের মধ্যে তারা দেখবে কোন রাত তাদের কাজের জন্যে সবচেয়ে ভালো হবে। সমস্যা হলো যে, পশ্চিম গেটে তাদের সাথে আরও দুজন প্রহরী দায়িত্ব পালন করে থাকে। তারা নিয়মিত সৈনিক। এই দুজনকে এড়িয়ে যেতে হবে। তাদেরকে নিলে খরচও বেড়ে যাবে। মার্সেল অথবা লুইস বলল যে, র‍্যাম্বার্টের জন্যে সবচেয়ে ভালো হয় যদি র‍্যাম্বার্ট তাদের সাথে অবস্থান করতে পারে। তাদের থাকার জায়গা হতে গেটের দূরত্ব মাত্র কয়েক মিনিটের পথ। সেখানে থাকতে হবে যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা এসে তাকে বলে যে, উপকূল তার পালিয়ে যাওয়ার জন্যে নিরাপদ। তবে এটা নিয়ে কোনো সময়ক্ষেপণ করা যাবে না। তারা শুনেছে যে, কর্তৃপক্ষ এই গেট হতে একটু দূরেই একটা সেন্ট্রিপোস্ট বসানোর চিন্তাভাবনা  করছে।
র‍্যাম্বার্ট রাজী হলো এবং তার অবশিষ্ট সিগারেটগুলো যুবকদেরকে দিলো।
তাদের একজন যে, এখনও কথা বলেনি, সে গনজালেসকে জিজ্ঞেস করল যে, খরচ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে কিনা এবং অগ্রীম কোনো টাকা দেওয়া হবে কিনা।
“না,” গনজালেস বলল,” তোমাদেরকে এবিষয়ে চিন্তা করতে হবে না। সে আমাদের একজন বন্ধু।”
“সে যাওয়ার আগে পরিশোধ করে যাবে।”
আরেকটা সাক্ষাতকারের ব্যবস্থা করা হলো। গনজালেস তাকে জানালো যে, একদিন পর তারা স্প্যানিশ রেস্টুরেন্টে একসাথে খাওয়াদাওয়া করবে। সেটি দুই যুবকের থাকার জায়গা হতে কাছে। “প্রথমরাতে আমি তোমার সাথে থাকব,” গনজালেস বলল।
পরেরদিন হোটেলে ফেরার সময়ে র‍্যাম্বার্টের  সাথে ত্যারুর দেখা হলো। সে হোটেলের সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসছিল। 
“তুমি কি আমার সাথে যাবে?” সে জিজ্ঞেস করল। “আমি রিও’র ওখানে যাচ্ছি। 
র‍্যাম্বার্ট ইতস্তত করল। 
“আমি তাকে আর বিরক্ত করতে চাই না।“ 
“আমার মনে হয় না এটা নিয়ে তোমার চিন্তিত হবার আছে। সে সবসময়েই তোমার প্রশংসা করে থাকে।“ 
সাংবাদিক চিন্তা করল এবং বলল,  “তোমার যদি আজ ডিনারের পর সময় থাকে, তাহলে তুমিই আসো না হোটেলে। আমার সাথে ড্রিংক করবে?”
“সেটা নির্ভর করবে রিও এবং প্লেগের উপরে,” ত্যারু বলল।                   
যাইহোক, সেদিন রাত এগারটায় রিও ও ত্যারু হোটেলের বারে প্রবেশ করল। প্রায় ত্রিশজন মানুষ ছিল সেখানে। সবাই উচ্চস্বরে কথা বলছিল। প্লেগ আক্রান্ত শহরের নির্জনতা থেকে এসে তারা এই শব্দ শুনে হতচকিত হলো এবং দরজায় দাঁড়িয়ে গেল। বুঝতে পারল যে, লিকার এখনো পরিবেশন না করার কারণে তারা চিৎকার চেঁচামেচি করছে। র‍্যাম্বার্ট খুব ঠান্ডা মাথায় একজন চিৎকার করা গ্রাহককে কনুই দিয়ে সরিয়ে দিয়ে তার বন্ধুদের জন্যে জায়গা  করে দিলো।  
“এই ধরণের গোলমেলে জায়গায় বসতে তোমাদের কি আপত্তি আছে?”
“না,”ত্যারু বলল, “ আসলে আমরা এমনটাই চাচ্ছিলাম।“  
রিও র‍্যাম্বার্টের দেওয়া ড্রিংকের ভেতরে দেওয়া তিক্ত বনজ লতাগুলো শুঁকে দেখল। 
চিৎকার চেঁচামেচির কারণে কথা শোনা যাচ্ছিল না। কিন্তু র‍্যাম্বার্টকে মনে হলো সে ড্রিংক করা ছাড়া আর কিছু নিয়েই ভাবছে না। ডাক্তার বুঝে উঠতে পারছিল না সে খুবই মাতাল হয়ে আছে কিনা।  পাশের টেবিলেই একজন নেভীর অফিসার তার দুইপাশে দুইজন মেয়ে নিয়ে বসেছিল। সে একজন লাল মুখের মোটা মানুষের কাছে কায়রো’র টাইফুস (typhus) মহামারি সম্পর্কে বর্ণনা করছিল। “স্থানীয়দের জন্যে তারা ক্যাম্প স্থাপন করেছিল। সেখানে রোগীদেরকে তাঁবুর ভেতরে রাখা হতো। চারপাশে পাহারা দিতো প্রহরীরা। স্থানীয়দের  পরিবারের কেউ যদি এসে রোগীদেরকে ওষুধ বা কিছু দেওয়ার চেষ্টা করত, তাহলে সেখানেই তাকে গুলি করে শেষ করে দেওয়া হতো। শুনতে একটু কঠিন লাগতে পারে।কিন্তু আমি জানি যে, এটা ছাড়া আর করার কিছু ছিল না।“ অন্য একটা টেবিলে কয়েকজন যুবক বসেছিল। তাদের কোনো কথাই বোঝা যাচ্ছিল না। 
“কী খবর তোমার? রিও উচ্চস্বরে বলল। 
“ এগোচ্ছে,” র‍্যাম্বার্ট বলল। “সম্ভবত এসপ্তাহেই হয়ে যাবে।“
“দুঃখজনক,” ত্যারু চিৎকার করে বলল। 
“কেনো?” 
“কারণ ত্যারুর মতে তুমি আমাদের জন্যে খুবই উপকারী হতে পারতে। কিন্তু ব্যক্তিগভাবে আমি জানি তোমার চলে যাবার ইচ্ছা কতটা প্রবল।“ 
ত্যারু দ্বিতীয় রাউন্ড ড্রিংক নিলো। 
র‍্যাম্বার্ট তার আসন হতে প্রথমবারের মতো উঠল এবং ত্যারুর চোখের ভেতরে তাকাল। 
“কীভাবে আমি উপকারী হতে পারতাম?” 
“অবশ্যই উপকারী হতে পারতে,” ত্যারু উত্তর করল। ”আমাদের কোনো একটি স্বাস্থকর্মীদের দলে যোগ দিয়ে।“ 
র‍্যাম্বার্টের মুখের প্রবল একগুঁয়েমিভাব ফিরে এলো। সে আবার তার আসনে গিয়ে বসল। 
“তুমি কি মনে করো না যে, স্বাস্থ্যকর্মীদের দল ভালো কাজ করছে?” ত্যারু জিজ্ঞেস করল। 
“অবশ্যই তারা করছে,“ সাংবাদিক উত্তর দিলো। 
রিও খেয়াল করল র‍্যাম্বার্টের হাত কাঁপছে। আজ সে প্রচুর ড্রিংক করেছে।

(এই পর্বের সমাপ্তি)

দ্য প্লেগ (প্রথম পর্ব)

দ্য প্লেগ (দ্বিতীয় পর্ব)

দ্য প্লেগ (তৃতীয় পর্ব)

দ্য প্লেগ (চতুর্থ পর্ব)

দ্য প্লেগ (পঞ্চম পর্ব)

দ্য প্লেগ (ষষ্ঠ পর্ব)

দ্য প্লেগ (সপ্তম পর্ব)

দ্য প্লেগ (অষ্টম পর্ব)

দ্য প্লেগ (নবম পর্ব)

দ্য প্লেগ (দশম পর্ব)

দ্য প্লেগ (একাদশ পর্ব)

দ্য প্লেগ (দ্বাদশ পর্ব)

দ্য প্লেগ ( ত্রয়োদশ পর্ব)

দ্য প্লেগ ( চতুর্দশ পর্ব)

দ্য প্লেগ (পঞ্চদশ পর্ব)

দ্য প্লেগ (ষোড়শ পর্ব)

দ্য প্লেগ (সপ্তদশ পর্ব)

দ্য প্লেগ (অষ্টদশ পর্ব)

দ্য প্লেগ  (ঊনবিংশ পর্ব)

দ্য প্লেগ  (বিংশ পর্ব)

দ্য প্লেগ  (একবিংশ পর্ব)

দ্য প্লেগ  (দ্বাবিংশ পর্ব)

দ্য প্লেগ  (ত্রয়োবিংশ পর্ব)

দ্য প্লেগ (চতুর্বিংশ পর্ব)

দ্য প্লেগ (পঞ্চবিংশ পর্ব)

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএইচ