দ্য প্লেগ (পর্ব ১৯)

দ্য প্লেগ (পর্ব ১৯)

মূলঃ আলবেয়ার কামু

অনুবাদঃ মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৮:২২ ২৬ জুলাই ২০২১   আপডেট: ১৮:২৩ ২৬ জুলাই ২০২১

ছবি: কোয়ারেন্টাইন ইন ওরান

ছবি: কোয়ারেন্টাইন ইন ওরান

শুধু র‍্যাম্বার্ট নয়, অন্যরাও এই ক্রমবর্ধমান বেদনাদায়ক পরিস্থিতি হতে পালানোর চেষ্টা করছিল, যদিও তাদের উল্লেখযোগ্য কোনো সাফল্যই ছিল না। র‍্যাম্বার্ট তার যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিল সকল কর্তৃপক্ষের সাথে। সে বিশ্বাস করত, শেষপর্যন্ত অধ্যাবসায়েরই জয় হয়ে থাকে। বিষয়টি তার আচরণ ও কথাবার্তার ভেতরেও প্রকাশ পেত। সে একের পর এক সাক্ষাৎ করছিল সকল ধরণের কর্মকর্তা ও অন্যান্যদের সাথে। কিন্তু স্বাভাবিক সময়ে তারা যথেষ্টই প্রভাবশালী হলেও এই সময়ে তাদের প্রভাব কাজ করছিল না। কারণ, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা রফতানি, ব্যাংকিং, ফল অথবা মদের ব্যবসা ইত্যাদি সম্পর্কে ভালো ধারনার অধিকারী হলেও প্লেগ বিষয়ে তাদের যোগ্যতা ছিল শূন্য।

যাই হোক, সুযোগ পেলেই র‍্যাম্বার্ট তার কারণগুলো তাদের কাছে উপস্থাপন করত। তার যুক্তিগুলোর সারমর্মও সবসময়েই একই থাকত। সেটা ছিল যে, এই শহরে সে একজন আগন্তক; কাজেই তার বিষয়টি বিশেষ বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে। সে যাদের সাথে কথা বলত, তারা প্রায় সময়েই তার যুক্তিগুলো সঙ্গে সঙ্গে মেনে নিত। কিন্তু বলত যে, র‍্যাম্বার্টের মতো আরও অনেকেই এই শহরে আছে। কাজেই র‍্যাম্বার্টের বিষয়টা ততটা ব্যতিক্রমী নয়, যতটা সে ভাবছে। এর বিপরীতে র‍্যাম্বার্ট হয়ত উত্তর করতে পারত যে, তাদের উত্তর তার যুক্তিকে কোনোভাবেই খণ্ডন করে না। তারা এটাও বলত যে, অন্যেরা যেহেতু বিষয়টি নিয়ে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলতে পারে, সেহেতু তাদের অবস্থান থেকে কোনোকিছু করা  দুষ্কর। বিশেষকরে বিষয়টি যখন অন্যদের জন্যে ‘নজীর’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

রিও’র সাথে আলাপচারিতার সময়ে র‍্যাম্বার্ট যাদের কাছে গিয়েছিল, তাদেরকে কয়েকটি শ্রেণীতে ভাগ করেছিল। উপরের যুক্তি যারা দিত, র‍্যাম্বার্ট তাদেরকে ডাকত ‘একগুঁয়ে’ (sticklers)। যারা তাকে বলত যে, বর্তমান পরিস্থিতি বেশীদিন বিরাজ করবে না, র‍্যাম্বার্ট তাদেরকে ‘সান্ত্বনাদানকারী’ (consolers) হিসেবে অভিহিত করত। এদেরকে অনুরোধ করলেই তারা বলত যে, র‍্যাম্বার্ট খামাখা একটা অস্থায়ী সমস্যা নিয়ে মন খারাপ করছে। এর বাইরে ছিল নগর কর্তৃপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাগণ। তারা তাকে সমস্যার বিষয়ে একটি সংক্ষিপ্ত নোট রেখে যেতে বলত। জানাত যে, যথাসময়ে তার বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে। সর্বশেষ দলের নাম দিয়েছিল সে ট্রাডিশনালিস্ট  (traditionalists)। এদের সংখ্যাই ছিল সবচেয়ে বেশী। এরা তাকে অন্য অফিসে যেতে বা অন্যপন্থা অবলম্বন করতে সুপারিশ করত।

এই সকল অসার্থক সাক্ষাতগুলো র‍্যাম্বার্টকে খুবই ক্লান্ত করে দিয়েছিল। তার লাভ হয়েছিল একটাই। নগরপ্রধানের অফিস ও মিউনিসিপ্যাল অফিস কিভাবে কাজ করে থাকে, সে সম্পর্কে  একটা সম্যক ধারনা জন্মেছিল। তবে তার ব্যর্থতা থেকে সে একটা জিনিস শিখেছিল। তা হলো কীভাবে নিজের সমস্যা থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখতে হয়। এই কাজে ব্যস্ত থাকার কারণেপ্লেগে আক্রান্তের সংখ্যা যে দ্রুত বাড়ছিল, এটাও তার দৃষ্টি এড়িয়ে গিয়েছিল। ফলে তার দিনগুলো কেটে যাচ্ছিল দ্রুততার সংগে। বলা যেতে পারে, শহরের মানুষেরা মৃত্যুকে এড়িয়ে প্রতিদিনের শেষে বেঁচে থাকাটাকেই মুখ্য বলে ধরে নিয়েছিল। এই মৃত্যগুলোর মধ্যদিয়ে তাদের শাস্তির সমাপ্তি ঘটছে বলেও তারা মনে করত। রিও’র সাথে এটাই ছিল তাদের বড় পার্থক্য। রিও কখনোই তাদের মতো চিন্তা করত না। তার কাছে মনে হতো যে, জীবনের সত্যকে এতো সহজভাবে ব্যাখ্যা করার অবকাশ নেই।

একবার র‍্যাম্বার্টের মনে আশার আলো জেগেছিল। সেসময়ে নগর প্রধানের অফিস থেকে তার কাছে একটি ফরম পাঠানো হয়েছিল। সেটির খালিস্থানগুলো পূরণ করে দেয়ার জন্যে। এতে তার পরিচয়, পরিবার, তার বর্তমান ও অতীত আয়ের উৎস ইত্যাদি সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়েছিল। এটা থেকে তার ভেতরে ধারণা জন্মেছিল যে, কর্তৃপক্ষ তালিকা করছেন সেই সব মানুষদের, যাদেরকে শহর ত্যাগ করে নিজেদের বাড়িতে ফিরে যাবার অনুমতি দেওয়া হতে পারে। এই অফিসগুলোর কর্মচারীরাও তার ধারনাকে নিশ্চিত করেছিল। কিন্তু বিষয়টির ভেতরে ঢোকার পর শেষপর্যন্ত সে আবিষ্কার করেছিল যে, এই তালিকা আসলে করা হচ্ছিল অন্য কারণে। কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী তা ছিল জরুরী অবস্থার জন্যে।

“কী ধরণের জরুরী অবস্থা?” সে জিজ্ঞেস করেছিল।

তাকে জানানো হয়েছিল যে, যদি সে অসুস্থ হয়ে মারা যায়, সেক্ষত্রে এই তথ্য কর্তৃপক্ষকে সাহায্য করবে তার পরিবারকে অবহিত করতে। এছাড়াও এই তথ্য থেকে তারা সিদ্ধান্ত নিতে পারবে যে, মৃত্যুর পর তার হাসপাতালের খরচ নগর কর্তৃপক্ষ বহন করবে, নাকি তার আত্নীয়স্বজনদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হবে। বিষয়টি র‍্যাম্বার্টকে যারপরনাই বিস্ময়াভিভূত করেছিল। তার মনে হয়েছিল এরকম একটা দুর্বিপাকের সময়ে একটা অফিস কেমন করে  এমন বিষয় নিয়ে কাজ করতে পারে, যার সাথে দুর্বিপাকের তাৎক্ষণিক কোনো সম্পর্কই নেই।

পরবর্তী পর্যায়টি ছিল র‍্যাম্বার্টের যুগপৎভাবে সহজ ও সবচেয়ে কঠিন। সময়টা ছিল আসলেই অবসাদের। বিভিন্ন অফিসে ঘোরাঘুরির পর সে বুঝতে পেরেছিল যে, তার জন্যে সকল পথই  বন্ধ হয়ে গেছে। সুতরাং সে উদ্দেশ্যহীনভাবে এক ক্যাফে হতে অন্য ক্যাফেতে যাওয়া-আসা করছিল। সকালে সে এগুলোর কোনো একটির উঠোনে বসত। খবরের কাগজ পড়ত। আশা নিয়ে যে, তাতে প্লেগ শেষ হবার সংকেত নিয়ে কোনো সংবাদ থাকতে পারে। পথচারীদের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকত। বারংবার রাস্তার অপরপাশের দোকানের নামগুলো পড়ত। জনপ্রিয় পানীয়গুলোর বিজ্ঞাপন পড়ত। এগুলো এখন আর এই শহরে পাওয়া যেত না। তারপর সেখান থেকে উঠে শহরের হলুদ রাস্তায় উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটাহাঁটি করত। এভাবে সে রাতের আগমন পর্যন্ত সময় পার করত। সন্ধ্যার পর আবার শহরের মধ্যে ঘুরাঘুরি করত। এক ক্যাফে বা রেস্টুরেন্ট হতে অন্যটাতে যেত।

একদিন বিকেলে রিও তাকে একটা ক্যাফের দরজার পাশে ঘুরাঘুরি করতে দেখতে পেয়েছিল। ভেতরে ঢুকবে কিনা সে সম্পর্কে দ্বিধাগ্রস্ত। অবশেষে সে  ভেতরে ঢুকেছিল এবং রুমের পেছনের দিকের একটা টেবিলে বসেছিল। এই সময়ে কর্তৃপক্ষের নির্দেশে ক্যাফের মালিকেরা বাতি জ্বালানো বন্ধ রেখেছিল। ফলে গোধূলির বাদামি আলো রুমের ভেতরে প্রবেশ করছিল। দেয়ালের আয়নায় সূর্যাস্তের গোলাপি আলো দেখা যাচ্ছিল এবং অন্ধকারের ভেতরে মার্বেলের টেবিলগুলো সাদা আভা নিয়ে চকচক করছিল। রিও’র কাছে খালি ক্যাফের ভেতরে র‍্যাম্বার্টকে খুবই বিষণ্ণ মনে হচ্ছিল। তাকে দেখাচ্ছিল ছায়ার ভেতরে প্রতিচ্ছায়ার মতো। রিও’র মনে হয়েছিল যে, সেই সময়েই সে সবচেয়ে বেশী অবরুদ্ধ বলে ভাবছিল। বাস্তবক্ষেত্রেও দিনের এই সময়েই শহরের সকল বন্দি মানুষেরা নিজেদেরকে সবচেয়ে বেশী অবরুদ্ধ মনে করত। প্রত্যেকেই ভাবত যে, কিছু একটা করা দরকার, যা তাদের মুক্তিকে ত্বরান্বিত করবে।  রিও দ্রুত সেখান হতে চলে এসেছিল।

র‍্যাম্বার্ট তার সময়ের একটা নির্দিষ্ট অংশ রেলস্টেশনেও কাটাত। স্টেশনটির প্লাটফর্মে ঢুকতে দেওয়া হতো না। তবে ওয়েটিং রুমগুলোতে প্রবেশ করা যেত। সেগুলো সারাক্ষণ খোলা থাকত। ভেতরে ঠান্ডা ও অন্ধকারাচ্ছন্ন থাকার কারণে গরমের দিনগুলোতে ভিক্ষুকেরা সেখানে অবস্থান করত। এখানে দাঁড়িয়ে র‍্যাম্বার্ট সময়ক্ষেপণ করত ট্রেনের টাইমটেবিল, থুথু ফেলার বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা এবং যাত্রীদের জন্যে নিয়মকানুন পড়ে।

এরপর সে ওয়েটিং রুমটির একটা কর্ণারে বসত। রুমটির কেন্দ্রস্থলে ছিল একটি মরিচাধরা লোহার স্টোভ। মাসের পর মাস যা ব্যবহার করা হয়নি। ভূমিচিহ্নের মতো সেটি সেখানে দাঁড়িয়েছিল। রুমের মেঝের উপরে অনেক আগে  করা পাথরের কারুকাজগুলো বিবর্ণ হয়ে গিয়েছিল। দেয়ালের গায়ে সাঁটা পোস্টারগুলো পর্যটকদেরকে আমন্ত্রণ জানাত। ‘ক্যানেস’ অথবা ‘বানদল’-এ ছুটি কাটাতে যাওয়ার জন্যে। রুমের কর্নারে বসে র‍্যাম্বার্ট তার পূর্ব স্মৃতিগুলো রোমন্থন করত এবং সামগ্রিক বিচ্ছেদ-বেদনা হতে সৃষ্ট মুক্তির আস্বাদন নিত। সেসময়ে তার চোখের সামনে ভেসে উঠতো সারি সারি পুরোনো পাথর, নদীর তীর, রাজপ্রাসাদের কবুতর, প্যারিস শহরের প্রান্তিক রেলস্টেশন ‘গার দ্যু নর’, রোম শহরের ‘প্যান্থিয়ন’ স্মৃতিস্তম্ভের চারপাশের পুরনো রাস্তাগুলো এবং আরও অনেক দৃশ্যাবলী। এই মানসিক ছবিগুলো কাজ করার ইচ্ছাগুলোকে হত্যা করত।

রিও বুঝতে পেরেছিল  যে, র‍্যাম্বার্ট  ভালবাসার অসহায়তা থেকে স্মৃতিগুলোকে  রোমন্থন করত। ফলে একদিন যখন র‍্যাম্বার্ট তাকে বলল যে, সে সকাল চারটার দিকে ঘুম থেকে উঠে তার প্রিয় শহর প্যারিস সম্পর্কে ভাবতে ভালোবাসে, রিও সহজেই বুঝতে পারল যে, সে আসলে সে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া মেয়েটির সাথে তার অতিক্রান্ত সময়কে কল্পনা করার চেষ্টা করছে। নিঃসন্দেহে শুধুমাত্র এই সময়েই সে নিশ্চিতভাবে অনুভব করত যে, মেয়েটি শুধু তারই।

দ্য প্লেগ (প্রথম পর্ব)

দ্য প্লেগ (দ্বিতীয় পর্ব)

দ্য প্লেগ (তৃতীয় পর্ব)

দ্য প্লেগ (চতুর্থ পর্ব)

দ্য প্লেগ (পঞ্চম পর্ব)

দ্য প্লেগ (ষষ্ঠ পর্ব)

দ্য প্লেগ (সপ্তম পর্ব)

দ্য প্লেগ (অষ্টম পর্ব)

দ্য প্লেগ (নবম পর্ব)

দ্য প্লেগ (দশম পর্ব)

দ্য প্লেগ (একাদশ পর্ব)

দ্য প্লেগ (দ্বাদশ পর্ব)

দ্য প্লেগ ( ত্রয়োদশ পর্ব)

দ্য প্লেগ ( চতুর্দশ পর্ব)

দ্য প্লেগ (পঞ্চদশ পর্ব)

দ্য প্লেগ (ষোড়শ পর্ব)

দ্য প্লেগ (সপ্তদশ পর্ব)

দ্য প্লেগ (অষ্টদশ পর্ব)

 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএইচ