গানের পাখি 

গানের পাখি 

মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৪:৪৩ ২৫ জুলাই ২০২১   আপডেট: ১৫:০০ ২৫ জুলাই ২০২১

ছবি: সাইফুল আলম

ছবি: সাইফুল আলম

‘ওরা হয়ত পালটে দিতে চায় পৃথিবীকে,
কিন্তু কিভাবে পালটাতে হবে, বুঝতে পারে না।’ - প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত

আমার শৈশবে কয়েকজন মানুষ আমার মনের ওপরে প্রবল প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিলেন। সফরদ্দি ভাই তাদের অন্যতম। তিনি ছিলেন বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী একজন শিল্পী। তাকে ছাড়া আমাদের এলাকার সাংস্কৃতিক অঙ্গন ছিল নীরব-নিথর। গান, বাজনা, অভিনয়, নৃত্য, হারমোনিয়াম, খঞ্জনী বা ঢোল বাজানো, সঙ সাজা সকল কিছুতেই তার প্রতিভা ও দক্ষতা ছিল অসাধারণ। অথচ কেউ তাকে কোনোদিনই শেখায়নি। 

১৯৭২/৭৩ সাল। শীতকাল। আমাদের বাড়ির পাশেই স্কুল। ২০০ গজ দূরত্বে। ঝাড় কাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ঝাড় কাটা বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়। আমি ক্লাস টু/থ্রিতে পড়ি। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। হারুন স্যার প্রধান শিক্ষক। আমার পিতা ঝাড়কাটা বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। আমার এক চাচা স্কুলের শারীরিক শিক্ষার শিক্ষক। গ্রামের স্কুল হিসেবে অধিকাংশ শিক্ষকরাই স্থানীয়। তারাও কোন না কোনোভাবে আমার পরিচিত। এমনকি স্কুলের অধিকাংশ ছাত্ররাও। বেশ কয়েকজন আমাদের বাড়িতে ও আমাদের আশেপাশের বাড়িতে জায়গীর থেকে পড়াশোনা করে। সুতরাং হাইস্কুলেও আমার অবাধ যাতায়াত। বিকেলের সময়টা আমি হাইস্কুলের মাঠেই খেলাধুলা করে কাটাই।

প্রতিবছর বার্ষিক পরীক্ষার পর হাইস্কুলের ছাত্ররা একটা বিচিত্রানুষ্ঠান ও একটা নাটক মঞ্চস্থ করে। ডিসেম্বর মাসের শীতের রাতে। এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিসহ সবাই আসে এই অনুষ্ঠান উপভোগ করতে। হাইস্কুল মাঠের মাঝখানে বিভিন্ন বাড়ি থেকে আনা কয়েকটা চৌকি জোড়া দিয়ে তৈরি করা হয় একটা কাঠের মঞ্চ। প্রায় মাস খানেক সময় ধরে এই মঞ্চের উপরে বা স্কুলের কমনরুমে অনুশীলন চলে। সন্ধ্যার পর। হারিকেন বাতি বা হ্যাজাকের আলোতে। রাত নয়-দশটা পর্যন্ত। গ্রাম এলাকা হিসেবে রাত দশটা মানে  গভীর রাত। আমি প্রতিদিন বিচিত্রানুষ্ঠান ও নাটকের অনুশীলন দেখতে যাই। বাড়ির কাছে হবার কারণে।  অনুশীলন দেখতে দেখতে নাটকের প্রতিটা চরিত্র আমার মুখস্ত হয়ে যায়। এমনকি বিচিত্রানুষ্ঠানের বিভিন্ন আইটেমগুলোও।  

সেই বছরের অনুষ্ঠানগুলোর একটা বিশেষ গুরুত্ব ছিল। জামালপুর মহকুমা শিক্ষা কর্মকর্তা পরিদর্শনে এসেছিলেন। তার সম্মানেই সেবারে স্কুলের মাঠে মঞ্চ বা প্যান্ডেল তৈরি করে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং তারপর নাটকের  আয়োজন করা হয়েছিল। রাতের বেলায় হ্যাজাকের আলোয় ঝলমল করছিল প্যান্ডেলটা। অনুষ্ঠানটার কথাও আমার স্পষ্ট মনে আছে। কারণ জীবনে সেই প্রথমবার আমি কোন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছিলাম। শুধু তাই নয়, মহকুমা শিক্ষা কর্মকর্তার নিকট হতে পুরস্কার গ্রহণ করেছিলাম। কবিতা আবৃত্তিতে। কবিতাটির  নাম ছিল ‘সবার আমি ছাত্র’। কবি সুনির্মল বসু। কবিতার শেষ পঙক্তি আমার এখনও স্পষ্ট মনে আছে: ‘বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর,/ সবার আমি ছাত্র,/ নানান ভাবে নতুন জিনিস/ শিখছি দিবারাত্র।/ এই পৃথিবীর বিরাট খাতায়,/ পাঠ্য যেসব পাতায় পাতায়/ শিখছি সে সব কৌতূহলে,/নেই দ্বিধা লেশমাত্র।’ 

আমার পাওয়া পুরস্কারের বইটা ছিল একটা বাংলা শিশুতোষ গল্পের বই। পল্লীকবি জসীম উদদীনের সম্পাদনায় প্রকাশিত। ‘বাঙালীর হাসির গল্প’। নিউজপ্রিন্ট এডিশন। প্রচ্ছদটা মনমাতানো রঙিন। ভেতরের গল্পগুলো অসাধারণ। হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে যাবার জোগাড়। ভয়ে অথবা আনন্দে কাঁপতে কাঁপতে আমি মহকুমা শিক্ষা কর্মকর্তার হাত থেকে পুরস্কার গ্রহণ করেছিলাম। সে রাতে  আমি ঘুমাতে পারিনি। উত্তেজনার কারণে। এখনও স্পষ্ট মনে আছে। প্রথম পুরষ্কারের স্মৃতি অমলিন থাকে চিরকাল।

সফরদ্দি ভাই ঝাড়কাটা হাইস্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র। আমাদের পাশের গ্রামের ছেলে। ওই সময়েই সে একজন পূর্ণ যুবক। অন্তত আমার চোখে। অবশ্য স্কুলের কোন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের জন্যে সেই সময়ে কোন নির্দিষ্ট স্কুল বা শ্রেণির ছাত্র হবার দরকার পড়ত না। শুধু পারদর্শী হলেই হত। যেমন আমি প্রাইমারি স্কুলের ছাত্র হওয়া স্বত্ত্বেও অংশগ্রহণ করেছিলাম। আমাদের বাড়ি থেকে দুই মাইল পশ্চিমে যমুনা নদী। বিশাল সেই নদী। এক পার থেকে অন্য পার দৃশ্যমান নয়। নদীর অপর পারের সারিয়াকান্দা থানার ‘চন্দনবাইশা’ স্কুলের  একজনও স্কুলের সেই বিচিত্রা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছিল। কারণ সে অসাধারণ পল্লীগীতি গাইতে পারতো।  সে এসেছিল  তার এক আত্নীয়ের বাড়িতে। আমাদের এলাকায়।

শুধু আমাদের স্কুলে নয়। পুরো শীতকাল জুড়ে আমাদের স্কুল, পার্শ্ববর্তী তেঘরিয়া স্কুল, মহিষবাথান স্কুল, বালিজুরি স্কুল, আশেক মাহমুদ স্কুল, গুনারীতলা স্কুল, জোরখালী স্কুল- সকল স্কুলে বিচিত্রা অনুষ্ঠান, নাটক, জারীগান, সারিগান এমনকি যাত্রা অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হতো। সফরদ্দি ভাই ছিলেন এই সবগুলো স্কুলের অনুষ্ঠানগুলোরই মধ্যমণি। 

ঢোল, তবলা, খঞ্জনী আর হারমোনিয়াম ছাড়া আর কোনো বাদ্যযন্ত্র অনুষ্ঠানগুলোতে ব্যবহার করা হতো  না। আধুনিক যন্ত্রপাতির প্রচলন ছিল না। অন্তত  অন্যত্র থাকলেও আমাদের এলাকায় তখনো আসেনি। আসতে হয়ত আরো সময় লেগে গিয়েছিল আরো কয়েক যুগ। পল্লী বিদ্যুতের সংযোগের মত। কিন্তু তাতে কি? সফরদ্দি ভাই ডান হাতের তর্জনী আর নিজের ওষ্ঠ ব্যবহার করে যেকোনো যন্ত্রের চেয়েই সুমধুর শব্দতরঙ্গ সৃষ্টি করতে পারতেন। বাজাতে পারতেন দোতরা। বেহালার সুরও। তার সুরতরঙ্গে এলাকার আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সবাই মুগ্ধ ও বিমোহিত হয়ে যেত।

সন্ধ্যার পর নগরের তুলনায় গ্রামের ভেতরে অনেক দ্রুত অন্ধকার ঘনিয়ে আসে। মাগরিব নামাজের কিছুক্ষণ পরেই ঝাড়কাটা স্কুল মাঠের দক্ষিণ দিকে অবস্থিত বাজার ভেঙে যায়।  বাজারের ভেতরের উচ্চকিত শব্দগুলো চারদিকে  ক্রমশ ছড়িয়ে পড়তে পড়তে এক সময়ে বিলীন হয়ে যায়। পরিবর্তে ঝাড়কাটা স্কুল মাঠের কেন্দ্রস্থলে স্থাপিত মঞ্চের চারপাশে মানুষের ভিড় জমতে থাকে। আটটা কাঠের চৌকি পাশাপাশি স্থাপন করে বর্গাকৃতির চতুষ্কোণ  মঞ্চ তৈরি করা হয়েছে। উপরে টাঙানো হয়েছে রঙিন সামিয়ানা। ফ্রিল দেওয়া। মঞ্চের চার কোণায় চারটা থাম। থামের গায়েও লাগানো হয়েছে লাল, নীল, সবুজ কাগজ। প্যান্ডেলের চারকোণায় চারটে হ্যাজাক বাতি। আলোতে ঝিকমিক করছে চারদিক।  কয়েকটা বিশাল বিশাল বাঁশ জোড়া দিয়ে একটা টাওয়ার তৈরি করা হয়েছে। টাওয়ারের মাথা থেকে অজস্র রশি দিয়ে মাঠের চার প্রান্তদেশে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। প্রতিটা রশিতে এক হাত পর পর ঝুলছে তিন কোণা পতাকা। মহা আনন্দিত পরিবেশ। 

সামিয়ানার নিচে মঞ্চের মেঝের উপরে এক লম্বা টেবিল। সাদা চাদরে আবৃত। দূর থেকে দেখতে ঢাউস সাইজের রেডিওর মতন লাগে। বেশিরভাগ দর্শকেরা না জানলেও আমি জানি এর ভেতরে বসে আছেন সফরদ্দি ভাই। অনুশীলনের সময়ে দেখেছি।  অনুষ্ঠান শুরু হল সন্ধ্যা ঠিক সাতটায়। সূর্যাস্তের পর। সফরদ্দি ভাই রেডিওর অন্তরাল হতে প্রতিদিনের খবর পাঠ (যা তিনি নিজেই আমাদের এলাকার দৈনন্দিন জীবনযাত্রা থেকে রচনা করেছেন) দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু করলেন।  এলাকার প্রবীণ, বিখ্যাত, অখ্যাত মানুষদের কর্মকাণ্ড থেকে শুরু করে মাছের বাজারের খবর, বিয়ের খবর, এলাকার মারামারি-কাটাকাটি কোনোকিছুই বাদ নেই। সফরদ্দি ভাই প্রবল প্রতিভা এবং কল্পনাশক্তি দিয়ে প্রবল রসিকতার সাথে এলাকার প্রাত্যহিক জীবন চিত্র ফুটিয়ে তুলছেন শুধু তার মুখ নিঃসৃত শব্দমালার মধ্য দিয়ে। হাসতে হাসতে কুটি কুটি সমগ্র এলাকার জনগণ। আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা সবাই। সবার গল্পই ছিল সফরদ্দি ভাইয়ের খবরের ভেতরে। 

অনুষ্ঠানের পরের অংশ। সফরদ্দি ভাই একাধারে পুরুষ ও নারী কন্ঠ ধারণ করে আব্দুল আলিম হয়ে ভাওয়াইয়া বা পল্লীগীতি গাচ্ছেন। ‘ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দে রে’ অথবা ‘রুপালী নদীরে রুপ দেইখ্যা তোর হইয়াছি পাগল’। আবার  কখনও ফেরদৌসি রহমান সেজে  সেই উদাসী গান ‘ওকি গাড়িয়াল ভাই, হাঁকাও গাড়ি তুমি চিলমারির বন্দরে’। পরক্ষণেই আবার সাবিনা ইয়াসমিনের ঠান্ডা লাগা কন্ঠে সিনেমার গান ‘অশ্রু দিয়ে লেখা এ গান যেন ভুলে যেও না...’। কখনও পুরুষ কন্ঠে। কখনও নারী কন্ঠে। তার গানের তালে তালে স্পন্দিত হচ্ছে উপস্থিত সবার মনপ্রাণ। সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মত তাকিয়ে স্টেজের দিকে। পতঙ্গ হলে তারা হয়ত বা ছুটেই যেত। হ্যাজাকের আলোতে বিশালাকার চতুষ্কোণ সাদা রেডিওকে মনে হয় মায়াবী জাদুর বাক্স। ভিন্ন পৃথিবী থেকে আনা। মনে হয় মুহূর্তেই বাক্সের ভেতর থেকে বের হয়ে এসে ভিনগ্রহের  শিল্পীরা ষ্টেজের উপরে দাঁড়িয়ে গান পরিবেশন শুরু করবে। আমরা সবাই অপেক্ষা  করছি তাদের বেড়িয়ে আসার। কিন্তু পূর্ণ এক ঘণ্টা পরিবেশনা শেষ হবার পর সেখান থেকে বের হয়ে আসলেন শুধু সফরদ্দি ভাই। মুহূর্তের স্থবিরতা। কিছুটা আশাভঙ্গ হবার কারণে। পরের মুহূর্তেই  মুহুর্মুহু হাততালি। প্রধান অতিথিসহ সবাই মন্ত্রচালিতের মতো দাঁড়িয়ে গেছে নিজ নিজ আসন থেকে। সফরদ্দি ভাইকে দেখার জন্যে।

রাত ক্রমশ গভীর হয়ে আসে। শুরু হয় স্কুলের ছাত্রদের পরিচালনায় নাটকের পর্ব। এখানেও সফরদ্দি ভাই মধ্যমনি। কখনও স্টেজের উপরে, কখনও স্টেজের  নিচে অবস্থান করে তিনি তার ইনডিজেনাস পদ্ধতি ব্যবহার করে নাটকের ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক বাজাচ্ছেন। নাটকের প্রতিটি অংকের শেষে  নিজেই স্টেজের উপরে এসে ভাঁড়ের সাজে দর্শককুলকে আনন্দ দিচ্ছেন। অথবা নাটকের শেষ অংকে সন্ন্যাসীর বেশে দোতরা হাতে ভক্তিমুলক গান ‘কর মনে ভক্তি মায়ে, থাকতে হাতে দিন…’ গেয়ে দর্শকদের চোখকে অশ্রুসিক্ত করে তুলছেন।

অনুষ্ঠান শেষে মহকুমা শিক্ষা অফিসার তার জন্যে নির্ধারিত সময়ের পূর্বেই প্যান্ডেলে উঠে যেয়ে সফরদ্দি ভাইকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। মুহূর্তের ভেতরে সফরদ্দি ভাইয়ের জন্যে আমাদের সবার বুক গর্বে ফুলে গেল। স্কুলের হেড স্যারও ভীষণ খুশি। শিক্ষা অফিসার নিশ্চয়ই স্কুলের উন্নয়নের জন্যে বড় ধরণের বরাদ্দ দিয়ে যাবেন। 

১৯৭১ সনে সফরদ্দি ভাই একটা  গানের দলের সদস্য হিসেবে বিভিন্ন  স্কুলে ও বাজারে মুক্তিযুদ্ধের গান গেয়ে বেড়াতেন। 'মোরা একটি ফুলকে বাঁচাব বলে যুদ্ধ করি' অথবা 'মুজিব বাইয়া যাও রে' গানের অনুরণনে আমাদের এলাকার কিশোর ও যুবকেরা রাতের আঁধারে যমুনা নদী দিয়ে উজান বেয়ে ভারতে চলে যেত। মুক্তিযোদ্ধা  হিসেবে ট্রেনিং নিয়ে ফিরে আসার জন্যে। মাত্র নয় মাস সময়কালেই আমাদের দেশ স্বাধীন হয়ে গিয়েছিল।  

যুদ্ধের বছরে স্কুল বন্ধ থাকার কারণে  ম্যাট্রিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়নি। ১৯৭২ সনে এই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছিলো। সফরদ্দি ভাই এই পরীক্ষায় সেকেন্ড ডিভিশন অর্জন করলেও পরীক্ষায় নকল হওয়ার অভিযোগে এই পাশের তেমন কোনো মূল্য ছিল না। ৭৩/৭৪ সনে সেনাবাহিনী অথবা জাতীয় রক্ষী বাহিনীতে লোক ভর্তি করা হচ্ছিল। আমি একদিন স্কুলের মাঠে যেয়ে দেখি সফরদ্দি ভাই স্কুলঘরের বারান্দার কাঠের ধর্না ধরে ঝুলছেন। তার সমস্ত শরীর ঘর্মাক্ত। সেনাবাহিনী অথবা জাতীয় রক্ষী বাহিনীতে ভর্তি হতে চান তিনি। কিন্তু উচ্চতা এক ইঞ্চি কম। 

আরো কয়েক বছর পরের কথা। সফরদ্দি ভাইয়ের বাবা মারা গেছেন। তাদের বেশিরভাগ জমিই ছিল কয়লাকান্দির চরে। একবার নদীর প্রবল ভাঙনে তাদের প্রায় সবটুকু জমিই  যমুনা নদীর গ্রাসে চলে গিয়েছিল। সুতরাং তাকে নতুন করে জীবনযুদ্ধে অবতীর্ণ  হতে হয়েছিল। কয়েকটা হাটবারকে ঘিরে চলত  তার জীবিকা নির্বাহের সংগ্রাম। তেঘরিয়া, বালিজুরি, মেলান্দহ বাজার, জুনাইল- এই সকল হাটে সফরদ্দি ভাই গমনাগমন করতেন। গান গেয়ে অন্যদের মনোরঞ্জন করে জীবিকা নির্বাহ করতেন।  

১৯৭৮ সাল। ক্যাডেট কলেজের অষ্টম শ্রেণিতে পড়ি। টার্ম শেষ ছুটিতে বাড়িতে এসেছি। বুধবার  বিকেলে হাটের দিনে তেঘরিয়া বাজারে গেলাম হাঁটতে হাঁটতে। গোল বৃত্তাকারে লোকজন ভিড় করে আছে। প্রবল অনুসন্ধিৎসা থেকে  লোকজনের ফাঁক দিয়ে ঢুকে বৃত্তের পরিধির ভেতরে গিয়ে দাঁড়ালাম।  দেখলাম বৃত্তের কেন্দ্রে সফরদ্দি ভাই। ডুগডুগি হাতে নেচে নেচে ঘুরে ঘুরে গান গাচ্ছেন। কবিরাজি ঔষধ বিক্রি করছেন। তার মাথা ভর্তি বাবরি চুল। একাগছি চুল তার মুখের উপরে নেমে এসেছে। মুখ বোঝাই যাচ্ছে না। আমাকে দেখেও তিনি খেয়াল করেন না অথবা তিনি কাউকেই দেখতে পান না। চারদিকের ভিড় ছাপিয়ে সেই দৃষ্টি চলে গেছে অন্যকোথাও। হয়ত বা ভিন্ন কোনো জগতে!

সফরদ্দি ভাইয়ের গান আর ডুগডুগির তালে বাজারের লোকেরা মোহাচ্ছন্ন হয়ে আছে। সেই পূর্বের মত। হাটের ধুলো-ঘূর্ণি তাকে ক্রমশ ঢেকে ফেলছে। ক্রমে তিনি অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছেন। অদৃশ্য কোন রেডিও থেকে যেন ভেসে আসছে তার কণ্ঠস্বর! 

বাড়িতে ফিরে আসতে আসতে আমার ভেতরে একটা দার্শনিক তত্ত্বের উদয় হয়। মনে হয় সফরদ্দিদের জন্য জীবন কখনই বৃত্তান্ত রচনা করে না। বরং সফরদ্দিরাই সারা জীবনভর নতুন নতুন সব বৃত্তান্তের জন্ম দিতে থাকে। জল-হাওয়া-জনপদের ভিতর।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেডআর