দ্য প্লেগ (পর্ব-১৮)

দ্য প্লেগ (পর্ব-১৮)

মূলঃ আলবেয়ার কামু

অনুবাদঃ মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ০৮:৫৪ ১৬ জুলাই ২০২১   আপডেট: ০৯:০৬ ১৬ জুলাই ২০২১

ছবিঃ ওরানের কোয়ারেনটাইন

ছবিঃ ওরানের কোয়ারেনটাইন

ধর্মাপদেশ অনুষ্ঠানের কয়েকদিন পর। রিও শহরের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোর একটিতে যাচ্ছিল। গ্র্যান্ডের সাথে। হঠাত করে সে অন্ধকারে একটি লোকের সাথে ধাক্কা খেলো। লোকটি ফুটপাথের মধ্যখানে দাঁড়িয়েছিল। এদিক-সেদিক দুলছিল। কিন্তু সামনের দিকে এগোচ্ছিল না। সেই মূহুর্তেই রাস্তার বাতিগুলো জ্বলে উঠেছিল। হঠাৎ করে। একটা বাতির আলো রিও ও তার সঙ্গীর পেছন হতে লোকটির মুখের উপরে পড়ে তার মুখটিকে আলোকিত করে তুলেছিল। লোকটির চোখগুলো বন্ধ ছিল এবং সে নীরবে হাসছিল। তার নীরব আনন্দিত মুখ হতে বড় বড় ঘামের ফোঁটা ঝরছিল।

“কোনো পলাতক পাগল হবে,” গ্র্যান্ড মন্তব্য করল। রিও লোকটির হাত ধরে তাকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করল। সেই সময়ে সে খেয়াল করল যে, গ্র্যান্ড প্রবলভাবে কাঁপছে। 
“এরকমভাবে চলতে থাকলে তো,” রিও মন্তব্য করল, “পুরো শহরই পাগলাগারদ হয়ে যাবে।” সে খুব ক্লান্তিবোধ করছিল এবং তার গলা শুকিয়ে আসছিল। “আস, আমরা কিছু পান করি।”  

তারা ছোট্ট একটা ক্যাফে’তে গেল। সেখানে বারের উপরের একটা বাতি থেকে শুধু আলো আসছিল। ভারী হয়ে থাকা বাতাসে সেই আলোকে অদ্ভুত লাল দেখাচ্ছিল। আপাত কোনো কারণ ছাড়াই ক্যাফের প্রত্যেকেই নীচু স্বরে কথা বলছিল।  ডাক্তারকে অবাক করে দিয়ে গ্র্যান্ড এক গ্লাস মদ চাইল এবং সেটিকে এক ঢোকেই নিঃশেষ করে দিল। “আগুনের মতো জিনিস,” সে মন্তব্য করল। এর এক মুহূর্ত পর সে রিও’কে বলল আবার যাত্রা শুরু করতে।   

রাস্তায় বেরিয়ে আসার পর রিও’র মনে হলো সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। স্ট্রীট ল্যাম্পের উপরে জমে থাকা কালো আঁধারের ভেতরে সে মৃদু কলধ্বনি শুনতে পেল। মনে হলো যেন অদৃশ্য একটা ঝাড়ু দিয়ে কেউ নির্জীব বাতাসে আঘাত করছে। অবিরত। বাঁশির শব্দের মতো। ঠিক যেমনটা ফাদার প্যানেলাক্স বলেছিলেন।       
“আনন্দের সাথে, আনন্দের সাথে,” গ্র্যান্ড বিড়বিড় করে বলল। তারপর থামল। 
রিও তাকে জিজ্ঞেস করল সে কী বলতে চাচ্ছে। 
“আনন্দের সাথে আমি আমার কাজ করি।” 
“হ্যা,” রিও বলল, “ভালোই তো।” তারপর সে বাতাসের ভেতরে সে কোন অদ্ভুত বাঁশির শব্দ শুনেনি ভাব করল।  গ্র্যান্ডকে জিজ্ঞেস করল যে, সে তার কাজে ভালো ফলাফল পাচ্ছে কিনা। 
“হ্যা, আমার মনে হয় আমি যথেষ্টই অগ্রগতি করতে পারছি।”     
“আর কতদিন লাগতে পারে?” 
গ্র্যান্ড একটা বিশেষ অঙ্গভঙ্গি করতে লাগল। তাকে দেখতে সাধারণ সময়ের মতো মনে হচ্ছিল না। তার কন্ঠস্বর মদ্যপানের কারণে জড়িয়ে যাচ্ছিল। 
“আমি জানি না। তবে এটা কোনো বড় ব্যাপার নয় আমার কাছে।” 

অন্ধকারের ভেতরে তাকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না। তবে রিও’র মনে হলো যে, সে হাত নাড়ছে। চেষ্টা করছে কিছু বলার। তারপর যখন সে কথা বলল, তখন তার শব্দগুলো ঝর্ণার মতো বেরিয়ে এল। 
“আমি যা বলতে চাই ডাক্তার, তা হলো যেদিন আমার লেখার হস্তলিপি প্রকাশকের কাছে পৌঁছাবে, সেদিন সে পড়ার পর অবশ্যই বলবেঃ তোমাকে সেলাম।” 
রিও তার কথা শুনে হতবাক হয়ে গেল এবং বিস্ময়ের সাথে দেখল যে, সে তার টুপি খুলে সোজা তার বাহু বাড়িয়ে দিয়েছে। এই সময়ে রিও’র মাথার উপরের সেই অদ্ভুত শব্দটা জোরালো হলো।
“তুমি দেখো,” গ্র্যান্ড বলল, “সেটি অবশ্যই ত্রুটিশূন্য হবে।”    

যদিও সাহিত্যের পৃথিবী সম্পর্কে রিও’র তেমন জানাশুনা ছিল না, তবুও তার সন্দেহ হলো যে, জিনিসগুলো ছবির মতো সুন্দরভাবে ঘটছে না। কারণ, প্রকাশকরা সাধারণত অফিসে টুপি পরে না। অবশ্য বিষয়টা যে ঘটবেই না তাও  নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। সুতরাং রিও মনে শান্তি বজায় রাখার চেষ্টা করল। চেষ্টা করল তার কানকেও বন্ধ করে রাখতে। কিন্তু তার পরেও সে মাথার উপরের অদ্ভুত শব্দটি শুনতে পাচ্ছিল। সেটা ছিল প্লেগের ফিসফিসানি।     

তারা শহরের সেই অংশে পৌঁছাল, যেখানে গ্র্যান্ড বাস করত। যেহেতু এলাকাটি কিছুটা উচ্চতায় অবস্থিত ছিল, সেহেতু তারা রাতের শীতল বাতাসকে নিজেদের গালের উপরে অনুভব করলো। এই বাতাস শহরের শব্দগুলোকেও তাদের থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল।

গ্র্যান্ড তার কথা চালিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু রিও তাকে অনুসরণ করতে ব্যর্থ হচ্ছিল। যা সে বুঝতে পারল তা হলো যে, গ্র্যান্ড ইতিমধ্যেই অনেক পৃষ্ঠা লিখে ফেলেছে এবং সেটিকে পরিপূর্ণতা দেওয়ার জন্যে সে  কঠোর পরিশ্রম করছে।  “আমার বিকেলগুলো ও পুরো সপ্তাহ কাটে শব্দের পেছনে। কখনও কখনও শুধু একটা ‘কনজাংকশন’কে ঠিক করতে।”

এরপর গ্র্যান্ড হঠাৎ করে থেমে গেল এবং হাত দিয়ে ডাক্তারের কোটের একটা বোতাম আঁকড়ে ধরল। তার প্রায় দাঁতহীন মুখ হতে তোতলামির মতো করে শব্দ বেরুতে লাগল।            
“ডাক্তার, আমি চাই যে, অন্তত তুমি আমাকে বোঝ। আমি তোমাকে নিশ্চিত করে বলতে পারি যে, ‘কিন্তু’ ও ‘এবং’  শব্দ দুটোর মধ্যে যেকোনো একটিকে পছন্দ করা সহজ। তবে ‘এবং’ ও ‘তখন’ এর মধ্যে যেকোনো একটিকে নির্বাচন করা যথেষ্ট কঠিন। তবে সবচেয়ে কঠিন হলো ‘এবং’ শব্দটিকে যথাযথভাবে ব্যবহার করতে পারা।”     
“হ্যা,” রিও বলল,”আমি বুঝতে পেরেছি।” 

তারা আবার হাঁটতে শুরু করল।  গ্র্যান্ডকে লজ্জিত মনে হচ্ছিল। সে দ্রুত পা বাড়িয়ে রিও’র পাশে আসলো। হঠাত করে বলল, “দুঃখিত। আমি জানি না আজ বিকেলে আমার কাছে কে এসেছে।”  
রিও কাঁধে হাত দিয়ে তাকে উৎসাহ দিলো। বলল যে, গ্র্যান্ড যা বলেছে সে সম্পর্কে তার খুব আগ্রহ আছে এবং সে তাকে সাহায্য করতে চায়। এটি মনে হলো তার ভেতরে আশ্বাসের সৃষ্টি করল। গ্র্যান্ডের বাসস্থানের কাছে পৌঁছানোর পর একটু ইতস্তত করে সে রিও’কে অনুরোধ করল তার ঘরে আসতে। রিও রাজি হলো।     
তারা ডাইনিং-রুমে প্রবেশ করল। গ্র্যান্ড একটি টেবিলের পাশে তাকে চেয়ার দিলো বসতে। চেয়ারটির উপরে অনেকগুলো কাগজ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। সেগুলোতে ছিল  মাইক্রোস্কোপিক অক্ষরে গ্র্যান্ডের লেখাগুলো। পরিবর্তন ও সংশোধনসহ।   
“হ্যা, এগুলোই সেগুলো,” সে ডাক্তারের জিজ্ঞাসু দৃষ্টির উত্তরে বলল। “কিন্তু তুমি কি কিছু পান করবে না? আমার কাছে কিছু ওয়াইন আছে।” 
রিও অস্বীকার করল। সে নিচু হয়ে হস্তলিপিগুলো দেখছিল।
“না, দেখো না,” গ্র্যান্ড বলল। “এটা হলো আমার লেখার ভূমিকা। এটি আমাকে খুবই কষ্ট দিচ্ছে। সীমাহীন কষ্ট।” 
সে নিজেও টেবিলের উপরের কাগজগুলোর দিকে তাকিয়েছিল। মনে হচ্ছিল সেগুলো তাকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করছে। শেষে সে সেগুলোকে হাতে নিয়ে ঢাকনাহীন একটা বৈদ্যুতিক বাল্বের নীচে স্থাপন করল। কাগজগুলো তার হাতের ভেতরে কাঁপছিল। রিও খেয়াল করল যে, তার কপাল ঘামে ভিজে গেছে। 
“বসো,” সে বলল, “এবং আমাকে পড়ে শোনাও।”
“হ্যা।” গ্র্যান্ডের দৃষ্টি ও হাসিতে কোমল কৃতজ্ঞতা ছিল। “আমিও চাই যে, তুমি এটা শোনো।”    

সে কিছুক্ষণের জন্যে অপেক্ষা করল কাগজের দিকে তাকিয়ে। তারপর বসল। এই সময়ে রিও অদ্ভুত সেই গুঞ্জন ধ্বনি শুনতে পেল। আসছিল রাস্তার দিক হতে। রিও’র মনে হলো এটি প্লেগের আগমনের মর্মরধ্বনি। সেই মুহূর্তে তার ভেতরে একটা অলৌকিক অনুভূতির সৃষ্টি হলো। মনে হলো শহরটি নীচে বিস্তৃত হয়ে আছে। নির্জন ও একাকী। জীবন্ত বলির পশুর মতো গোঁগোঁ শব্দ করছে। দমবন্ধ হয়ে।

“মে মাসের এক সুন্দর সকালে একটি সুন্দরী যুবতী ফুলে ফুলে ঢাকা Bois de Boulogne এভিন্যু দিয়ে গোলাপী রঙের ঘোড়া চালিয়ে যাচ্ছে,” গ্র্যান্ড পড়ছিল।           
নীরবতা ফিরে আসলো। সেই সাথে ফিরে এলো উপুড় হয়ে থাকা শহরের অস্পষ্ট গুঞ্জন। গ্র্যান্ড কাগজটি টেবিলের উপরে নামিয়ে রেখে তখনও সেটির দিকে তাকিয়েছিল। একটু পর উপরের দিকে তাকালো।  
“তুমি কি ভাবছ?” 
রিও জানালো যে উপরের এই মুক্ত বাক্যটি তার ঔৎসুক্যকে বাড়িয়ে দিয়েছে। সে আরও শুনতে চায়। অথচ গ্র্যান্ড ভাবছিল যে, সে সবকিছুই ভুল লিখেছে। তাকে এবার খুবই উত্তেজিত মনে হলো। সে হাতের তালু দিয়ে কাগজের উপরে থাপ্পড় দিল। 
“এটা শুধু আমার লেখার খসড়া। আমি যখন আমার মনের ভেতরে সঠিকভাবে ছবিটা আঁকতে পেরেছি, শুধু তখনই আমার শব্দগুলো এই রূপ পেয়েছে। ঘোড়া কদম মিলিয়ে চলা শুরু করেছে। এক-দুই-তিন। এক-দুই-তিন। দেখতে পেয়েছ আমি কি বুঝাতে চেয়েছি? এর পরের অংশগুলো এখন আমি খুব সহজেই লিখে ফেলতে পারব। তবে যেটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন আমার কাছে, তা হলো এই শব্দাবলির মায়ার আতিশয্য এতই প্রবল হবে যে, প্রকাশক এর প্রথম শব্দ পড়েই আমাকে বলবেনঃ ‘তোমাকে সালাম।’ কিন্তু এর আগে সে স্বীকার করল যে, তাকে আরও অনেক কাজ করতে হবে। সে কখনোই স্বপ্নেও চিন্তা করে না বর্তমান অবস্থায় বাক্যটিকে প্রিন্টে দিতে। যদিও কোনো কোনো সময়ে তার মনে হয় যে, বাক্যের গঠনটি সন্তোষজনক হয়েছে। তবে সে নিশ্চিত জানে যে, সেটি এখনও যথার্থ পর্যায়ে পৌঁছেনি। এটাও সে মনে করে যে, এর মান এখনও সাধারণ পাঠকের পড়ার উপযোগী হয়নি। এই সময়ে তারা জানালার বাইরে রাস্তার উপরে লোকজনের দৌড়াদৌড়ির শব্দ শুনতে পেল ”         

রিও উঠে দাঁড়ালো। “একটু অপেক্ষা করো, আমি দেখে আসছি কি হচ্ছে,” গ্র্যান্ড বলল। তারপর জানালার দিকে তাকিয়ে বলল,“পড়াটা শেষ করে যাব।” কিন্তু  তাড়াহুড়া করা পায়ের শব্দ আবার শোনা গেল। রিও দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে গেল। রাস্তার উপরে উঠতেই দু’জন লোক তাকে ধাক্কা দিয়ে চলে গেল। মনে হলো তারা শহরের দুটো প্রবেশদ্বারের কোনো একটিতে যাচ্ছে। আসলে প্রচন্ড উত্তাপ ও প্লেগের কারণে আমাদের শহরের কিছু মানুষের মাথা ইতিমধ্যেই নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। কয়েক জায়গায় তাদের মধ্যে মারামারিও হয়েছিল। এছাড়াও রাতের বেলায় প্রহরীদের চোখ এড়িয়ে কিছু মানুষ বাইরের পৃথিবীতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টাও করেছে।
(এই পর্বের সমাপ্তি) 
চলবে...

দ্য প্লেগ (প্রথম পর্ব)

দ্য প্লেগ (দ্বিতীয় পর্ব)

দ্য প্লেগ (তৃতীয় পর্ব)

দ্য প্লেগ (চতুর্থ পর্ব)

দ্য প্লেগ (পঞ্চম পর্ব)

দ্য প্লেগ (ষষ্ঠ পর্ব)

দ্য প্লেগ (সপ্তম পর্ব)

দ্য প্লেগ (অষ্টম পর্ব)

দ্য প্লেগ (নবম পর্ব)

দ্য প্লেগ (দশম পর্ব)

দ্য প্লেগ (একাদশ পর্ব)

দ্য প্লেগ (দ্বাদশ পর্ব)

দ্য প্লেগ ( ত্রয়োদশ পর্ব)

দ্য প্লেগ ( চতুর্দশ পর্ব)

দ্য প্লেগ (পঞ্চদশ পর্ব)

দ্য প্লেগ (ষোড়শ পর্ব)

দ্য প্লেগ (সপ্তদশ পর্ব)

ডেইলি বাংলাদেশ/জেডআর