মায়ের আঁচল 

মায়ের আঁচল 

জিন্নিয়া সুলতানা  ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৪:৫৭ ২৮ মার্চ ২০২১  

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

রাত একটা বাজে। লিপা চোখ বন্ধ করে বালিশের চারপাশে কি যেন খুঁজতে লাগলো। কিন্তু কিছু খুঁজে না পেয়ে সে উঠে বসলো। খেঁয়াল করলো পাশে রাখা ডায়েরির ভেতর থেকে মোবাইল ফোন বাজার শব্দ আসছে। হঠাৎ মনে পড়লো, কি একটা লিখতে লিখতে সে ঘুমিয়ে পড়েছিল। খুব বিরক্ত হয়ে কল রিসিভ করল।
_ হ্যালো!
_ হ্যালো লিপা?
আচ্ছা তুই জানিস? মানুষ কি করে অমানুষ বর্বর হয়ে যায়!
_রূপা? এত রাতে এসব বলার জন্যে আমাকে কল দিয়েছিস? যত্তসব ফাজলামি। জানিস না রাতে আমার ঘুমাতে সমস্যা হয়, তাও কাঁচা ঘুম ভাঙিয়ে উল্টা পাল্টা কথা বলে যাচ্ছিস। রাখ বলছি।
_এই না, শুন শুন, একটা দরকারে কল দিয়েছি তোকে, তোর দুলাভাই এর এক ভাগ্নি, একটা নামী দামী ক্লিনিকে জব করে, সে আজ কল দিয়ে একটা কথা বললো, আমার না খুব খারাপ লাগছে।
_কি বলেছে তোকে সে?
_না আমাকে খারাপ কিছু বলেনি, বললো তার ক্লিনিকে নাকি একটা মহিলা তার বাচ্চাকে বিক্রি করতে চায়।
_সে কি কথা, কি বলিস এসব?
_হ্যা রে, সত্যিই।
মহিলাটা খুব বিপদে পড়েছে।
তার স্বামী তাকে এখানে ভর্তি করে দিয়ে লাপাত্তা হয়ে গেছে।এখন ডেলিভারি চার্জসহ সবকিছু মিলিয়ে চার্জ অনেক টাকা হয়ে গেছে। ক্লিনিক মালিক তাকে টাকা ছাড়া কোনো মতেই ছাড়তে রাজি না, ওরা বাচ্চাকে কব্জা করে রেখেছে।
বলছে টাকা দিয়ে ছাড়িয়ে নিতে। এখন মহিলা কোনো উপায় না পেয়ে বাচ্চা বিক্রি করে দিতে চায়।
_রূপা তুই সত্যিই জানিস তো?
মেয়েটা তোকে কোনো ভুল তথ্য দেয় নি তো?এটা কেমন কথা হলো, মগের মুল্লুক নাকি?
_হ্যা রে, সত্যিই,তুই দেখনা বাচ্চাকে বিক্রি করে মহিলাকে সাহায্য করতে পারিস কি না?
_রূপা, আমি জানতাম তুই বোকা, তবে এতটা বোকা জানতাম না, তুই বুঝতে পারছিস কি বলছিস তুই?
একটা বাচ্চাকে বিক্রি করা? মানুষ কি বাজারের পণ্য হয়ে গেছে?
_আমার মাথা ঠিক নাই লিপা, সরি, ওই শয়তান লোকটা কেন বউ বাচ্চাকে এমন বিপদে ফেলে গেলো?
আর ডাক্তার গুলি কেমন অমানুষ বর্বর হয়ে গেছে দেখ,মাথা ঠিক থাকার কথা?
_আচ্ছা,এত কথা বলতে হবেনা। আমাকে ভাবতে সময় দে, দেখি কি করতে পারি।
_আচ্ছা আমাকে জানাস কিন্তু, রাখলাম।
_ঠিক আছে, আল্লাহ্ হাফেজ।

মোবাইল রেখে দিয়ে লিপা ঘুমানোর চেষ্টা করলো কিন্তু কোনো মতেই যেন তার চোখে ঘুম আসছে না। চোখ বন্ধ করতেই তার ছোট বেলার কথা মনে পড়তে লাগলো। খুব ছোট বেলায় পড়াশুনার জন্যে লিপাকে বাড়ি ছেড়ে ফুপুর বাড়ীতে চলে আসতে হয়েছিল।

সকাল হলেই ফুপু তার নিজের ছেলে মেয়েদের নিজ হাতে মুখে তুলে নাস্তা খাইয়ে দিতেন, কিন্তু লিপা খেয়েছে কিনা সে কথা একবার কেউ জিজ্ঞেস ও করতে আসতো না।

সারা দিন স্কুল শেষে বিকেলে যখন সবাই খেলছে মাঠে, তখন লিপা বাড়ির গরু ফিরিয়ে আনতে ছড়ার ধারে যেত। পানি দেখলে খুব ভয় পেতো লিপা, ভয়ে মাঝে মাঝে একা একা কান্না করতো আর বলতো মা কেন তুমি আমাকে তোমার থেকে দূরে পাঠিয়ে দিলে। এখানে কেউ আমার ভালো মন্দ খবর রাখে না মা। কিন্তু ছোট্ট লিপা কাউকেই কিছু বলতে পারতো না। শুধু বাবা মা থেকে দূরে সরে থাকার ব্যথাটা বুকে চেপে রাখতো। কিন্তু বাবা মায়ের থেকে দূরে সরে থাকার যন্ত্রনা টা তাকে ভালো মতন ঝেঁকে ধরেছিল।
স্কুলের চানাচুর মুড়ি বিক্রি করতো যে ছেলেটা লিপাকে প্রতিদিন রাস্তায় বাজে বাজে কথা বলতো, কিন্তু এসব কথা শুনার মতন কেউ ছিলনা তার কাছে।
বাড়ি ফিরলে ঘরের কাজ নিয়েই ব্যস্ত থাকতে হতো। কে শুনবে লিপা কেমন আছে?
পান থেকে চুন খসলেই ফুপা বলে উঠতো, বাবা মা নিজেদের আপদ আমার ঘাড়ে ফেলে দিয়ে গেছে। এখন আমাকেই সব সামাল দিতে হবে।

এসব কথা লিপাকে খুব কষ্ট দিত, কিন্তু কিছুই করার ছিল না। লিপা মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলো, না আমার মতন এই বাচ্চাটাকে বাবা মা ছাড়া বেড়ে উঠতে দিতে পারি না। এই যন্ত্রণা যে কত ভয়নকর টা আমি ভালো বুঝি। এসব ভাবতে ভাবতেই সকাল হয়ে গেল। মোবাইল টা হাতে নিয়ে ফোনবুক ঘেঁটে কবিরের নাম্বার টা বের করলো লিপা। কবির হচ্ছে লিপার সবচেয়ে ভালো বন্ধু যে একজন ভালো সাংবাদিক।

- হ্যালো কবির?
- লিপা এত সকালে তুই? ঠিক আছিস তো?
- আমি ঠিক আছি। কিন্তু একটা সমস্যায় পড়েছি বন্ধু, একটা ক্লিনিকে চিকিৎসা বিল দিতে না পারায় সদ্য ভূমিষ্ট একটা শিশুকে ক্লিনিক এ মালিক পক্ষ আটকে রেখে দিয়েছে।
কিন্তু মায়ের পক্ষে এত টাকা বিল পরিশোধ করা সম্ভব নয় বলে মা সন্তানকে বিক্রি করে দিতে চাচ্ছে। কি করা যায় বলতো, ওদের সাহায্য করতে হবে বন্ধু।
- মানে? কি বলছিস এসব, তাড়াতাড়ি ডিটেইলস বল আমায়।

লিপা কবিরকে সব বলার পর দেখা গেল কবিরের এক বন্ধু খালেক ওই ক্লিনিক পরিচালকের ঘনিষ্ট বন্ধু।
কবির লিপাকে তার নাম্বার দিয়ে বললো, ভালো হয়েছে, খালেককে আমি বলে দিচ্ছি সেই তোকে হেল্প করতে পারবে। খালেকের সাথে যোগাযোগ করতে সে ব্যাপারটা শুনে লিপার মতন বিচলিত হয়ে উঠলো। সাথে সাথেই ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করে কনফার্ম হলো, এরকম কোনো রোগী এই মেডিকেল আসেই নাই।

লিপা রুমের ভেতর পায়চারি করতে করতে সব কিছু ভাবছে, কিন্তু ঘটনা টা কিছুতেই তার মাথায় ঢুকছে না। রূপা তো আবার কনফার্ম হয়ে বললো, ওই মেয়েটা মিথ্যে বলে নাই।
তাহলে মিথ্যাটা কোথায়?
এক রাতেই বাচ্চা সহ একটা মহিলা উধাও হয়ে গেল কিভাবে?
হঠাৎ মাথায় এলো, খালেক কে নিয়ে সরাসরি ক্লিনিকে চলে গেলে কেমন হয়? তখন কিছু একটা বুঝা যাবে নিশ্চয়। কেবিনে ঢুকে লিপার চোঁখ কপালে উঠে গেল। খালেক আর লিপা একে অপরের চোখের দিকে তাঁকিয়ে যেন কথা হারিয়ে ফেলেছে।

রুমটা পরিষ্কার ঝকঝকে, জানলার পর্দা, বেড কভার সব কিছু এত সুন্দর গুছানো যে মনে হচ্ছে এখানে অন্তত সপ্তাহ পনেরো দিন থেকেই কোনো মানুষ ছিল না। যেমন টা ক্লিনিকের পরিচালক বলেছিলেন,এই নামের কোনো মহিলা এখানে আসেই নাই আর এই কেবিনে কি করে থাকবে, আর রোগী না থাকলে বাচ্চা আটকের ব্যাপার আসবে কি করে?

ঘটনার কোনো আলামত না পেয়ে খালেক লিপাকে রেখে কাজে চলে গেল কিন্তু এখনো যেন লিপার মাথার ঘোর কিছুতেই কাটছে না। সে ক্লিনিক থেকে বের হয়ে রূপার স্বামীর ভাগ্নী কে কল দিল।
মেয়েটির ভাষ্য মতে, খালেকের কল পেয়ে ক্লিনিকের পরিচালক বিপদ থেকে উদ্ধার পেতে রোগী মহিলাকে সন্তানসহ কেবিন থেকে বের করে দেয়। রাতের বেলা ঠান্ডার দিনে ছোট্ট বাচ্চাকে নিয়ে মা রিসিপশনের ভেতরের দিকে বসেছিল। সকালে ডাক্তারের কথা মতন রোগীর মা পাঁচ হাজার টাকা ম্যানেজ করে নিয়ে আসেন।
এর পরে এই টাকা রেখে বাকি পঞ্চান্ন হাজার টাকা না নিয়েই রোগীকে বাচ্চা সহ ক্লিনিক থেকে বের করে দেওয়া হয়। আর সব স্টাফ কে বলে দেওয়া হয় কেউ যেন এ বিষয়ে মুখ না খুলে।

কল কেটে দিয়ে লিপা আকাশের দিকে তাকিয়ে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। যাই হোক, অন্তত একটা বাচ্চাকে পৃথিবীতে এসেই বাজারের পণ্যের মতন বিক্রি হওয়া থেকে বাঁচাতে পারলো।

কষ্টে থাকুক আর ভালো থাকুক তবু বাচ্চাটা তো মায়ের মমতা পেয়ে বড় হয়ে উঠতে পারবে, তাকে মায়ের আঁচল ছাড়া জীবনে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হবে না।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেডএম