জুলাই যুদ্ধ

জুলাই যুদ্ধ

মূল: The July War by Rabih Alameddine

অনুবাদ: মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১২:০৫ ১৩ জানুয়ারি ২০২১   আপডেট: ১২:১১ ১৩ জানুয়ারি ২০২১

গ্রীষ্মকালে আমাদের পাড়াটি কয়েকটি পর্বে নির্জন হয়ে যায়। এই নির্জনতার শুরু মে মাসে। স্কুল এসময়ে উঁচু ক্লাসের ছাত্রদেরকে (সতেরো ও আঠারো বছর বয়সী) এক মাসের ছুটি দেয়। স্নাতক পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্যে। আমাদের পূর্বপুরুষদের সময় হতে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী শিক্ষার্থীরা তখন শহরের বাইরের বাসস্থানগুলোতে চলে যায়। এগুলো হলো কাঠের তৈরি নির্জন কুটির ও কেবিন, যেগুলোর অবস্থান সামাজিক বসবাস বা অধ্যয়নের স্থানসমূহ হতে দূরে। পরিযায়ী পাখিরা যেভাবে ফিরে আসে, তেমনি করে ছাত্ররাও জুন মাসে ফিরে আসে। পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্যে। পরীক্ষার পর স্কুলগুলো বন্ধ হয়ে যায়। পুরো বছরের জন্যে। তখন কয়েকটা পরিবার ভ্রমণ করার জন্যে চলে যায় বিদেশে। কিছু সংখ্যক পরিবার চলে যায় পর্বতে। একজন বহিরাগতের কাছে এই পরিবর্তন কখনোই লক্ষণীয় নয়। কারণ পরিবর্তনটা যথেষ্টই শ্লথগতি সম্পন্ন। তবে তা অবশ্যম্ভাবী। এই পরিবর্তন চলতে থাকে আগস্ট মাস পর্যন্ত; যে সময়ে বৈরুত জ্বলতে থাকে। 

জুলাই মাসের প্রথমদিকে আমাদের উঠানের অন্যদিকের মাসরি (Masris) পরিবার পর্বতের উদ্দেশ্যে চলে গেলো। তারা তাদের গ্রীষ্মকালীন বাসস্থান থেকে সেপ্টেম্বরের শেষদিকের পূর্বে (যখন তাপমাত্রা শীতল হতে থাকবে) আর  ফিরবে না। সেই গ্রীষ্মেই আমাকে পদোন্নতি দেয়া হয়েছিলো এপার্টমেন্টের কেয়ারটেকার হিসেবে। আমি দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলাম আমার ভাইয়ের কাছ থেকে। আমার পিতা আমাকে শক্তভাবে বলেছিলেন মাসরিদের বাড়িটিকে দেখাশুনা করতে। কারণ, তিনি ভেবেছিলেন যে, তেরো বছর বয়সেও আমি বয়স্কদের মতো আচরণ করছিলাম না, এবং আমার আরো দায়িত্ববান হবার প্রয়োজন ছিল। কাজেই তিনি আমাকে হাত-পা নেড়ে নেড়ে গালি ও বক্তৃতা দিচ্ছিলেন এক মাস সময় ধরে।       

সকালে স্নানাগারে আমার পিতা বক্সারের শর্ট ও টি-শার্ট পরে ভ্যানিটি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আমাকে উপদেশ দিতেন। তার মুখের বরফ-সাদা শেভিং ফোমের মধ্য দিয়ে শব্দগুলো বুদ্বুদের মতো বের হতো। “আমি  যখন তোমার বয়সী ছিলাম, তখন আমি সারাদিন তোমার মতো কোনকিছুই না করে অলসভাবে কাটাতাম না,” তিনি বলতেন। “তুমি কি আরো পরিণত বয়সের বন্ধু খুঁজে পাও না? কিছু করতে পারো না যা কাজে আসে? তুমি জানো যে, প্রতিটা কাজেরই একটা প্রতিদান আছে, এবং কোনকিছু না করার প্রতিদান হলো শেষ পর্যন্ত তুমি কিছুই হতে পারবে না।

দুপুরে লাঞ্চের সময়ে আমরা সবাই একটা ওকে কাঠের টেবিলের চারপাশে বসতাম। “সোজা হয়ে বস, ওয়াজদির দিকে তাকিয়ে দেখো সে কিভাবে বসে আছে, একজন মানুষের মতো। তোমার এই ছেলেমিপনা অনেক হয়েছে।“ 

বৈঠকখানায় বসে টেলিভিশন দেখার সময়ে তিনি পূর্বতন কথাগুলোর পুনরাবৃত্তি করতেন। শুধুমাত্র রাতের খাওয়ার পরে ছাড়া। “তোমার চিন্তা করা উচিৎ জীবনে তুমি কি হতে চাও,”তিনি বলতেন। ডান বাহু দিয়ে তিনি আমার মাকে ধরে থাকতেন, যেটাকে আমার নিকটে সব সময়ে মনে হতো বৈবাহিক আলিঙ্গন। আমার মাও তাকে সপ্রশংসভাবে শ্রদ্ধা করতেন। তার কাছে পিতার  মুখনিঃসৃত প্রতিটা শব্দকেই একেকটি মুক্তা বলে মনে হতো।  

পিতা বাম হাত নেড়ে নেড়ে প্রশ্ন করতেন, “তুমি কি পছন্দ কর? সমস্যার সমাধান করতে? সেক্ষেত্রে তুমি একজন ইঞ্জিনিয়ার হতে পারো। মানুষকে সাহায্য করতে চাও?  তাহলে তুমি এটর্নী হতে পারো। তুমি চাইলেই স্কুলের গ্রেডকেও উন্নত করতে পারো, যদি তুমি পরিশ্রম করো। তোমার উচিৎ ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করা।“

প্রতিবেশীর এপার্টমেন্টের দেখাশুনা করার বিষয়টি আমার  নিকটেও অসুবিধাজনক ছিলো না। কারণ, গ্রীষ্মের সময়ে আরো দায়িত্ববান হবার নিমিত্ত হিসেবে আমাকে খুব কম কাজই করতে হতো। সপ্তাহে একবার জানালাগুলো খুলতে হতো। বদ্ধ বাতাসকে বের করে দেয়ার জন্যে। এর বাইরে আমাকে আরেকটা কাজ করতে হতো। সেটা ছিলো দুটো ক্যানারী পাখিকে খাওয়ানো ও তাদের খাঁচাটিকে পরিষ্কার করা।  

আমি ডক্টর মাসরি’র চামড়ার সোফাতে পায়ের উপরে পা তুলে বসে হ্যারল্ড রবিন্স এর একটা পুরনো উপন্যাস পড়ছিলাম। সেখানে যেখানে সকল ঘটনাগুলোই ঘটছিল মধ্যপ্রাচ্যে, এবং আমি একশন দৃশ্য খুবই পছন্দ করতাম। উপন্যাসের সবচেয়ে ভালো দৃশ্যটিতে লায়লা নামের এক শিশু শরনার্থী ছিলো। সে আরব ও ইহুদি উভয় পক্ষ দ্বারাই আতঙ্কগ্রস্ত ছিলো। দৃশ্যটিতে লায়লা একজন সুশ্রী চেহারার এক মোসাদ এজেন্টের সাথে সহবাসে লিপ্ত হয়েছিলো। তার প্রেমিকের প্ররোচনায়, যে তাকে এজেন্টের কাছ হতে কিছু মূল্যবান তথ্য আদায় করতে বলেছিলো।         

আমি যেকোন বইয়ের প্রথম হতে শেষ পর্যন্ত পড়তে পছন্দ করতাম। কিন্তু আমার ভাই সেটা করতো না। সে শুধু বইয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো পড়ত। ওয়াজদি ডক্টর মাসরি’র লাইব্রেরী হতে নতুন কোন ক্লাসিক বই, কলিন্সের বই অথবা রবিন্সের বই নিয়ে আসতো এবং যত্রতত্র বইয়ের ভাঁজ করা অংশগুলো খুলে রাখতো। এই ভাঁজ করা অংশগুলোতে কোন না কোন যৌন দৃশ্যের রগরগে বর্ণনা থাকতো। এগুলো ছিলো সেই অংশ, যেগুলোর ডক্টর মাসরিও খুবই নিবিষ্ট পাঠক ছিলেন। বই পড়া নিয়ে আমার ভাইয়ের আগ্রহ বছর খানেক পূর্বে উবে গিয়েছিলো, তার সতেরো বছর বয়সে পদার্পন করার পর। কারণ, এই সময়ে সে নিবিষ্ট থাকতো কল্পনার পরিবর্তে বাস্তব কিছুতে।

ডঃ মাসরি’র পুরো লাইব্রেরীটাই বৈঠকখানার একটা আসবাবপত্রের তাকগুলোর ভেতরে স্থাপিত ছিলো। ডাইনিং কক্ষ হতে সামনে অনেকগুলো ফ্রেমের ভেতরে  কাঁচের কভার দেয়া ক্যাবিনেট এনে এটি তৈরী করা হয়েছিলো।  কাঁচগুলোর পেছনে পেপারব্যাক কাগজ লাগানো ছিল। প্রতিটি পেপারব্যাক কাগজের উপরে অন্তত একটি করে উত্তেজনাকর যৌনদৃশ্য আঁকা ছিলো। অনেকটা আমার পিতার উপদেশের মতো। যেনো দায়িত্ববান কেয়ারটেকার হওয়াই হলো পুরুষত্বের প্রবেশদ্বার। আমিও তাই ভাবতাম। ওই পেপারব্যকগুলোই ছিলো আমার জন্যে সেইন্ট পিটার। 

বইয়ের সেই পৃষ্ঠায় পৌঁছলাম, যেখানে লায়লা একজন টেররিষ্ট হিসেবে নিয়োগ পাচ্ছিল। ঠিক তখনি দরজার বেল বেজে উঠলো। মোসাদের এজেন্টের মতো নিঃশব্দে আমি দরজার দিকে এগিয়ে গেলাম। পীপ-হোলের ভেতর দিয়ে তাকানোর পূর্বেই বুঝতে পারলাম যে, ওটা পিপো। আমাকে মারতে এসেছে। মাসরি পরিবার পর্বতের উদ্দেশ্যে যাত্রা করার পরই সে আমাকে জানাতে বলেছিলো।

“তারা চলে যাবার পরক্ষণেই যদি তুমি আমাকে না জানাও,” তিনদিন আগে সে বলেছিলো,” আমি তোমাকে হাত দিয়ে চেপে তেলাপোকার মতো পিষে ফেলবো।“  তার উপমার ব্যবহারগুলো সবসময়ে অশুদ্ধ ছিলোসেগুলো শুনে আমি হাসতে হাসতে অজ্ঞান হয়ে যেতাম, যদি না সেগুলো তার অপ্রত্যাশিত কোন কাজ দ্বারা অনুসৃত হতো। সুতরাং মাত্রারিক্ত ওজনের এই দৈত্যের নিকটে আমি মিথ্যে করে বললাম যে, ওয়াজদি এবছরেও পুনরায় কেয়ারটেকার নিযুক্ত হয়েছে। কারণ, আমি জানতাম যে, পিপো ওয়াজদিকে ভয় পায়। কারণ, পুরো পাড়ার ভেতরে ওয়াজদিই ছিলো একমাত্র বালক, যে তার চেয়ে শক্তিশালী ও লম্বা ছিলো। 

পিপোর সবচেয়ে খারাপ অভ্যাস ছিলো শার্টের কলার ধরে আমাকে উপরে টেনে তোলা এবং আমার মুখকে তার মুখের সামনে স্থাপন করে কথা বলা। তবে এটা সে বন্ধ করে দিয়েছিলো, যখন একদিন সে আমাকে উপরে টেনে তোলার সময়ে মিথ্যে করে বলেছিলাম যে, আমি ওয়াজদি’র শার্ট পরে আছি, এবং আমার ভাই খুবই রাগান্বিত হবে যদি সে দেখে যে, তার শার্টের কলারে ভাঁজ পড়েছে।

“আমি জানি তুমি ভেতরেই আছো,” পিপো দরজার ওপার থেকে বললো। তার কন্ঠস্বর অলুক্ষণে ও ফিসফিসি শোনাচ্ছিলো, কারণ সে চিৎকার করতে পারছিলো নাপাছে তার কথা ওয়াজদি অথবা আমার পিতা শুনে ফেলে।   সুতরাং সে পুনরায় বেল বাজিয়ে বললো,” দরজা খোল।“

আমি দরজা খুলছিলাম না কয়েকটি কারণে। এর মধ্যে একটা কারণ ছিল নৈতিকঃ আমি মাসরি পরিবারকে পছন্দ করতাম এবং পিপোকে তাদের বাসার দখল দিতে রাজী ছিলাম না। খালি এপার্টমেন্ট নিয়ে সে কি করতে পারে, সে সম্পর্কে আমার স্পষ্ট ধারণা ছিলো না। তবে আমি নিশ্চিত ছিলাম যে, কোন ভালো উদ্দেশ্যে সে তা ব্যবহার করতো না। কাজেই, সে যা চাচ্ছিলো তা আমি করছিলাম না। আমি জানতাম যে, দরজা খুলি বা না খুলি, সে আমাকে অপদস্ত করতোই। মার খাওয়া যদি নিশ্চিত হয়, তবে সেটাকে বিলম্বিত করতে পারাটাই অধিকতর ভালো পথ।

“তুমি যদি দরজা না খোলো,” পিপো বলেছিল,” আমি কার্লের পাগুলো ভেঙে দেবো।“

“কি বলছো, তুমি?” আমি আর্দ্রকন্ঠে ফিসফিস করে চিৎকার করে উঠেছিলাম। অতঃপর পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়েছিলাম এবং উঁকি না দিয়েই নিশ্চিত হতে চাচ্ছিলাম যে, পিপোর সাথে সেখানে আমার সাবেক বেস্ট ফ্রেন্ড উপস্থিত আছে কিনা। “তুমি আমার পা ভাঙতে পারো না। ওটা করার কোন যুক্তি তোমার নেই।“

“সে যদি দরজা না খোলে, তাহলে অবশ্যই আমি ভাঙবো।“

“সে যদি এখানে না থেকে থাকে? সে আমাকে বলেছিলো যে, তার কাছে চাবি আছেতবে হয়তো সে তার রুমে বসে বই পড়ছে। তুমি আমাকে আঘাত করতে পারো না, শুধু এই কারণে যে দরজাটা নিজ থেকে খুলছে না।“

আমি আমার পিতার কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম। “এই ছেলেরা, তোমরা এখানে কি করছো? মাসরিরা ভেতরে নেই। দ্রুত কিছু পায়ের আওয়াজ শোনা গেল এবং কাপুরুষ কার্ল সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে এলো। পিপো অসঙ্গতিপূর্ণ কিছু একটা উত্তর দিলো। “আমি তোমাকে এখানে দেখতে চাই না, ফিলিপ,” আমার পিতা বললেন। “তুমি বড় হয়েছো। সুতরাং বড়দের মতো আচরণ করতে শেখো।"

এক সপ্তাহের কম সময়ের মধ্যে আমার সাথে সেটা ছিলো কার্লের দ্বিতীয়বার বিশ্বাসঘাতকতা। গত সোমবারে আমরা একত্রে আমাদের বিল্ডিং এর যে দেয়ালটা রাস্তার দিকে মুখ করা, তার উপরে বসেছিলাম। পা ঝুলিয়ে। সে আমার চেয়ে মাত্র কয়েক মাসের বড় হলেও আমার চেয়ে অনেকবেশী স্থূল ছিলো। একটা গাড়ি দ্রুতগতিতে আমাদের সামনে দিয়ে অতিক্রম করে  যাবার সময়ে সে চিৎকার করে কি গাড়ি ও কোন বছরে তৈরি তা বলল। তার কন্ঠস্বরের উচ্চতা থেকে বোঝা যাচ্ছিলো, সে তার প্রিয় ‘বিএমডব্লিউ’ কথা বলছিলো। সে গাড়িটিকে দেখছিলো। আমিও অবাক হয়ে তাকে দেখছিলাম, তার ব্রনময় মুখ। যেনো প্রথমবার দেখছি। 

গত কয়েকদিনে একবারও সে তার মাথার চুল আচড়ায়নি। “বুইক, ১৯৯৮,” সে ঘোষণা করলো। আমি মৃদু হেসে কাঁধ দিয়ে তার বাহুতে ঘষলাম। তার শরীর থেকে  ডিওডোরেন্ট ও বগলের গন্ধ আসছিলো। “পেউজিট, ২০০৬, সর্বশেষ মডেল।” আমি মৃদু হেসে তার কাঁধের সাথে আবার ঘষা দিলাম। “ নিসান, ২০০০।”  আবার হাসি, আবার ঘষা, আবার হাসি। এই পর্যায়ে আমি থামলাম, কারণ আমি অনুভব করছিলাম যে, রাস্তার ওপারে আমাদের বাসার ব্যালকনি থেকে বাবা আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। সাফারির পশুদের মতো উন্নত ষষ্ঠ-ইন্দ্রিয় ছিলো আমার। এটা ব্যবহার করে অনেক দূরত্ব থেকে আমি তার অস্বীকৃতি বা অসন্তুষ্টি বুঝতে পারতাম।     

সবসময়েই পিপোর আগমনের শব্দ শোনা যেতো, সে দৃশ্যমান হবার পূর্বে। গর্জন করতে করতে আমাদের দিকে এগিয়ে আসতো। মুখ অবজ্ঞায় জ্বলজ্বল করতে থাকতো। এবং, সবসময়েই সে সাদা ও নীল রঙের শার্ট পরতো। 
“কি করছো তোমরা এখানে? নিশ্চয়ই খারাপ কাজ, ” সে চিৎকার করলো।

কার্ল দেয়ালের উপর থেকে লাফ দিয়ে নামলো এবং কাঠের তৈরি হেজের মধ্যে উপুড় হয়ে পড়লো। “আমি না, সে,” বলে সে আমার দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করলো। “সে করেছে।“ পিপো মুখ খিঁচে রাগান্বিতভাবে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “ কি খারাপ কাজ করেছো তুমি তার সাথে?”

আমার ভেতরে রক্ত বুদ্বুদ হয়ে ফুটছে বলে অনুভব করলাম। দেয়াল থেকে লাফ দিয়ে তার কাছে নেমে বললাম,”সাবধান হয়ে কথা বলো পিপো,” কার্ল ঢোক গিললো, কিন্তু আমি থামলাম না, “ তুমি কি মনে করো যে, আমরা এখনো কিন্ডারগার্টেনে পড়ি?”

অতঃপর আমি ঘুরে দাঁড়ালাম এবং সেখান থেকে চলে গেলাম। আমার পিতা তখনো আমাকে দেখতে পাচ্ছিলেন। তিনি সেখানে থেকে পিপোর ঘুষি আমার পিঠের উপরে পড়তে এবং আমাকে সামনের দিকে পড়ে যেতে দেখেছিলেন। আমি দ্রুতগতিতে এসফল্টের উপরে মুখ থুবড়ে পড়লাম।

আমার পিতা পিপোকে চিৎকার করে থামতে বললেন। আমি ভূমি থেকে উঠে ডানে বামে না তাকিয়ে বাসার দিকে যাত্রা শুরু করলাম। আমি জানতাম যে, আমার পিতা সেখানে আমার জন্যে একটি বক্তৃতা নিয়ে অপেক্ষা করছেন। বিষয় – কীভাবে অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হয়। তিনি কথা বলার সময়ে আমি তার কথার দিকে ভ্রুক্ষেপও করছিলাম না। আমি শুধু তাকিয়েছিলাম আমাদের ব্যালকনির একটা বড় বোগেনভেলিয়ার ঝোপের ম্যাজেন্টা রঙের ফুলগুলোর দিকে।

দুপুরের আগে আকাশটাকে দেখাচ্ছিলো হাড়ের মতো সাদা এবং ছায়াগুলো তখনো বালির উপরে ক্রমশ ছোট হচ্ছিলো।  সমুদ্র মৃদু গর্জন করছিলো। আমি এক পায়ের উপরে নিজের ভারসাম্যতা রক্ষা করে নিজেকে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু সক্ষম হচ্ছিলাম না। তারপর পুনরায় অন্য পায়ের উপরে ভর করে সারস পাখির অনুকরণে একই কাজ করার চেষ্টা করছিলাম। আমার পায়ে কোন চপ্পল ছিলো না। ওয়াজদি এবং তার নতুন মেয়ে বন্ধুর উপরে গোয়েন্দাগিরি করার আবেগে আমি ভুলেই গিয়েছিলাম যে, সৈকতের বালি কতটা উত্তপ্ত হতে পারে। তারপরেও পায়ের আঙুলের উপরে দাঁড়িয়ে আশা করছিলাম আরও কিছু দেখতে পাবার। কিন্তু আমার ভাইয়ের অবস্থান ছিলো খুবই দূরে। সুতরাং তাদেরকে অনুসরণ করা বাদ দিয়ে আমি লাফিয়ে লাফিয়ে বেলাভূমিতে চলে গেলাম। 

জলের উষ্ণতা সাঁতারের জন্যে যথেষ্টই উপযোগী ছিলো। কিন্তু আমি আরেকটু শীতল জল চাচ্ছিলাম, যাতে আমার পায়ের তলাকে দ্রুত আরাম দিতে পারি। দিনটি ছিলো খুবই সুন্দর; দেবদূতদের ভেতরে হাসি ও ক্ষমার অনুভূতি সৃষ্টি করার জন্যে যথেষ্ট। চারপাশে সূর্যস্নানকারীরা নিরুদ্রপভাবে শুয়েছিলো। তাদের প্রত্যেকের কাছে একটা করে সানট্যান  (suntan) তেল ছিলো। 

ওয়াজদি ও তার নতুন গার্লফ্রেন্ড আমার পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলো। পরস্পরের কাছাকাছি। তবে পরস্পরের হাত না ধরে, যেমনটা আমি আশা করেছিলাম। দীর্ঘদিন সাঁতার কাটার কারণে ওয়াজদি ছিলো শীর্ণদেহী ও পেশিবহুল। তার বাদামি চুল ইতিমধ্যেই সূর্যের উত্তাপে ব্লিচড হয়ে গিয়েছিলো। সে  আমাকে পাত্তা না দিয়ে হাসিমুখের মেয়েটির সাথে কথা বলছিলো। এক সময়ে তারা পরস্পর থেকে বিদায় নিলো এবং ওয়াজদি হাঁটতে হাঁটতে ধীরপায়ে আমার দিকে এগিয়ে আসলো। আমি তখনো জলের ভেতরেই দাঁড়িয়ে ছিলাম। চপ্পল ভেজার পূর্বেই সে থামলো। 

“সে আমাকে তাকে স্পর্শ করতে দিয়েছে,” সে ঘোষণা করলো।

আমি দ্রুততার সাথে তার কাছে গেলাম, “স্পর্শ করেছো তাকে, কোথায় স্পর্শ করেছো?”

“এমন প্রশ্ন শুধু শিশুরাই করতে পারে।“ বলে সে উল্টোদিকে ফিরলো ও চলে গেলো। আমি বকবক করতে করতে  তার পেছনে ছুটলাম। তাকে খুবই স্মার্ট ও শহুরে বলে মনে হচ্ছিলো। সিগারেট ধরানোর সময়ে আমি তার লম্বা আঙুলগুলোর প্রশংসা করলাম মনে মনে। সে সোজা হয়ে মাথা উঁচু করে হাঁটছিলো। “মেয়েটি আমাকে বলেছে যে, আমার মোজা না পরার বিষয়টি সে পছন্দ করেছে।“

“মানে কি? আমিও তো মোজা পরিনি।“

“সে পছন্দ করে যে, আমি জুতার সাথে যাতে মোজা না পরিআমি আর কখনোই মোজা পরবো না। কখনোই না।“

যুদ্ধের প্রথম রিফিউজি ছিলো আমার বোন নাদিয়া। ইসরাইলীরা বিমান বন্দরে বোমা বর্ষণের পর, সে ও আমার এক বছর বয়সী ভাগ্নে, ঘুমের কারণে তখনো তার কপোল ফোলা- এই অবস্থায় তিনটে স্যুটকেস নিয়ে আমাদের বাড়িতে আসলো। এর একটাতে ছিলো তার কাপড় ও জিনিষপত্র। দ্বিতীয়টিতে ছিলো তার ছেলের কাপড়চোপড়, এবং তৃতীয়টিতে ছিল ছেলের ডায়াপার। সে আমাদের বাড়ি হতে মাত্র তিন বিল্ডিং দূরে বাস করতো। বিমানবন্দরের একেবারেই ধারেকাছে নয়। কিন্তু আমরা জানতাম যে, আমাদের এখানে আসতে সে কখনোই বিলম্ব করবে না। আমরাও তাকে জিজ্ঞেস করিনি তার স্বামী কোথায় আছে।  

“সে যেখানে আছে, সেখানেই থাকতে পারে,” আমার বোন হাঁফাতে হাঁফাতে বললো। “ইসরাইলীদের কাছে সফিস্টিকেটেড অস্ত্র আছে। আমি তার সাথে থাকতে চাই না, যখন মিজাইল তাকে খুঁজে পাবে।“

আমার বোন একজন শিয়াপন্থীকে বিয়ে করেছিলো।

“তোমার এভাবে বলা উচিৎ নয়,” আমার পিতা বললেন। “তোমার স্বামী একজন ভালো মানুষ, একজন খুবই চমৎকার মানুষ।“ 

আমরা সবাই আমাদের বোনের স্বামীকে ভালোবাসতাম। কিন্তু নাদিয়ার কাছে তাকে বিরক্তিকর মনে হতো। বিয়ের আগে তার প্রতি সে নেশাগ্রস্ত ছিলো, তবে বিয়ের পরে নয়। স্বামীর প্রতি তার সারাক্ষণ বিরক্তি আমাকে আসলেই অবাক করতো। ভদ্রলোক একজন বুদ্ধিমান এবং প্রকৃতপক্ষেই নম্র স্বভাবের মানুষ ছিলেন। তবে তার ভেতর স্থিরতা কম ছিলো। বিবাহ কিভাবে তার সম্পর্কে নাদিয়ার ধারণা বদলে দিয়েছিলো, সেটা হঠাত করে ব্যাখ্যা করা কঠিন ছিলো। আমার ধারণা, বিবাহ পরবর্তী জীবনের অন্তরঙ্গতা ও দৈনন্দিনতা নাদিয়াকে বিস্মিত করেছলো, যা সে কাটিয়ে উঠতে পারেনি। এটা হয়ত বা আরো খারাপ হয়েছিলো, যেহেতু তার স্বামী বাণিজ্যিক উড়োজাহাজের পাইলট হিসেবে যথেষ্টই এদিক-সেদিক ভ্রমণ করতেন। তারপরেও নাদিয়া অভিযোগ করতো যে, তার আরো বেশী বাইরে থাকা উচিৎ। আমার মা তাকে সাপোর্ট করতেন এই বলে যে, বিবাহিতা হিসেবে তার বয়স খুবই কম এবং যথাসময়ে সে সবকিছু বুঝতে পারবে।   

আমার বোন তার স্যুটকেস নিয়ে তার পুরোনো কক্ষের ভেতরে ঢুকলো। এই কক্ষের চাবি সে কাউকেই দিয়ে যায়নি। কারণ, বিয়ের পরেও দিনের বেশীরভাগ সময়ই সে আমাদের এপার্টমেন্টে অতিবাহিত করতো। আমি ভাগ্নেকে কোলে নিয়ে তাকে অনুসরণ করলাম এবং খাটের উপরে তাকে রাখলাম। বোনের পুরনো খেলনাগুলো সরিয়ে তার জন্যে জায়গা করলাম। তার কক্ষের দেয়ালগুলো ছিলো গোলাপি রঙের। অনেকটা নেইল পলিশ ও লিপস্টিক রঙের। সে গাঢ় রঙ অপছন্দ করতো। তার ধারণা ছিল সেগুলো ব্যবহার করলে ঠোঁট মোটা দেখায়।

“ওকে দেখে রাখো,”নাদিয়া বলল, “আমাকে জিনিষপত্র মজুদ করার জন্যে কিনতে যেতে হবে।“

“তোমার ভাই তোমার সাথে যেতে পারে,” আমার মা বললেন। সে জিনিষগুলো বয়ে আনতে পারবে। আমি এখানে থাকবো। কিন্তু তোমরা কোনকিছুই ভুলে রেখে এসো না।“       

পুরো দেশ তখন রাস্তার উপরে ছিলো। এটা ঘটতো, প্রতিবার যখন ইসরাইল বৈরুতের উপরে বোমাবর্ষন করতো। তবে দক্ষিণে তারা কখনোই নিয়মিত বোমাবর্ষন করতো না। উষ্ণ ঋতুতে বিমানবন্দরে তাদের কর্তৃক  বোমাবর্ষনের অর্থই ছিলো সকল ভ্রমণকারীদেরকে শহর, এমনকি দেশ থেকে বের করে দেয়া।

গ্যাস স্টেশনের পাশ দিয়ে অতিক্রম করার সময়ে আমার পিতা মানুষের ভিড় দেখে খুবই বিরক্ত হলেন। তিনি স্টিয়ারিং হুইলের উপরে মাথা আছড়ালেন। আমাদেরকে সুপারমার্কেটে নামিয়ে দিয়ে তাকে কয়েকঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হবে। তেলের ট্যাঙ্ক ভর্তি করার জন্যে। ওয়াজদি আমার মায়ের কার নিয়ে বেরিয়েছিলো। সম্ভবত সে  কোন স্টেশনে ইতিমধ্যেই আটকে গেছে।

“আমি এগুলো পছন্দ করি না,’ আমার পিতা চিৎকার করলেন।

“ তাহলে আমরা এগুলো করছি কেন?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।

“ইসরাইলীরা থামবে না। এটা তারা কখনোই তা করে না। কারণ, বোমা ফেলা হলো সুবিধাবানদের অধিকার। এর অর্থ হলো, তারা দোজখের দৈত্যদের বৃষ্টি ঝরাবে আমাদের উপরে।“ তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে ফুসফুসকে ঠাণ্ডা বাতাস দিয়ে পূর্ণ করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু তা কোন সময়েই কাজ করতো না। “বোমা নিক্ষেপ করে সবাইকে হত্যা কর, সবাইকে ধ্বংস করে দাও। কেউ কি এর দায়িত্ব নেবে? কেউ কি এর জন্যে নিজেকে দোষী ভাববে? তারা নিজেদেরকে ছাড়া অন্য সবাইকে দোষ দিতে জানে শুধু।“

কথাগুলো বলে পিতা একটু শান্তি পেলেন। প্রতিবারেই ইসরাইলীরা আমাদেরকে আক্রমণ করলে তিনি রেগে যান। তবে তার রাগ ধ্বংস ও মৃত্যুর জন্যে নয়। তিনি রেগে যান কেউই দায়িত্ব নিচ্ছে না বলে। আমি জানি আজ আমার পিতা অনেকক্ষণ রেগে থাকবেন।

সুপারমার্কেটে যাবার পর আমি ও আমার বোন পরস্পর হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলাম। আমি আনন্দিতভাবে গাড়িতে পানের জলের কেস, পিতার জন্যে সিগারেটের কার্টুন, ময়দার বস্তা, গম ও কফি ভরলাম। আমার বোন ভাগ্যবতী হলে সেও তার সবকিছুই পাবে, কারণ মার্কেটটি খুব দ্রুতই খালি হয়ে যাচ্ছিলো। লোকজনেরা গত বিকেল হতেই জিনিষপত্র মজুদ করা শুরু করে দিয়েছিলো। এ বিষয়ে লেবানীজদের যথেষ্ট পূর্বভিজ্ঞতা রয়েছে।

আমি সিদ্ধান্ত নিচ্ছিলাম কি পরিমাণ চাল আমাকে কিনতে হবে। এই সময়ে আমি দুইটা করিডোরের ওপার হতে  আমার বোনের চিৎকার শুনতে পেলাম। দ্রুত সেদিকে গেলাম এবং দেখতে পেলাম  যে, সে এক প্যাকেট প্যামপারস (Pampers) শক্ত করে ধরে আছে এবং একজন লম্বা মেনিকিউর করা বাদামী রঙের পোষাক পরা  মহিলা সেটি তার কাছ হতে ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে। মহিলা বকবক করতে করতে আমার বোনের  ভ্যানগাড়িতে রাখা দুই প্যাকেট তোয়ালের দিকে তাকিয়ে নিজের সদ্য আঁচড়ানো চুল নেড়ে তাকে ধাক্কা দিচ্ছিলেন। মহিলাকে দেখে বাতিকগ্রস্ত বলে মনে হচ্ছিলো আমার। বোনের আঙুল প্লাস্টিকের ভেতরে ঢুকেছিলো এবং তার কয়েকগাছি চুল টুপির বাইরে  চলে এসেছিলো। আশেপাশের ক্রেতারা ফিসফিস করছিলো। নিজেদের হাসি চেপে রাখার কোনোই চেষ্টা করছিলো না তারা।  মহিলার ফিলিপিনো পরিচারিকা নীল ইউনিফরম পরিহিত অবস্থায় মুখে হাত রেখে এই মারামারি দেখছিলো। পরিচারিকা ও তার গৃহকর্তী দুজনের চুলের ফ্যাশন একই ধরণের ছিলো। সম্ভবত তারা দুজনে একই হেয়ারড্রেসারের কাছ হতে চুলে সাজ নিয়েছিলো। তাদের দুজনের পরনেই একই ধরণের সোয়েটার ছিলো, যা তারা তাদের কাঁধের উপরে বেঁধে রেখেছিলো।

নাদিয়া টানাটানি ও চিৎকার করছিলো। শেষ পর্যন্ত মহিলা তার হাতের বন্ধন খুলে দিলেন। “তোমার তিনটি প্যাকেজ আছে,” সে বলল হতাশ কন্ঠে। “আমাকে ওখান হতে এক প্যাকেট দাও।“

আমার বোন অবজ্ঞার সাথে প্যাম্পার্স এর শেষ প্যাকেজটি নিজের ভ্যানগাড়ির ভেতরে রেখে উল্টো ফিরে ভ্যানগাড়ি ঠেলতে ঠেলতে চলে গেলো। “চল যাই,” আমাকে দেখার পর সে বলল।

মহিলাটি কানে কানে তার পরিচারিকার সাথে কথা বললো। পরিচারিকা মাথা নেড়ে আমার বোনের ভ্যানগাড়ির দিকে ছুটলো এবং একটি  ডায়াপার প্যাকেজ নিয়ে দ্রুত অন্য করিডোরের পেছনে অদৃশ্য হয়ে গেলো। তার নীল সোয়েটার নায়কের টুপির মতো বাতাসে উড়ছিলো। আমার বোন চিৎকার করে তার ভ্যানগাড়ি নিয়ে পরিচারিকার দিকে ছুটে যাওয়ার চেষ্টা করলো। কিন্তু ততক্ষণে অন্য ক্রেতারা তার পথের উপরে এসে দাঁড়িয়েছে। মহিলা হাসলো এবং তার চেহারা দীপ্তিময় হয়ে উঠলো। আমি আশা করেছিলাম যে, সে চিৎকার করে বলবে, “ আমাদের সবার মধ্যে সবচেয়ে ফর্সা কে?”

বোমা বর্ষনের সপ্তাহকাল অতিক্রান্ত হলে আমার পিতার রগ কমে এলো। সেই বিকেলে তিনি কালো প্যান্ট ও সাদা শার্ট পরেছিলেন, যেগুলো তিনি একদিন পূর্বেও পরেছিলেন। এলকোহলের কারণে তার চোখ লাল হয়ে ছিলো। চার আঙুল দিয়ে গ্লাস ধরে তিনি পান করছিলেন। সেটিকে কাৎ করে ধরে রাখছিলেন কিছুক্ষণ সময়ের জন্যে এবং তৃষ্ণা মিটাচ্ছিলেন। তার আঙ্গুলগুলো ছিলো লম্বা, ভাঁজ পরা এবং ফোলা। তার ঠোঁট সংকুচিত ও বিবর্ণ হয়ে গিয়েছিলো। সুতরাং আমি সেটা দেখতে পাচ্ছিলাম না। তিনি জলসিক্ত ছাঁদের দিকে তাকিয়েছিলেন। মাতাল দৃষ্টিতে।

"কোন কোন সময়ে," তিনি শান্তভাবে বললেন, “আমি খুবই ক্লান্তিবোধ করি।“

“আমি জানি।“

তিন সিলিঙ এর দিকে তাকিয়েই আমার সাথে কথা বলতে থাকলেন। মাথা নামালেন না।

তিনি কাজে যেতে পারেননি। যখন তিনি কাজ করতে পারতেন না, তখন তিনি ক্লান্তিবোধ করতেন। এবং যখন তিনি ক্লান্ত হতেন, তখন তিনি মদপান করতেন। এবং যেহেতু তিনি খুব কম সময়েই মদপান করতেন, সেহেতু তিনি ক্লান্ত ও বিষন্ন মদ্যপে পরিণত হতেন।  

বোমা বর্ষনের মধ্যে কয়েকদিন বিরতি এলো। ওয়াজদি বাইরে হাঁটতে যেতে চাইলো। অনেকদিন সে বন্দী হয়ে ছিলো। সে এপার্টমেন্ট ত্যাগ করে চলে গেলো এবং  আমি তাকে অনুসরণ করলাম। আমরা আমাদের প্রিয় সৈকতে গেলাম। সেটি ছিলো একটি দীর্ঘ সাদা বালির সৈকত। ইসরাইলীরা বোমাবর্ষন শুরু করার পর প্রথমেতারা পোর্টের একটা তেলের ডেপোতে আঘাত করলো। ফলে তেল ছড়িয়ে গিয়ে সৈকতকে কালো রঙে রূপান্তরিত করলো। আমরা সৈকতের কাছ দিয়ে দেখতে পেলাম, জলের উপরে অসংখ্য মাছের মৃতদেহ ভাসছে। যে সমুদ্র এক সময়ে মধুরতার সাথে ফিসফিস করতো, সেটা এখন কুৎসিত শব্দ করছিলো।

আমার ভাই সৈকতে নামলো কাছ থেকে দেখার জন্যে। “তুমি কি আসছো?” আমি কোন উত্তর দিলাম না। আমি তাকে অনুসরণও করলানা। পারলাম না অনুসরণ করতে।

দ্বিতীয় পর্যায়ের রিফিউজিরা, (যারা ছিলো আসল রিফিউজি) আসলো বোমা বর্ষনের দুই সপ্তাহ পরে। ডক্টর তার এপার্টমেন্ট তার দুইজন কর্মচারী ও তাদের পরিবারের জন্যে খুলে দিতে বললেন। এরা দক্ষিণ শহরতলিতে অবিরাম বোমাবর্ষনের কারণে গৃহছাড়া হয়েছিলো। আমাদের পাড়াও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলো, তবে বর্তমানে তা অপেক্ষাকৃতভাবে নিরাপদ ছিলো। পাড়ার দিকে যাওয়ার সাঁকোটা উড়িয়ে দেয়া হয়েছিলো। দুই রাস্তা পরের লম্বা বিল্ডিং, যেটার উপরে  টেলিভিশন এনটিনা ছিলো, তাকে গুঁড়িয়ে সমতলের সাথে মিশিয়ে দেয়া হয়েছিলো। তবে আমাদের এলাকা বর্তমান পর্যন্ত ক্লাস্টার বোমা আক্রমণ থেকে বেঁচে ছিলো।   

কেয়ারটেকার হিসেবে আমি পরিবারগুলোর জন্যে অপেক্ষা করছিলাম। আমি আশা করেছিলাম যে, তাদের সাথে সন্তানরাও থাকবে। কিন্তু সেখানে বছরের ইঁচড়েপাকা এক বালক ছাড়া আর কেউ ছিলো না। কর্মচারীদের দুজনেই দক্ষিণ অঞ্চলে ডঃ মাসরির বাগানে কাজ করতো। সুতরাং তারা তাদের স্ত্রীদের রেখে ফিরে চলে গেলো।

“যুদ্ধ থামুক বা না থামুক,” অধিকতর বয়স্ক লোকটি বলেছিলো, “আমাদের পক্ষে বাগান ছেড়ে অন্য কোথাও থাকা সম্ভব নয়।“

অন্য দিকে একচোখ ওয়ালা মানুষটি বলেছিলো যে, তারা দুজন পরস্পরের ভাই হলেও, স্ত্রীদের সঙ্গে তাদের বৈপরীত্য লক্ষ্য করার মতো। তারা দেখতে জীর্ণশীর্ণ হলেও তাদের স্ত্রীরা দেখতে খুবই সুন্দরী ও কম বয়সী। ছোট ভাইটি সাম্প্রতিক অতীতে বিয়ে করেছিল। তার স্ত্রীর চামড়া ছিলো ফ্যাকাসে ধরণের সাদা। এবং চোখগুলো ছিলো কিছুটা নিমীলিত ও হালকা নীলাভ। তার শুভ্র চুলে তিন ধরণের শেইড ছিলো। পরনে ছিলো কৃত্তিম হীরক খচিত কালো টাইটস, যা তার দীর্ঘ টি-শার্টের নীচে হারিয়ে গিয়েছিলো।     

আমি দরজা খুলতেই মহিলাদ্বয় এপার্টমেন্টের ভেতরে ঢুকে পায়চারী করতে লাগলো। তাদের চলাচল পরস্পরের সাথে এতোটাই সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিলো যে, আমার কাছে মনে হচ্ছিলো তারা সারা জীবন একসাথে বাস করেছে। আমি কক্ষের দরজা বন্ধ করার আগেই অপেক্ষাকৃত বয়স্কা মহিলাটি বললো, “তুমি কি মোহাম্মদ আলীকে বাসাটা ঘুরে দেখাতে পারবে?”

মোহাম্মদ আলী তার মায়ের পাশেই দাঁড়িয়েছিলো। নিজের জুতার দিকে তাকিয়ে। তাকে বয়সের তুলনায় ক্ষুদ্র আকৃতির মনে হচ্ছিলো। তার চিবুকটি অবতল বুকের ভেতরে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিলো। মাথাটিকে মনে হচ্ছিলো ময়লাযুক্ত। সেখান হতে চুলের গুচ্ছ শিশু সাপের মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিলো। যখন সে আমার দিকে তাকালো,  আমি ভয় পেয়ে গেলাম। কারণ,  তার চোখ দুটো ছিলো ভয়ংকর। যাদুকরদের মতো তীক্ষ্ণ দৃষ্টিসম্পন্ন।

“আমি পারবো না,” আমি উত্তর দিলাম। “সম্ভব হলে পরে ঘুরে দেখাবো।“

পরিবারের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে, একদিন সকালে আমার বোন সিদ্ধান্ত নিলো উত্তরের দিকে গমনের। ত্রিপোলিতে শপিং করতে যাওয়ার জন্যে। ইতিমধ্যেই সে বৈরুতের মার্কেটগুলো চষে ফেলেছিলো। রাস্তাগুলো যদিও ক্ষতিগ্রস্ত ছিলো, গত দশদিনে ইসরাইলীরা উত্তরের দিকে কোন আক্রমন করেনি। আমার পিতা মাতার কেউই তার সাথে যেতে রাজী হলো না। আমার ভাইও অস্বীকার করলো যেতে। সুতরাং সে তার স্বামীকে বাধ্য করলো তার সাথে যেতে। “আমাকে এপার্টমেন্ট থেকে তুলে নেয়ার আগে অবশ্যই নিশ্চিত করবে যে, তুমি তোমার শিয়া জিপিএস লোকেটর বাসায় রেখে আসছো,“ সে তাকে খোঁচা দিলো। সাধারণভাবে আমার মা তাকে খোঁচা দিয়ে থাকেন তার অতিরিক্ত মোবাইল ফোন ব্যবহারের জন্যে। তবে এটাও ঠিক যে, ইসরাইলীরা সমস্ত ল্যান্ডলাইনগুলোকে ধ্বংস করে দিয়েছিলো।

পূর্ববর্তী সপ্তাহে আমি তাকে বলেছিলাম যে, সে অদ্ভুত ধরণের, অস্ত্রপাগল। কিন্তু সে আমার কথায় কোনরূপ মনোযোগই দিলো না। আমার মা আমাকে বোঝালেন যে, প্রতিটি মানুষেরই আঘাতজনিত চাপ ((traumatic stress) মোকাবেলা করার পদ্ধতি ভিন্ন এবং বোমাবর্ষন দেখেনি এমন একজন মানুষের যুদ্ধকালীন আচরণ বুঝতে পারা আসলেই কঠিন। ইসরাইলী মিসাইলগুলো আঘাত করার পর আমার পিতা মদ্যপান করেন; আমার মা রান্না করেন; আমার ভাই চিন্তায় নিমগ্ন হয়ে যায়; এবং আমার বোন ডায়াপার শপিং করে বেড়ায়।  বোমাবর্ষনের পূর্বে সে সম্ভবত অন্য যে কোন লেবানীজের মতো যৌক্তিক আচরণ করতো, কিন্তু প্রতিটা মিসাইল বর্ষণের সাথে সাথে সে অস্থির আচরণ করতে থাকে। তার গোলাপী কক্ষটি ডায়াপার দিয়ে পরিপূর্ণ ছিলো। সেগুলো মেঝে থেকে ছাঁদ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে গিয়েছিলো। সেখানে আর কছুই রাখার জায়গা ছিলো না। এমনকি আমার বোন নিজের ও সন্তানের খাটের নীচেও  অনেকগুলো ডায়াপার রেখে দিয়েছিলো। সন্তানের ছয় বা সাত বছর পর্যন্ত পরার জন্যে যথেষ্ট সংখ্যক ডায়াপার কক্ষটিতে মজুদ ছিলো। আমি যখন বিষয়টা তাকে বললাম, সে চিৎকার করে বললো, “আমি তো আবার গর্ভবতীও হতে পারি। এরকম ঘটেই থাকে।“ কিন্তু আজ সকালে আমরা ডিজেল জেনারেটর চালিয়ে টেলিভিশন সংবাদ দেখার সময়ে একজন ঘোষক জানালেন যে, ইসরাইলীরা ‘জনসন এন্ড জনসন’ ওয়্যারহাউজে গতরাতে বোমাবর্ষন করে সবকিছুই পুড়িয়ে দিয়েছে।

“কেন?” আমার মা টেলিভিশনকে জিজ্ঞেস করলেন।

আমার পিতা স্কচের বোতলের দিকে তাকালেন। কিন্তু মদপান করার জন্যে তখনো খুবই সকাল ছিলো।

আমার ভাই কফিতে চুমুক দিলো। “আমি নিশ্চিত যে, সন্ত্রাসীরা শ্যাম্পু ও ব্যান্ড-এইডের মধ্যে লুকিয়ে ছিলো। সুতরাং দুঃখ করে লাভ নেই।“  

আমার বোন উজ্জ্বল হয়ে উঠলো, মনে হলো যে, মূহুর্তের ভেতরে সে চেয়ারে বসেই লম্বা হয়ে গেছে। “ আমি তোমাকে আগেই বলেছিলাম যে, ডায়াপারগুলো শেষ হয়ে যাবে। এরপর তারা  Procter & Gamble warehouse এ বোমাবর্ষন করবে। সে আমাদের সাথে কথা বলছিলো, কিন্তু তাকে দেখে মনে হচ্ছিলো সে বিশাল অদৃশ্য শ্রোতাদের সাথে কথা বলছে। কথা শেষে  সে তার ঠোঁট ভাঁজ করে তার নতুন রঙ করা আঙুল দিয়ে শীষ বাজাতে শুরু করলো।

মোহাম্মদ আলীকে আমার পুরো বাসস্থান ঘুরে দেখাতে হলো। আমার মা সেই রুক্ষ ছেলের সাথে সময় কাটাতে আমাকে চাপ দিচ্ছিলেন। তিনি ভাবতেন যে, তাকে দেখতে ভূতুড়ে প্রাণী বলে হয় এবং সে একটা শিশুর যা দেখা উচিৎ, তার চেয়ে অনেক বেশী সে দেখেছে। “সে নিশ্চয়ই খুব একাকী শিশু,” তিনি বললেন। “বাসা ধ্বংস হয়ে যাবার পর তার পরিবার বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়েছে। আমাদের উচিৎ তার সাথে সহমর্মী ও প্রতিবেশীসূলভ আচরণ করা।“  

আমি জানতাম না তাকে কি দেখাতে হবে। ইসরাইলীরা যুদ্ধের ভেতরে একটা বিরতি নিচ্ছিলো। ফলে আমাদেরকেও গৃহের ভেতরে অন্তরীন থাকতে হচ্ছিলো না। কিন্তু মোহাম্মদ আলীকে দেখে মনে হচ্ছিলো না যে, সে তার পরিপার্শ্ব নিয়ে আদৌ আগ্রহী। চলার সময়ে মাথা নীচু করে থাকা ছাড়া সে আর কিছুই করছিলো না। আমাদের বাসার দিকে মুখ করে থাকা দেয়ালের উপরে আমরা নিশ্চুপভাবে বসেছিলাম। তার পাগুলো আমার পায়ের চেয়ে ছোট ছিলো। আমার দিকে না তাকিয়ে সে সামনের দিকে ঝুঁকে ছিলো। আঙুলের যে অংশ দিয়ে সে দেয়াল ধরেছিলো, সেটাকে সাদা মনে হচ্ছিলো। সে আঙুল কামড়াত। আমি আমার আঙুলগুলোর দিকে তাকিয়ে দ্রুত অন্যদিকে তাকালাম।

নির্জনতা আমাকে বিব্রত করছিলো। “তুমি কি একমাত্র ছেলে?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।

“না।“ তার অদ্ভুত স্বরবর্ণ হতে তাকে দক্ষিণ অঞ্চলের বলে শনাক্ত করলাম।

আমি অপেক্ষা করতে থাকলাম, আশা করে যে, সে কথা চালিয়ে যাবে। কিন্তু সে নির্জনতাকেই বেছে নিলো। “তোমার ভাই-বোনেরা কোথায়?”

“এখানে নেই।“

আমি তাকে ঘুষি মারতে চাচ্ছিলাম। এর সাথে সময় কাটানোর চেয়ে ডাক্তারদের কোন বই পড়াও আমার জন্যে ভালো।

“তুমি কি চাও যে আমি তোমাকে একাকী থাকতে দেই? আমি তাকে বললাম আমার বিরক্তি লুকানোর চেষ্টা না করেই। “অসুবিধা নেই। তুমি থাকলে আমার অসুবিধা হবে না। আমি তোমার সাথে বন্ধুভাবাপন্ন হবার চেষ্টা করছি।“

সে শেষ পর্যন্ত তার মাথা ঘোরালো, তার নীল চোখ দিয়ে আমাকে মাপতে মাপতে। “তুমি আমার বন্ধু হতে চাচ্ছো কেনো?” সে জিজ্ঞেস করলো।

“কারণ আমার মা আমাকে বলেছে হতে।“

সে হাসতেই তার মুখের ভেতরে একটা সোনালি দাঁত দেখা গেলো।

“আমার তিন ভাই ও দুই বোন আছে,” সে বললো।

“অনেক ভাই-বোনই তো তোমরা,” আমি বললাম।

“আমার বড় ভাই নাইজেরিয়াতে থাকে, এবং আমার দুই বোন ও তাদের পরিবারগুলোও সেখানে থাকে। আমার এক ভাই যুদ্ধে শহীদ হয়েছে। বেঁচে থাকলে তার বয়স এখন ষোল হতো।

আমি একটু অপেক্ষা করলাম যাতে সে কথা চালিয়ে যেতে পারে। “আরও একটা ভাই আছে তোমার,” আমি বললাম।

“সে যুদ্ধ করছে।“ সে ইতস্তত করে দীর্ঘশ্বাস ফেললো। “সে একজন যুবক।“

আমি দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে নিরুত্তাপ ভাব প্রদর্শন করলাম। ভাবখানা এই যে, যোদ্ধাদের নিয়ে কথা বলা আমার জন্যে কোন ব্যাপারই না। “বয়স কত তার?”

“চৌদ্দ।“

‘তোমার অন্য ভাইও কি যোদ্ধা ছিলো?”

“আমি জানি না।“

“এটা কিভাবে সম্ভব যে, তুমি জানো না?”

“যুদ্ধ না হলে কে যে যোদ্ধা তা কেউই জানে না। আমি জানি যে, আমার সেই ভাই যুদ্ধ করছে, কারণ সে আমাকে বলেছে গত সপ্তাহে। সে আমাকে বলে গেছে মা’কে রক্ষা করতে, কারণ সে শত্রুদের মারতে যাচ্ছিলো।“

“ আহ,” আমি বললাম। “যুদ্ধ।“ 

“তুমি অনেক প্রশ্ন করো,” সে বললো।

“কারণ, তুমি কোনকিছুই জিজ্ঞেস করো না।“

“আমি জিজ্ঞেস করবো,” সে বললো। “তুমি সেই মোটা বালক থেকে লুকিয়ে থাকো কেনো?”  

আমি কোন উত্তর দিলাম না। আমি আমাদের ব্যালকনির দিকে তাকালাম দেখার জন্যে যে, সেখানে কেউ আছে কিনা।

“তোমার উচিৎ না তাকে ভয় পাওয়া,” সে বললো। 

সেদিন বিকেলে আমি শুনলাম আমার পিতা ব্যালকনির উপরে পাগল হায়েনার মতো হাসছেন। তিনি বিয়ারে চুমুক দিয়ে কোমর-সমান উঁচু কংক্রিট দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে ছিলেন, যেটি মাসরি’দের ব্যালকনিকে আমাদেরটা থেকে পৃথক করেছিলো। বোগেনভেলিয়া ফুলগুলো তার পায়ের কাছে দুমড়ে-মুচড়ে পড়েছিলো। অন্যদিকে নতুন বিবাহিতা মহিলাটি শুনছিলো আমার পিতার কথা। তিনি তাকে শোনাচ্ছিলেন আমার সংগে আমেরিকা এম্বাসেডরের সাক্ষাতের গল্প। এই গল্পটি তিনি প্রায়ই শুনিয়ে থাকেন। আমার পিতা আমাকে ঈশারা করলেন তার পাশে গিয়ে  দাঁড়ানোর জন্যে। তিনি আঙুল দিয়ে আমার মাথার চুল এলোমেলো করে দিয়ে আমাকে খুব কাছে নিয়ে জড়িয়ে ধরলেন এবং তার গল্প বলতে থাকলেন।

সিভিল ওয়ার শেষ হবার কয়েক বছর পর আমি কিন্ডারগার্টেনে পড়তাম। সেই সময়ে আমেরিকান এম্বাসেডর আমাদের স্কুল পরিদর্শন করতে এসেছিলেন। তার সাথে ছিলো প্রতিবেদক ও চামচাদের একটি দল। এম্বাসেডর অনেকগুলো শিশুর সংগে আলাপচারিতা করেছিলেন। কথা শেষ হবার পর আমাকে অবাক করে দিয়ে তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন,”দুই যোগ দুই কত হয়?” আমি কোন ধরনের ইতস্তত না করেই বলেছিলাম, “ আপনি কি কিনছেন, নাকি বিক্রি করছেন?” সেখানে আমি নিজেকে একজন লেবানীজ বলে চিহ্নিত করেছিলাম, যে ভালো লাভের জন্যে নিজেদের আত্নাকেও বিক্রি করে দিতে পারে, যদিও তারা নিজেদেরকে ফোনেশিয়ানদের (Phoenicians) উত্তরাধিকার বলে দাবী করে থাকে। আমি নিজেকে আমার পিতার সন্তান বলেও পরিচয় দিয়েছিলাম এবং বলেছিলাম যে,  তিনি মানিচেঞ্জারের ব্যবসা করেন।

আমার পিতা গল্পটা শেষ করে পুনরায় হায়েনার মতো হাসিতে মত্ত হলেন।

তার হাসিটা শেষ পর্যন্ত কৌতুকময় হেঁচকিতে পরিণত হলো। “তুমি আসলেই একটা ফানি ছেলে,” বলতে বলতে তিনি আমার গাল আলিঙ্গন করলেন।

সকালের রোদে আমি আর মোহাম্মদ আলি আগের দিনের মতো একই দেয়ালের উপরে বসেছিলাম। খুব একটা কথা বলছিলাম না। প্রায় বিশ মিনিট আমরা সেখানে অবস্থান করার পর সেখানে পিপো এসে উপস্থিত হলো।

“তোমার এই বন্ধুটি কে?”

পালিয়ে যাওয়ার কোন উপায় ছিলো না। মোহাম্মদ আলী তার ক্ষয়ে যাওয়া জুতার দিকে তাকিয়ে ছিল। আমার হাতের পাতা ঘামছিলো।

“সে আমার বন্ধু নয়,” আমি বললাম। “তার পরিবার পাশের বাসায় এসেছে, কারণ তাদের বাসায় বোমা ফেলা হয়েছে।“

“সুতরাং তুমি আরেকজন কম বয়সী ছেলে পেয়েছো তোমার সাথে খারাপ কাজ করার জন্যে?”

কিছু একটা ছেলেটির ভেতরে অনাবৃত হলো। সে তার মাথা তুলে রাগত দৃষ্টিতে পিপোর দিকে তাকালো।

“আমার দিকে ওভাবে তাকিয়ো না, ছোট্ট----“ পিপোর দৃষ্টি বিস্ফারিত হয়ে গেলো, যখন সে দেখলো মোহাম্মদ আলী একটা সুইস আর্মি ব্লেড দিয়ে তার বাহুতে এলোপাথাড়ি আঘাত করছে।

“তুমি যদি আরেকবার আমার সাথে কথা বলো,” মোহাম্মদ আলী বললো, “আমি তোমাকে খুন করবো।“

পিপো তার হালকা নীল শার্টের উপরে ছেড়া জায়গাটা দেখলো এবং তার ভেতর দিয়ে আঙুল ঢুকিয়ে দিলো। সেখানে কোন রক্ত ছিলো না। “এটা আমার প্রিয় শার্ট,’ সে বললো। “আমার মা আমার জন্যে কিনেছে এটা।“

“তুমি যদি আবার আমার সাথে কথা বলো...”

‘এইবার পিপো উত্তেজনা দেখালো। মোটা দেহের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও সে যথেষ্টই দ্রুত গতি সম্পন্ন ছিলো। সে কম বয়সী বালকটির মুখে ঘুষি মারলো এবং তাকে উড়ন্ত করে দেয়ালের উপরে ছুঁড়ে দিলো। সেটাই যথেষ্ট ছিলো না। পিপো তাকে ধাক্কা দিয়ে মাটির উপরে ফেলে দিয়ে তার বুকের উপরে চেপে বসলো এবং তার উপরে আক্রমণ শুরু করে দিলো। ছেলেটির শরীর থেকে রক্ত ফিনকি দিয়ে বের হবার পর এবং তার হাড্ডি ভেঙে দেয়ার পর সে চিৎকার করতে লাগলো, “ তুমি কি মনে কর যে, তুমি আমাকে শিশুদের ছুরি দিয়ে আমাকে ভয় দেখাবে?”

আমি পিপোকে থামানোর চেষ্টা করলাম, কিন্ত সে আমার উপরে লাফিয়ে পড়লো, যখন আমি তার কাছে যাওয়ার চেষ্টা করলাম। সে আসলেই অনেক বড় ছিলো। আমি সাহায্যের জন্যে চিৎকার করলাম। আমি ভাবলাম যে, মোহাম্মদ আলী মরেই গেছে। আমি এত জোরে জোরে চিৎকার করছিলাম যে, পুরো পাড়ার সবাই সেখানে জমে গেলো। ওয়াজদি পিপোকে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বালকের উপর থেকে টেনে তুললো।

কেউ একজন এ্যাম্বুলেন্স ডাকলো। অন্য কেউ তার মাকে ডাকলো।

পিপো বিড়বিড় করলো,” “সে আমাকে ছুরি দিয়ে মেরেছে। ছুরি মেরেছে। আমি যাচ্ছি বাবাকে বলতে।“ 

যদিও আমরা তার পরিবারকে ঠিকমতো চিনতাম না, আমার বাবা-মা তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্যে সিদ্ধান্ত নিলেন এবং আমাকেও তারা জোর করে নিয়ে  গেলেন। হাসপাতালের বিছানায় মেশিন ও তার সতর্ক মা  দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে তাকে আর পূর্বের দিনের বালকের মতো মনে হচ্ছিলো না তার মুখের রেখা ও ছায়াগুলো পরিবর্তন হয়ে গিয়েছিলো। মনে হচ্ছিলো আমি তাকে একুইরিয়ামের ভেতরে দেখছি। আমি সরাসরি তার মুখের দিকে তাকাতে পারছিলাম না। আমার পিতা অজ্ঞান হয়ে থাকা মোহাম্মদ আলীর দিকে তাকিয়েছলেন। তিনি মাথা নাড়ছিলেন যেন তার সামনে অভাবনীয় কিছু ছিলো। তার কাছে মনে হচ্ছিলো যে তার দৃষ্টির বিভ্রম হয়েছে। তিনি চোখ বন্ধ করে আবার খুলছিলেন। আমার মনে হলো যে, তার বাড়ি ফেরা দরকার। এই মূহুর্তে তার প্রয়োজন মদ্যপান করা।

আমার মা অন্যদিকে হাসপাতালেই থাকতে চাইলেন, কারন তিনি মোহাম্মদ আলীর মায়ের জন্যে খুবই দুঃখিত অনুভব করছিলেন। আমি আমার পিতাকে অনুরোধ করলাম আমাকে বাড়িতে নিয়ে যেতে। আমি যখন তাকে অনুসরণ করে কারের দিকে যাচ্ছিলাম, তখন ছেলেটির চাচী, নতুন বিবাহিতা মহিলাটি আমাদের দিকে দৌড়ে এলেন। তার শরীর চিতাবাঘের মতো নড়ছিল। তিনি আমাদেরকে অনুরোধ করলেন তাকে একটা লিফট দেয়ার জন্যে।

সামনের আসনে বসে মোহাম্মদ আলীর চাচী বকবক করতে এবং নার্ভাসভাবে হাসতে লাগলেন।  তাকে দেখে মনে হলো না তিনি তার ভাতিজার অবস্থা নিয়ে উদ্বিগ্ন। প্রতিটা মানুষই আঘাতজনিত চাপ পৃথকভাবে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। আমাদের পক্ষে কখনোই যুদ্ধাকালীন আচরণ কি হবে তা বোঝা সম্ভব হয় না।

এপার্টমেন্টে শুধু পিতা আর আমি ছিলাম। তিনি একটা সাদা সোয়েট স্যুট ( sweat suit) পরেছিলেন। তার মানে হলো তিনি কোথাও বেড়াতে যাবার পরিকল্পনা করছিলেন। তার ব্যাকব্রাশ করে আঁচড়ানো চুল ও দৃষ্টির আতিশয্য থেকে তাকে আমার কাছে পূর্ব ইউরোপিয়ান বলে মনে হচ্ছিলো, যিনি প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন কোন নাইটক্লাবে যাওয়ার। ইসরাইলীরা বৈরুতের দক্ষিণ অংশে পুনরায় বোমা ফেলছিলো। এই সময়ে কেউই বেড়াতে বাইরে যাচ্ছিলো না। তিনি বিরক্ত ভঙ্গীতে হাত নেড়ে বের হয়ে চলে গেলেন। একটু পর আমাদের পাশের এপার্টমেন্টটির দরজা বন্ধ হবার শব্দ শুনতে পেলাম। আমি চোখ বন্ধ করে ভাবতে চেষ্টা করলাম। পিতার সাদা সোয়েট স্যুট ক্রমশ কালো রঙে রূপান্তরিত হয়ে গেলো।

ঘন্টাখানেক পর আমি লিভিং রুমে হাতলওয়ালা একটা চেয়ারের উপরে বসেছিলাম। পিতার মুখমণ্ডলের উপরে বিন্দু বিন্দু স্বেদ জমেছিলো। তিনি তখনো এডিডাস এর তৈরি সেই সোয়েট স্যুটটি পরেছিলেন। কিন্তু সেটার সামনের দিকটা উন্মুক্ত ছিলো। ফাঁক দিয়ে তার অন্তর্বাস দেখা যাচ্ছিলো। তার বুকের কিছু লোমও সেই অন্তর্বাস ভেদ করে বেড়িয়ে আসছিলো। তার পেটকে অনেক বড় দেখাচ্ছিলো। মনে হচ্ছিলো সেটা পুরো পৃথিবীকে গিলে ফেলেছে। তার মাথার চুলগুলো কপালের ওপরে লেপ্টে ছিলো।

গ্রীষ্মের বাতাস ম্যাজেন্টা রঙের ফুলগুলোকে নিয়ে তখন ব্যালকনিতে একটা ঘুর্ণির সৃষ্টি করেছিলো। সেটাকে  মনে হচ্ছিলো বলরুমের ভূতুড়ে গাউনের মতো। আমার পিতা আমার দিক থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে জানালার দিকে, নাচের দিকে, বৈরুতের দিকে এবং আমাদের শহরের দিকে তাকালেন।

সবকিছুই ক্রমশ ভেঙে পড়ছিলো।

সমাপ্ত

ডেইলি বাংলাদেশ/টিআরএইচ