একাত্তুরের দিন।। পর্ব: সীমা

একাত্তুরের দিন।। পর্ব: সীমা

মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৬:৩৬ ১ ডিসেম্বর ২০২০  

ছবি- সংগৃহীত

ছবি- সংগৃহীত

‘জন্মই আমার আজন্ম পাপ, মাতৃজরায়ু থেকে নেমেই জেনেছি আমি
সন্ত্রাসের ঝাঝালো দিনে বিবর্ণ পত্রের মতো হঠাৎ ফুৎকারে উড়ে যাই
পালাই পালাই সুদূরে’ - দাউদ হায়দার

উজ্জ্বল শ্যাম বর্ণের মেয়ে। বয়স টীনের (Teen) এর শেষ প্রান্তে। অথবা সদ্য বিংশতিতম জন্মদিবস অতিক্রম করেছে। নাম সীমা। বাঙ্গালী নাম। শুনলেই বুকের ভেতরে মোচড় দিয়ে বঙ্গোপসাগরের তীরে নবীন এক দেশের মানচিত্রের সীমারেখা জেগে ওঠে। গাঙ্গেয় ব-দ্বীপ। বাংলা নামের এক দেশ। 

সীমা নামটা সম্ভবত তার কিশোরী মায়ের দেয়া। কেনো তিনি তার নাম সীমা রেখেছিলেন কে জানে? একটা পূর্ণ বিপর্যয়ের ভেতরেও কি সেই কিশোরী ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতে ভুলে যায়নি?

অবাক করা ব্যাপার হলো এই নামেই সুইডেনের একটা বিদেশী পরিবারে বড় হচ্ছিল সে।

পরনে নীল জিন্সের প্যান্ট। ওপরে সাদা হাফ শার্ট। পিঠে খয়েরী রঙের ব্যাকপ্যাক। ভ্রমণকারীদের মতো। কানে ইয়ার ফোন। বোঝা যায় জন্মের পর থেকেই সুদূর বিদেশ-বিভূঁইয়ে প্রতিপালিত হয়েছে সে। 

কাজল-কালো চোখ। চোখ দুটোই বলে দেয় সে বাংলাদেশের মেয়ে। ঠিক যেন কয়েক বছর পূর্বে রিদমিক জিমন্যাস্টিকে রাশিয়ার হয়ে রিও অলিম্পিকে স্বর্ণ পদক অর্জনকারিণী ‘বাংলার বাঘিনী’ মার্গারিটা মামুনের অতল চোখের মতো। মেয়েটার মুখমন্ডলে একটা নরম ভাব ভিড় করে আছে। লাজুক বাঙ্গালী কিশোরীর মুখের মতো।

এক ইউরোপীয় পরিবারের সাথে মেয়েটা একটু পূর্বেই আন্তঃনগর ট্রেনের কম্পার্টমেন্টে প্রবেশ করেছে। এক বর্ষীয়ান  দম্পতি, দীর্ঘ দেহী সুঠাম চেহারার এক ইউরোপীয় কিশোর এবং কৈশোর অতিক্রমকারীণী সেই মেয়ে। চার জনের দলের মধ্যে মেয়েটার আকৃতিই খর্বাকৃতির। অন্য সবার কাঁধের নীচে পড়ে। উচ্চতা ৫ ফুট ১ অথবা ২ ইঞ্চি। অন্যেরা ছয় ফুটের কাছাকাছি।

১৯৯২ সন। নভেম্বর মাস। আমি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন। জীবনে প্রথমবারের মতো বিদেশে গিয়েছি। কম্বোডিয়ায়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে জাতিসংঘের সামরিক পর্যবেক্ষক হিসেবে। এক বছর সময়ের জন্য। ছয় মাস পর ছুটিতে বাড়ি ফিরছি। অদৃশ্য কোন মায়ার টানে। ঢাকায় দুইদিন অবস্থানের পর ছুটছি গ্রামের বাড়িতে। জামালপুরে। নাড়ির টান একেই বলে!

ঢাকা বিমানবন্দর রেল স্টেশন। ‘একতা’ ট্রেনের চেয়ার কোচে বসে আছি। জানালার ধারে। একটু পরেই ট্রেন ছাড়বে। ময়মনসিং এর উদ্দেশ্যে। আরো কয়েকটা স্টেশন পেরিয়ে জামালপুর। এই ট্রেনে করেই আমি বাড়ি ফিরি। সব সময়ে। টঙ্গী জংশন অতিক্রম করলেই রেললাইনের দু’ধারে বিশাল সবুজ প্রান্তর। প্রান্তরের ওপারে দিগন্তের পাশে গ্রামের রেখা। ধূসর সবুজ অথবা কালচে। ট্রেন দ্রুত চলতে শুরু করলেই গ্রামগুলো ট্রেনকে চক্কর দিতে থাকে।সেই আমার ছেলেবেলা থেকে। ঘূর্ণায়মান লাটিম বা আলোর বৃত্তের মতো। অতঃপর এইচ জি ওয়েলসের ‘টাইম মেশিন’ মুভির মতো আমার চারপাশের দৃশ্যপট ক্রমাগত বদলাতে থাকে। এক ধরনের মগ্নতার ভেতরে আমি বারংবার প্রত্যাবর্তন করি আমার জন্মস্থানে।

হেমন্তের শেষ বিকেল। চেয়ার কোচ। আমার আসন আর সামনের আসনের মধ্যবর্তী স্থানে ছোট টেবিল। ট্রেনের মেঝেতে স্থায়ীভাবে বসানো। আমার সামনের চেয়ারে বসেছে সেই ইউরোপীয় দম্পত্তি। আমার পাশের সীটে সেই মেয়েটি। ট্রেন ছাড়ার পর ইউরোপীয় মহিলাই আমাকে প্রথম সম্ভাষণ করলেন। ‘হ্যালো’ বলে। জাতিসংঘ মিশনে কয়েক মাস কাজ করার পর আমার ভেতরে বিদেশীদের নিয়ে জড়তা কিছুটা কেটে গেছে। জাতিসংঘের যে দলে আমি কাজ করি সেখানে আমি ছাড়া সকলেই বিদেশি। মালয়েশিয়ান, অস্ট্রিয়ান, আইরিশ, ব্রিটিশ, ফ্রেঞ্চ, চায়নিজ এবং আমি। প্রতিটা দেশ থেকে একজন করে।

আমি জিজ্ঞেস করতেই মহিলা বললেন, “আমরা সুইডেন থেকে এসেছি। এটা আমাদের মেয়ে সীমা। আর ওটা আমাদের ছেলে”। বেড়াতে এসেছে কিনা জিজ্ঞেস করতেই জানালেন, “আমরা গিয়েছিলাম কুমিল্লার নিকটবর্তী বরুয়ায়।বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের অব্যবহিত পরে ১৯৭২ সালে আমরা সীমাকে দত্তক হিসেবে গ্রহণ করে নিয়ে গিয়েছিলাম। এরপর বাংলাদেশে আর আসা হয়নি। এবারে এসেছি সীমার মায়ের খোঁজে। সীমা তার মাকে দেখতে চাচ্ছিলো অনেকদিন ধরে।” 

সীমার মায়ের খোঁজ পেয়েছে কিনা জানতে চাইলে জানালো অনেক খুঁজেছে তারা। কিন্তু কেউই তার সম্পর্কে কিছুই বলতে পারেনি। সে কারণেই তারা এখন যাচ্ছে ময়মন সিংহ হয়ে ঈশ্বরগঞ্জে। এক মিশনারিতে। এই মিশনারির মাধ্যমেই সীমাকে দত্তক নেয়া হয়েছিলো। তাদের ক্ষীণ আশা মিশনারির পক্ষ থেকে সীমার মায়ের অবস্থানের বিষয়ে যদি সাহায্য পাওয়া যায়। 
মহিলা তার পকেট থেকে সীমার শিশু বয়সের একটা ছবি বের করলেন। সাদা কালো। দত্তক নেওয়ার সময়ে তোলা। বসতে শিখেছে এমন এক শিশুর ছবি। পেটটা ফুলে গোল হয়ে আছে। কৃমির কারণে। চোখের ভেতরে জল টলমল করছে। কপালের একপাশে বড় কাজলের টিপ। সীমার মুখটা দেখতে এখনও একই রকম।

ছবিতে শিশু সীমা শীর্ণকায়া এক কিশোরীর কোলে। সম্ভবত সীমার মা। অদ্ভুত কোন কারণে মায়ের চেহারাটা অস্পষ্ট ও ঝাপসা হয়ে আছে। হেমন্তের শেষ বিকেলের ধানক্ষেতের আঁধারের মতন। সীমার বর্তমান মা আমকে জিজ্ঞেস করলেন, “উয়াজ নট শি ভেরি কিউট?” আমি বললাম, “খুব সুন্দর!” পাশ থেকে সীমা মৃদু হাসলো। নিঃশব্দে। 

আমি সীমার সাথে কথা বলি। বাংলাদেশে সে আগে আসেনি। তবে বাংলাদেশকে তার খুব ভাল লেগেছে। ল্যাঙ্গুয়েজ, মিউজিক এবং আরও কি কি সাবজেক্টে নরওয়েতে পড়াশুনা করে। গফরগাঁও অতিক্রম করে আমরা ময়মন সিংহের কাছাকাছি চলে এসেছি। আমার কাছে একটা বাংলা গানের সিডি ছিল। রবীন্দ্র সঙ্গীত এবং নজরুল গীতির সংমিশ্রণ। আমি নিজে দোকান থেকে এডিট করে নিয়েছিলাম। তাকে দিতেই সে তার সি ডি প্লেয়ারে ঢুকিয়ে ইয়ার ফোন দিয়ে কিছুক্ষন শুনল। তারপর আমকে ফিরিয়ে দিতে দিতে বলল যে, ল্যাঙ্গুয়েজটা সে বুঝেনি। তবে সুরটা খুব মেলোডিয়াস!

আমি তাকে সিডিটা দিয়ে দিতে চাইলে সে ভীষণ খুশি হলো। পরিবর্তে তার ব্যাকপ্যাক খুলে আমাকে চিনামাটির তৈরি একটা ছোট্ট জুতা আমাকে গিফট করল।

জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকার পর তার দত্তক বাবা আমাকে বললেন, “তোমাদের দেশটা খুব সুন্দর। আমার কাছে মনে হচ্ছে আমি আমার চশমার ওপরে আর একজোড়া রঙিন চশমা লাগিয়েছি!” আমিও জানালা দিয়ে বাইরের দ্রুত অপসৃয়মান দৃশ্যাবলির দিকে দৃষ্টি ফেললাম। দেখলাম যে, আমাদের দেশটা আসলেই ভীষণ সুন্দর। অথচ এই দেশের জন্ম প্রক্রিয়াটা কি রক্তাক্তই না ছিল!

আমার পাশে বসা এই মেয়েটা এই রক্তাক্ত জন্ম প্রক্রিয়ারই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। যাকে জন্মের পর পরই, কিছু বুঝতে শেখার আগেই মাতৃ স্নেহ থেকে বঞ্চিত হয়ে অন্য দেশে চলে যেতে হয়েছে। শুধুমাত্র আমাদেরকে শুদ্ধতা দেবার জন্যে। মনে পড়ে গেলো যুদ্ধের পর আমাদের গ্রামের বারি কাকা এক শহুরে মহিলাকে বিয়ে করে এনেছিলেন বঙ্গবন্ধুর ডাকে। সেই মহিলাও একদিন সবার অলক্ষ্যে চলে গিয়েছিলেন আমাদের এলাকা থেকে। ১৯৭৩ সালে। আর কোনদিনই ফিরে আসেননি। 
সীমা জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। তাকে যথেষ্ট ক্লান্ত দেখাচ্ছে। চারপাশের দৃশ্যাবলী তাকে আনন্দ দিচ্ছে বলে আমার মনে হলো না। একটা শিকড়বিহীন বৃক্ষ কতক্ষণই বা হাওয়ায় দুলতে পারে?

সামনেই ময়মন সিংহ স্টেশন। থামলেই নেমে যাবে ওরা। 

স্বাধীনতার মতো পরশপাথরকে স্পর্শ করার জন্যে আমাদেরকে কত ধরণের আত্মত্যাগই না স্বীকার করতে হয়েছে। আমরা কি সব মনে রাখি?

(প্রকাশিত)

ডেইলি বাংলাদেশ/টিআরএইচ