Alexa জীবন যুদ্ধে জয়ী রুবিনা

জীবন যুদ্ধে জয়ী রুবিনা

প্রকাশিত: ১৮:৫৬ ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৮  

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

রুবাইয়া রহমান রুবিনা। হার না মানা এক সংগ্রামী নারী! জীবন সংগ্রামে জয়ী হওয়ার অনন্য উদাহরণ। সমাজে নিজে আলাদা অবস্থান তৈরি করেছেন তিনি। হয়ে উঠেছেন অনুসরণীয় এক সফল নারী উদ্যোক্তা।

নাটোরের শিক্ষিত নারী উদ্যোক্তা রুবিনা। হাঁস-মুরগী, মাছ আর কৃষি উদ্যান তৈরি করে সফলতা পেয়েছেন তিনি। মাত্র সাড়ে চার বছরে পেয়েছেন সফলতার স্পর্শ। মিলেছে একাধিক স্বীকৃতি। রুবিনা এখন কাজ করছেন নারী উদ্যোক্তার ক্ষেত্র সম্প্রসারণে।

অভাব অনটনের সংসার। বাবার মৃত্যুর পর অসহায় হয়ে পড়ে পুরো পরিবার। বিয়ের পর সংসারে মনোযোগ দেন তিনি। কিন্তু টেকেনি সংসার। ভেঙ্গে যায় দাম্পত্য জীবন। কিন্তু নিজের সংসার গেলেও ভেঙ্গে পড়েননি রুবিনা।

নাটোর সদরের চাদপুরে বাবার অবর্তমানে মা আর ছোট ভাই-বোনের সংসারে হাল ধরেন রুবিনা। শুরু হয় সেলাই করে জীবিকা নির্বাহের সংগ্রাম। এ থেকে সংগৃহীত অর্থ আর অর্থলগ্নী প্রতিষ্ঠানের ঋণে কেনেন পাঁচশ’ মুরগির বাচ্চা। বাড়ির আঙ্গিনায় শুরু করেন ব্রয়লার মুরগীর খামার। সেখানেও দূর্ভাগ্য! ডুবে গেলেন লোকসানে।

কিন্তু হার মানেননি রুবিনা। তার ভাষায়, রুবিনা বলেন, ব্যবসায়ে লোকসানের মধ্যে লুকিয়ে থাকে মুনাফা।

নতুন উদ্যমে শুরু করেন খামারের কার্যক্রম। শুধু মুরগীর খামারই নয়,বাড়ি সংলগ্ন পুকুরে শুরু করেন মাছ চাষ। পাশাপাশি হাঁসের খামার।

প্রায় একই সময়ে কৃষিতে হয় তার অভিষেক। পর্যায়ক্রমে জমি ইজারা নিয়ে ফলের ছয়টি বাগান তৈরি করেন রুবিনা। এসব বাগানে ফলছে আম, লেবু, পেয়ারা, কলা, কুল আর পেঁপে, রয়েছে মরিচ। আমের তালিকায় আছে অপ্রচলিত গৌরমতি, ব্যানানা ম্যাঙ্গোর মত আম।

নাটোর হর্টিকালচার সেন্টার ৪০টি খুঁটিতে ১২০টি ড্রাগন ফলের প্রদর্শনী খামার স্থাপন করে দিয়েছে রুবিনাকে। ড্রাগনের বাগানে সাথীফসল হিসেবে তিনি চাষ করেছেন টমেটো, কপি, শিম আর মরিচ।

সব উপকরণের কার্যকর ব্যবহারের মাধ্যমে রুবিনা প্রমাণ করেছেন-কোনোকিছুই অপ্রয়োজনীয় নয়। মুরগীর বিষ্ঠা দিয়ে তৈরি করছেন উৎকৃষ্ট জৈব সার-রিং কম্পোস্ট। প্রতি মাসে যার বিক্রি মূল্য তিন হাজার টাকা। পাশেই উৎপাদন করছেন আরেকটি জৈব সার-ভার্মি কম্পোস্ট। কারখানার উপরে শোভাবর্ধন করছে বেগুনী রঙের শিম ফুল। বাড়ির শোভা বাড়িয়ে রেখেছে এক ঝাঁক কবুতর। এর বাণিজ্যিক মূল্যও কম নয়।

রুবিনার বিশাল এ কর্মযজ্ঞে সহযোদ্ধা হিসেবে পেয়েছেন ছোট ভাই রুবেল আর অনার্সে পড়ুয়া ছোট বোন রিমিকে। সঙ্গে দু’জন নিয়মিত শ্রমিকসহ প্রতিদিন আরো গড়ে ১৫ জন করে।

রুবিনার এ কর্মযজ্ঞের স্বীকৃতি দিয়েছে সরকারি বিভিন্ন দফতর। তাদের বাড়ির আঙ্গিনায় আইপিএম স্কুল পরিচালনা করছে নাটোর কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ। এতে এলাকার ২৫ পরিবারের ৫০ সদস্যকে হাঁস-মুরগি পালন, গরু মোটাতাজাকরণ, সবজি চাষ, বসতবাড়ির বাগান ইত্যাদি বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও অর্থ সহায়তা দেয়া হচ্ছে।

রুবিনার নেতৃত্বে গঠিত চাঁদপুর ‘নারী উন্নয়ন সমবায় সমিতি’র ২৫ সদস্য প্রশিক্ষণ শেষে প্রত্যেকেই সমবায় বিভাগ থেকে গাভী পালনের ঋণ পাচ্ছেন এক লাখ ২০ হাজার টাকা।

রুবিনাকে সভানেত্রী করে মহিলা বিষয়ক অধিদফতরের নিবন্ধনে গঠিত ‘ইয়ূথ উইম্যান ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি’ সেলাই কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে। রুবিনাকে নিয়ে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে সমাজ সেবা ও প্রাণি সম্পদ বিভাগ।

নাটোর হর্টিকালচার সেন্টারের ‘বছরব্যাপী ফল উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্প’র আওতায় রুবিনাকে কমিউনিটি হর্টিকালচার প্রোভাইডার মনোনীত করা হয়েছে। মাসে তিন হাজার টাকা সম্মানী ভাতায় কৃষিতে উদ্যোক্তা সৃষ্টির কাজ করছেন রুবিনা। এলাকার আট শতাধিক ব্যক্তিকে হর্টিকালচার সেন্টারে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ছাড়াও প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও হাতে কলমে শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছেন।

ইতোমধ্যে রুবিনার হাতে প্রশিক্ষিত নারী উদ্যেক্তাদের মধ্যে সফল হয়েছেন হেনা বেগম, শাকিলাসহ বেশ কয়েকজন। হেনা বেগম বলেন, আমাদের নতুন করে বাঁচতে শিখিয়েছেন রুবিনা।

নাটোর মহিলা বিষয়ক অধিদফতর রুবিনাকে দিয়েছে জয়িতা পদক, ইউনিলিভার ‘তোমার স্বপ্ন কর সত্যি’ ক্যাটাগরিতে দুই লাখ টাকার প্রাইজমানি। আর সবচেয়ে সম্মানজনক হিসেবে গত বৃহস্পতিবার ঢাকার খামারবাড়িতে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশের আয়োজনে রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদের কাছ থেকে ‘কৃষি উন্নয়নে নারী’ পদক পেয়েছেন রুবিনা।

রুবিনা বলেন, আমার পথ চলাতেই আনন্দ। এ পথ চলা সার্থক হবে-যদি সমাজের অবহেলিত নারীদের উদ্যোক্তা হিসেবে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে সফল হই। ইনশাল্লাহ আমি সফল হবো।

নাটোর হর্টিকালচার সেন্টারের উপপরিচালক স ম মেফতাহুল বারি বলেন, রুবিনাকে কমিউনিটি হর্টিকালচার প্রোভাইডার মনোনীত করা হয়েছে। নতুন উদ্যোক্তা বিশেষত নারী উদ্যোক্তা তৈরিতে ইতোমধ্যে তিনি তার কাজ শুরু করেছেন।

বছরব্যাপী ‘ফল উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্প’র পরামর্শক এস এস কামরুজ্জামান বলেন, রুবিনার মেধা আর কৃষি বিভাগের প্রয়োজনীয় সমর্থন ও সহযোগিতায় তিনি এখন সফল উদ্যোক্তা। সারাদেশে তার মতো উদ্যোক্তা তৈরি হলে দেশ হবে সমৃদ্ধ।

ডেইলি বাংলাদেশ/আজ/এমআরকে