Alexa আজও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার কপালে জোটেনি

‘আজও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার কপালে জোটেনি’

প্রকাশিত: ১৪:৪৭ ৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮   আপডেট: ২০:৪৩ ১৫ এপ্রিল ২০১৮

টেলি সামাদ

টেলি সামাদ

ইতিহাস আজীবন কথা বলে। ইতিহাস মানুষকে ভাবায়, তাড়িত করে। প্রতিদিনের উল্লেখযোগ্য ঘটনা কালক্রমে রূপ নেয় ইতিহাসে। সেসব ঘটনাই ইতিহাসে স্থান পায়, যা কিছু ভালো, যা কিছু প্রথম, যা কিছু মানবসভ্যতার অভিশাপ-আশীর্বাদ।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে এক সময়ের শক্তিমান অভিনেতা টেলি সামাদ। পর্দায় দেখা না গেলেও তাকে মনে রেখেছেন দেশের অগনিত মানুষ। এরই মধ্যে ছয়শর বেশি ছবিতে কাজ করেছেন তিনি। তার অনবদ্য অভিনয় আর অসাধারণ সব ভঙ্গিমা এখন অনেকের কাছে গল্পের মতো।

টেলি সামাদ এক সময় চলচ্চিত্রে অভিনয় নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও এখন কালেভাদ্র দু-একটি নাটকে কাজ করছেন। তার সঙ্গে মুঠোফোনে কথা হয় ডেইলি বাংলাদেশ প্রতিনিধি যাহিন ইবনাতের। তিনি কেনো কাজ করছেন না? আবার কাজে ফিরছেন কিনা? এসব প্রশ্নের উত্তর দেন টেলি সামাদ। তার সম্যক কথা দর্শকের উদ্দেশ্যে তুলে ধরা হলো:

কেমন আছেন?

টেলি- ভালো নেই। বাইরে তেমন যাওয়া হয় না। ঘরে বসেই কেটে যাচ্ছে দিন। আশির দশকে দাপিয়ে কাজ করেছি। এখন কাজ করা আমার পক্ষে সম্ভব হয় না। এমনকি কথা বলতেও খুব কষ্ট হয়। তাই আমার খবর কেউ রাখে না।

এখন কি করছেন?

টেলি- বলার মত তেমন কিছু করছি না। সারাদিন বাসায় থাকি। টিভি দেখি আর ছবি আঁকি। এভাবে আমার সময় চলে যায়। আমাকে নিয়ে নিউজ করার মত কিছু নেই। তাই কেউ নিউজও করেনা। তবে আগেই বলেছি মাঝেমধ্যে দু’একটা নাটক নির্মাণ করছি। টুকটাক বিভিন্ন স্টেজ শো- তে অংশগ্রহণ করছি। তবে শারীরিক অসুস্থতার কারণে কোন কিছুতে নিয়মিত হতে পারছি না।

অভিনয়ে আসলেন কীভাবে?

টেলি- ছোটবেলা থেকেই একটা সাংস্কৃতিক আবহের মধ্যে বড় হয়েছি। বাবাকে দেখেছি ছবি আঁকতে, গান গাইতে। যদিও বাবা পেশায় ব্যবসায়ী ছিলেন। বাবার দেখাদেখিতে আমিও ছবি আঁকতাম গান গাইতাম, এছাড়া ছোটবেলা থেকেই অভিনয়ের প্রতি আমার একটা ঝোঁক ছিলো। ক্লাস থ্রিতে পড়াকালীন নিজেই একটা নাটক লিখে সেই নাটকে অভিনয় করেছিলাম। এরপর বড় ভাই আব্দুল হাইয়ের দেখাদেখি আমিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগে ভর্তি হলাম। এরপর অভিনয়ে জড়িয়ে গেলাম।

চলচ্চিত্রে আপনার যাত্রা কোন কাজের মধ্য দিয়ে?

টেলি- টিভি, চলচ্চিত্র ও মঞ্চে অভিনয়ের পাশাপাশি প্রযোজনা এবং গানের জগতে কাজ করেছি। নজরুল ইসলামের পরিচালনায় ১৯৭৩ সালের দিকে ‘কার বৌ’ চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে এই অঙ্গনে পথচলা শুরু আমার। সে সময় ‘মনা পাগলা’ ছবির সংগীত পরিচালনা করেছি। ১৯৭৩ সালে ‘কার বউ’ চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে বড় পর্দায় যাত্রা শুরু হলেও দর্শকের কাছে বেশ পরিচিতি পেয়েছি আমজাদ হোসেনের ‘নয়নমণি’ ছবির মাধ্যমে। তবে সর্বাধিক জনপ্রিয়তা অর্জন করি, আমার অভিনীত ‘পায়ে চলার পথ’ ছবিটি দিয়ে। এরপর অসংখ্য ছবিতে অভিনয় করা হয়েছে। অভিনয়ের বাইরে ৫০টির বেশি ছবিতে গানও গেয়েছি।

এখন কাজ করছেন না কেনো?

টেলি- আমি অভিনয়ের মানুষ। জীবনে আমার যা কিছু অর্জন সবকিছু অভিনয়ের বদৌলতে। অনেক দিন যাবত অভিনয় থেকে দূরে থাকলেও আমার মনটা পড়ে থাকে অভিনয়েই। প্রবল ইচ্ছা থাকা স্বত্বেও শরীরে পেরে ওঠেনা বলে আর ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে পারিনা।

উল্লেখ্য ২০১৪ সালের ২০ মে চিকিৎসার জন্য আমেরিকায় যান টেলি সামাদ। দীর্ঘ চার মাস নিউইয়র্কে অবস্থান করার পর ওই বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর দেশে ফিরেন তিনি। এসে সে বছরের ১ অক্টোবর তার পায়ের বুড়ো আঙুলে একটি ক্ষত দেখা দেয়। ১৮ অক্টোবর রাজধানীর একটি বেসরকারী হাসপাতালে তাকে ভর্তি করানো হয়। এরপর বাসায় ফিরে শারিরিকভাবে আর সুস্থ হতে পারেন নি তিনি।

আব্দুস সামাদ থেকে টেলি সামাদ হলেন কীভাবে?

টেলি- সে সময় আমার কমেডি নিয়ে টেলিভিশন সহ প্রায় সকল মাধ্যমেই বেশ আলোচনা। সবাই বলতো, অনেকদিন পরে ভালো একজন কমেডি অভিনেতা পাওয়া গেছে। এরপর বিটিভি থেকে একদিন আমার বাসায় চিঠি আসলো আমাকে সেখানে যেতে হবে। সেখানে উপস্থিত হতেই বিটিভির ক্যামেরাম্যান মোস্তফা মামুন ভাই বললেন তোর নাম আজ থেকে আব্দুস সামাদ বাদ দিয়ে টেলি সামাদ। সেই থেকেই টেলি সামাদের জনপ্রিয়তার জয়রথে ছুটে চলেছেন।

এখন আসি ভিন্ন কথায়, আপনি তো একজন কৌতুকভিনেতা। এখন চলচ্চিত্রে কৌতুক অভিনয় শিল্পীর সংকট। এই বিষয়টি কীভাবে দেখেন?

টেলি- কৌতুক পরিবেশন সৃষ্টিশীল একটা কাজ এবং সবচেয়ে কঠিন। এই কঠিন কাজটি দর্শকদের কাছে সাবলীলভাবে উপস্থাপন করতে হবে, সুতরাং হাস্যরসের সহজাত একটা ক্ষমতা শিল্পীর থাকতে হবে। যিনি তার চোখ-মুখ, হাত-পা, বক্তব্য, আঞ্চলিকতা- এগুলোর ব্যবহার সঠিকভাবে করতে পারবেন তিনি সফল হবেন।

অনেক চলচ্চিত্রে কাজ করেছেন। বর্তমান ছবিতে কি কি সংকট আছে বলে মনে করছেন?

টেলি- আমাদের এখন শিল্পী দরকার। তাছাড়া আমার মনে হয় সিনিয়র শিল্পীদের দ্বারা আবার চলচ্চিত্রে নিয়মিত কাজ করানো উচিত। তারা ফিরলে চলচ্চিত্রের অনেক সংকট দূর হবে বলে মনে করছি। সে সঙ্গে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,  এখন তো শিল্পী হওয়ার আগেই তারকা খ্যাতি, গাড়ি-বাড়ি হাঁকাতে চাচ্ছে অনেকেই। দিন শেষে দেখা যাচ্ছে ওরা হারিয়ে যাচ্ছে। তাদের মনে রাখতে হবে, ফেসবুকে খোলামেলা ছবি দিয়ে আলোচনায় আসা যায়, কিন্তু প্রকৃত শিল্পী হওয়া যায় না। আগেকার দিনে নায়িকাদের নামেও ছবি চলতো। অনেক নায়িকা একাই ছবি টেনে নিয়ে যেতো। কিন্তু এখন ইন্ডাস্ট্রি নায়ক নির্ভর। 

এখনকার ছবির মান কেমন মনে হচ্ছে?

টেলি- আশির দশকে যখন চলচ্চিত্রের রমরমা অবস্থা ছিল, তখন দাপিয়ে কাজ করেছি। তবে আমাদের সময়ে এখনকার মতো এতো দ্রুত ছবির কাজ শেষ হতো না। একটা ছবির কাজ শেষ করতে ৬-৮ মাস সময় লাগতো। ভক্তি হতো কাজের প্রতি। আমার মনে আছে, প্রয়াত বুলবুল ভাইয়ের সঙ্গে একটি ছবিতে অভিনয়ের জন্য আমাকে ৯০ বার শট দিতে হয়েছিল। আর এখন শুনি এক মাসেই ছবির কাজ শেষ হয়ে যায়। আর ছবিতে কোন ধরণের মানই খুঁজে পায় না। যার কারণে হল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে আমাদের দর্শকরা। তবে এটা সত্যি যে, আগের চেয়ে প্রযুক্তির উৎকর্ষতা অনেক গুনে বেড়েছে। কিন্তু একটা ছবির কাজ করতে গেলে, সে চরিত্রে ঢুকতে গেলে সেটা নিয়ে স্টাডি করতে হয়। আমাদের সময়ে এটা করতাম। কিন্তু এখন কেউ সেটা করে না বললেই চলে! যার ফলে অনেকের অভিনয় হয় না।

ক্যারিয়ারে অনেক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। অপ্রাপ্তির কিছু থাকলে শেয়ার করুন।

টেলি- প্রায় চার দশক ধরে চলচ্চিত্রের সঙ্গে জড়িত। এতগুলো বছরে ৬০০ চলচ্চিত্রে অভিনয়ও করেছি। প্রায় প্রত্যেকটি ছবিতে আমার অভিনয় প্রশংসিত ছিল। কিন্তু শেষ জীবনে এসে আমার একটাই আক্ষেপ, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেলাম না তবে এই পর্যন্ত অনেক পুরস্কারই পেয়েছি। সেসব পুরস্কারে আমার ঘর ভর্তি হয়ে আছে। কিন্তু আজ ও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার আমার কপালে জোটেনি। এটা যেহেতু জাতীয় চলচ্চিত্র পর্যায়ের পুরস্কার সেহেতু আমার মনে হয় এটা অর্জন করতে হলে জাতে ওঠা লাগে। কবে যে জাতে উঠবো আর কবে এই পুরস্কারটা পাবো সেটা বোধহয় ঈশ্বর মালুম।

এক সময়ের তুমুল ব্যস্ত এই অভিনেতা সর্বশেষ কাজ করেছেন ‘জিরো ডিগ্রী’ ছবিতে। তাও ২০১৫ এর দিকে। কিন্তু এখন শারীরিকভাবে এত অসুস্থ যে, ডেইলি বাংলাদেশের প্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলার সময় বার বারই বলছিলেন কষ্ট হচ্ছে কথা বলতে। তাই আর কথা বাড়াতে চাই না।

তবে ফোন রাখার সময় একটা কথায় তিনি বলেছেন, রাজ্জাকের চলে যাওয়াতে বাংলা সিনেমা আরো এক ধাপ ধ্বংসের দিকে পতিত হলো। সে সঙ্গে বাংলা ছবিতে প্রাণ ফিরিয়ে আনতে সকলের প্রচেষ্টা আরো বাড়াতে হবে মনে করছেন এই কিংবদন্তি অভিনেতা টেলি সামাদ।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেডআই/টিএএস