৯০ হাজার শিশুর প্রাণ বাঁচিয়েছেন মহিয়সী এই নারী

৯০ হাজার শিশুর প্রাণ বাঁচিয়েছেন মহিয়সী এই নারী

কানিছ সুলতানা কেয়া ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১২:২৫ ২২ মে ২০২০  

ছবি: সারা বাকের

ছবি: সারা বাকের

নিউইয়র্ক শহরে টাইফয়েডের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যায় ২০ শতকের গোড়ার দিকে। জ্বর, হাম, আমাশয় এবং অন্যান্য সংক্রামক ব্যাধিতে হাজারো মানুষ মারা যেতে থাকে। বিশেষ করে শিশুরা বেশি আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছিলো। 

অপরিচ্ছন্নতা, স্যানিটেশনের অভাব, অপুষ্টি এবং বিভিন্ন সংক্রমণ রোগের কারণেই এত শিশু মারা গিয়েছিল। সবচেয়ে বেশি মারা গিয়েছিল নিউইয়র্ক শহরের ম্যানহাটনের লোয়ার ইস্ট সাইডে। নিউইয়র্ক সিটি স্বাস্থ্য বিভাগের অবহেলার কারণে পরিস্থিতি আরো বেশি খারাপের দিকে যাচ্ছিল। 

১৯৮০ সালে সারা জোসেফাইন বাকের শিশু হাইজিনের ডিপার্টমেন্টের পরিচালক ছিলেন। শিশু মৃত্যুহার কমাতে পরিষ্কার দুধের স্টেশন স্থাপন করেন তিনি। এছাড়াও প্রশিক্ষিত নার্সদের দিয়ে মায়েদের জীবাণু এবং শিশুদের স্বাস্থ্যবিজ্ঞান সম্পর্কে প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থাও করেছিলেন। 

তখন যুক্তরাষ্ট্রের মতো আধুনিক দেশেও শিশু মৃত্যুর হার আশ্চর্যজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল। শুধু নিউইয়র্ক সিটিতেই, পাঁচ বছরের নিচে বয়সী এক-তৃতীয়াংশ শিশু মারা গিয়েছিল। প্রতি গ্রীষ্মের সময় সেখানে গড়ে দেড় হাজার শিশু মারা যায়। দিনকে দিন এর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। হয়তো রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে পারত। 

সারা বাকেরতবে বাকের তার কাজ শুরু করেছিলেন। তিনি সেসময় নানা পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। তার প্রথম কার্যক্রমটি ছিল সহকারী পরিদর্শকরা সব অসুস্থ শিশুদের খোঁজখবর নিয়মিত নিচ্ছেন কিনা তা নিশ্চিত করা। এরপর তিনি জানতে পারলেন আদৌ তারা একাজ করছেন না। এমনকি শহরের সব অঞ্চল পরিদর্শনও করছে না তারা। এতে বেকার খুবই মর্মাহত হন। 

তখন পরিচালক হিসেবে বাকেরের প্রথম বছরের শেষের দিকে। তখন শহরে শিশুমৃত্যুর সংখ্যা তুলনামূলক হ্রাস পেতে থাকে। বেকারের নানা পদক্ষেপের জন্য কমপক্ষে  ১২০০ শিশুর মৃত্যু কম হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্যের ইতিহাসবিদ এলেনা কনিস বলেন, সেসময় বাকের অন্য জায়গায় যেতে পারেননি। জনস্বাস্থ্যে তার কর্মজীবনের ৩০ বছর পার করেন। 

এই সময়ের মধ্যে বাকের গৃহস্থালীর কাজ, শিশু পরিচর্যার প্রশিক্ষণসহ শিশুদের কল্যাণে স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১৯৩০ এর দশকে অবসরে যান বাকের। সেসময়ের সংবাদ প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, তিনি নিউইয়র্ক সিটিতে প্রায় ৯০ হাজার শিশুকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন। এরপর বাকের জনস্বাস্থ্য কর্মসূচিগুলো নিউ ইয়র্ক সিটির শহরগুলো অনুসরণ করতে থাকে।  

নিউইয়র্কের পুফকিসির বাসিন্দা ছিলেন বেকার। বাবা মা ভাই বোন নিয়ে খুব সুখেই তারা বসবাস করছিল।  হঠাৎ বাবা তারপর ভাইয়ের মৃত্যুতে একেবারে ভেঙে পড়ে পরিবারটি। তার ক্যারিয়ার হিসেবে চিকিৎসা পেশাকেই বেছে নেয় বাকের। ছোট বোন মেরি এবং মায়ের ভরণ-পোষণের পুরো দায়িত্ব ছিল তার উপর। 

মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় অগ্রদূত ছিলেন বাকেরমেডিকেলে পড়ার ক্ষেত্রে তার প্রথম পছন্দের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল ভাস্সার কলেজ। তবে সেখানকার পড়ার খরচ বেশি হওয়ায় বাকের নিউইয়র্ক ইনফিরমারিতে মহিলা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। ১৮৯৮ সালে মেডিকেলে পড়া শেষ করেন বাকের।

এরপর ইংল্যান্ড হাসপাতালে নারী ও শিশু বিভাগে এক বছরের জন্য ইন্টার্নশিপ করেন। সেখানে তিনি জনাকীর্ণ, অবহেলিত এবং অসচ্ছল দরিদ্র ও শ্রমিক শ্রেণীর মানুষের শিশুদের নিয়ে কাজ করেছেন। তাদের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি নিশ্চিত করতে এবং মৃত্যু হার কমাতে কাজ করেন বাকের।  

ইন্টার্নশিপ শেষে বাকের নিউইয়র্কে ফিরে আসেন। এরপর ১৯০২ সালে তিনি নিউইয়র্ক স্বাস্থ্য বিভাগে খণ্ডকালীন পরিদর্শক হিসেবে যোগদান করেন। তিনি ছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা হিসেবে নিযুক্ত প্রথম নারী চিকিৎসক। এখানে তিনি পাঁচ বছর কাজ করেছিলেন। নিউইয়র্ক সিটিতে তখনো উন্নত চিকিৎসা তেমন কিছুই ছিল না।

সেসময় নিউইয়র্ক স্বাস্থ্য বিভাগ একটি স্থায়ী সংস্থা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বাকের যোগ দিয়েছিলেন শিশু হাইজিনের ডিপার্টমেন্টে। সেটি তখন একেবারেই নতুন চালু হয়েছে। তাই কর্মকর্তাদের সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য সঠিক জীবাণু তত্ত্ব এবং ব্যাকটেরিওলজির জ্ঞান এবং সরঞ্জাম পর্যাপ্ত ছিল না। 

সারা জীবনই তিনি নারী ও শিশুর স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করে গেছেন১৯ শতকে ফরাসি রসায়নবিদ লুই পাস্তুর জীবাণু তত্ত্ব বিকাশ করেন। যা প্রমাণ করে, অণুজীব এবং তাদের গুণগুলো ক্ষয় এবং রোগের কারণ হতে পারে। পাস্তুরের কাজকে সামনে রেখে জার্মান চিকিৎসক রবার্ট কোচ আবিষ্কার করেন, যক্ষ্মা, কলেরা, টাইফয়েড জ্বর এবং প্লেগজনিত রোগগুলো অণুজীবের সংক্রমণের কারণ হতে পারে। চিকিৎসকরা তখন অল্প কিছু ধরনের সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ করতে পারতেন। চিকিৎসা বিজ্ঞানের এই অগ্রগতিগুলো বাকের এবং তার স্বাস্থ্য বিভাগের অনেক সাহায্যে এসেছিল। 

বাকের এবং তার সহকর্মীরা ব্যাকটেরিয়া পরীক্ষা, রোগ নির্ণয় এবং লোকেদের টিকা দিতে শুরু করে। তবে যখন বাকের কাজ শুরু করলেন তিনি দেখেন, তার কয়েকজন সহকর্মী ঠিকভাবে সরঞ্জামগুলো ব্যবহার করছেন না। তাদের প্রথম কাজ ছিল স্কুলের শিশুদের পরীক্ষা করা। অসুস্থ শিশুদের তারা পরীক্ষা করে চিকিৎসা দিতেন। ১৯৩৯ সালে বাকের তার আত্মজীবনী লিখেছিলেন। সেখানে তিনি তার এই কাজকে করুণ প্রহসন বলে উল্লেখ করেন। 

১৯০৭ সালে, বাকেরকে স্বাস্থ্য কমিশনারের সহকারী হিসেবে পদোন্নতি দেয়া হয়। তার ব্যক্তিগত আগ্রহ ক্রমবর্ধমান শিশু এবং শিশু স্বাস্থ্যের দিকে পরিণত হয়। এক বছরের মধ্যে, তিনি নিউইয়র্ক সিটি স্বাস্থ্য বিভাগের অধীনে গঠিত শিশু হাইজিন ব্যুরোর পরিচালক নিযুক্ত হন। তিনি তার সমস্ত মনোযোগ শিশুদের স্বাস্থ্য রক্ষার কাজে দেন। শিশু মৃত্যুহার মোকাবিলায় তৈরি করেন আলাদা স্বাস্থ্য বিভাগ। এরপর তিনি পৌরসভার প্রথম নারী সদস্য নিযুক্ত হন। 

তখন তিনি মানুষকে গৃহ নির্মাণের জন্য নানা পরামর্শ দিতে থাকেন। গৃহে সঠিকভাবে স্যানিটেশনের ব্যবস্থা, সুরক্ষিত জায়গায় রান্নাঘর তৈরির পরামর্শ দেন। ১৯১১ সালের মধ্যে, নিউ ইয়র্ক সিটি-তে শিশুমৃত্যুর হার হ্রাস পায় ৪০ শতাংশ। বাড়ির বাইরে কাজ করা মায়েদের সহায়তার জন্য, বেকার লিটল মাদারস লিগ গঠন করেন।

টাইফয়েড মেরিকেও পরীক্ষা করেন বাকেরসেখানকার সদস্য ছিল ১২ থেকে ১৬ বছর বয়সী ছেলেমেয়েরা। তারা বাবা-মায়ের অবর্তমানে ঘরে থাকা ছোট ভাই-বোনদের কীভাবে যত্ন নেবে তা শেখানো হত। এছাড়াও তাদের স্বাস্থ্য সচেতনতা, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকার বিষয়ে শিক্ষা দেয়া হয়েছিল। এখানে উপস্থিতির ভিত্তিতে মেয়েদের ব্যাজ এবং পুরষ্কার দেয়া হত। ১৯১৫ সালের মধ্যে ২৫ হাজার মেয়ে তার ফাউন্ডেশনের তালিকাভুক্ত হয়। 

বেকার নতুন কিছু চেষ্টা করার সিদ্ধান্ত নেন। বাকেরের আত্মজীবনীর ভূমিকাতে ইতিহাসবিদ হেলেন এপস্টেইন লিখেছেন, বাকের বৈজ্ঞানিকভাবে প্রথম প্রমাণ করেছিলেন, শিশুদের মায়ের ভালোবাসার প্রয়োজন। মায়ের ভালোবাসা শিশুর মনস্তাত্ত্বিক এবং শারীরিক বিকাশের জন্য খুবই কার্যকরী। তিনি পরবর্তীতে নিউইয়র্ক মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ পান। 

১৯০৭ সালে বাকের টায়ফয়েড মেরি ম্যালনের রক্ত এবং প্রস্রাবের নমুনা সংগ্রহ করতে যান। তবে মেরি তাতে একেবারেই রাজি ছিল না। ম্যালন টাইফয়েড জ্বরের প্রথম বাহক। তিনি অসুস্থ না হয়েও এই রোগের জীবাণু বহন করতেন এবং ছড়িয়ে দিতে পারতেন। তিনি মূলত রান্নার কাজ করতেন। আর প্রস্তুতকৃত খাবারের মাধ্যমে অজান্তেই তিনি এই রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটিয়েছিলেন। যার ফলে ৫৩ জন টাইফয়েডে আক্রান্ত হন এবং নয়জন মারা যায়।

শিশুমৃত্যু হার ঠেকাতে তিনি বিশেষ পদক্ষেপ নেনবাকের যখন ম্যালনের কাজের জায়গায় পৌঁছান। তখন ম্যালন তার রক্ত দিতে অস্বীকার করে এবং পালিয়ে যায়। ম্যালনকে খুঁজে পেতে বাকের ও পুলিশ অফিসারদের দুইদিন লেগেছিল। হাসপাতালের পরীক্ষাগারে টাইফয়েড ব্যাকটেরিয়ার সত্যতা পাওয়া যায়। এরপর ম্যালনকে তিন বছরের জন্য স্বাস্থ্য বিভাগের হেফাজতে নিবিড় পরিচর্যায় রাখা হয়। তাকে রান্নার কাজ না করার প্রতিশ্রুতি অনুসারে মুক্তি দেয়া হয়েছিল। 

তাকে লন্ড্রির চাকরি দেয়া হয়। যাতে ম্যালন রোজগার করতে পারে। তবে এ কাজে কম উপার্জন হত বলে ১৯১৫ সালে, ম্যালন আবার রান্নার কাজ শুরু করেন। আবার টাইফয়েডের প্রাদুর্ভাব বাড়তে থাকে। বাকের তাকে দ্বিতীয়বারের মতো আবিষ্কার করেন। নিউইয়র্ক সিটির পূর্ব নদীর নর্থ ব্রাদার দ্বীপে সারা জীবন ম্যালনকে নির্বাসনে পাঠানো হয়। সেখানেই ২৬ বছর পর তিনি মারা যান।  

বাকের ১৯৪৪ সালে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। সারা বাকেরের কাজে আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি অনেকটাই ঋণী বলা যায়। তিনি শিশু মৃত্যুহার কমিয়ে এনেছিলেন। সেই সঙ্গে মায়ের স্বাস্থ্য, স্যানিটেশন সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করে তুলেছিলেন।  

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস