৭২ বছর বয়সী ‘সিরিয়াল কিলার’ গ্র্যানি রিপার
Best Electronics

৭২ বছর বয়সী ‘সিরিয়াল কিলার’ গ্র্যানি রিপার

তুনাজ্জিনা জাহান রেমি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৩:০১ ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯   আপডেট: ১৩:০২ ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

তার হাসিখুশি বাদামী চোখ এবং পাখির বাসার মত ঘাড় পর্যন্ত চুল সহ মুখমন্ডল দেখে যে কেউ তাকে একজন বিনয়ী ভদ্রমহিলা বলেই ভাববে কিন্তু ৭২ বছর বয়সী এই তামারা স্যামসনভাকে যতই বিনীত মনে হোক না কেন, তিনি আধুনিক সময়ের রাশিয়ার সবচেয়ে ধূর্ত ও ভয়ংকর মহিলা সিরিয়াল কিলার। তার মত সিরিয়াল কিলার সাধারণত খুব কমই খুঁজে পাওয়া যাবে কেননা তিনি শুধু খুন করেই ক্ষান্ত হতেন না বরং রাশিয়ার পুলিশদের ধারনা তামারা স্যামসোনোভা একজন নরখাদকও! হত্যার পর খুনীর অঙ্গ প্রত্যঙ্গ ছুরি বা করাত দিয়ে টুকরো টুকরো করে ফেলতেন। ধরা পড়ার পর তাকে ‘গ্র্যানি রিপার’ খেতাব দেয়া হয়। 

সবচেয়ে অবাক করার মত তথ্যটি হচ্ছে, এই গ্র্যানি রিপার তার প্রতিটি খুনের সূক্ষ্ম বর্ণনা লিখে রাখতেন তার গোপন ডাইরিতে। বর্তমানে তিনি তার স্থানীয় সেন্ট পিটার্সবার্গ জেলের হেফাজতে রয়েছেন। রাশিয়ার তদন্তকারী কমিটি যা কিনা যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআইয়ের সমগোত্রীয় বলে তুলনা করা হয়, সে কমিটি তদন্ত করে মত প্রকাশ করেন যে, তামারা এখন পর্যন্ত ১১টি হত্যা করেছেন এবং তাদের মৃতদেহ টুকরো টুকরো করে বিভিন্ন অঙ্গ আলাদা আলাদা স্থানে লুকিয়ে ফেলেছেন। এমনকি তার হাতে খুন হন ৭৯ বছর বয়সের এক বৃদ্ধা যার দেখাশোনার ভার তার উপর ন্যস্ত ছিল। শুধু তাই নয়, তার স্বামীকেও তিনি খুন করেন যে কিনা এক দশক ধরে নিখোঁজ ছিলেন। 

এমনকি আরো বিস্ময়কর তথ্য তদন্তকারীদের কাছ থেকে দেয়া হয়েছে যে তামারা তার কিছু কিছু শিকারের ক্ষেত্রে ক্যানিবালিজম করেছেন। ক্যানিবালিজম বা নরমাংস ভক্ষণ মানে হচ্ছে মানুষের এমন এক ধরনের আচরণ যেখানে একজন মানুষ আরেকজনের মাংস ভক্ষণ করে। তবে এর অর্থ আরো বাড়িয়ে প্রাণীতত্ত্বে বলা হয়েছে, কোনো প্রাণীর এমন কোনো আচরণ যেখানে সে তার নিজের প্রজাতির মাংস আহার করে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে এটি তার সহযোগীও হতে পারে। সেন্ট পিটার্সবার্গ পুলিশও এই তথ্য সম্পর্কে নিশ্চয়তা দেয়। মৃত শরীরের অঙ্গগুলোর মধ্যে তার সবচেয়ে পছন্দ ছিল ফুসফুস। রাশিয়ান ক্যানিবাল হত্যাকারী আন্দ্রেই চিকাতিলোর অনেক বড় ফ্যান ছিলেন তামারা, যিনি ১৯৭৮ থেকে ১৯৯০ এর মধ্যে কমপক্ষে ৫২ জনকে হত্যা করেছিলেন। 

গ্রানি রিপার পেশায় ছিলেন একজন হোটেল কর্মী। তবে চাকরি ছেড়ে দেন বহু বছর আগে। খুব আকস্মিকভাবেই। ২০১৫ সালের শুরুর দিকে তিনি বড় দেখে একটি প্লাস্টিক ব্যাগে করে কিছু একটা টেনে টেনে নিয়ে যাচ্ছিলেন বাড়ির বাইরে। বাড়ির সামনে থাকা একটি সিসি টিভি ক্যামেরায় দৃশ্যটি ধরা পড়ে। ব্যাগের আকার এবং সেটি বহনের ভঙ্গি দেখে বিষয়টি পুলিশের অস্বাভাবিক মনে হয় । দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে একের পর এক হত্যাকাণ্ড চালিয়ে গেছেন তামারা, অথচ শুধুমাত্র শেষবার ছাড়া কখনোই তিনি পুলিশকে সন্দেহের কোনো সুযোগ দেননি। এমনকি কখনো খুনের কোনো প্রমাণও তিনি রেখে যাননি। হত্যাকাণ্ডের পর মৃতদেহের মস্তিস্ক, হাত পা কেটে দেহ থেকে আলাদা করে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গুম করে ফেলতেন শহরের বিভিন্ন স্থানে। রাশিয়ার পুলিশের ধারনা তামারা নিহতদের নির্দিষ্ট কিছু অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ভক্ষণ করতেন। কেননা উদ্ধার হওয়া মৃতদেহগুলির মস্তিষ্ক, কলিজা এবং ফুসফুস এখন পর্যন্ত কখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি। ২০০৫ সালে তামারার স্বামী নিখোঁজ হন। পুলিশদের ধারণা তিনিই তার স্বামীকেও একই কায়দায় খুন করে লাশ গুম করে ফেলেছেন।

তামারার এক অদ্ভুত ব্যাপার ছিল যে সে তার ডায়েরিতে সব লিখে রাখতেন। ডায়েরিতে একটি হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা দিতে গিয়ে তামারা লিখেছেন, ‘আমি আমার ভাড়াটে মহিলা ভলিডিয়াকে হত্যা করেছি। তার মৃতদেহ বাথরুমে ফেলে ছুরি দিয়ে টুকরো টুকরো করে প্লাস্টিকের ব্যাগে ভরেছি। পরে সেগুলো ফ্রুনজেনস্কি জেলার বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ফেলে দিয়েছি।’ তামারার সর্বশেষ শিকার তার বান্ধবী উলনোভা। চায়ের কাপ পরিষ্কার করে না ধুয়ে আনায় বান্ধবীর ওপর রেগে গিয়েছিলেন এই ভয়ঙ্কর নারী। এর প্রতিশোধ একদিন চায়ের সঙ্গে অতিরিক্ত মাত্রায় ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে দেন তামারা। ভেবেছিলেন এতে হয়তো তার মৃত্যু হবে কিন্তু উলনোভা শুধু জ্ঞান হারিয়েছিলেন। ওই অবস্থায়ই তাকে হ্যাক্সো ব্লেড দিয়ে কেটে টুকরা টুকরা করেন তামারা। পরে এসব খণ্ডিত অংশ একটি প্লাস্টিকের ব্যাগে ভরে সেন্ট পিটার্সবার্গের দিমিত্রোভা স্ট্রিটের কাছে একটি পুকুরে ফেলে দেন। উলনোভার দেহাবশেষ ফেলতে গিয়েই পুলিশের নজরে পড়ে যান তামারা। একই সড়কে ১৬ বছর আগে এক ব্যবসায়ীর খন্ডিত দেহ পাওয়া গিয়েছিল। তামারার বাড়ি তল্লাশি করে পরবর্তীতে ওই ব্যবসায়ীর ভিজিটিং কার্ড পাওয়া যায়। তার ডায়েরির সঙ্গে আরো নানা ধরণের জ্যোতিষশাস্ত্র এবং কালো জাদুর বই পাওয়া যায়। 

পুলিশ চেষ্টা চালিয়া যাচ্ছে যে তাদের কাছে যত অমীমাংসিত গুম হয়ে যাওয়ার মামলা রয়েছে তাদের কারো খবর তার কাছ থেকে পাওয়া যায় নাকি। তাকে যেদিন প্রথম আদালতে হাজির করা হয় তিনি সাংবাদিকদের দিকে তাকিয়ে ফ্লাইং কিস দিতে থাকেন এবং নানা ধরণের হাসি ঠাট্টা করতে থাকেন। তিনি বিচারককে বলেন, "আমি দোষী এবং শাস্তি পাওয়ার যোগ্য। আমি এই বিচারের জন্য ১০ বছর ধরে প্রস্তুতি নিচ্ছি। আমার এসব কাজই ইচ্ছাকৃত।" গ্রেপ্তারের পর পুলিশের কাছে সব দোষ স্বীকার করেছেন তামারা। তিনি জানিয়েছেন, গ্রেপ্তারের জন্য তার প্রস্তুতি ছিল এবং শেষ হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে এই সবকিছুর সমাপ্তি তিনি টেনেছেন।
 

জানা যায় যে তামারা মস্কো স্টেট ভাষাবিদ্যা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজী ও জার্মান বিষয়ে অধ্যয়ন করেছিলেন কিন্তু তার মানসিক অসুস্থতার ইতিহাস রয়েছে এবং তাকে তিনবার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এসব তথ্যও তার ডায়েরি থেকেই পাওয়া যায়। ১৫ বছর ধরে তার সবচেয়ে কাছের প্রতিবেশী ছিলেন ৫৩ বছর বয়সী সঙ্গীতশিল্পী মারিয়া ক্রভেনকো এবং তিনি জানান পাঁচ বছর আগে পর্যন্তও তামারা ভাড়াটেদের ফ্ল্যাট ভাড়া দিয়ে চলতেন এবং প্রায়ই তার ফ্ল্যাটে বসবাসকারী বিভিন্ন যুবক বা মেয়েদের থাকতে দেখেছি। আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম কেন তিনি একটি রুম ভাড়া করার পরিবর্তে চাকরি খুঁজে নিচ্ছেন না কিন্তু তিনি বলেন যে তিনি অসুস্থ এবং এটি প্রমাণ করার জন্য বেশ কিছু মেডিকেল কাগজপত্রও দেখান। ২০১৫ সালের জুলাইয়ে ভয়ঙ্কর এই সিরিয়াল কিলারকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়। আদালতে দোষ স্বীকার করে তিনি বলেছেন, আমি অপরাধী, তাই আমার শাস্তি পাওয়া উচিত কিন্তু কেন তিনি এতগুলো খুন করেছেন তার কারণ তিনি ব্যাখ্যা করেননি।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস

Best Electronics