৭০ বছর পূর্বে মৃত্যু, তার শরীরের ‘অমর কোষ’ আজো উৎপাদিত হচ্ছে! 

৭০ বছর পূর্বে মৃত্যু, তার শরীরের ‘অমর কোষ’ আজো উৎপাদিত হচ্ছে! 

মো. হাসানুজ্জামান ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৫:৪২ ২৭ জুন ২০২০   আপডেট: ১৬:০২ ২৭ জুন ২০২০

ছবি: হেনরিয়েটার শরীরে ছিল হেলা কোষ

ছবি: হেনরিয়েটার শরীরে ছিল হেলা কোষ

অধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে অসংখ্য গবেষণা এবং আবিষ্কারের সঙ্গে ‘হেলা’কোষ ওতপ্রতোভাবে জড়িত। চিকিৎসা বিজ্ঞানের গবেষণার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে ‘হেলা’ কোষ। এই বিশেষ কোষটি অমর হিসেবে পরিচিত। 

তবে অবাক করা বিষয় হলো, এই কোষটি যার শরীরে পাওয়া যায় বেঁচে থাকতে তিনিও জানতেন না বিষয়টি। এমনকি তার মৃত্যুর কয়েক দশক পরে মিলেছিল এই অমূল্য অবদানের স্বীকৃতি। এক নারীর শরীরে মিলেছিল অমূল্য এই কোষ। এতে করে বদলে যায় আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থা। সেই মহীয়সী নারীর অবদান নিয়েই এই লেখা।  

হেনরিয়েটা একজন আফ্রিকান-আমেরিকান নারী ছিলেন। তিনি ১৯২০ সালে ভার্জিনিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে তার মৃত্যু হয় ১৯৫১ সালের ৪ অক্টোবর। তার কোষগুলো ‘হেলা’কোষ লাইনের উৎস। যা প্রথম অমর মানব কোষের লাইন। এটি চিকিৎসা গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ সেল লাইন। একটি অমর সেল লাইন নির্দিষ্ট অবস্থার অধীনে অনির্দিষ্টকালের জন্য পুনরুৎপাদন করে।   

‘হেলা’ সেল লাইন আজ অবধি অমূল্য মেডিকেল ডেটার উৎস হিসেবে অবিরত রয়েছে। হেনরিয়েটা ল্যাকসের জন্ম এবং বেড়ে ওঠা ভার্জিনিয়াতে। ১৯২০ সালের ১লা আগস্ট তার জন্ম। প্রথমে তার নাম ছিল লরেটা প্লিজান্টা। পরবর্তীতে তার নাম হয় হেনরিয়েটা ল্যাকস। হেনরিয়েটার চার বছর বয়সের সময় তার মা মৃত্যুবরণ করে। তার বাবা এরপর অনেকটা উদাসীন হয়ে পড়েন। শিশু হেনরিয়াটার দেখাশুনা করা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। 

হেনরিয়েটহেনরিয়েটাকে তিনি ক্লোভার শহরে দাদা টমি ল্যাকসের কাছে পাঠিয়ে দেন। তার দাদার একান্নবর্তী পরিবার ছিল। সেখানে তার অন্যান্য চাচাত ভাই বোনেরা বসবাস করত। ডেভিড ল্যাকস ছিলেন তার চাচাত ভাই। ভবিষ্যতে তার সঙ্গেই হেনরিয়েটার বিয়ে হয়। বিয়ের কয়েক বছর পর তারা ম্যারিল্যান্ডে বসবাস শুরু করে। ১৯৫০ সালের মধ্যেই হেনরিয়েটার পাঁচ সন্তানের জননী হন।  

তার শেষ সন্তান জন্ম নেয় ১৯৫০ সালে। এরপর তার অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয় এবং তার পেটে ব্যথা বাড়তে থাকে। চিকিৎসকরা তাকে পরীক্ষা করার পরামর্শ দেয়। হেনরিয়েটা ম্যারিল্যান্ডের যে অঞ্চলে বসবাস করতেন সেখানে একমাত্র জন হপকিন্স হাসপাতাল কৃষ্ণাঙ্গদের চিকিৎসা সেবা প্রদান করত। ১৯৫১ সালের ২৯ জানুয়ারি হাসপাতালে গিয়েছিলেন। 

জন হপকিন্স হাসপাতালের চিকিৎসক হাওয়ার্ড জোন্স পরীক্ষার পর হেনরিয়েটাকে জানায় তিনি জরায়ুর ক্যান্সারে আক্রান্ত। তবে পরিবারের কাছে নিজের ক্যান্সারের কথা প্রথম অবস্থায় গোপন রেখেছিলেন এই নারী। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী, হেনরিয়েটা নিয়মিত হাসপাতালে যাওয়া শুরু করেন। সে সময় হাসপাতালে ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য রেডিয়াম থেরাপি প্রয়োগ করা হতো। 

রেডিয়াম দেহে জন্ম নেয়া ক্যান্সার কোষ ক্ষয় করতে পারলেও তা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর ছিল। ফলে হেনরিয়েটার স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটতে থাকে। কোষ বিজ্ঞানী জর্জ ওটো গে সে সময় জন হপকিন্স হাসপাতালে কোষ বিভাজন নিয়ে গবেষণা করছিলেন। এ বিষয়ে তিনি প্রায় ৩০ বছর গবেষণারত ছিলেন। তিনি গবেষণার মূল বিষয় ছিল, দীর্ঘস্থায়ী টিস্যু তৈরির চেষ্টা। 

হেনরিয়েটা ও তার স্বামীজর্জ গে হেনরিয়েটার ক্যান্সারের খবর পেয়ে আগ্রহ নিয়ে তাকে দেখতে আসেন। তিনি হেনরিয়েটার ক্যান্সার কোষের নমুনা কেটে নিজের গবেষণাগারে সংরক্ষণ করেন। তবে তিনি হেনরিয়েটাকে না জানিয়েই এটা করেছিলেন।জর্জ গে গবেষণাগারে হেনরিয়েটার কোষগুলো বিভাজিত হওয়ার সময় কিছু অস্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করলেন।

অন্যান্য ক্যান্সার কোষ গবেষণাগারে সাধারণত কয়েক দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকে। তবে হেনরিয়েটার নমুনা কোষগুলো বেশ কয়েক সপ্তাহ পর দেখা গেল তা বিভাজিত হচ্ছে। (জীব কোষের বিভক্তির মাধ্যমে একটি থেকে দুটি বা চারটি কোষের সৃষ্টি হয় তাকে কোষ বিভাজন বলে)। 

জর্জ গে হেনরিয়েটার কোষগুলো আলাদা করে ভিন্ন ভিন্ন পাত্রে কোষ উৎপাদন করতে থাকেন। এই উচ্চ বৃদ্ধিহার সম্পন্ন টিস্যুগুলোর নাম দেয়া হয় ‘হেলা’ কোষ। যা ২০ শতকের চিকিৎসা বিজ্ঞানের জন্য বিস্ময় সৃষ্টি করে। জর্জ গে তার হেলা কোষের নমুনা দেশের বিভিন্ন বড় বড় গবেষণাগারে পাঠান। দ্রুত বিজ্ঞানমহলে এই কোষ নিয়ে সাড়া পড়ে যায়। 

কোষ নষ্ট হয়ে যাওয়ার প্রতিবন্ধকতায় এতদিন যেসব গবেষণা বন্ধ ছিল, সেগুলো নতুন করে শুরু করা হয়। ১৯৫১ সালের ৪ অক্টোবর হেনরিয়েটা ল্যাকস মৃত্যুবরণ করেন। জন হপকিন্সে তার মৃত দেহের ময়না তদন্তের সময় জর্জ ওটো গে এবং তার সহকারী আরো কোষ সংগ্রহ করেন। ময়না তদন্তে জানা যায়, ক্যান্সার তার পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়েছিল। 

ভার্জিনিয়ার হ্যালিফ্যাক্স কাউন্টিতে ল্যাকসটাউন নামের পারিবারিক সমাধিস্থলে হেনরিয়েটাকে সমাধিস্থ করে হয়েছিল। সে সময় তার সমাধি মার্ক করা হয়নি। তার মৃত্যুর কয়েক দশক পরে তার সমাধি চিহ্নিত করে এপিটপ সংযুক্ত করা হয়। বায়মেডিকাল গবেষণায় ‘হেলা’ কোষ ধীরে ধীরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে থাকে। 

হেলা কোষ১৯৫৪ সালে জোনাস সাল্ক পোলিও ভ্যাকসিন তৈরির জন্য তার গবেষণায় ‘হেলা’ কোষ ব্যবহার করেছিলেন। গবেষণার জন্য ‘হেলা’ কোষের চাহিদা বিশ্বব্যাপী বৃদ্ধি পায়। ক্যান্সার, এইডস, বিকিরণ এবং বিষাক্ত পদার্থের প্রভাব, জিন ম্যাপিং এবং অন্যান্য অসংখ্য বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানীদের কাছে পাঠানো হয়। ১৯৫৫ সালে প্রথম মানব কোষ হিসেবে ‘হেলা’ কোষ সফলভাবে ক্লোন করা হয়। 

গবেষণার জন্য ১৯৫০ এর দশক থেকে ৫০ মিলিয়ন ‘হেলা’ কোষ উৎপাদিত হয়েছে। ‘হেলা’ কোষ থেকে গবেষণা করে অন্তত ১১ হাজার বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবন হয়েছে। হেনরিয়েটা মৃত্যুর পূর্বে তার কোষ ব্যবহারের কথা জানতে পারেননি। এমনকি তার পরিবারও প্রায় আড়াই দশক পরে এই তথ্য জানতে পারেন।  

১৯৭০ এর দশকের শুরুর দিকে বেশিরভাগ গবেষণাগারে ‘হেলা’ কোষ অন্যান্য কোষগুলো দূষিত করে দিয়েছিল। সে সময় গবেষকরা ‘হেলা’ কোষ এবং অন্যান্য কোষের পার্থক্য করার জন্য হেনরিয়েটার পরিবারের রক্তের নমুনা সংগ্রহের চেষ্টা করেছিলেন। তার পরিবারের সদস্যদের রক্তের নমুনা দেয়ার জন্য বারবার অনুরোধ করা হচ্ছিল। তারা কিছুই বুঝতে পারছিলেন না কেন তাদের রক্তের নমুনা নেয়া হচ্ছে?

১৯৭৫ সালের একটি ডিনার-পার্টিতে কথোপকথনের সময় তার পরিবারের সদস্যরা প্রথম জানতে পারেন হেনরিয়েটা ল্যাকসের কোষ নিয়ে চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা গবেষণা চালাচ্ছে। সে কারণেই তার পারিবারের সদস্যদের রক্তের নমুনা চাওয়া হচ্ছে। কোষ সংগ্রহ ও গবেষণার জন্য হেনরিয়েটা ল্যাকস কিংবা তার পরিবারের কাছ থেকে অনুমতি নেয়া হয়নি। সে সময় অবশ্য অনুমতির প্রয়োজন ছিল না। 

কোষগুলো চিকিৎসা বিষয়ক গবেষণা এবং বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হত। ১৯৮০ এর দশকে পারিবারিক সম্মতি ছাড়াই পারিবারিক মেডিকেল রেকর্ডগুলো প্রকাশিত হয়েছিল। ১৯৯০ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার রিজেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের বনাম মুর এর মামলায় ক্যালিফোর্নিয়ার সুপ্রিম কোর্টে অনুরূপ একটি বিষয় উত্থাপিত হয়েছিল। 

আদালত রায় দিয়েছিল যে কোনো ব্যক্তির ফেলে দেয়া কিংবা বিচ্ছিন্ন কোষ এবং টিস্যু তাদের সম্পত্তি নয়। সেগুলো বাণিজ্যিকীকরণ হতে পারে। ২০১৩ সালে গবেষকরা ‘হেলা’ কোষগুলোর স্ট্রেনের জিনোমের ডিএন ক্রম প্রকাশ করেছিল। রেবেকা স্ক্লুট ‘দ্য ইমর্টাল লাইফ অব হেনরিয়েটা ল্যাকস’ গ্রন্থে হেনরিয়েটার জীবন ও অবদানের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেন। ২০১০ সালে গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। 

হেনরিয়েটার সমাধিরেবেকা স্ক্লুট হেনরিয়েটা ল্যাকসের পরিবারকে বিস্তারিত তথ্য জানিয়েছিলেন। ল্যাকস পরিবার তাদের জিনগত তথ্যের পাবলিক এক্সেস থাকার বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছিল। পরবর্তীতে ন্যাশনাল ইনিস্টিটিউট অব হেলথ এর সঙ্গে ল্যাকস পরিবারের একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ‘হেলা’ কোষের স্বীকৃতি স্বরূপ ১৯৯০ এর দশকের মাঝামঝি সময় থেকে বেশ কিছু উদ্যোগ করা হয়। 

১৯৯৬ সালে ‘মোরহাউজ স্কুল অব মেডিসিন’ প্রথম ‘হেলা’ বার্ষিক নারী স্বাস্থ্য সম্মেলন করেছিল। চিকিৎসক রোল্যান্ড প্যাটিলোর নেতৃত্বে এই সম্মেলনটি হেনরিয়েটা ল্যাকসের অবদান মূল্যায়ন এবং স্বীকৃতি প্রদানের জন্য অনুষ্ঠিত হয়। অটলান্টার মেয়র ১১ অক্টোবর ১৯৯৬ সালের প্রথম সম্মেলনের তারিখ ‘হেনরিয়েটা ল্যাকস ডে’ ঘোষণা করেন। 

তৎকালীন মার্কিন কংগ্রেস সদস্য রবার্ট এহরলিস হেনরিয়েটার অবদানের স্বিকৃতির জন্য একটি কংগ্রেশনাল রেজোলিউশন উপস্থাপন করেছিলেন। ২০১০ সালে, জন হপকিন্স ইনস্টিটিউট ফর ক্লিনিকাল অ্যান্ড ট্রান্সলেশনাল রিসার্চ হেনরিয়েটা ল্যাকস এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানে ‘হেলা’ কোষের অবদানের প্রতি সম্মান জানাতে বার্ষিক হেনরিয়েটা ল্যাকস মেমোরিয়াল লেকচার সিরিজ প্রতিষ্ঠা করে। 

২০১৮ সালে বিশ্ববিদ্যালয়টি তাদের একটি নতুন ভবনের নামকরণ করেছে হেনরিয়েটার নামে। বিশ্বের বিখ্যাত অনেক প্রতিষ্ঠান তার সম্মানে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। হেনরিয়েটার ক্যান্সার ধরা পড়ার নয় মাস পর মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুর কয়েক দশক পর তার অজানা অবদানের স্বীকৃতি মেলে। তবে চিকিৎসা বিজ্ঞানে অপরিসীম অবদানের জন্য তার কোষের মতোই তিনিও অমর হয়ে থাকবেন নিঃসন্দেহে। 

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস